Search This Blog

Saturday, June 8, 2019

হৃদয়বিনিময়

এই যে আমার হৃদয়, এ তোমার হোক । 
এই যে তোমার হৃদয়, এ আমার হোক ।

না । কোনও সাম্প্রতিক প্রণয়কবিতার পঙক্তি নয় এটি । শত শত বছর ধরে, কতো শত বছর আমি জানি না, হিন্দুবিবাহে উচ্চারিত মন্ত্রের বঙ্গানুবাদ । যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব; যদিদং হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম । এই হৃদয়বিনিময়ের মন্ত্রটি বিবাহ অনুষ্ঠানের কলরোল, নারীপুরুষের সম্মিলিত হাসির আওয়াজ, স্টিরিওফোনিক শব্দের অত্যাচারের ভিতর ডুবে যায় । না পাত্র, না পাত্রী, না পুরুতঠাকুর, কেউই সংস্কৃত জানেন না, জানলেও এর তাৎপর্য বুঝবার মত পরিশীলন নেই প্রায়শই তাঁদের মনে । কত বড় একটা কথা কত সহজে, কত অক্লেশে মানুষ উচ্চারণ করে, এ মন্ত্র তার উদাহরণ । মনন নেই, পরিশীলন নেই, প্রয়োগ নেই জীবনে । এ এমন এক মন্ত্র, যা অতীন্দ্রিয় কোনও তত্ত্ববিষয়ক নয়, একেবারেই মানবিক কথাগুলি, মানুষের গভীরতম অন্তর্লীন প্রার্থনা এই মন্ত্রে ভাষা পেয়েছে । 

যাকে আমি ভালোবাসি, তার সঙ্গে আমি এক হতে চাই । একত্বের প্রতি আকর্ষণ জীবকুলের সহজাত । বিচ্ছেদ সর্বদাই অনাকাঙ্খিত, আকস্মিক । বিচ্ছেদ স্বাভাবিক নয়, আরোপিত এবং স্বরচিত । সনাতন শাশ্বতধর্মে মিলনকে, ঐক্যকে স্বাভাবিক বলা হয়েছে । অপরপক্ষে বৌদ্ধধর্মে বিচ্ছেদকেই স্বাভাবিক, চতুরার্য সত্যের প্রথম সত্য বলা হয়েছে । হিন্দু ধর্মের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের এইখানে সূক্ষ্ম প্রভেদ । হিন্দু বলবেন, না । মিলনই স্বাভাবিক, বিচ্ছেদ নয় । আর সেই মিলন মানুষের দেহে দেহে নয়, মনের সঙ্গে মনেও নয়; সে মিলন আত্মায় । আত্মা এক ও অখণ্ড । তাতে দ্বিধা নেই, দ্বৈত নেই । একত্ব তাই আত্মার স্বরূপ । আর যা স্বরূপ, তাই তো স্বাভাবিক ।

বেশ কথা । কিন্তু তা হলে মনের সঙ্গে মনের মিলনের কথা বলা হল কেন এখানে? মিলন তো আত্মায় । আর আত্মা তো মন নয়, মনের অতীত । মনের পেছনে মনের থেকে স্বতন্ত্রভাবে আত্মার অধিষ্ঠান । এখানে মনের সঙ্গে মনের মিলের কথা বলা হল --অথচ মনের সঙ্গে মনের কি মিল হতে পারে? এক মনের সঙ্গে অন্য মনের পার্থক্য আছে । দুটো মন এক হবে কী করে? আমার মন তো আমারই মন, সে মন অন্যের মনের সঙ্গে এক হতে পারে কখনও?

এই প্রশ্নটি নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই দেখব, 'আমার মন' কথাটার মধ্যে কী পরিমাণ অহংকার লুকিয়ে আছে । এটা আমার মন, আমারই মন । এ মন আমার সম্পত্তি ! কী ভয়ঙ্কর অহংকার ! একটু নিজের মনের দিকে তাকালেই আমি বুঝব, যাকে আমি বলছি 'আমার মন', তা গড়ে উঠেছে কত মানুষের দানে, পিতামাতা বন্ধুমিত্র শিক্ষকগ্রন্থ পরিজন -- কত মানুষের চিন্তার আকলন করে কত জন্ম ধরে গড়ে উঠেছে এই মন, যাকে আমি আজ ভুল করে 'আমার' বলছি । আর যতক্ষণ এই 'আমি' আর 'আমার'-এর স্বৈরতন্ত্র চলবে, ততক্ষণ বিচ্ছেদের বিষে নীল হয়ে থাকবে না আমার স্নায়ুকোষ, আমার হৃদয়?

এ বিষ নাশ করার একমাত্র বিশল্যকরণী -- প্রেম । আর এই প্রেম এমনই এক আশ্চর্য আলোক, যা অহংকারকে গলা টিপে হত্যা করে না, তাকে বড় করে দেয় । এত বড় যে, সে মৎস্যগন্ধা থেকে পদ্মগন্ধা হয়ে যায় । ক্ষুদ্রত্বের অভিমান থেকে বিরাটত্বের আয়তিতে পৌঁছে দেয় । কিন্তু কোন্‌ কৌশলে?

প্রেম বলে, দুটো মন আলাদা, বেশ তো । কিন্তু তুমি তোমার মনটিতে, তোমার হৃদয়টিতে অন্যের অধিকার স্বীকার করে নাও । আর অন্যের হৃদয়টিকে দখল করে নাও । অন্যের হৃদয় হোক তোমারই হৃদয় । তোমার হৃদয় হোক অন্যের । দুজনার মাঝে বেড়া ভেঙে দাও । তোমার প্রিয় যেন তোমার মনের ভিতর আসতে পারে, তোমার হৃদয় হোক তারও সাম্রাজ্য । আর তুমি যেন যেতে পারো তোমার প্রিয়ের হৃদয়পুরে,  প্রিয়ের বা প্রিয়ার হৃদয় হোক তোমারও রাজ্যপাট । দুটি হৃদয় এক হোক, আর সেই একাকার হয়ে যাওয়া, কাঁটাতারহীন, বিভাজকরেখাহীন হৃদয়সাম্রাজ্যের হৃদয়েশ্বর, হৃদয়েশ্বরী হয়ে থাকো তোমরা দুজন ।

এক ভাবে দেখলে, এ শুধু বিবাহের মন্ত্র নয় । জীবনের মন্ত্র । পরিবারজীবনে, সাহিত্যজীবনে, সমাজজীবনে, রাষ্ট্রনৈতিক জীবনে সর্বত্রই এই প্রেমের মন্ত্র সমানভাবে প্রযোজ্য ।

“সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্‌।
দেবাভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে।।( ঋগ্বেদ-সংহিতা ১০।।১৯১।।২ )

-- একসঙ্গে চল,  একভাবে বলো, তোমাদের সকলের মনকে নিয়ে এক বিরাট মন সৃষ্টি ক’র।
পূর্বকালে দেবতারা যেরূপ মিলিতভাবে যজ্ঞের হবিঃ গ্রহণ করতেন, তোমরাও তদ্রূপ মিলিতভাবে জগতের যাবতীয় সম্পদ ব্যবহার ক’র।

"সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানাং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্। ( ঋগ্বেদ-সংহিতা ১০।।১৯১।।৩ )
-- তোমাদের মন্ত্র এক হোক, সঙ্কল্প এক হোক । এক হোক তোমাদের মন ।

আর এই একত্বের প্রার্থনাই তো প্রেমের সারনিষ্কর্ষ ।

লেখক: সন্মাত্রানন্দ
লেখক (পশ্চিমবঙ্গ)

Wednesday, June 5, 2019

জনপ্রিয় বাংলা টাইপ সফটওয়্যার ‘অভ্র’ আবিষ্কার করেও প্রচারের আড়ালে রয়ে গেলেন এই তরুণ ডাক্তার


দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ছিলেন মেধাবী মেহেদী হাসান খান। কিন্তু শিক্ষকরা বলেছিলেন, এই ছেলে ডাক্তার হওয়ার অযোগ্য। মেডিকেল কলেজ ছেড়ে দেওয়া উচিত মেহেদীর। কারণ ডাক্তারির পড়াশুনা বাদ দিয়ে, দিন-রাত এক করে, খাওয়া-ঘুম ভুলে হস্টেলের ঘরেই একটা ছোট্ট কম্পিউটার সম্বল করে  মেহেদী তখন লড়ছিলেন অন্য লড়াই। বাংলা ভাষার জন্য লড়াই।
১৮ বছর বয়সের যুবক স্বপ্ন দেখছিলেন বাংলা ভাষাকে সারা পৃথিবীর কাছে খুব সহজে পৌঁছে দেওয়ার। কম্পিউটারে বাংলা লিখতে তাঁর খুব অসুবিধা হয়, এবং সেই পদ্ধতি মেহেদীর পছন্দ নয়। তাই তিনি চান এমন একটা সফটওয়্যার, যার সাহায্যে ইংরেজি অক্ষরে টাইপ করেই বাংলা লেখা সম্ভব।

বন্ধুরা মেহেদীকে বলে পাগল, ডাক্তারি পড়তে এসে কেউ সময় নষ্ট করে! তাও আবার নাকি বাংলা লেখার সুবিধার্থে! কিন্তু মেহেদী মেহেদীই। বাংলা ভাষার জন্য তাঁর দেশের মানুষ প্রাণ দিতে পারেন, আর সেই বাংলাকে লেখার দিক থেকে সহজ করতে কেরিয়ার বিসর্জন দিতে পারবেন না! হাল ছাড়েননি মেহেদী।
২৬ মার্চ,২০০৩ সাল, মেহেদীর জীবনে শুধু নয়, লক্ষ লক্ষ বাঙালির জীবনের একটি বিশেষ দিন। সেই দিন মেহেদী বিশ্বের সামনে আনলেন ‘অভ্র’ সফটওয়ার। যা আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের সব চেয়ে পছন্দের বাংলা রাইটিং সফটওয়ার। আজ বাঙালির কম্পিউটার, ল্যাপটপ খুললেই স্ক্রিনে একটি স্লোগান ভেসে ওঠে , ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’। এটিই  ডাক্তার মেহেদী হাসান খানের তৈরি করা স্লোগান। তাঁর স্বপ্ন ছিল, ভাষাকে উন্মুক্ত করতে হবে সবার জন্য, বেঁধে রাখা যাবে না জটিলতার নাগপাশে। 

আজ কিন্তু তিনি ডাঃ মেহেদী হাসান খান। হাজার তাচ্ছিল্য সত্ত্বেও তিনি ‘অভ্র’ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছেন ডাক্তারিও। আজ ভারত ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘অভ্র কিপ্যাড’। লেখা হচ্ছে সরকারি ফাইল থেকে পরিচয়পত্র। মেহেদীর এই আবিষ্কার বাঁচিয়ে দিয়েছে দুই দেশের কোটি-কোটি টাকা। যার জন্য এত কিছু, সেই মানুষটাকে আমরা চিনিই না। চিরকাল প্রচারবিমুখ, ৩২ বছরের এই বিনয়ী তরুণ বাংলা ভাষার জন্য এত বড় অবদান রেখে গেলেও, রয়ে গেলেন প্রচারের আলোর বাইরেই।

