Search This Blog

Monday, May 18, 2026

মানব কর্তৃত্বের অবসান

ইতিহাসবিদ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষ, যিনি অতীতের কোনো ধূলিমলিন দলিল, কয়েকশ বছর আগের কোনো যুদ্ধ অথবা কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশের উত্থান-পতন নিয়ে গবেষণায় মগ্ন। কিন্তু আমি নিজেকে সেই প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। আমি ইতিহাসকে দেখি এক বিশাল ক্যানভাস হিসেবে, যেখানে অতীত কেবল পেছনের গল্প নয় বরং আগামীকে বোঝার একমাত্র দর্পণ। সত্তর হাজার বছর আগে আমরা যখন পূর্ব আফ্রিকায় এক তুচ্ছ প্রাণী হিসেবে ঘুরে বেড়াতাম, তখন আমাদের প্রভাব এই পৃথিবীর বুকে জেলিফিশ বা কাঠঠোকরার চেয়ে বেশি ছিল না। আজ সেই অবস্থা থেকে আমরা পুরো গ্রহের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছি। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কেন আমরা অন্য সব প্রাণীকে ছাড়িয়ে গেলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, মানুষের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত অলৌকিক ক্ষমতা। যা হলো বড় স্কেলে, অত্যন্ত নমনীয়ভাবে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করার ক্ষমতা। শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে চেনে এবং সহযোগিতা করে, কিন্তু তাদের দল ২০ বা ৩০ জনের বেশি বড় হতে পারে না। আবার মৌমাছি বা পিঁপড়েরা লাখ লাখ সংখ্যায় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু তাদের সেই সহযোগিতা অত্যন্ত যান্ত্রিক ও অনমনীয়। মৌচাকে নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে তারা তাদের সামাজিক কাঠামো রাতারাতি বদলে ফেলতে পারে না। মানুষই একমাত্র জীব, যে একই সাথে লাখ লাখ অচেনা মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে নিজের নিয়ম বদলে ফেলতে পারে।

কিন্তু এই নমনীয় সহযোগিতার আসল চাবিকাঠি কী? এর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের কল্পনাশক্তিতে। আমরা এমন সব মিথ, গল্প এবং কাল্পনিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারি এবং সম্মিলিতভাবে তা বিশ্বাস করতে পারি, যার কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বে নেই। দেশ, মুদ্রা, কোম্পানি, আইন, মানবাধিকার, ধর্ম ...... এসবই মানুষের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী একেকটি গল্প। পকেট থেকে একটি কাগজের নোট বের করে যখন আমি অন্য একজন অচেনা মানুষকে দিই, সে আমাকে খাবার দেয়। কেন? কারণ আমরা দুজনেই বিশ্বাস করি যে, এই কাগজের টুকরোটির একটি মূল্য আছে। এই যে সম্মিলিত বিশ্বাসের ক্ষমতা, এটাই আমাদের এই গ্রহের শাসক বানিয়েছে।

তবে আজ আমি এখানে অতীতের গল্প বলতে আসিনি। আজ আমি বলতে এসেছি আমাদের ভবিষ্যতের কথা। আজ আমি যে সত্যটি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, তা হয়তো অনেকের কাছে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং রূঢ় মনে হতে পারে। আমার বিশ্বাস, আমরা অর্থাৎ আজ যারা এই গ্রহে উপস্থিত আছি তারা হয়তো আধুনিক মানব প্রজাতির শেষ কয়েকটি প্রজন্মের একটি। আগামী এক বা দুই শতাব্দীর মধ্যে আমাদের মতো মানুষ এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের স্থান দখল করবে এমন কিছু সত্তা বা জীব, যারা আমাদের চেয়ে ততটাই আলাদা হবে, যতটা আমরা শিম্পাঞ্জি বা নিয়ানডার্থালদের থেকে আলাদা।

এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এটি হলো মানুষের হাত থেকে ‘কর্তৃত্ব’র স্থানান্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা নিজেদের হাতে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পুঞ্জীভূত করেছি, তা এখন আমাদের অজান্তেই চলে যাচ্ছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের হাতে। এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে তাকাতে হবে আমরা কীভাবে আজকের এই মানবকেন্দ্রিক বিশ্বে এসে পৌঁছালাম, তার দিকে।


গত দুই থেকে তিন শতক ধরে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, তা একটি বিশেষ মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত। একে আমরা বলি ‘হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ। কিন্তু মানবতাবাদের আগের যুগটি কেমন ছিল?

মানবতাবাদের পূর্বে, মানুষ বিশ্বাস করত যে এই মহাবিশ্বের এবং আমাদের জীবনের সমস্ত কর্তৃত্বের উৎস আমাদের ভেতরে নেই। কর্তৃত্বের উৎস ছিল মেঘের ওপরে, স্বর্গে- অর্থাৎ ঈশ্বরের হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি বা নৈতিকতার ক্ষেত্রে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হলে মানুষ নিজের মনের কথা শুনত না। তারা দ্বারস্থ হতো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের, কিংবা পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবিদার পুরোহিত, পোপ, রাব্বাই বা শামানদের কাছে। মানুষ বিশ্বাস করত যে ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র ঈশ্বর।

কিন্তু গত দুই-তিনশ বছরে এক অভূতপূর্ব জাগতিক ও মানসিক বিপ্লব ঘটল। আমরা কর্তৃত্বকে আকাশ থেকে নামিয়ে নিয়ে এলাম মাটির পৃথিবীতে, মানুষের নিজের বুকের ভেতর। এই হিউম্যানিস্ট বিপ্লব ঘোষণা করল: এই মহাবিশ্বে মানুষের অনুভূতি এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার  চেয়ে বড় কোনো কর্তৃত্ব নেই। মানবতাবাদ আমাদের শেখাল যখনই তুমি জীবনে কোনো সংকটে পড়বে, সে তোমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সিদ্ধান্তই হোক বা পুরো দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হোক, তোমাকে বাইবেল বা কোনো বড় নেতার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। তোমাকে তাকাতে হবে নিজের ভেতরের দিকে। শুনতে হবে নিজের হৃদয়ের আওয়াজ।

