বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত আঁধারে নিমজ্জিত। যে জনপদে ভোরের আলোয় শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ প্রতিটি ভোরে পত্রিকার পাতা খুললেই ভেসে আসে কোনো না কোনো নিথর দেহের ছবি। কখনো সেই দেহ পড়ে থাকে স্যুয়ারেজ লাইনে, কখনো ড্রামে, আবার কখনো বা নিজ ঘরের ঠিক পাশের ফ্ল্যাটের কোনো এক অন্ধকার কোণে। মিরপুরের সাত-আট বছরের শিশু লামিসার পরিণতি আমাদের সমাজের সেই বীভৎস চেহারাটিকেই উন্মোচিত করেছে, যা আমরা সভ্যতার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি।
একটি জুতো দরজার সামনে পড়ে আছে, আর অন্যটি নিখোঁজ এই দৃশ্যটি একজন মা বা বাবার কাছে কেবল একটি হারানো বস্তু নয়, এটি একটি অশুভ সংকেত, একটি কলিজা ছিঁড়ে যাওয়া হাহাকার। যখন সেই বাবা বা মা পাগলের মতো প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়েন, তখন তিনি আসলে কড়া নাড়েন আমাদের বিবেকের দ্বারে। কিন্তু আমরা কি সেই দুয়ার খুলি? যখন ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশ এসে পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙে, তখন যা দেখা যায়, তা কোনো সুস্থ মানুষের কল্পনারও অতীত। একটি নিথর দেহ, চারপাশ লালিমায় সিক্ত। আর বাথরুমের বালতিতে পড়ে আছে সেই চিরচেনা মুখটি—যে মুখে প্রতিদিন অজস্র চুমু একেঁ দিতেন তার বাবা-মা। যে চুলগুলোকে পরম মমতায় বেণী করে দিতেন মা, সেই চুল ধরেই ঘাতক সোহেল রানা তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর ওপাড়ে।
লামিসার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যে কারণগুলো উঠে আসছে, তা কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধি। ঘাতক সোহেল রানার মতো মানুষরা আমাদের মাঝেই বিচরণ করছে। তারা প্রতিবেশী সেজে থাকে, সুযোগ বুঝে শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোহেলের স্ত্রীর জবানবন্দি অনুযায়ী, সে নিজেও ছিল তার স্বামীর বিকৃত যৌনাচারের শিকার। প্রশ্ন হলো, এই বিকৃতি সমাজ বা রাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে কীভাবে মহীরুহে পরিণত হয়?
কেন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একটি সাত-আট বছরের শিশুর প্রতি কামাতুর হয়? এটি কি কেবল ব্যক্তিগত বিচ্যুতি, নাকি আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পচনের ফলাফল? ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত দুনিয়ায় পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের চারপাশের অপরাধীদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব।
লামিসার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। আমাদের সমাজের শিকড় যে কতটা গভীরে পচে গিয়েছে, তার প্রমাণ মেলে গলির মোড়ে ৯-১০ বছরের শিশুদের কর্মকাণ্ডে। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল গল্পের বই বা খেলার বল, সেই বয়সে তারা সিগারেট টানছে, পাহারাদার বসাচ্ছে এবং বিকৃত যৌন অনুকরণ করছে। ৯-১০ বছরের ছেলে-মেয়েরা ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে 'সংসার' করার নেশায় এই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আমাদের সন্তানদের এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
এই শিশুরা এসব শিখছে কোথায় থেকে? তারা যা দেখছে, তা-ই অনুকরণ করছে। আকাশ সংস্কৃতি, স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার এবং বাবা-মায়ের চরম উদাসীনতা তাদের এই পথে ধাবিত করছে। সন্তানকে জন্ম দেওয়াটাই শেষ কথা নয়; তাকে মানুষের মতো বড় করার দায়িত্বও পরিবারের। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক বাবা-মা সন্তানদের 'রাস্তার প্রাণীর' মতো ছেড়ে দেন। তারা কার সাথে মিশছে, কার কাছে যাচ্ছে, মোবাইল বা ইন্টারনেটে কী দেখছে এই নূন্যতম খবরটুকু রাখার প্রয়োজনীয়তা অনেকে অনুভব করেন না। ফাহিমা নামের যে শিশুটি প্রতিবেশী চাচার কাছে সিগারেট আনতে গিয়ে নিজের জীবন দিল, তার রক্ত আমাদের সবার হাতে লেগে আছে। কারণ, আমরা আমাদের প্রতিবেশীকেও আর বিশ্বাস করতে পারছি না।
লামিসা বা ফাহিমার মতো হাজারো শিশুর লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে কারণ রাষ্ট্র এখানে একটি নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। যখন কোনো অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া এতই দীর্ঘ এবং জটিল যে, অনেক সময় বিচার পেতে পেতে ভুক্তভোগীর পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল ভিআইপিদের জন্যই কি সীমাবদ্ধ? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা ছিল, তা আজ ভোটের রাজনীতি আর দুর্নীতির আড়ালে চাপা পড়েছে। অপরাধীদের অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালন-পালন করা হয়। ফলে, সোহেল রানার মতো ঘাতকরা গ্রিল কেটে পালানোর সাহস পায়। বিচার ব্যবস্থা যদি কার্যকর হতো, যদি প্রতিটি শিশু হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হতো, তবে হয়তো লামিসাদের রক্তে মেঝের লালিমা আজ আমাদের দেখতে হতো না।
বর্তমানে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে বাবা-মাকে প্রতিটি মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখতে হয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি পরিস্থিতি। যে প্রতিবেশী বিপদে এগিয়ে আসার কথা, তাকেই আজ ঘাতক হিসেবে ভাবতে হচ্ছে। সন্তানকে 'সেফটি স্কিল' বা 'গুড টাচ/ব্যাড টাচ' শেখানো আজ বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অন্যতম অংশ।
সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তারা যাতে কোনো ছোটখাটো অস্বস্তিও বাবা-মাকে খুলে বলতে পারে, সেই বিশ্বস্ততার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ, শিশুদের ওপর হওয়া অধিকাংশ নির্যাতনই ঘটে অতি পরিচিত মানুষদের দ্বারা। দারোয়ান, শিক্ষক, প্রতিবেশী এমনকি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও শিশুরা আজ নিরাপদ নয়।
একজন মা বা বাবার হাহাকার যখন এই পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিনি বলেন, "মেয়েদেরকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন... তাহলে আমাদের বলেন, আমরা এই দেশে মেয়ে জন্ম দেওয়া বন্ধ করে ফেলি," তখন বুঝতে হবে সমাজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই চরম উক্তিটি আসলে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার স্মারক।
লামিসা আজ নেই। কিন্তু আপনার ঘরে যে সন্তানটি এখনো হাসছে, খেলছে, সে কি নিরাপদ? তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি কে দেবে? রাষ্ট্র? আইন? নাকি সমাজ? বাস্তব সত্য হলো, কেউ আপনাকে গ্যারান্টি দেবে না। আপনাকে আপনার সন্তানের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি সেকেন্ড তাদের চোখে চোখে রাখতে হবে।
লামিসার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল যে, আমরা একটি অসুস্থ সমাজে বাস করছি। এই লাশের মিছিল থামানোর একমাত্র পথ হলো সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। সরকারকে বুঝতে হবে, উন্নয়নের বড় বড় অট্টালিকা কোনো কাজে আসবে না যদি সেই অট্টালিকার ভেতরের শিশুরা নিরাপদ না থাকে।
লামিসার রক্তমাখা নিথর দেহটি আমাদের একটি বার্তাই দিয়ে গেল হয় আমরা আমাদের সমাজকে আমূল বদলে ফেলবো, নয়তো একের পর এক লামিসাদের রক্তে আমাদের হাত রঞ্জিত হতে থাকবে। আজ আপনার সন্তান নিরাপদ আছে বলে আপনি শুকরিয়া আদায় করতে পারেন, কিন্তু আগামীকালের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।
তাই সজাগ হতে হবে এখনই।
No comments:
Post a Comment