Tuesday, June 4, 2019

ইতর-বাটপার-অমানুষে ভর্তি একটা দেশে বেঁচে আছি আমরা…


আমরা এমন একটা দেশে বাস করি, যে দেশটা ইতর আর শুওরে ভর্তি। হাঁটতে চলতে এদের দেখা পাবেন, গায়ের সঙ্গে ধাক্কা খাবেন। প্রতিক্রিয়াশীলরা বলে নব্বই পার্সেন্ট মুসলমানের দেশ, সরকার বলে শতভাগ দারিদ্র‍্যমুক্ত দেশ, আমিও সেরকম বলি, নিরানব্বই পার্সেন্ট অমানুষ আর জানোয়ারে ভর্তি একটা দেশ এটা। শুনতে চান কেন?
বাইরের দেশে ব্ল্যাক ফ্রাইডে নামে কেনাকাটার একটা স্পেশাল অকেশন আছে, এই দিনে প্রচুর ছাড় দেয়া হয় অনেক পণ্যে। আর আমাদের দেশে প্রতিটা শুক্রবারই ব্ল্যাক ফ্রাইডে, তবে অন্য অর্থে। শুক্রবারে বাজারে গেলে দামের ঠেলায় আপনি চোখেমুখে অন্ধকার দেখবেন, সেটাই আমাদের ব্ল্যাক ফ্রাইডে।
রোজার মাসে বিশ্বের সব মুসমিলপ্রধান দেশে দেখবেন ব্যবসায়ীরা চেষ্টা করে, যতটা পারা যায় সৎ থাকার। সারাবছর ব্যবসা করলেও, এই একটা মাসে তারা কমবেশি ক্রেতাদের সেবা করার চিন্তাভাবনা করে; ভাবে, মানুষের উপকার করতে পারলে টাকা কামানো না যাক, অন্তত কয়টা নেকি বেশি কামানো যাবে, সেটা হয়তো পরকালে কাজে লাগবে। একই জিনিসটা খ্রিস্টানরা করে বছরের শেষে, বড়দিনের সময়, ভারতেও দুর্গাপূজা আর দিওয়ালির সময় বিশাল বিশাল ছাড়ের অফার দেখি অ্যামাজন/ফ্লিপকার্টে।
আর আমাদের দেশের ইতর বাটপার ব্যবসায়ীরা এই একটা মাসের অপেক্ষায় থাকে। সারাবছর কাস্টোমারের হাত-পা কেটে রাখা এই জানোয়ারের দল রোজার মাসে আল্লাহর নাম মুখে নিয়ে মানুষের গলা কাটার মিশনে নামে। ইফতার আইটেম থেকে কাঁচাবাজার, যেখানেই যান, গলা আপনার কাটা যাবেই। ছোলাবুট থেকে গরুর মাংস, চিনি থেকে তেল- রোজার সময় এমন একটা জিনিস পাবেন না যেটার দাম আগের মাসের তুলনায় বাড়েনি।
বাজারে মুরগী কিনতে যাবেন, চোখের পলকে বাটপারের দল ঝুড়ির ওজনসহ ঢুকিয়ে দেবে। দেড় কেজির মুরগীর সঙ্গে তিনশো গ্রামের ঝুড়ির ওজনটাও দিয়ে আসতে হবে ফাও। রোজার শুরুতে গরুর মাংসের দর বাড়িয়ে চড়িয়ে বেঁধে দেয়া হয় অনেক নাটক করে, সেটাও ব্যবসায়ীরা মানতে চায় না, দুই সপ্তাহের মাথায় তারা ঘোষণা দেয়, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দামে তারা মাংস বিক্রি করতে পারবে না!
৩০০-৩৫০ টাকা যে গরুর মাংসের দাম থাকার কথা ছিল, ঈদের দুইদিন আগে সেটা ৬০০/৭০০ টাকার নিচে পাওয়াই যায় না, এরমধ্যে আবার ২০০-২৫০ গ্রাম হাড়-চর্বির যন্ত্রণা তো ফ্রি আছেই। একটু নির্ঝঞ্ঝাটে বাজার করতে সুপারশপে যাবেন? তারাও ছুরিতে শাণ দিয়ে বসে আছে আপনাকে জবাই করার জন্যে। মেয়াদোত্তীর্ণ মাছ মাংসে ফ্রিজ ভরিয়ে রেখেছে সবাই।
টাকা দিয়েও যদি জিনিসটা ভালো পাওয়া যেতো, তাহলেও হয়তো মেনে নেয়া সম্ভব হতো। একটার পর একটা রেস্টুরেন্টে অভিযান চালানো হয়, আর আমরা দেখি, রংচঙে যে খাবারগুলো আমাদের সামনে পরিবেশন করা হয়, সেগুলোর প্রস্তুতপ্রণালী। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাসী মাংস, ফাঙ্গাস পড়া ব্রেড কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া মেয়াদোত্তীর্ন জিনিসপত্র দিয়ে বানানো খাবারে কি চমৎকারভাবেই না আমাদের আপ্যায়ন করা হয় রেস্টুরেন্টগুলোতে! মাঝারি মানের রেস্টুরেন্টের কথা বাদই দিলাম, কেএফসি বা ডোমিনোসের মতো বিখ্যাত চেইন শপগুলোও যখন এই ভেজালের মিছিলে নাম লেখায়, তখন আমাদের গা শিউরে ওঠে, বড্ড অসহায় লাগে।
এক লাখ দুই লাখ জরিমানার বাহারী খবর শুনি, লাভ কি? দু’দিন পরেই সব ভুলে আমরা উজবুকের দল ছুটে যাই সেই রেস্টুরেন্টগুলোতেই। এসব লাখ টাকার জরিমানা পুষিয়ে নিতে দুইদিনও লাগে না এই হারামীদের, সেটা আমাদের কারণেই। আমরা হাভাতের দল, এদের হাতে হররোজ বাঁশ না খেলে পেটের ভাত তো হজম হয় না আমাদের।
ফলমূলে ফরমালিন দেয়া বন্ধ হয়েছে, কিন্ত আগুন দাম তো রোধ করা যায়নি। এক কেজি মাল্টার দাম কি করে ২০০ টাকা হয়, সেটা আমার মাথায় কোনভাবেই ঢোকে না। মাল্টা কবে থেকে বড়লোকের ফল হয়ে গেল? এই মাল্টা কি উগান্ডা থেকে আমদানী করা? একশো লিচুর নাম করে ষাট-সত্তরটা গছিয়ে দেয়া হবে, অথচ দাম তিনশোর কম রাখবে না কেউ। সারাবছর যে আপেল ১৩০-১৩৫ টাকায় ওঠানামা করে, রোজার মাসে সেটাতে ১৬০-১৮০ টাকার কমে হাতই দেয়া যায় না।
বাসার মহিলারা নিজেদের একটু সুন্দর করে সাজানোর জন্যে ছোটে পারসোনা, ফারজানা শাকিলস- এ। আমরা অবাক হয়ে দেখি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেরিয়ে আসে সেখানকার মেয়াদোত্তীর্ণ কসমেটিকসের সমাহার! তবুও আমাদের বোনেরা, মেয়েরা চাঁদরাতে ছুটবে সেসব জায়গায়, ব্র‍্যান্ড বলে কথা! এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারাই আবার যখন বিশেষ দিবসগুলোতে নারীশক্তি, নারীর স্বাধীনতা, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার ফ্রন্ট পেজে হাসিমুখে সাক্ষাৎকার দেন, তখন আমার মুখ থেকে অটোমেটিক  গালাগাল বেরিয়ে আসে।
কয়েকদিন আগের কথা, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে হঠাৎ অভিযান চালালো ভ্রাম্যমান আদালত। হোটেলগুলোর রান্নাঘরের দুরবস্থা দেখে জরিমানা করা হলো বেশ কয়েকটা হোটেলকে। শুওরের পাল তো দলে ভারী, তারা ইফতার বিক্রি বন্ধ করে দিলো! মানে, আমার খুশি আমি ভেজাল দেবো, নোংরা খাবার খাওয়াবো, এটা আমার মৌলিক অধিকার, কেউ সেখানে বাধা দিতে পারবে না!
সিলেটের কোথায় যেন দেখলাম, ভেজালবিরোধী অভিযান চালাতে আসা এক ম্যাজিস্ট্রেটকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে বাজারের ব্যবসায়ীরা! পরে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করেছে তাকে! এদের ক্ষমতা আন্দাজ করতে পারেন? বাংলাদেশে আসলে ডাক্তারদের শুধুশুধু কসাই বলা হয়, আসল কসাই হচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
এই দেশে ভেজাল খাবার রাখার দায়ে হোটেলকে জরিমানা করলে এরা সবাই মিলে খাবার বিক্রি বন্ধ করে দেবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ রাখার দায়ে ফার্মেসীকে জরিমানা করলে সবগুলো ফার্মেসী মিলে ঔষধ বিক্রি বন্ধ করে দেবে। চালকের অসাবধানতায় দুর্ঘটনা ঘটে যাত্রী বা পথচারীর প্রাণ গেছে? ড্রাইভারকে গ্রেফতার করেই দেখুন, পরিবহণ ধর্মঘট শুরু হয়ে যাবে এক ঘন্টার মধ্যে!
এই দেশের প্রত্যেকটা মানুষ সুবিধাবাদী, আই রিপিট প্রত্যেকটা মানুষ। রাস্তায় বৃষ্টির একটা ফোঁটা পড়ে সারতে পারে না, দুইশো টাকার সিএনজি ভাড়া এক লাফে পাঁচশো টাকা হয়ে যায়। পঞ্চাশ টাকার রিক্সাভাড়ার দূরত্বে কেউ একশো টাকার নিচে যেতে চায় না। যে ধান কৃষক ১২/১৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে সিণ্ডিকেটের কাছে, সেটাই আমরা চাল হিসেবে ৫৫/৬০ টাকায় কিনে খাই। বগুড়ার কৃষক আলুর ন্যায্য দাম না পেয়ে রাস্তায় আলু ফেলে প্রতিবাদ জানায়, অথচ আমরা বছরের কোন ঋতুতেই ১৮-২০-২৫ টাকার কমে আলু পাই না।
আড়ঙ-কে জরিমানা করায় গতকাল ভোক্তা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে কয়েক ঘন্টার মধ্যে খুলনায় বদলি করা হয়েছে! মৌমাছির চাকে ঢিল ছুঁড়ে বসেছেন মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার নামের সেই ভদ্রলোক, রেহাই কি আর আছে? এক সপ্তাহ আগে যে পাঞ্জাবী ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে, সেটাই আজ ১৩০০ টাকার প্রাইসট্যাগ লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছিল আড়ঙে। অভিযোগ পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, জরিমানা করেছে।
আর তার ঘন্টাকয়েক বাদেই চলে এসেছে বদলির ফরমান! অথচ আড়ং কিন্ত স্বীকার করেই নিয়েছে যে, প্রাইস ট্যাগ সংক্রান্ত ভুলটা তাদের তরফ থেকে হয়েছে। অথচ মাশুল গুণতে হচ্ছে সেই সরকারী কর্মকর্তাকে। কারণ তার ওপরওয়ালারা অসন্তুষ্ট হয়েছেন তার ওপর! বাক্সপেটরা গুছিয়ে এখন চলে যাও খুলনা, ঢাকায় তোমার আর থাকা হচ্ছে না বাপু! বিলাসপণ্যের দাম নির্ধারণের আইনটা কিরকম সেটা জানি না, ভোক্তা অধিকারে এই মামলা খাটে কিনা সেটা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন। কিন্ত এই আচমকা বদলির আদেশটা যে ন্যায়সঙ্গত কিছু নয়, সেটা তো পাগলেরও বোঝার কথা।
যেটা বলছিলাম আগে, রোজার মাসে এসব ভণ্ডামি করা মানুষগুলো কিন্ত প্রায় সবাই মুসলমান। এদের বেশিরভাগই রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, কয়েক বছর পরপর হজ আর ওমরাহও করে। এরা জাকাত দেয়, মসজিদে হাজার হাজার টাকা দান করে, এতিমখানায় টাকা দেয়। এগুলো তারা কেন করে জানেন? পাপ মোচনের আশায়। দুনিয়ায় এরা যেভাবে টাকা ঢেলে সবকিছু ম্যানেজ করে রেখেছে, সেভাবেই এরা খোদাকে ঘুষ দেয়, ভাবে, খোদা বুঝি এসব পেয়ে খুশি হবেন, পুলসিরাতের রাস্তাটা কয়েক ফুট চওড়া করে দেবেন এদের জন্যে! এরা স্রষ্টা আর ঘুষখোর আমলা বা রাজনীতিবিদদের এক পাল্লায় মাপে!
এজন্যেই আমার সামনে যখন বাংলাদেশকে কেউ নব্বই পার্সেন্ট মুসলমানের দেশ বলে, আমি একদলা থুথু মাটিতে ফেলে মনে মনে বলি, নিরানব্বই পার্সেন্ট ইতর বাটপার অমানুষ জানোয়ারের দেশ এটা। এরা মানুষ হতে পারছে না, মুসলমান হয়ে লাভ কি? 

শুধুশুধু মুসলমানিত্বের নাম ভাঙিয়ে ইসলাম ধর্মটাকে অপমান করার দরকার আছে কি?

কিশোর কুমার বালা'র কবিতা

অস্তিত্বের প্রশ্নে? 

মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কোষ গুলোতে 
প্রচন্ড তোলপাড় অনুভব করছি
বুক ফেটে কান্নাজুরে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়
ধর্ষিতা জন্মভূমি মাগো
তুমি লজ্জার বালাই ধুয়ে নিলে একাত্তরের রক্ত গঙ্গায়! 

পাত ফোড়ালে ভাতের রাজ্যে 
হাভাতের দল রক্ত খায়
তুমি খাও প্রেতাত্মার স্খলিত বীর্য

কালের বিবর্তনেই মানুষের রক্তে জাগে আদিম নেশা 
সন্ত্রাসবাদ আর কায়েমি শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয় তৃতীয় বিশ্বের মানবতা। 
এই সভ্যতাকে আমি চিরস্থায়ী হতে দেব না 
আধুনিক সভ্যতার নামে পৃথিবীকে ধ্বংসকারীদের গলাটিপে হত্যা করে আমি জন্মদেবো নতুন পৃথিবীর 
কারন পৃথিবীর অনেক দিন বেঁচে থাকা প্রয়োজন।।

প্রচলিত ধর্মগুলো যেমন সনাতন, ইসলাম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার আঁতুড় ঘর

বিদ্যা-বুদ্ধিতে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বলছি, ধর্মবিশ্বাসী তো বটেই, বড় হয়ে যারা নিজেদের জ্ঞান্তবুদ্ধি দিয়ে ধর্মের
অসারতা বুঝতে পেরেছে, তারাসহ প্রায় প্রতিটি মানুষই কমবেশি সাম্প্রদায়িক। কারণ ছেলেবেলা আমরা সর্বপ্রথম যে
জ্ঞানার্জন করি, তার নাম ধর্ম। মুখে বুলি ফোটার আগে, মাতৃভাষা উচ্চারণ ঠিকভাবে শোখার আগেই ধর্ম শিখি। অথচ ধর্মের মধ্যেই যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ, তা বুঝি না, জানি না, পরবর্তীতে কেউ কেউ বুঝলেও ধর্ম, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দাপটে, তা স্বীকার করি না। ধর্ম যদি সাম্প্রদায়িক না-ই হবে, এক ধর্ম যদি অন্য ধর্মকে সম্মানই করবে, ভালোবাসবে, শ্রদ্ধা করবে, তাহলে কী করে এতো ধর্মের সৃষ্টি হলো? অর্থাৎ এক ধর্ম অন্য ধর্মকে আঘাত করে, দোষারোপ করে, খারাপ, এমনকি জঘন্য-ঘৃণ্য… প্রমাণ করেই তো নতুন নতুন ধর্ম সৃষ্টি করেছে। যদি দ্বিতীয় ধর্মটি সৃষ্টির সময় এর সৃষ্টিকর্তা পূর্বের ধর্মেকে খারাপ বা জঘন্য বা ঘৃণ্য ইত্যাদি প্রমাণ করতে না-ই পারতো, তাহলে কী প্রথম ধর্মটির অনুসারীরা দ্বিতীয় ধর্মটি গ্রহণ করতো? প্রশ্নই ওঠে না। পূর্বেরটার চেয়ে নতুনটা ভালো প্রমাণ করতে প্রতিটি ধর্মই পূর্বের ধর্মগুলোকে যে যতো পেরেছ আঘাত করেছে, দোষ দিয়েছে, এমনকি সাধারণ, অসাধারণ সব মানুষের মনেই প্রচণ্ড ঘৃণার সৃষ্টি করতে হয়েছে। যে ঘৃণার জাল ছিঁড়ে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে আসা বাঙালির সংখ্যা হাতে গোনা। নতুন ধর্ম সৃষ্টিকারীরা শুধু ঘৃণা ছড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, খুন করেছে, যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধবন্দি হিসেবে কঠোর শাস্তি দিয়ে নতুন ধর্ম গ্রহণের বাধ্য করেছে, ধর্ষণ করেছে, দাস্তদাসী বনিয়েছে, যুদ্ধের মতো নিকৃষ্ট একটি ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ীভাবে বৈধতা দিয়েছে… (ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ এসবই বেশি ছিলো, যা এখনো আছে, ধর্মগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত চিরকালই থাকবে)। অতএব কম আর বেশি, ধর্ম পালনকারীরা সবাই সাম্প্রদায়িক। হয়তো কারো মনে এটি সুপ্ত, কেউ সহজে উত্তপ্ত হয় না, অধিকাংশই অতি সামান্যতেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া কোনোদিন কী শুনেছেন, একটি ধর্ম অন্য একটি ধর্মকে প্রশংসা করছে? শুনেছেন, নিজের ধর্মের চেয়ে কেউ অন্য ধর্মকে বেশি শ্রদ্ধা করে (ভালো হলেও)…? একটি ধর্মের ভালো দিকগুলোকেও অন্য একটি ধর্ম মেনে নেয় না, প্রশংসা করে না, অথচ খারাপ দিকগুলো নিয়েই যতো পারে কুৎসা রটায়, বানিয়ে বানিয়ে গল্পকারে তা ব্যাখ্যা করে… এবং এটা সর্বত্রই, পার্থক্য হলো- কেউ করে প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে। অথচ ৫৭ ধারা শুধু ব্লগারদের বেলায় ওদের বেলায় নয়, কেনো? অতএব ধর্ম যখন সাম্প্রদায়িক, তখন প্রায় শতভাগ ধার্মিকদের এই দেশের মানুষ কীভাবে অসাম্প্রদায়িকতা হয়, এ বোকার বোধগম্য নয়। সুতরাং সম্পূর্ণরূপে ধর্মের বেড়াজাল থেকে মুক্ত না হতে পারলে, তিনি অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।
মনের মধ্যে ধর্মের প্রতি সামান্য একটু টান থাকলেও সম্ভব না, কারণ ছেলেবেলার ওই শিক্ষার বাইরে যেতে অবচেতন মন বারবার বাধা দেবেই। ধর্ম এমন এক মারাত্মক এবং অদ্বিতীয় ভাইরাস, যা অধিকাংশ ধার্মিকের মনে নয়, মগজে থাকে। যারা কম ধার্মিক বা তথাকথিত মডারেট তাদের মগজে না থাকলেও, মনের মধ্যে থাকে। মানুষের মগজ এবং মননই এর প্রধান খাদ্য। অন্য ভারাইসগুলো তা নয়। এ এমনই মারাত্মক ভাইরাস, যা বংশগতই শুধু নয় স্বভাবজাতও বটে। যার কোনো প্রতিকার নেই, কোনো ওষুধ নেই, আছে শুধু মলম। ধর্মীয় সমপ্রতী রক্ষার জন্য মাঝে মাঝেই বিজ্ঞজনেরা আন্তঃধর্মীয় সম্মেলন করেন, যা মলমের মতো এক-আধটু উপশম দেয়। অতএব, ধর্ম এবং ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না করে কীভাবে ধর্মীয় সমপ্রীতি রক্ষা করা সম্ভব? একদিকে মলম লাগাবেন, অন্যদিকে ক্যান্সারের বিষ ঢোকাবেন (যা চলছে হরদম), এ কেমন খেলা? এরূপ বিষাক্ত, অপ্রতিরোধ্য ভাইরাসটিকে দমন করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা প্রচেষ্টা কোনোটাই বিশ্ববাসীর নেই। বিশ্বের প্রায় সবাই বলেন ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠি নিয়ে সমালোচনা করা উচিত নয়, তারা এগুলোকে বৈষম্যের মধ্যে ফেলেন। তবে বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠি এসব নিয়ে কুটুক্তি করা বৈষম্য হলেও, ধর্ম নিয়ে কুটুক্তি করা কীভাবে বৈষম্যের মধ্যে পড়ে?
কারণ ধর্ম নিজেই তো বৈষম্যের আতুরঘর এবং সর্বোচ্চ শিখর। কারণ প্রতিটি ধর্মই অন্য ধর্মকে নগ্নভাবে বৈষম্য করে। অতএব, ধর্ম সমালোচনায় কোনো অপরাধ হতে পারে না। যারা এসব বলেন, তারা ভন্ড, প্রতারক, মতলবাজ,  স্বার্থপর…। ধর্ম বা সামপ্রদায়িকতা কী কঠিন, মারাত্মক, অপ্রতিরোধ্য, চিরঞ্জীবি… ভাইরাস এর উদাহরণ প্রতিদিন দেখছি ও শুনছি। এমনকি একই ধর্মালম্বীরাও নিরন্তন খুনাখুনিতে লিপ্ত। ধর্মশিক্ষা কতোটা বৈষম্যের, কতোটা ভয়ংকর, কতোটা সামপ্রদায়িক হলে নিজেদের জন্মদাত্রীকে পর্যন্ত খুন করতে পারে? কতোটা উলঙ্গ হলে (অনার কিলিং-এর নামে) পিতা-মাতারা আপন সন্তানকে হত্যা করতে পারে? এর প্রচুর উদাহরণের মধ্যে একটি দেখুন:- “মাকে কুপিয়ে খুন করল দুই আইএস জঙ্গি ভাই! …যমজ দুই ভাই তাদের বাবা-মা এবং ভাইয়ের উপর হামলা চালায়। প্রথমে ভাইকে ধাওয়া করে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে ধারাল অস্ত্র দিয়ে তাকে একাধিক বার কোপানো হয়। …এর পর মাকে কুপিয়ে হত্যা করে। বাধা দিতে গেলে বাবাকেও জখম করে। …বহু দিন ধরেই তারা আইএসের মতাদর্শে বিশ্বাসী। …বছরখানেক আগেও রিয়াধে এইরকমই একটি হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। সে বারও দুই ভাই প্রথমে তাদের অন্য এক ভাইকে হত্যা করে। বাধা দিতে গেলে আরও তিন জনকে খুন করে তারা।” আনন্দবাজার (২৫ জুন/১৬)। এবার বলুন, ধর্মীয় সন্ত্রাবাদের প্রধান শিকড়টি কোথায়! এরা সরাসরি আইএস যোদ্ধা নয়, সমর্থক মাত্র। এরপরও কী বলবেন, ধর্মে সামপ্রদায়িকতা এবং সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় নেই? কোনো হিংস্র জানোয়ারকে দেখেছেন কী, নিজের বাচ্চা মেরে ফেলে অথবা বাচ্চারা জন্মদাত্রীকে মেরে ফেলে? অথচ সর্বশ্রেষ্ঠ জীবেরাই এটা করে (যদিও কতিপয়)! কারণ, সর্বনাশ মহাশক্তিশালী ওই ভারাস যাদের মগজে বাস করে তারাই কেবল আত্মজকে এভাবে খুন করতে পারে। ভাইরাসটি যাদের মনে বাস করে, তারা খুন না করলেও নানারূপ বিদ্রুপ করে, ভয়ভীতি দেখায়, মারধোর এবং কড়া শাসন করে, মামলা-মোকদ্দমা করে, কখনো কখনো ভাড়াটে খুনি দিয়ে খুনও করায়…। কিন্তু পশুর মজগে ও মননে ধর্ম নামক কোনো ভাইরাস নেই, তাই তারা এসব করে না। ধর্ম নিজেই যখন সাম্প্রদায়িক, তখন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ কী করে অসাম্প্রদায়িক হয়? ধর্ম মানুষের মনোজগতকে যেভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে, অন্য কোন মতবাদ বা দর্শন তেমনটা আচ্ছন্ন করতে পারে কী? এছাড়া, ধর্মীয় সন্ত্রাস যে কোনো সন্ত্রাসের চাইতে হাজারগুণ মারাত্মক, যা আলোর গতির চেয়েও বেশি গতিসম্পন্ন। জানি না, ধর্মকে আঘাত না করে, মনোজগতকে পরিবর্তন না করে, কীভাবে ধর্মীয় সন্ত্রাস বা সাম্প্রদায়িকতা দমন সম্ভব? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝি, এটা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। কারণ যা স্বভাবজাত তাতে সামান্য আঘাত লাগলেই মানুষ চরম উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং এ সুযোগকে কাজে লাগাতে কিছু ধার্মিকরা (নাস্তিকরা নয়) সব সময়ই প্রস্তত থাকে। কারণ স্বভাবজাত অভ্যেসগুলো মনোগজতকে ছেলেবেলা থেকেই এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে ইহজীবনেও সেখান থেকে কমপক্ষে ৯০%ই আর ফিরতে পারে না। এমনকি যারা নিজেদের অধার্মিক বা ধর্মহীন বলে দাবি করেন, তারাও পিতৃধর্মের প্রতি কিছুটা হলেও দুর্বল থাক।
শিশুর যেমন আতুর ঘর আছে, সাম্প্রদায়িকতারও আছে। সাম্প্রদায়িকতা মূলত আতুর ঘরে প্রতিটি শিশুর সাথেই জন্ম নেয় এবং বেড়ে ওঠে প্রথমত পরিবার, পরে সমাজ এবং ধর্মজীবিদের পৃষ্ঠপোষকতায়। পরবর্তীতে যা রাষ্ট্র ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করে। ধর্মজীবিদের সাম্প্রদায়িকতা জ্বলন্তই থাকে, মাঝে মধ্যে শুধু উষ্কে দেয়। অন্যদিকে বেশিরভাগ সাধারণ ধার্মিকদের মনেও এটা তুষের আগুনের ন্যায় থাকে, যখন ধর্মজীবিরা বরুদ ছিটায় তখন আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে।
সাম্প্রদায়িকতার জন্য প্রথমত ও প্রধানত দায়ী পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক ধর্মশিক্ষা। কারণ সর্বপ্রথম শিশুর সাদা মগজে যে শব্দগুলো লেখা হয় তা ধর্মীয় বাণী বা ধর্মশিক্ষা, যা পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন… সর্বোপরি বন্ধ না করে মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করবেন কীভাবে? যুগ যুগান্তরের এ শিক্ষাই তো সাম্প্রদায়িকতার প্রধান উৎস। অথচ এখানে কেউ হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। অতএব তথাকথিত ক্রসফায়ার, জেল-জরিমানাসহ যে কোনো আইন প্রয়োগ হোক না কেনো, ধর্মকে আঘাত না করে, নিরাপদে রেখে আর যাইহোক, সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ অসম্ভব। কারণ হাজার হাজার বছরের গোড়ামিপূর্ণ ধর্মশিক্ষা বহু আগেই ক্রোনিক ডিজিজে পরিণত হয়েছে। স্বীকার করুন আর না-ই করুন, …আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ঈশ্বরের অনুসারী, অন্যরা নয়, তার ভ্রান্ত, পাপী, নারকী, ঘৃণ্য, অস্পৃশ্য, শয়তানের উপাসক… ছেলেবেলার এসব শিক্ষা কে না পেয়েছে? এরূপ শিক্ষায় আমাদের প্রত্যেকের কী হাতেখড়ি হয়নি? অতএব ধর্মশিক্ষার পীঠস্থান পরিবার, সামাজ ও ধর্মালয় থেকে এরূপ শিক্ষা দূরীভূত না করে, সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল আর সোনার পাথর বাটি- এক কথা। এ মরণব্যাধি ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেতে মলম লাগালে চলবে না, প্রয়োজন কেমো থেরাপি।
অথচ সকলেই মলম দিচ্ছেন!
লেখক: স্নেহাংশু বিশ্বাস
প্রভাষক, রসায়ন, তালুকদার হাট স্কুল ও কলেজ, সাধারণ সম্পাদক, উদীচী বরিশাল

Sunday, June 2, 2019

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: ভঙ্গুর ও অনুর্বর প্রজন্ম সৃষ্টির আয়োজন

এক.
শিক্ষাজীবনে কাজী কাদের নেওয়াজ-এর লেখা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি পড়েননি বা জানেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেখানে রাজকুমারকে একজন গৃহশিক্ষক কর্তৃক পাঠদান ও মূল্যবোধ তৈরির এক অসাধারণ আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে। অন্য হাজারও দৃষ্টান্তের মতো এখানেও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি গৃহে আলাদা শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীদের বাড়তি কিছু শিখানোর প্রথা অতিপ্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। তাহলে এখন দোষ কোথায়? কয়েকবছর ধরে দেখছি, অযৌক্তিকভাবে প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনীকে শিক্ষকদের উপরে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গৃহে শিক্ষাদান কিংবা শিক্ষার্থীদের বাড়তি সময়ে পাঠদানের অপরাধে শিক্ষদের টেনেহিঁচড়ে বের করে, হাতকড়া পরিয়ে, জরিমানা করে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনেই অপমান-অপদস্থ করা হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে যেন, শিক্ষকতা করাটাই অপরাধ। মেধা খাটিয়ে, পরিশ্রম করে, শিক্ষার্থী তথা সমাজকে জ্ঞানার্জনে সাহায্য করে কয়েকটি বৈধ পয়সা রোজগার করে শিক্ষকদের সংসার চালানোর এই পবিত্র সংগ্রামকে একটি মহল ‘বানিজ্য’ বলে সাড়ম্বরে প্রচার করছে। আমি অস্বীকার করছিনা যে কেউ কেউ সত্যিই বানিজ্য করে। আমি স্বীকার করছি, কিছু কিছু নামধারী তথাকথিত শিক্ষক প্লে-নার্সারী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল পর্যন্ত অর্থ ও কামনার লোভ সংবরণ করতে না পেরে বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এদেশে এহেন অপকর্মের মাত্রা ইদানিং এত চরমে গিয়ে পৌছেছে যে, নিজেকে শিক্ষক বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধের চেয়ে কুণ্ঠাবোধ বেশি হয়। তবে হ্যাঁ, এমন শিক্ষকও সমাজে ঢের আছেন যে, তাঁদের দেখলে মাথা অবচেতন মনেই নত হয়ে যায়। যারা প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে সমাজে দৃষ্টান্ত স্বরূপ-এমন সংখ্যা এখনও অনেক অনেক বেশি। তাহলে কেন সবাইকেই ঐরূপ রুচিহীন মানদন্ডে দন্ডিত করা হবে?? 


দুই.
আমরাই মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র হতভাগা দেশ যেখানে হাস্যকরভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুই দৃষ্টিতে ভাগ করা হয়েছে। একটি সরকারি অংশ, অন্যটি বেসরকারি (পৃথিবীর অন্য সব দেশেই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণকৃত)। এদেশে সরকারি ভাগটিকে ঘরে-বাইরে সবাই ‘উচ্চবর্ণের কুলীণ বংশ’ মনে করেন যাদের সাত খুন মাফ এবং সুযোগ-সুবিধা আর অধিকারের বেলায় শতভাগ। আর বেসরকারি অংশটিকে বেশিরভাগ মানুষই ‘নি¤œ বর্ণের অছ্যুত’ হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে আবার বেসরকারিকে ‘বেদরকারি’ও বলে থাকেন। ব্যাপারটা এমন যে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার সব রকম ব্যবস্থা এমনভাবে করা আছে যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে নিজে হীনমন্যতায় ভুগতে বাধ্য হয়। এটা ঠিক যে, সরকারি অংশের শিক্ষার্থী বা শিক্ষক হতে গেলে তাকে অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করে আসতে হয়। সে যে মেধাবী (ব্যতিক্রমও রয়েছে অনেক) এতে সন্দেহ নেই। তাই বলে অপেক্ষাকৃত কম কঠিন পরীক্ষা দিয়ে আসা বেসরকারি অংশের মধ্যে যে মেধাবী শিক্ষার্থী বা মেধাবী শিক্ষক নেই, তাতো নয়। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমার মতো হাজারও মানুষের শিক্ষাজীবনে হাজারও এমন প্রত্যক্ষ ও প্রমাণিত উদাহরণ আছে যে, একজন সরকারি গেজেটেড শিক্ষকের তুলনায় একজন বেসরকারি অংশের শিক্ষক শিক্ষাদান সংক্রান্ত সকল কর্মকান্ডে বেশি পারদর্শী, বেশি পরিশ্রমী ও বেশি নিবেদিত। আবার বলছি, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমতো আছেই। তবে বড় সার্টিফিকেট নিয়ে, বড় পরীক্ষা দিয়ে, বড় ডিগ্রী নিয়ে আসা আর ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের মন জয় করে, নিজেকে উজাড় করে প্রকৃত শিক্ষাদান করে জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়া এক জিনিস নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এদেশে এই বেসরকারি অংশকে বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট করা হয়, কথায় কথায় এদের চাকরি হারানো আর বেতন বন্ধের হুমকি দেয়া হয়। অথচ এই অংশই পরিমানে ও অবদানে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় পাঁচ দশক পরেও এদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাবা-মার কষ্টার্জিত টাকায় ফি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়, ভর্তি হতে হয়। আজও শিক্ষকদের বেতনÑভাতা নিয়ে দরকষাকষি চলে, বেতন আর পদোন্নতির অংক ক্রমান্বয়ে কমিয়ে চূড়ান্ত নীতি আসতে থাকে একের পর এক। এ যে কি লজ্জার, অসম্মানের আর ঘৃণার তা বলাই বাহুল্য। এদেশে কোনো এক সরকারি অফিসের একজন পিয়ন যেখানে তার বেতন আর ঘুষের টাকার অংক বেশ হাসিমুখে দাপটের সাথে ঘোষণা করে, সেখানে একজন শিক্ষক বেতনের অংক উচ্চারণ করতেই লজ্জাবোধ করেন, আর ঘুষতো নেই এই মহান শিক্ষকতা পেশায়। তাহলে বলুন, পেট না চললে মেধা আর জ্ঞান চলে কি??


তিন.
মহান মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ জীবন-মানের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে এখন কোথাকার কোন তথাকথিত ধর্মগুরু প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস নির্ধারণ করে দেন। তারই নির্দেশনায় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক থেকে ষোল-সতের জন খ্যাতিমান কবি-লেখকদের লেখা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, লেখার শুরুতে যে কবিতাটির রেফারেন্স টেনেছিলাম সেটিও পঞ্চম শ্রেণির বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে) এর পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিতমূলক অসংখ্য লেখা কৌশলে পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার নোংরা কারসাজিতে প্রাচীন ও সর্বাধিক পঠিত সেই সীতানাথ বসাক-এর “আদর্শলিপি” বাজার থেকে দূর করে শিশুদের জন্য নতুন নতুন বইয়ের সংস্করণ আনা হয়েছে যা কিনা অন্তঃসারশুন্য। উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলেও মোনায়েম খানের সময়ে পাঠ্যবইয়ে জসীমউদ্দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতাটিকে ‘দাওয়াত’ নামে এবং নজরুলের ‘মহাশ্মশান’ কবিতাটিকে ‘গোরস্থান’ নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবহমান বাঙালী এই দিনগুলোই কি দেখতে চেয়েছিল? বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষকদের দ্বারা চলে না, চালানো হয় শিক্ষক জগতের বাইরে কিছু স্তরের আমলাদের দিয়ে। যেহেতু তারা শিক্ষক নন, তাই তাদের সকালে-বিকালে শিক্ষানীতি পরিবর্তন করতে আর বই পাল্টাতে সময় লাগে না। কারন, শিক্ষদের বুকের ব্যাথ্যা তারা বুঝবেন কি করে? একই দেশে একই ক্ষেত্রে দুই নীতি দেখেছেন কি? এদেশে আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানটি যেখানে বলে কোন প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে পদ সৃষ্টিপূর্বক শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে, না হলে অনুমোদন মিলবে না। সেখানে সরকারের শিক্ষা অধিদপ্তর বলে “নিয়োগ দিতে পারেন কিন্তু বেতন-ভাতা আমরা দেব না।” তাহলে এই দ্বিচারিতা আর তামাশার মানে কি??


চার.
দেশ বরেণ্য কিছু শিক্ষাবিদগণ যখন মঞ্চে ওঠেন তখন তাদের উপদেশ বানী শুনে আমরা হাততালি দেই। তাদের সভা-কাঁপানো মুখরোচক বুলি এরকম, ‘তোমরা যারা কোমলমতি শিক্ষার্থী আছো, তোমরা এ-প্লাসের পিছনে ছুটবে না, তোমরা ভাল মানুষ হওয়ার জন্য ছুটতে থাকো। আর আপনারা যারা অভিভাবক আছেন তাদের বলি, আপনার সন্তানকে পরীক্ষায় এ-প্লাস পাওয়ার জন্য চাপ দেবেন না। ওদের মানবিক বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করবেন’ .......... ইত্যাদি ইত্যাদি। ও শিক্ষাবিদ মহোদয়, বিনয়ের সাথে বলছি, আপনারাই যখন বুয়েট কিংবা ভার্সিটির ভর্তি কমিটিতে নীতি-নির্ধারক তকমায় থাকেন তখন আপনারাই তো বড় অক্ষরে ঘোষণা দেন যে, এস.এস.সি বা এইস.এস.সিতে এ-প্লাস না থাকলে ওমুক প্রতিষ্ঠানে ওমুক বিষয়ে আবেদন করা যাবে না। তাহলে এটাকি আমাদের প্রজন্মের সামনে সার্কাস দেখাচ্ছেন? বছরের ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর আপনাদের হঠাৎ মনে পরে পঞ্চম, অষ্টম কিংবা দশম শ্রেণিতে এতগুলো বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়ার দরকার নেই। স্কুল-কলেজে নোটিশ আসে কিছু বিষয় অপ্রয়োজনীয়, তাই এগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। চৌদ্দ বছরে সাতবার বই পরিবর্তন, একাধিকবার প্রশ্নপত্র পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন, বছরের এ-মাথায় ও-মাথায় উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন- এসব কি?? তাহলে বইগুলো ছাপালেন কেন? কাদের টাকায় ছাপালেন? শিশুদের ছয় মাস ধরে ওগুলো টানালেন কেন? পড়াতে বললেন কেন? ওহে শিক্ষার মহাজন, আমার মতো নরাধমকে একটু বুঝিয়ে বলবেন কি- কোন্ দেশ থেকে অংক বা গণিতকে সৃজণশীল করার ধারণা পেয়েছেন? (গণিত শাস্ত্র বা অর্থনীতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো কিভাবে সৃজনশীল হয় তা আমার বোধগম্য নয়, কেউ জানলে একটু দয়াকরে জানাবেন)। দাতা সংস্থাগুলোর হুকুমে পৃথিবীর অনেক দেশের সাথে তাল মিলিয়ে নাকি সৃজনশীল পদ্ধতি আনলেন, ঠিক আছে- কিন্তু সেই সব দেশের শিক্ষার পরিবেশ-প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, প্রশাসন সেগুলো তো নিয়ে আসেননি!! বেতন-মানের প্রসঙ্গে নাহয় নাই গেলাম। এটা কি ‘ঘরে বেড়া নাই, দুয়ারে তালা মারা’র মতো অবস্থা নয়??


পাঁচ.
পরিশেষে পরিতাপের বিষয় বলি, আফ্রিকার স্বনামধন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের তোরণদ্বারে বড় হরফে লেখা উক্তিটি, “একটি দেশকে ধ্বংস করতে চাইলে কোন অস্ত্র কিংবা পারমানবিক বোমার দরকার নেই, সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অসৎ প্রবণতা ঢুকালেই হলো, ঐ জাতি আপনা-আপনিই ধসে পড়বে।’ তাহলে কি আমরা এখন এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সেরকমই কোনো দেশীয় বা আন্তর্জাতিক নীলনক্শার লাগামহীন আয়োজন দেখছি?? এ কি শুধুই ধোকা, কেবলই ফক্কিকার??



লেখক: অধ্যাপক পিযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়
ইংরেজি বিভাগ, বেগম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মহিলা কলেজ, বরিশাল

Saturday, June 1, 2019

মেয়েরা মা হবার পর, মেয়ে হওয়াটাই ভুলে যায়

মেয়েরা মা হবার পর, মেয়ে হওয়াটাই ভুলে যায়। আসলে ভুলে যায় বললে অন্যায় হবে তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়। সে ফ্যামিলি ম্যানুপুলেশনের স্বীকার হয়। কিভাবে হয়, সেটাই আজকে ব্যাখ্যা করব।
আপনার চারপাশে তাকালে আপনি নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারবেন কোন মেয়েটি সন্তানের মা আর কোন মেয়েটি এখনো মা হয়নি।
যে মেয়েটি মা হবার আগে প্রচণ্ড রুচিশীল, গোছানো আর স্টাইলিশ মেয়ে ছিল, সেই এক-ই মেয়ে মা হবার পরে কেন এলোমেলো চুল আর বেঢপ সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়ে হয়ে যায় ? কেন হয়, ভেবেছেন ?

মা হবার পরে মেয়েদের শারীরিক যে ক্ষতি হয়, সে বিষয়ে যত্ন নেবার প্রচুর মানুষ চারপাশে থাকলেও, মানসিক ভাবে যে মেয়েটা হারিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে আসলে কেউ খেয়াল করে না। প্রেগনেন্সির সময় হরমোনাল পরিবর্তনের ফলে মেয়েটার ভেতরে যে বিষণ্ণতা, মুডসুইমিং সহ নানা ধরনের মানসিক জটিলতা বাসা বেঁধেছে, সেটা দুর করার জন্য পরিবারে মানুষেরা উদ্যোগী হয় না। হয়ত বোঝেও না।
তাই স্বামী কিংবা পরম আত্মীয়রা বলে না, মেয়ে তুমি গত এক বছর ধরে যে কষ্ট করেছ এবং এখন যে একজন অসাধারণ মা হয়ে দেখাচ্ছ , সে জন্য তোমাকে ভালোবাসা, আজকে একটু অবসর নাও , যাও বাইরে থেকে ঘুরে আসো , অনেকদিন তোমার আড্ডা দেয়া হয়নি, আজকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও, একটু সাজো, আমরা তো আছি তোমার বাচ্চার পাশে। তুমি এটা ডিজার্ভ কর।
নব্য মায়ের জন্য প্রচুর খাবার থাকলেও মা যদি একটু ঘুমিয়ে পরে আর বাচ্চাটা কাঁদে তবে কেউ না কেউ বলে ওঠে,
আরে বাচ্চা কাঁদছে কেন ?
কিংবা মা যদি একটু অন্য মনস্ক হয় তবেই বাড়ির বয়স্ক নারীরা জ্ঞান দেয়, মা হওয়া সহজ না, তিনি কিভাবে রাত ভর জেগে জেগে মা হয়েছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি ।
এমনিতেই নব্য মা তার এই নতুন অভ্যাসের সাথে মানিয়ে নিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তার উপড়ে কেউ তার মাতৃত্ব অবহেলা করার দায় চাপাচ্ছে কিনা, সে সবও খেয়াল রাখতে হচ্ছে।
এতকিছুর পরে মেয়েটা যে একটু নিজের দিকে খেয়াল করবে সেই সময় আর উৎসাহ কোনটাই পায় না ।
ধীরে ধীরে মেয়েটা মেনে নিতে থাকে, এখন সে মা তাই তার আর আগের মত মেয়ে হওয়া হবে না। সাঁজতে গেলে সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। নিজের মুটিয়ে যাওয়া শরীর ঢাকতে ব্যস্ত হয়, আয়নায় নিজেকে আর দেখে না , সে নিজেকে দেখে বাচ্চার মা হিসেবে।
অথচ একটু উৎসাহ , একটু যত্ন আর একটু আশ্রয় পেলেই সেই আগের উচ্ছল টিপটপ মেয়েটা, সাজগোজ করা, হাসিখুশি , আড্ডাবাজ মেয়েটা, হারিয়ে জেতো না, কিংবা যাবে না ।
যে মেয়েটা সমস্ত পরিবারের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, তার মুখের হাসি ম্লান না করে ফিরিয়ে দিন। সে জেনো মা হয়েও সেই আগের মেয়েরটি-ই থেকে যায়।

লেখা: ফড়িং ক্যামেলিয়া
ব্লগার ও কবি

স্বর্ণের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: সংকট, ডলারের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের রূপান্তর

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে ...