সত্যজিৎ রায়ের মূল ছোটগল্প অনুকূল প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে; যা তাঁর জনপ্রিয় সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে তাঁর গল্প সংকলন অশ্বমেধের ঘোড়া-তেও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর ২০১৭ সালে পরিচালক সুজয় ঘোষ সত্যজিৎ রায়ের এই ছোটগল্প অবলম্বনে একটি শর্টফিল্ম নির্মান করেন যার নাম- অনুকুল। আমি যখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, আমার বারবার সত্যজিৎ রায়ের সেই কালজয়ী গল্প 'অনুকূল'-এর কথা মনে পড়ে। ২০১৭ সালে এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত শর্ট ফিল্মটি যারা দেখেছেন, তারা হয়তো আমার সাথে একমত হবেন। সেখানে দেখা যায়, অনুকূল নামের একটি রোবট মানুষের চেয়েও বেশি নিয়মনিষ্ঠ, বেশি দক্ষ; এমনকি এক পর্যায়ে সে তার মালিকের প্রতি এমন এক ধরনের 'যান্ত্রিক আনুগত্য' প্রদর্শন করে যা একই সাথে বিস্ময়কর এবং আতঙ্কজনক। অনুকূলের সেই নির্লিপ্ত চাহনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যন্ত্র যখন মানুষের জায়গা নিতে শুরু করে, তখন মানবিক আবেগ আর যান্ত্রিক যুক্তির লড়াইটা কতটা অসম হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সত্যজিতের সেই দূরদর্শী ভাবনাকে আমার খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হচ্ছে। কারন ইতিহাসকে আমি কেবল গত হয়ে যাওয়া দিনগুলোর দলিল মনে করি না; আমার কাছে ইতিহাস হলো পরিবর্তনের পাঠশালা। কিন্তু বর্তমানের এই এআই বিপ্লব অতীতের যেকোনো পরিবর্তনের চেয়ে আলাদা। এর কারণ হলো এর 'গতি'। আমরা মানুষ হিসেবে যেহেতু জৈবিক প্রাণী, তাই আমাদের বিবর্তন হতে, কোনো কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে বা শিখতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু এআই হলো অজৈব, ফলে এর বিবর্তন ঘটে আলোর গতিতে। আমার ভয় হয়, অনুকূলের মতো নিখুঁত হতে গিয়ে আমরা আমাদের ধীরস্থির মানবিক সত্তা নিয়ে এই অতিদ্রুত দৌড়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খেই হারিয়ে ফেলব না তো?

প্রথম বিশ্বের উদ্যোক্তারা আমাদের চমৎকার সব স্বপ্ন দেখান- ক্যানসার নিরাময় হবে, জলবায়ু সংকট মিটে যাবে, ব্যক্তিগত টিউটর সবার হাতে পৌঁছাবে। আমি তাদের এই আশাবাদকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু একজন সমাজ ও পরিবেশ সচেতন মানুষ হিসেবে আমার মন তাতে পুরোপুরি সায় দেয় না। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় বলশেভিকরাও কিন্তু এক নিখুঁত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ইউটোপিয়া বা স্বর্গরাজ্য গড়তে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী পথ বেছে নিয়েছিল, তা আমাদের সবার জানা। আমার প্রশ্ন হলো- একটি অমলেট বানানোর জন্য আমরা ঠিক কতগুলো ডিম ভাঙতে রাজি আছি? এআই-এর সুফল পাওয়ার লোভে আমরা কি আমাদের গণতন্ত্র বা মানবিক আস্থাকে বিসর্জন দিতে পারি?
আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র হলো একটি সুস্থ কথোপকথনও যা শুধু নিজে বল্লেই চলবে না বরংচ অন্যেরটাও মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কিন্তু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালে আমি কী দেখি? আমি দেখি, অ্যালগরিদমগুলো আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে। এই এআই-র কোনো দেশপ্রেম নেই, কোনো নৈতিকতা নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ইউজার এনগেজমেন্ট। আর মানুষ হিসেবে আমরা রাগ বা ঘৃণার খবরে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে- সমাজ ভাগ হয়ে যাচ্ছে, আমরা একে অপরের কথা শোনার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। একটি সমাজ যখন কথা বলার ক্ষমতা হারায়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
আমার কাছে সবচেয়ে আতঙ্কজনক মনে হয় বট বা নকল মানুষের ধারণাটি। আমরা যদি এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে আমি কার সাথে কথা বলছি; মানুষ নাকি বট? সেটাই বুঝতে না পারি, তবে আস্থার জায়গাটা কোথায় থাকবে? আমরা যেমন জাল টাকা রুখতে কঠোর আইন করি, তেমনি ইন্টারনেটে ছদ্মবেশী এই নকল সত্তাদের রুখতেও আমাদের শক্ত হতে হবে। আমি মনে করি, কোনো এআই যদি মানুষের পরিচয় দিয়ে আমার সাথে কথা বলে বা আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তবে তা মানবসভ্যতার ওপর এক ধরনের ডিজিটাল হামলা।
অনেকে বলেন, এআই-কে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব কারণ এতে উদ্ভাবন থমকে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি, রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ মানেই বাধা দেওয়া নয়। একটি গাড়িতে ব্রেক থাকে বলেই আমরা তা দ্রুত চালাতে পারি। এআই-এর ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু মূল নীতি ঠিক করতে হবে। এআই-কে সবসময় প্রকাশ করতে হবে যে সে একজন যান্ত্রিক সত্তা। কোনো কোম্পানির অ্যালগরিদম যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তবে সেই দায়ভার সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেই নিতে হবে। আমরা এআই-কে স্মার্ট করার জন্য যত টাকা খরচ করছি, তার অন্তত কিছু অংশ কি আমাদের নিজেদের বিবেক ও সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে পারি না?
আমরা কি সেই শিশুর মতো হবো যে এখনই একটা মার্শমেলো খাওয়ার লোভে ভবিষ্যতের দুটো মার্শমেলো পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে? পৃথিবীজুড়ে এখন এআই নিয়ে এক পাগলাটে প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই সবার আগে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু এই দৌড়ে যদি আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলি, তবে সেই বিজয়ের কোনো মূল্য থাকবে না। আমি চাই এআই আমাদের অনুকূল হোক, আমাদের সহযোগী হোক; কিন্তু আমাদের হৃদয়ের মালিক যেন সে না হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির এই বিশাল জোয়ারে দাঁড়িয়ে আমি কেবল এটুকুই বলতে চাই; আসুন আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের প্রজ্ঞা এবং করুণাকেও লালন করি।
কারন দিনশেষে, যন্ত্র কেবল গণিতে দক্ষ হতে পারে
কিন্তু সহমর্মিতা কেবল মানুষেরই ভূষণ।
কাজল দাস
সম্পাদক
কালেরধ্বনি
৬ মে ২০২৬