আমরা শৈশব থেকে হাজার বার এই স্লোগানগুলো শুনেছি: "নিজের মনের কথা শোনো" (Listen to yourself), "হৃদয় যা বলে তা-ই করো", "যা তোমাকে আনন্দ দেয়, সেটাই করো"। আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মানবতাবাদী দর্শন কীভাবে মিশে আছে, তা একটু বিশদভাবে দেখা যাক।

আজকের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে মানুষের অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন বলি "ভোটারই সব ক্ষমতার উৎস" বা "ভোটারই সবচেয়ে ভালো বোঝেন", তখন আমরা আসলে হিউম্যানিজমের কথাই বলি। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি কে হবেন, বা দেশের নীতি কেমন হবে—এই জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা কোনো পরম জ্ঞানী ব্যক্তি, কোনো নোবেলজয়ীদের কাউন্সিল কিংবা ঈশ্বরের প্রতিনিধিদের কাছে যাই না। আমরা দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে যাই এবং জিজ্ঞেস করি, "আপনি কী মনে করেন? আপনার কী মনে হয়?"

ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একজন মানুষ যখন ব্যালটে সিল দেন, তখন তিনি কোনো জটিল গাণিতিক হিসাব বা বিশুদ্ধ যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে ভোট দেন না; তিনি ভোট দেন তাঁর অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে। কেউ একজন প্রার্থীকে দেখে ভরসা পান, কাউকে দেখে তাঁর রাগ হয়, কেউ আশাবাদী হন। এই অনুভূতিগুলোর ওপরে কোনো উচ্চতর আদালত নেই। আধুনিক গণতন্ত্রে আপনি কোনো ভোটারকে গিয়ে বলতে পারেন না যে, "হ্যাঁ, আপনি এই নেতাকে পছন্দ করছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার চেয়ে উচ্চতর কোনো শক্তি বলছে যে আপনি ভুল করছেন।" মধ্যযুগে এমনটা বলা সম্ভব হলেও, আধুনিক মানবতাবাদী রাজনীতিতে ভোটারের অনুভূতিই শেষ কথা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে হিউম্যানিজমের রূপটি হলো "ক্রেতাই সর্বদা সঠিক" (The customer is always right)। একটি পণ্য ভালো না মন্দ, কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল—তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো পলিটব্যুরো বা রাষ্ট্রীয় কমিটির হাতে নেই। তা নির্ধারণ করে ক্রেতার ইচ্ছা, পছন্দ এবং তাঁর খেয়ালখুশি। ক্রেতারা তাদের ক্রেডিট কার্ড বা টাকা দিয়ে ভোট দেয়।

ধরা যাক, টয়োটা বা ফোর্ড কোম্পানি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও সেরা গাড়িটি তৈরি করতে চায়। এর জন্য তারা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের একত্র করল। সাথে নিল সেরা সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং অস্কারজয়ী শিল্পীদের। তারা সবাই মিলে চার বছর ধরে গবেষণা করে, নকশা তৈরি করে একটি ‘নিখুঁত গাড়ি’ উৎপাদন করল এবং বাজারে ছাড়ল। কিন্তু শোরুমে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্রেতারা সেই গাড়ি কিনছে না।

এখন হিউম্যানিস্ট অর্থনীতিতে এর অর্থ কী? এর অর্থ কি এই যে ক্রেতারা বোকা এবং তারা ভুল করছে? একদমই নয়। এর অর্থ হলো, ওই নোবেলজয়ীরা এবং বড় বড় বিশেষজ্ঞরা সবাই ভুল করেছিলেন। ক্রেতার অনুভূতির চেয়ে বড় কোনো বিশেষজ্ঞ এই বাজারে নেই। কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রে হয়তো রাষ্ট্র এসে বলতে পারত, "আমাদের পলিটব্যুরো অনেক ভেবেচিন্তে এই গাড়িটি সোভিয়েত শ্রমিকের জন্য নির্ধারণ করেছে, অতএব আপনাদের এটাই ব্যবহার করতে হবে।" কিন্তু মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ক্রেতার ইচ্ছাই পরম আইন।

শিল্পকলার জগতেও হিউম্যানিজম এক বড় পরিবর্তন এনেছে। আমরা বলি, "সৌন্দর্য থাকে দর্শকের চোখে" (Beauty is in the eye of the beholder)। হাজার বছর ধরে দার্শনিকরা থিওরি দিয়েছেন যে সৌন্দর্য একটি বস্তুনিষ্ঠ বা ঐশ্বরিক বিষয়। ঈশ্বর বা প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয় কোনটা সুন্দর আর কোনটা কুৎসিত। কিন্তু মানবতাবাদী নান্দনিকতা এই কর্তৃত্বকে মানুষের অনুভূতির ওপর ছেড়ে দিল।

ঠিক এক শতাব্দী আগে, ১৯১৭ সালে, ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ (Marcel Duchamp) বাজার থেকে একটি সাধারণ সিরামিকের ইউরিনাল বা প্রস্রাবাগার কিনে আনলেন। সেটির ওপর একটি ভুয়া নাম সই করে সেটিকে একটি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শন করলেন এবং নাম দিলেন ‘ফাউন্টেন’ (Fountain)। আজ পৃথিবীর যেকোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট হিস্ট্রির ক্লাসে প্রথম সপ্তাহে এই ছবিটা দেখানো হয়। অধ্যাপক ছবিটি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেন, "বলুন তো, এটা কি শিল্প?"

মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কেউ বলে এটা শিল্প, কেউ বলে এটা স্রেফ একটা নোংরা জিনিস। কিন্তু আলোচনার শেষে অধ্যাপক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তা হলো—শিল্পের কোনো অবজেক্টিভ বা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। মানুষ যদি কোনো কিছুকে শিল্প হিসেবে দেখে এবং তার জন্য লাখ লাখ ডলার খরচ করতে প্রস্তুত থাকে, তবে সেটাই শিল্প। আপনি যদি মনে করেন দুশাঁ-র ওই ইউরিনালটি একটি চমৎকার শিল্পকর্ম, তবে পৃথিবীর কারো ক্ষমতা নেই আপনাকে ভুল প্রমাণ করার।

ভালো ও মন্দ, পুণ্য ও পাপের ধারণাও আজ হিউম্যানিজম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মধ্যযুগে যদি কেউ সমকামিতার কথা বলত, চার্চ এসে বলত—এটা এক মহাপাপ। কেন? কারণ বাইবেলে লেখা আছে, পোপ বলেছেন, ঈশ্বর নিষেধ করেছেন। সেখানে সেই মানুষের অনুভূতি কেমন, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

কিন্তু আজ হিউম্যানিস্ট নৈতিকতার যুগে আমরা জিজ্ঞেস করি, "ঈশ্বর কী বলেছেন বা ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে, তা আমাদের প্রধান বিবেচ্য নয়। আমরা দেখতে চাই এর দ্বারা মানুষের অনুভূতিতে কী প্রভাব পড়ছে।" যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, তারা একসাথে সুখী হয় এবং এর দ্বারা অন্য কোনো মানুষের ক্ষতি না হয়—তবে এতে পাপের কী থাকতে পারে? হিউম্যানিজম বলে, যদি কোনো কাজ কাউকে আঘাত না করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনন্দ দেয়, তবে তা নৈতিকভাবে সঠিক।

এমনকি আজ যদি কোনো ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী কোনো কিছুর বিরোধিতা করতে চায়, তারাও কিন্তু এখন আর শুধু "ঈশ্বরের আদেশ" বলে চিৎকার করে না। তারা আধুনিক মিডিয়ার সামনে এসে বলে, "এই বিষয়টি আমাদের অনুভূতিতে আঘাত হানছে" (It hurts our feelings)। অর্থাৎ, তারাও বুঝে গেছে যে আধুনিক বিশ্বে নিজের দাবি টিকিয়ে রাখতে হলে ঈশ্বরের আইনের চেয়ে মানুষের অনুভূতির দোহাই দেওয়া বেশি কার্যকর।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যও হিউম্যানিজম বদলে দিয়েছে। অতীতে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল একজন শিক্ষার্থীকে বাইরের কোনো পরম শক্তির সাথে জুড়ে দেওয়া—তা সে ঈশ্বরই হোক বা প্রাচীন জ্ঞানীদের কোনো গ্রন্থই হোক। তখন মুখস্থ বিদ্যা এবং শাস্ত্রীয় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হতো।

কিন্তু আজ যেকোনো কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে যান এবং জিজ্ঞেস করুন, "আপনার শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী?" তারা সবাই একবাক্যে বলবেন, "আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের ফিজিক্স, ম্যাথ বা হিস্ট্রি যাই শেখাই না কেন, আমার মূল লক্ষ্য হলো তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখানো, যাতে তারা নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারে"। কারণ মানুষের নিজের চিন্তাই হলো তার জীবনের সর্বোচ্চ গাইড।


মানবতাবাদের এই যে বিশাল ও সুন্দর প্রাসাদ যা মানুষের অনুভূতি, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আর তার সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে- তা আজ এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। তবে এই সংকট কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বা উত্তর কোরিয়া কিংবা রাশিয়ার একনায়কদের কাছ থেকে আসছে না। এই মারাত্মক হুমকিটি ধেয়ে আসছে সিলিকন ভ্যালির গবেষণাগার, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্রগুলো থেকে।

আজকের লাইফ সায়েন্স বা জীবনবিজ্ঞান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষকেরা আমাদের বলছেন যে, হিউম্যানিজমের এই পুরো গল্পটি আসলে একটি ভুল এবং সেকেলে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। হিউম্যানিজম ধরে নেয় মানুষের একটি ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বা 'Free will' আছে এবং মানুষের অনুভূতি হলো এক পরম পবিত্র বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রমাণ করছে যে, "স্বাধীন ইচ্ছা" বলে আসলে কিছু নেই।

ভৌত ও জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানের কাছে প্রকৃতির কেবল দুই ধরনের প্রক্রিয়া জানা আছে—একটিকে আমরা বলি ‘ডিটারমিনিস্টিক’ বা পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া (Deterministic processes), আর অন্যটি হলো ‘র‍্যান্ডম’ বা সম্পূর্ণ আকস্মিক প্রক্রিয়া (Random processes)। এই দুটির মিশ্রণে একটি সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিস্টিক ফলাফল আসতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে "স্বাধীনতা" বা 'Freedom' বলে কিছু থাকে না। মানুষ যেভাবে ঈশ্বর, স্বর্গ ও নরকের ধারণা তৈরি করেছে, ঠিক একইভাবে সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে "স্বাধীন ইচ্ছা"র ধারণাটি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সত্য এটাই যে, মানবদেহের জিন, নিউরন আর হরমোনের বাইরে এমন কোনো অদৃশ্য সত্তা নেই যা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তাহলে আমাদের অনুভূতিগুলোর কী হবে? প্রেম, বিরহ, ভয়, আনন্দ—এগুলো কি মিথ্যা? না, অনুভূতিগুলো মিথ্যা নয়, এগুলো বাস্তব। কিন্তু এগুলো কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নয়। বিজ্ঞান বলছে, অনুভূতি হলো আসলে ‘বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদম’।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গত এক শতাব্দীর গবেষণাকে যদি আমি মাত্র তিনটি শব্দে প্রকাশ করতে চাই, তবে তা হবে: "Organisms are algorithms" (জীব হলো এক ধরনের অ্যালগরিদম)। শিম্পাঞ্জি, তিমি বা মানুষের অনুভূতিগুলো আসলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, এগুলো হলো জীবনসংগ্রাম ও বংশবৃদ্ধির তাগিদে প্রকৃতি দ্বারা লাখ লাখ বছর ধরে তৈরি হওয়া এক জটিল গাণিতিক হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরা যাক, আফ্রিকার সাভানাতে একটি বাবুন বানর হেঁটে যাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য তাকে খাবার খুঁজতে হবে, আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে যেন সে নিজে কারো খাবার না হয়ে যায়। হঠাৎ সে একটি গাছে অনেকগুলো পাকা কলা দেখতে পেল। কিন্তু একই সাথে সে দেখল, গাছের কিছু দূরে একটি সিংহ বসে আছে। এখন বাবুনটিকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে- সে কি কলার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখবে, নাকি ওখান থেকে চলে যাবে?

এই সিদ্ধান্তটি আসলে কিসের সিদ্ধান্ত? এটি মূলত সম্ভাবনার হিসাব-নিকাশ। বাবুনটিকে মনে মনে হিসাব করতে হবে: আমি যদি কলার দিকে না যাই, তবে ক্ষুধায় আমার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? আর আমি যদি কলার দিকে যাই, তবে সিংহটি আমাকে ধরে ফেলার সম্ভাবনা কতটুকু? কোন সম্ভাবনাটি বেশি?

এই হিসাবটি করার জন্য বাবুনটির প্রচুর তথ্যের বা ডাটার প্রয়োজন।

  • কলার ডাটা: কলাগুলো গাছ থেকে কত উঁচুতে আছে? সেখানে কয়টি কলা আছে? সেগুলো কি বড় নাকি ছোট? পাকা নাকি কাঁচা? দশটি বড় পাকা কলা হলে এক হিসাব, আর দুটি ছোট কাঁচা কলা হলে অন্য হিসাব।

  • সিংহের ডাটা: সিংহটি গাছ থেকে কত দূরে আছে? সে কি ঘুমাচ্ছে নাকি জেগে আছে? সিংহটিকে দেখে কি ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে নাকি তার পেট ভরা? সে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে?

  • নিজের ডাটা: আমি নিজে কতটুকু ক্ষুধার্ত? আমি কত জোরে দৌড়াতে পারি?

এখন এই সমস্ত ডাটা বা তথ্যকে একত্র করে বাবুনটিকে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বাবুনটি তো আর পকেট থেকে কাগজ-কলম বা ক্যালকুলেটর বের করে প্রবাবিলিটি থিওরি মেলাবে না। তাহলে সে কীভাবে এই হিসাব করে?

আসলে, বাবুনটির পুরো শরীরটাই হলো একটি ক্যালকুলেটর। তার চোখ, কান, নাক চারপাশের পরিবেশ থেকে এই ডাটাগুলো সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন এবং পুরো স্নায়ুতন্ত্র মিলে মুহূর্তের মধ্যে বায়োকেমিক্যাল প্রসেসিং সম্পন্ন করে। এই হিসাবের ফলাফলটি কিন্তু কোনো সংখ্যা বা পার্সেন্টেজ হিসেবে ভেসে ওঠে না; ফলাফলটি প্রকাশ পায় একটি তীব্র ‘অনুভূতি’ বা ইমোশন হিসেবে।

যদি হিসাবের ফল বলে যে কলার দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, তবে বাবুনের শরীরে এক বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হবে এবং সে নিজের ভেতরে ‘সাহস’ অনুভব করবে। তার বুক ফুলে উঠবে এবং সে কলার দিকে দৌড় দেবে। আর যদি হিসাবের ফল বলে যে ঝুঁকি বেশি, তবে তার শরীরে অন্য রাসায়নিক কাজ করবে যা তাকে ‘ভয়’ হিসেবে নাড়া দেবে এবং সে ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচবে।

আমরা যাকে মনের তাগিদ, অনুভূতি বা হৃদয় বলি—তা আসলে লাখ লাখ বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এক অত্যন্ত উন্নত জৈবিক অ্যালগরিদম, যা আমাদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।


এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, অর্থাৎ জীব যে একটি অ্যালগরিদম—এই তত্ত্বটি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের বাস্তব জীবনে কোনো বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ কোনো চার্চ, কোনো সরকার বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি (KGB)-র পক্ষেও একজন মানুষের শরীরের ভেতরের ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না।

ধরা যাক, কেজিবি আপনার পেছনে ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখল। আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন- সব তারা রেকর্ড করল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেজিবির পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে আপনার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর ভেতরে কী ঘটছে, আপনার রক্তচাপ কেন বাড়ছে বা আপনার ডিএনএ-র গঠন কেমন। তাদের কাছে সেই বায়োলজিক্যাল জ্ঞানও ছিল না, আর সেই বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রসেস করার মতো কম্পিউটার বা প্রসেসিং পাওয়ারও ছিল না।

তাই এতদিন পর্যন্ত হিউম্যানিজমের এই পরামর্শটিই সেরা ছিল যে "তুমি পোপের কথা শুনো না, স্টালিনের কথা শুনো না, নিজের অনুভূতির কথা শোনো।" কারণ আপনার অনুভূতিই ছিল এই পৃথিবীর সবচেয়ে পরীক্ষিত ও সফল অ্যালগরিদম।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এসে আমরা দুটি বিশাল বৈজ্ঞানিক সুনামির মুখোমুখি হয়েছি, যা পরস্পরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। ১. একদিকে, ডারউইনের পর থেকে আমরা মানবদেহ, মস্তিষ্ক এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট বায়োলজিক্যাল জ্ঞান অর্জন করছি। ২. অন্যদিকে, কম্পিউটার সায়েন্সের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রনিক অ্যালগরিদম তৈরি করছি।

আজ যা ঘটছে, তা হলো এই দুটি সুনামির মিলন—অর্থাৎ বায়োটেক এবং ইনফোটেক -এর দেয়ালটি ভেঙে এক হয়ে যাচ্ছে। গুগল, অ্যামাজন, অ্যাপল বা ফেসবুক—যারা একসময় নিছক তথ্যপ্রযুক্তির কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা আজ ক্রমেই বায়োটেক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, মানুষের শরীর এবং মনের মেকানিজমও আসলে কোডিং আর ডাটার খেলা।

আমরা এমন এক বিন্দুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যেখানে এই প্রযুক্তি জায়ান্টদের তৈরি করা বাহ্যিক অ্যালগরিদমগুলো (External algorithms) আমাদের নিজেদের চেয়েও আমাদের অনেক ভালো বুঝতে পারবে। তাদের কাছে থাকবে আমাদের বায়োলজিক্যাল ডাটা, আমাদের জিনগত কোড এবং তা বিশ্লেষণ করার মতো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং পাওয়ার। আর যেদিন এই বাহ্যিক অ্যালগরিদমটি আপনাকে আপনার নিজের চেয়ে ভালো চিনবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষের থেকে কর্তৃত্বের চাবিকাঠি চলে যাবে অ্যালগরিদমের কাছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই কর্তৃত্ব বদলের খেলা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগের হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির একটি ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি একটি ডিএনএ টেস্ট করিয়েছিলেন। সেই টেস্টের রিপোর্টে দেখা গেল তাঁর শরীরে 'BRCA1' নামক জিনের একটি বিপজ্জনক মিউটেশন রয়েছে। বিগ ডাটা (Big Data) এবং পরিসংখ্যানের হিসাব অনুযায়ী, যে নারীদের শরীরে এই নির্দিষ্ট মিউটেশনটি থাকে, তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮৭%।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এই পরীক্ষাটি করিয়েছিলেন, তখন তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তাঁর নিজের অনুভূতি বা শরীর তাঁকে বলছিল না যে তিনি অসুস্থ। কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো অস্বস্তি ছিল না। হিউম্যানিজমের ভাষায় বললে, তাঁর হৃদয় বলছিল—"তুমি একদম ঠিক আছ, জীবন উপভোগ করো।" কিন্তু বিগ ডাটার অ্যালগরিদম তাঁকে বলছিল অন্য কথা, "তোমার শরীরের ভেতরে একটি টাইম বোম টিকটিক করছে। তুমি হয়তো এখন কিছুই টের পাচ্ছ না, কিন্তু ভেতরের সত্যটা ভিন্ন।"

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের অনুভূতির চেয়ে অ্যালগরিদমের সেই গাণিতিক হিসাবকে বেশি বিশ্বাস করলেন। তিনি কোনো লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচার (Double mastectomy) করালেন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিবন্ধ লিখে অন্য নারীদেরও এই বিষয়ে সচেতন করলেন। এই যে নিজের অনুভূতিকে পাশে সরিয়ে রেখে একটি বাহ্যিক অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ওপর নিজের জীবন সঁপে দেওয়া—এটাই হলো একবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত রূপ। ভবিষ্যতে আমরা কেউই আর নিজের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত নেব না; আমাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইস (Wearable devices) সার্বক্ষণিক আমাদের রক্ত, হরমোন আর হার্টবিট মেপে আমাদের চেয়ে আগে বলে দেবে আমাদের কখন কোন ওষুধ খেতে হবে বা কোন অপারেশন করাতে হবে।


ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে আমরা দেখব, মধ্যযুগের ধর্মগুলো বলত—কর্তৃত্ব আকাশ থেকে আসে। এরপর হিউম্যানিজম এসে বলল—কর্তৃত্ব মানুষের অনুভূতি থেকে আসে। আর আজ আমাদের চোখের সামনে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বৈশ্বিক ধর্ম বা মতাদর্শ, যাকে আমি বলি ‘ডাটাইজম’ (Dataism)। ডাটাইজম বিশ্বাস করে যে এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের উৎস হলো ‘ডাটা’ বা তথ্য। এই মতাদর্শ মানুষের হাত থেকে কর্তৃত্বকে পুনরায় আকাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—তবে তা কোনো ঈশ্বরের স্বর্গ নয়, তা হলো ‘গুগল ক্লাউড’ বা ‘মাইক্রোসফট ক্লাউড’।

ডাটাইজম মানুষকে বলছে: "তোমার নিজের হৃদয়ের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি গুগলের কথা শোনো, অ্যামাজনের কথা শোনো। কারণ তুমি কী অনুভব করছ এবং কেন অনুভব করছ—তা তোমার চেয়ে তারা অনেক নিখুঁতভাবে জানে। তাই তোমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তটি তারাই নিতে পারবে।"

একজন লেখক এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি সবসময় ভালোবাসিকে মাটির কাছাকাছি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝতে। চলুন দেখা যাক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সিদ্ধান্তগুলো এই অ্যালগরিদমের প্রভাবে কীভাবে বদলে যাচ্ছে।

খুব সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত—"আমি আজ কোন বইটি পড়ব?"

  • মধ্যযুগে আপনি এই প্রশ্ন নিয়ে যেতেন চার্চের পুরোহিতের কাছে। তিনি বলতেন, "বাইবেল পড়ুন। এর বাইরে আর কোনো বই পড়ার প্রয়োজন নেই।"

  • হিউম্যানিজমের যুগে আপনি যেতেন একটি বইয়ের দোকানে। বইগুলোর তাকের মাঝখান দিয়ে হাঁটতেন, দু-একটি বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতেন এবং নিজের ভেতরের একটি ‘গাট ইনস্টিনক্ট’ বা মনের টানে একটি বই কিনে বাড়ি ফিরতেন।

  • আর আজ, ডাটাইজমের প্রাথমিক যুগে আমরা যখন অ্যামাজনের ভার্চুয়াল বুকশপে ঢুকি, একটি অ্যালগরিদম স্ক্রিনে ভেসে উঠে বলে—"আমি তোমাকে চিনি। গত কয়েক বছর ধরে তুমি কী কী বই কিনেছ, কোন বিষয়গুলো পছন্দ করেছ তা আমি জানি। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমি তোমাকে এই তিনটি বই পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।"

কিন্তু এটি তো কেবল শুরু, অত্যন্ত প্রাথমিক একটি পদক্ষেপ। এর পরের ধাপটি আরও চমকপ্রদ এবং কিছুটা ভয়ানক, যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা যখন কিন্ডল (Kindle) বা কোনো ই-রিডারে বই পড়ি, তখন আমরা ভাবি আমরা বইটি পড়ছি। কিন্তু সত্য হলো—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, আপনি যখন বইটি পড়ছেন, বইটি একই সাথে আপনাকে পড়ছে! গুটেনবার্গের ছাপাখানার বই কখনো মানুষকে পড়তে পারত না। কিন্তু কিন্ডল জানে আপনি বইয়ের কোন পাতাটি কত দ্রুত পড়ছেন, কোন লাইনে এসে আপনি থমকে গেছেন, আর কোন পৃষ্ঠায় যাওয়ার পর আপনি বইটি বন্ধ করে দিয়েছেন এবং আর কখনোই খোলেননি।

এখন কল্পনা করুন, এই ই-রিডারকে যদি আপনার ডিভাইসের ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial recognition) বা মুখাবয়ব চেনার প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা হয়, তবে কিন্ডল বুঝতে পারবে বইয়ের কোন লাইনটি পড়ে আপনি হাসলেন, কোন অংশটি পড়ে আপনার চোখে জল এলো, আর কোথায় গিয়ে আপনি বিরক্ত হলেন।

এর চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে, যখন এই রিডারকে আপনার হাতের স্মার্টওয়াচ বা শরীরের ভেতরের কোনো বায়োমেট্রিক সেন্সরের সাথে যুক্ত করা হবে, তখন অ্যামাজন বা গুগল জানতে পারবে তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়ার সময় কোন বাক্যটিতে আপনার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, কোন দৃশ্যে আপনার হার্টবিট দ্রুত হয়েছিল আর কোথায় আপনার শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসৃত হয়েছিল।

আপনি হয়তো বইটি শেষ করার পর তার অর্ধেকের বেশি ভুলে যাবেন, কিন্তু অ্যামাজন কিছুই ভুলবে না। বইটি পড়া শেষ হওয়ার পর অ্যামাজন আপনার মনস্তত্ত্বের এমন একটি নিখুঁত প্রোফাইল তৈরি করে ফেলবে, যা দিয়ে সে আপনার ইমোশনাল বোতামগুলো ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

বই কেনার চেয়েও মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো সঙ্গী নির্বাচন—কাকে আমি বিয়ে করব, কার সাথে আমি জীবন কাটাব? বিবর্তনের পরিভাষায় এটি হলো 'Mate selection', যা যেকোনো প্রাণীর বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।

ধরা যাক, আমি একটি সম্পর্কে আছি এবং আমার সঙ্গী আমাকে আলটিমেটাম দিল—"হয় তুমি আমাকে বিয়ে করো, না হয় আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।" এখন আমি এক চরম সংকটে।

  • মধ্যযুগে আমি হয়তো কোনো কাজীর কাছে বা পুরোহিতের কাছে যেতাম দোয়ার জন্য বা উপদেশের জন্য।

  • বিংশ শতাব্দীতে আমার বন্ধুরা আমাকে বলত, "নিজের মনের কথা শোনো, তোমার মন যার দিকে টানে, তাকেই বেছে নাও।"

  • কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই ডাটাইজমের যুগে আমি গুগলের কাছে গিয়ে বলব, "গুগল, আমার সামনে এই কঠিন সিদ্ধান্ত। আমি এখন কী করব? আমার কি একে বিয়ে করা উচিত?"

গুগল তখন তার বিশাল সার্ভার থেকে আমার সমস্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে বলবে: "দেখো, আমি তোমার জন্মের পর থেকে তোমাকে ট্র্যাক করছি। আমি তোমার জীবনের প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি সার্চ হিস্ট্রি, তোমার করা প্রতিটি ফোন কল জানি। তুমি যখনই থিয়েটারে কোনো সিনেমা দেখেছ বা কোনো গান শুনেছ, তোমার হার্টবিট কেমন ছিল তা আমি রেকর্ড করেছি। এমনকি তুমি যখন এই মানুষটির সাথে ডেটিংয়ে গিয়েছ, তখন তোমার রক্তচাপ কতটা বেড়েছিল, তাও আমার জানা আছে। আমার কাছে তোমার ডিএনএ রিপোর্ট এবং মেডিকেল রেকর্ডও আছে। শুধু তাই নয়, তোমার সঙ্গীর সমস্ত ডাটাও আমার কাছে আছে। আর আমার সার্ভারে আছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সফল ও ব্যর্থ দাম্পত্য জীবনের ডাটাবেজ। এই সমস্ত তথ্যকে আমাদের কোয়ান্টাম অ্যালগরিদমে প্রসেস করে আমি তোমাকে ৮৭% নিশ্চিতmap দিয়ে বলছি যে—একে বিয়ে করলেই তুমি দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুখী হবে।"

গুগল এখানেই থামবে না। সে আরও যোগ করবে: "আমি তোমাকে এত ভালো চিনি যে, আমি জানি আমি এখন যে পরামর্শটি দিলাম, তা তোমার পছন্দ হয়নি। তোমার মন খারাপ হয়েছে। আমি এটাও জানি কেন তোমার মন খারাপ হয়েছে। কারণ তোমার যে আদিম বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদমটি এক লাখ বছর আগে আফ্রিকার সাভানাতে তৈরি হয়েছিল, তা বাহ্যিক সৌন্দর্য বা লুকসকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। আদিম যুগে ভালো চেহারা সুস্থতার লক্ষণ ছিল বলে তোমার জিন ওদিকেই টানছে। তুমি ভাবছ এই ছেলে বা মেয়েটি দেখতে ততটা সুন্দর নয়, তাই তোমার মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আমার আধুনিক পোস্ট-মডার্ন অ্যালগরিদম জানে যে দীর্ঘমেয়াদী সুখী দাম্পত্যে বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভূমিকা মাত্র ১১%, যেখানে তোমার আদিম মন একে ৩০% গুরুত্ব দিচ্ছে। অতএব, নিজের প্রাচীন মনকে বাদ দিয়ে আমার কথা শোনো। বিয়েটা করেই ফেলো।"

এখানে একটি বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। গুগলকে কিন্তু ১০০% নিখুঁত বা অন্তর্যামী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাকে কেবল একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে কত বড় বড় ভুল করে! ভুল সাবজেক্টে পড়াশোনা করে, ভুল মানুষকে বিয়ে করে, ভুল পেশা বেছে নেয় এবং ১০ বছর পর মাথায় হাত দিয়ে বলে—"হায়! আমি কী ভুলই না করেছিলাম!" গুগলকে কেবল মানুষের এই গড়পড়তা ভুলের চেয়ে একটু কম ভুল করতে হবে। আর যখনই আমরা দেখব যে গুগলের দেওয়া পরামর্শগুলো মেনে চললে আমাদের জীবন আসলেই সহজ আর সুন্দর হচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুগলের হাতে তুলে দেব।

আজকে আমরা যখন শহরের কোনো অচেনা রাস্তায় গাড়ি চালাই, আমরা কি আমাদের নিজেদের দিকবিদিকের অনুভূতির ওপর ভরসা করি? না। আমরা চোখ বন্ধ করে গুগল ম্যাপস (Google Maps) বা ওয়েজ (Waze)-এর নির্দেশ মেনে চলি। ডানে মোড় নিতে মন চাইলেও ম্যাপ যদি বলে বাঁয়ে যেতে, আমরা বাঁয়েই যাই। কারণ আমরা জানি ম্যাপ আমাদের চেয়ে বেশি তথ্য জানে। এর ফলে আজ আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক দিক চেনার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। স্মার্টফোনটি বন্ধ হয়ে গেলে আমরা অনেকেই আজ সম্পূর্ণ অন্ধ ও অসহায় বোধ করি। এভাবেই খুব ছোট ছোট পদক্ষেপে, স্বেচ্ছায়, কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়াই আমরা আমাদের কর্তৃত্ব অ্যালগরিদমের কাছে হস্তান্তর করছি।


কর্তৃত্বের এই যে স্থানান্তর, তা আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে? এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অ্যালগরিদম যখন আমাদের অনুভূতিকে হ্যাক করতে পারবে, তখন দুটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার জন্ম হতে পারে।

১. ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্রের চরম রূপ (Digital Dictatorship)

যদি এই প্রযুক্তি কোনো সর্বগ্রাসী বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারের হাতে পড়ে—যেমন উত্তর কোরিয়া—তবে তা এক ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। আজকের দিনে উত্তর কোরিয়ার মানুষ মুখে একনায়ক কিম জং উনের প্রশংসা করলেও মনে মনে হয়তো তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু স্বৈরশাসক মানুষের মনের খবর জানে না বলে তারা বেঁচে যায়।

কিন্তু ভবিষ্যতে যখন উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি নাগরিককে একটি বাধ্যতামূলক বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট বা চিপ পরতে হবে, এবং তারা যখন কোনো ঘরের দেওয়ালে কিম জং উনের ছবি দেখবে—তখন যদি তাদের রক্তচাপ, হার্টবিট বা মস্তিষ্কের নিউরনের কম্পন সামান্যতম রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অ্যালগরিদম সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় পুলিশকে অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে। সেই মানুষটির অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যাবে। এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত এবং নিশ্ছিদ্র স্বৈরতন্ত্র, যেখানে মানুষের মনে মনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হবে।

২. উদারনৈতিক সমাজের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

অন্য দিকে, আমেরিকার মতো একটি লিবারেল বা মুক্ত সমাজে এই প্রযুক্তি স্বৈরতন্ত্রের রূপ না নিয়ে হয়তো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের রূপ নেবে। সেখানে অ্যালগরিদম আপনাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে না, কিন্তু সে আপনাকে এত সূক্ষ্মভাবে প্ররোচিত (Nudge) করবে যে আপনি ভাববেন আপনি নিজের ইচ্ছাতেই কাজটি করছেন। আপনার মন খারাপের মুহূর্তে সে আপনার সামনে এমন পণ্যের বিজ্ঞাপন আনবে যা আপনি কিনে ফেলবেন। আপনার ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য আপনার ভয়ের বোতামগুলোতে চাপ দেবে। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা সেখানে পরিণত হবে একটি নিয়ন্ত্রিত পণ্যে।


আমার এই পুরো বক্তব্য শোনার পর আপনাদের মনে হতে পারে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ তবে সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং আমরা এক অনিবার্য নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শেষ করার আগে আমি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা ‘ক্যাভিয়েট’ (Caveats) আপনাদের সামনে রাখতে চাই, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।

প্রথম সংশয়: মন এবং মস্তিষ্কের পার্থক্য (Mind vs. Brain)

আমার এই পুরো থিওরি বা ডাটাইজমের মূল ভিত্তি হলো একটি ধারণা—"Organisms are algorithms" (জীব হলো অ্যালগরিদম)। কিন্তু বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত মস্তিষ্কের (Brain) মেকানিজম কিছুটা বুঝতে পারলেও, মানুষের ‘মন’ বা চেতনা (Mind) সম্পর্কে এখনও প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছে।

মস্তিষ্ক হলো নিউরন, সিন্যাপ্স আর কেমিক্যালের একটি ভৌত নেটওয়ার্ক। কিন্তু ‘চেতনা’ বা ‘মন’ হলো আমাদের অনুভূতি—ভয় পাওয়ার অনুভূতি, ভালোবাসার অনুভূতি, কোনো কিছুর স্বাদ নেওয়ার ভেতরের অভিজ্ঞতা (Subjective experiences)। বিজ্ঞান আজও জানে না কীভাবে মস্তিষ্কের কোটি কোটি ইলেকট্রনিক সিগন্যাল থেকে একটি জীবন্ত অনুভূতির জন্ম হয়।

যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে মানুষের মন বা চেতনাকে কেবল গাণিতিক অ্যালগরিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে কম্পিউটারের পক্ষে কখনোই মানুষকে পুরোপুরি হ্যাক করা সম্ভব হবে না। তখন এই পুরো ‘হোমো ডিউস’ বা অ্যালগরিদমিক রাজত্বের গল্পটি একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বা ফ্যান্টাসি হিসেবেই থেকে যাবে।

দ্বিতীয় সংশয়: প্রযুক্তি কখনো পূর্বনির্ধারিত নয় (Technology is not deterministic)

ইতিহাস থেকে আমরা যে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পাই, তা হলো—প্রযুক্তি আমাদের কেবল একটি পথ দেখায়, কিন্তু আমরা সেই প্রযুক্তি দিয়ে কেমন সমাজ তৈরি করব, তা কিন্তু আমাদের ওপরই নির্ভর করে। প্রযুক্তি কোনো ভাগ্য বা নিয়তি নয়।

বিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের কথা ধরা যাক। ট্রেন, বিদ্যুৎ, রেডিও, গাড়ি—এই প্রযুক্তিগুলো যখন আবিষ্কৃত হলো, তখন কিন্তু ট্রেন এসে মানুষকে বলে দেয়নি যে তাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। মানুষ এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দিকে তৈরি করেছে হিটলারের ফ্যাসিবাদের অমানবিক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, স্টালিনের কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রের গুলাগ, আবার অন্য দিকে তৈরি করেছে পশ্চিমের উদারনৈতিক গণতন্ত্র।

আমি প্রায়ই একটি চমৎকার এবং দৃশ্যমান উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝানোর চেষ্টা করি। আপনারা যদি রাতের বেলায় মহাকাশ থেকে তোলা পূর্ব এশিয়ার একটি স্যাটেলাইট ছবি দেখেন, তবে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়বে।

  • ছবির নিচের ডান কোণায় দেখা যাবে আলোর এক সুবিশাল সমুদ্র—সেটি হলো আধুনিক, উন্নত দক্ষিণ কোরিয়া।

  • ছবির ওপরের অংশে দেখা যাবে আলোর আরেকটি বিশাল অবয়ব—সেটি হলো চীন।

  • আর এই দুই আলোর সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিশাল অন্ধকার গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল দেখা যায়। সেটি কিন্তু কোনো সমুদ্র বা মহাসমুদ্র নয়; ওটি হলো উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়ার মানুষ কি বিদ্যুৎ বা লাইট বাল্বের প্রযুক্তি সম্পর্কে জানে না? অবশ্যই জানে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া বা চীন বিদ্যুৎ দিয়ে যে ধরনের সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার শাসকরা বিদ্যুৎ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অন্ধকার একটি সমাজ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি এক হলেও মানুষের সিদ্ধান্তের কারণে ফলাফল সম্পূর্ণ আলাদা হয়েছে।


তাই আজ আমি আপনাদের সামনে যে অ্যালগরিদমিক ভবিষ্যতের চিত্রটি তুলে ধরলাম—যেখানে আমাদের অনুভূতিগুলো তার সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে, যেখানে গুগল বা অ্যামাজন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে—তা কিন্তু কোনো অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। এটি কেবল একটি সম্ভাবনা, একটি সতর্কবার্তা।

যদি আপনাদের এই আসন্ন ভবিষ্যতের রূপরেখা পছন্দ না হয়, যদি আপনারা মনে করেন যে মানুষের অনুভূতি আর তার স্বাধীন ইচ্ছার মর্যাদা অ্যালগরিদমের গাণিতিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, তবে আজই আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে এই প্রযুক্তিগুলো কাজ করছে, কীভাবে আমাদের ডাটা নিয়ে আমাদের অজান্তেই আমাদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে।

আমরা যদি আজ সচেতন না হই, আমরা যদি আমাদের সমস্ত তথ্য ও মনোযোগ অন্ধের মতো এই বড় বড় টেক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দিতে থাকি, তবে কর্তৃত্বের এই স্থানান্তর কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি এই প্রযুক্তির সঠিক ও মানবিক ব্যবহারের আইনি ও নৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারি, তবে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে আমাদের গৌরবময় অস্তিত্ব আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারব।

ভবিষ্যৎ কিন্তু ইতিমধ্যেই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি আমাদের জীবনের ম্যাপটি গুগলের হাতে দিয়ে অন্ধের মতো গাড়ি চালিয়ে যাব, নাকি মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং চাকাটি নিজের হাতে ধরে ম্যাপের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো পথ আবিষ্কার করব?

No comments:

Post a Comment

এক অদম্য লড়াই ও কাঁচের সাম্রাজ্য জয়ের মহাকাব্য

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশ...