মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যুদ্ধ, মহামারি, সাম্রাজ্যের পতন কিংবা আধুনিক অর্থনৈতিক মন্দা- যেকোনো চরম সংকটে যখনই মানুষ তার প্রচলিত ব্যবস্থা বা কাগজের মুদ্রার ওপর আস্থা হারিয়েছে, তখনই সে বুক পেতে আশ্রয় নিয়েছে স্বর্ণের নিরাপদ বলয়ে। কাগজের মুদ্রা বা আধুনিক ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা যেখানে সরকারের নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে স্বর্ণের আবেদন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সার্বজনীন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে, বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণের দামের যে অভাবনীয় ও রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, তা সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে এক গভীর চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সোনার দামের এই উল্লম্ফন কেবল অলংকার তৈরির চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ঘটেনি; এর পেছনে রয়েছে গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের ক্ষয় এবং এক নতুন বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে- সাধারণ মানুষ বা বিনিয়োগকারীরা এখন কী করবেন? সোনা কি আরও কিনে রাখবেন, নাকি চড়া দামে বিক্রি করে লাভ তুলে নেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে স্বর্ণের দীর্ঘ ইতিহাস এবং বিশ্ব অর্থনীতির জটিল গোলকধাঁধায়।
স্বর্ণের মূল্যের দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন বুঝতে হলে আমাদের দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং বৈশ্বিক চিত্রের তুলনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ দশকে মুদ্রাস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার যে রূপান্তর ঘটেছে, তার সবচেয়ে বড় সূচক হলো স্বর্ণের দাম।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম ছিল মাত্র ১৫৪ টাকা। সেই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল বার্ষিক প্রায় ৭০ মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী ছিল প্রায় ৫১০ টাকা। অর্থাৎ, স্বাধীনতার ঠিক পর পর একজন সাধারণ নাগরিকের গড় বার্ষিক আয় দিয়ে প্রায় তিন ভরি সোনা অনায়াসে কিনে ফেলা সম্ভব হতো।
অথচ, ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। সরকারের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫১ টাকায়। আপাতদৃষ্টিতে টাকার অঙ্কে এই আয় বিশাল মনে হলেও, স্বর্ণের বর্তমান আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে এই বিপুল পরিমাণ বার্ষিক আয় দিয়ে এখন বাজারে দেড় ভরি সোনাও কেনা সম্ভব নয়। এই সাধারণ সমীকরণটিই প্রমাণ করে যে, গত ৫৫ বছরে কাগজের টাকা বা দেশীয় মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কতটা হ্রাস পেয়েছে এবং তার বিপরীতে স্বর্ণ নিজের অন্তর্নিহিত মূল্যকে কীভাবে ধরে রেখেছে।
স্বর্ণের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে ২০২৫ সালে। বিগত বছরগুলোতে স্বর্ণের দাম পর্যায়ক্রমে বাড়লেও ২০২৫ সালের উত্থান ছিল অবিশ্বাস্য ও দ্রুতগতির। উদাহরণস্বরূপ, যদি ২০২৫ সালের একেবারে শুরুতে কোনো বিনিয়োগকারী স্বর্ণের পেছনে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে রাখতেন, তবে মাত্র এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৬ সালের শুরুতে সেই স্বর্ণের বাজারমূল্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টাকায়।
মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে প্রায় ৬০ শতাংশ মুনাফা বা রিটার্ন সাধারণ যেকোনো বৈধ বিনিয়োগ মাধ্যমের (যেমন ব্যাংক এফডিআর, সঞ্চয়পত্র বা শেয়ার বাজার) তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণত স্বর্ণের দাম এত অল্প সময়ে এত তীব্র গতিতে বাড়ে না। এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধিই ইঙ্গিত করে যে, বিশ্ব অর্থনীতির অন্দরমহলে এক বড় ধরনের ওলটপালট বা কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে চলেছে।
অর্থনীতিতে একটি চিরন্তন সত্য রয়েছে- স্বর্ণের দাম বাড়ার মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের ‘আস্থা’ এবং ‘ভয়’। মানুষ যখনই বুঝতে পারে যে তার পকেটে থাকা কাগজের টাকা, ব্যাংকে জমানো আমানত কিংবা দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হচ্ছে, তখনই সে স্বর্ণের দিকে ধাবিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চাইলেই যেকোনো সময় দেশের অর্থনীতি সচল রাখার নামে বা ঋণ শোধ করার জন্য কাগজের টাকা বা নোট ছাপাতে পারে। একে বলা হয় ‘ফিয়াট কারেন্সি’। অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা দেয় তীব্র মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এছাড়া শেয়ার বাজারের পতন ঘটতে পারে, বন্ডের বাজার ধসে যেতে পারে এবং ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। সোনা কোনো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে বা কোনো সরকারি ছাপাখানায় বোতাম চেপে তৈরি করা যায় না। এটি একটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খনি থেকে তুলতে বিপুল শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলস্বরূপ, হাজার বছর ধরে চলে আসা এই ধাতুর ওপর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আস্থা কখনো নষ্ট হয় না। যখন কাগজের টাকার মান কমতে থাকে, তখন সমপরিমাণ স্বর্ণ কিনতে বেশি পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হয়, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি “সোনার দাম বাড়ছে”। আসলে অনেক সময় সোনার দাম বাড়ে না, বরং কাগজের মুদ্রার মান কমে যায়।
বিশ্ব অর্থনীতি ও স্বর্ণের ভাগ্য বহু বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা স্বর্ণের নিয়ন্ত্রণে মার্কিন সরকারের তিনটি বড় এবং বিতর্কিত পদক্ষেপ দেখতে পাই।
১৯৩০-এর দশকে সমগ্র বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রাস করেছিল ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দা। ব্যাংকগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়ে রাস্তায় বসেছিল এবং পুরো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই চরম সংকটের মুখে মার্কিন নাগরিকেরা কাগজের ডলারের ওপর আস্থা হারিয়ে দলে দলে সোনা কিনতে শুরু করে এবং ঘরে সোনা মজুত করতে থাকে। সে সময় মার্কিন মুদ্রানীতির নিয়ম ছিল- সরকারকে প্রতি এক ডলার ছাপানোর বিপরীতে তার ৪০ শতাংশ মূল্যমানের সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বা ফেডারেল রিজার্ভে সংরক্ষণ করতে হতো। কিন্তু মানুষ সমস্ত সোনা নিজেদের ঘরে লুকিয়ে ফেলায় সরকারের পক্ষে নতুন ডলার ছাপানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৩৩ সালের ৫ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এক ঐতিহাসিক ও চরম বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এই আদেশের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে সোনা মজুত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হয়। সমস্ত নাগরিককে তাদের ঘরে থাকা সোনা সরকারের কাছে নির্দিষ্ট মূল্যে (আউন্স প্রতি ২০.৬৭ ডলার) জমা দিতে বাধ্য করা হয়। ইতিহাসে একে অনেক অর্থনীতিবিদ The Great Gold Robbery বলে অভিহিত করেন।
জনগণের কাছ থেকে সমস্ত সোনা বাজেয়াপ্ত করার পর, রুজভেল্ট এক ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ২০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ ডলার করে দেন। অর্থাৎ রাতারাতি সোনার দাম ৬৯ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং মার্কিন সরকার প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টনেরও বেশি সোনা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে মার্কিন নাগরিকদের এই সোনা কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। অবশেষে ১৯৭৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে মার্কিন নাগরিকেরা পুনরায় ব্যক্তিগতভাবে সোনা কেনা ও রাখার অধিকার ফিরে পান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হবে মার্কিন ডলার এবং এই ডলারের মান সরাসরি স্বর্ণের সাথে যুক্ত থাকবে (প্রতি আউন্স সোনা = ৩৫ ডলার)। বিশ্বের যেকোনো দেশ চাইলে মার্কিন সরকারকে ডলার দিয়ে তার বিপরীতে সোনা তুলে নিতে পারত।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ নানা সামাজিক কর্মসূচির কারণে আয়ের চেয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা শুরু করে। এই বিপুল খরচের জোগান দিতে মার্কিন সরকার তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি কাগজের ডলার ছেপে বাজারে ছেড়ে দেয়। এটি বুঝতে পেরে ইউরোপের দেশগুলো (বিশেষ করে ফ্রান্স) তাদের ডলার ফেরত দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সোনা দাবি করতে শুরু করে। এতে মার্কিন স্বর্ণের রিজার্ভ দ্রুত খালি হতে থাকে।
এই ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন (Richard Nixon) টেলিভিশনে এসে এক আকস্মিক ঘোষণা দেন, যা অর্থনীতিতে ‘নিক্সন শক’ নামে পরিচিত। তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সোনা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা আমেরিকা আর মানবে না। অর্থাৎ, ডলার ও স্বর্ণের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কটি ছিন্ন করা হলো।
এর ফলে বিশ্ব এক সম্পূর্ণ নতুন ‘ফিয়াট মানি’ বা কাগজের মুদ্রার যুগে প্রবেশ করে। সোনা থেকে মুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৩৫ ডলারের কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে এবং ১৯৮০ সালের মধ্যে তা আউন্স প্রতি ৮৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকে।
ডলার ও স্বর্ণের সম্পর্কের বিবর্তন:
[১৯৪৪ (ব্রেটন উডস)] -> ১ আউন্স সোনা = ৩৫ ডলার (স্থির হার)
[১৯৭১ (নিক্সন শক)] -> স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পর্ক ছিন্ন (মুক্ত বাজার)
[১৯৮০ সালের মধ্যে] -> স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়ে আউন্স প্রতি ৮৫০ ডলারে পৌঁছায়
যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই তেল কেনার প্রয়োজন ছিল, তাই তেল কেনার জন্য প্রতিটি দেশকে বাধ্য হয়েই ডলারের রিজার্ভ রাখতে হতো। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থা। এই কৌশলের কারণে স্বর্ণের ব্যাকআপ ছাড়াই মার্কিন ডলার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একক আধিপত্যশীল মুদ্রায় পরিণত হয়।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার ওপর ভর করে বিশ্ব অর্থনীতি ভালোই চলছিল, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে মার্কিন পুঁজিবাদী অর্থনীতি পুনরায় বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতের ঋণের ওপর ভিত্তি করে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এই মন্দা কাটিয়ে উঠতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (Fed) এক নতুন এবং বিতর্কিত আর্থিক নীতি গ্রহণ করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ (Quantitative Easing - QE)। এটি আসলে আধুনিক উপায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা তৈরি বা ছাপানোর একটি প্রক্রিয়া।
এই নীতিমালার অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নতুন মুদ্রা তৈরি করে বাজার থেকে সরাসরি বাণিজ্যিক বন্ড এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ কিনে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়ানো এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনে ঋণ নেওয়া সহজ করা। কিন্তু অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের নিজস্ব মান কমতে শুরু করে। বিনিয়োগকারীরা আবারও বুঝতে পারেন যে কাগজের টাকা নিরাপদ নয়। ফলে স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৮০০ ডলার থেকে এক লাফে ১,৯০০ ডলারে উঠে যায়।
২০২০ সালে যখন করোনা ভাইরাস মহামারি পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়, তখন অর্থনৈতিক লকডাউন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সহ বিশ্বের প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও একই পথ অবলম্বন করে। তারা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়ে। এই বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ বাজারে আসার কারণে শেয়ার বাজার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির (যেমন বিটকয়েন) দাম যেমন কৃত্রিমভাবে বাড়ে, তেমনি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দামও পুনরায় রেকর্ড উচ্চতা স্পর্শ করে।
বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে স্বর্ণের বাজারের যে পরিস্থিতি, তার মূল সূত্রপাত হয়েছে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর। এই ঘটনাটি বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর অংশ হিসেবে পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত থাকা রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার ও ইউরো) রিজার্ভ রাতারাতি জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়। শুধু তাই নয়, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম ‘সুইফট’ (SWIFT) ব্যবস্থা থেকেও বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এই ঘটনাটি বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত, উদীয়মান এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক) কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চোখ খুলে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, ডলার বা ইউরোর মতো কাগজে মুদ্রা যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বা ডিজিটাল সার্ভারে থাকবে, ততক্ষণ তা নিরাপদ নয়। কোনো দেশের নীতি যদি ওয়াশিংটনের পছন্দ না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে সেই দেশের কষ্টার্জিত রিজার্ভকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জব্দ করা হতে পারে।
এই চরম রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) বা ডলার বর্জন এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর ডলারের একমাত্র এবং সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ‘স্বর্ণ’। কারণ স্বর্ণ কোনো দেশের দায় (Liability) নয়; এটি নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে শারীরিকভাবে (Physical Gold) সংরক্ষণ করা যায়, যা কোনো বিদেশি নিষেধাজ্ঞা বা ডিজিটাল আদেশের মাধ্যমে জব্দ করা অসম্ভব। রাশিয়া এবং চীন ইতিমধ্যে তাদের স্বর্ণের শতভাগ মজুত নিজেদের দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিয়েছে।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। দেশটির জাতীয় ঋণের (National Debt) পরিমাণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা আমেরিকার মোট বার্ষিক জিডিপির (GDP) চেয়েও বেশি। ১ ট্রিলিয়ন মানে ১ হাজার বিলিয়ন, সুতরাং ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা কতটা বিশাল তা সহজেই অনুমেয়।
এই ঋণের পাহাড় কেবল একটি সংখ্যা নয়। এই ঋণের জন্য মার্কিন সরকারকে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের সুদ গুণতে হচ্ছে। পুরনো ঋণ শোধ করতে এবং সুদের টাকা দিতে মার্কিন সরকারকে প্রতিনিয়ত নতুন করে আরও ঋণ নিতে হচ্ছে এবং নতুন ডলার ছাপাতে হচ্ছে। অর্থনীতি যখনই চাপে পড়ে, তখনই সুদের হার কমাতে হয়, যা ডলারের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ঋণের ভয়াল রূপ দেখে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন বন্ড বিক্রি করে দিয়ে সোনা কিনছেন।
সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতিকর চক্র:
[বিশাল মার্কিন ঋণ (৩৯ ট্রিলিয়ন$)] -> [ঋণ ও সুদ শোধের জন্য অতিরিক্ত ডলার তৈরি] -> [ডলারের অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি] -> [স্বর্ণের নিরাপদ আশ্রয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি]
১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বলেছিলেন ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ (End of History) ঘটেছে, কারণ তখন মনে হয়েছিল মার্কিন পুঁজিবাদ এবং ডলার ব্যবস্থার কোনো প্রতিদ্বন্দী নেই। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতায় বিশ্ব আবার পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার যুগে ফিরে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।
প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চীন এখন আমেরিকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। একসময় আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তা থাকলেও, এখন তারা নিজেরাই নিজেদের বাজার বাঁচাতে চীনের ওপর পাল্টা শুল্ক (Tariff) আরোপ করছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বাণিজ্যের জন্য আমেরিকার চেয়ে চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেওয়ার একক ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হারাচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পেট্রোডলারের মূল অংশীদার দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে নিরাপত্তার জন্য শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে না রেখে নিজেদের শিল্পে এবং স্বর্ণে রূপান্তর করছে।
স্বর্ণের বাজারে সাধারণ খুচরা ক্রেতাদের চেয়ে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় হলো বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকেই বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার, পোল্যান্ড ইত্যাদি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একনাগাড়ে সোনা কিনে চলেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ছিল স্বর্ণের নিট বিক্রেতা (Net Sellers)। তারা স্বর্ণ বিক্রি করে ডলার রিজার্ভে রাখত। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে তারা নিট ক্রেতায় (Net Buyers) পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ দাম থাকা সত্ত্বেও নিট ২৪৪ টন সোনা কিনে নিজেদের ভল্টে যোগ করেছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেরা টাকা ছাপে, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করে—তারা যখন কাগজের ডলারের চেয়ে সোনাকে বেশি নিরাপদ মনে করে নিজেদের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, তখন বুঝতে হবে আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে কোনো বড় গলদ রয়েছে। এটি কাগজের মুদ্রার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিজেদেরই একটি ‘আস্থাহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ভোট’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই বিপুল ক্রয়ের কারণে বাজারে সাধারণ স্বর্ণের সরবরাহ কমে গেছে, যা দামকে প্রতিনিয়ত ওপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (World Gold Council)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে সর্বমোট প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন সোনা খনি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মাটির নিচে উত্তোলনযোগ্য আর মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সোনা অবশিষ্ট আছে, অর্থাৎ প্রাকৃতিক সরবরাহ এমনিতেই সীমিত।
বিশ্বের মোট উত্তোলিত স্বর্ণ প্রধানত চারটি খাতে বিভক্ত হয়ে রয়েছে: ১. অলংকার বা গয়না (Jewelry): প্রায় ৪৪ শতাংশ (যা মূলত ভারত ও চীনের সাধারণ মানুষের ঘরে রয়েছে)। ২. বিনিয়োগ (Private Investment): প্রায় ২১ শতাংশ (ব্যক্তিগত বার, কয়েন ইত্যাদি)। ৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান: প্রায় ১৮ শতাংশ (রিজার্ভ হিসেবে ভল্টে রক্ষিত)। ৪. শিল্প ও প্রযুক্তি (Industrial/Technology): প্রায় ১০ শতাংশ (ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য চিকিৎসা খাতে ব্যবহৃত)।
বৈশ্বিক স্বর্ণের ব্যবহার (শতকরা হার):
██████████████████████░░░░░░░░░░ ৪৪% অলংকার
███████████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ২১% ব্যক্তিগত বিনিয়োগ
█████████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ১৮% কেন্দ্রীয় ব্যাংক
█████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ১০% শিল্প ও প্রযুক্তি
███░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ৭% অন্যান্য/অনির্ণীত
২০২৫ সালে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে ওই এক বছরেই সোনার দাম ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫,৩০০ ডলার অতিক্রম করে।
২০২৬ সালের শুরুতে, বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে দাম আরও কিছুটা বাড়লেও, পরবর্তী মাসগুলোতে বাজারে কিছুটা ‘কারেকশন’ বা মূল্য সংশোধন হয়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সোনার গড় মূল্য ছিল আউন্স প্রতি ৪,৮৭৩ ডলার, যা এখনো ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের মূল্য কত হতে পারে, তার কিছু চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছে:
গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs): মার্কিন এই বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংকের মতে, স্বর্ণের এই দাম কেবল সাময়িক যুদ্ধ বা আতঙ্কের কারণে বাড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত রূপান্তর। তারা পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০Check সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৫,৪০০ ডলার স্পর্শ করতে পারে। (উল্লেখ্য, ১ আউন্স হলো ২.৬৭ ভরির সমান)।
ইউবিএস (UBS): সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এই ব্যাংকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সোনা ৬,২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। এমনকি বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হলে তাদের সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস হলো সোনা আউন্স প্রতি ৭,২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
সোসিয়েতে জেনারেল (Société Générale): ফ্রান্সের এই বহুজাতিক ব্যাংকটির ধারণা, সোনার দাম খুব দ্রুতই ৬,০০০ ডলারে পৌঁছাবে।
ডয়েচে ব্যাংক (Deutsche Bank): জার্মানির এই শীর্ষ ব্যাংকটি আগামী ৫ বছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারা যদি বজায় থাকে, তবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভের মধ্যে স্বর্ণের অনুপাত বর্তমানের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়। আর যদি সত্যিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভের ৪০ শতাংশ স্বর্ণে রূপান্তর করে, তবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৮,০০০ ডলার থেকে ১০,০০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
প্রবন্ধের মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর করণীয় কী? সোনা কি এখন কেনা উচিত নাকি বিক্রি করা উচিত?
অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের উত্তর নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য এবং মেয়াদের ওপর। যারা দ্রুত লাভের আশায় বা ফটকা কারবারের জন্য সোনা কেনেন, ২০২৫ সালের বিশাল উত্থানের পর বর্তমান উচ্চ মূল্যে তাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ, যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো যুদ্ধের অবসান ঘটে বা সাময়িকভাবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হয়, তখন স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে এবং লাভ তুলে নিতে (Profit Booking) একযোগে সোনা বিক্রি শুরু করেন।
যদি বড় ধরনের বিক্রির চাপ আসে, তবে সোনার দামে একটি বড় পতন বা সংশোধন দেখা দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িকভাবে দাম পড়ে গিয়ে আউন্স প্রতি ৪,১০০ ডলার, ৩,৯০০ ডলার বা এমনকি ৩,৫০০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে চড়া দামে অলংকার বা সোনা কিনে দ্রুত লাভের আশা করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যারা আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য নিজেদের পুঁজিকে নিরাপদ রাখতে চান, মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঞ্চয়ের জন্য ভাবছেন—তাদের জন্য সোনা এখনো সেরা বিকল্প। দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ঋণের বোঝা, কাগজের টাকার অবমূল্যায়ন এবং ডলারের পতন অনিবার্য বলেই মনে হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, যদি বাজারে কোনো সাময়িক সংশোধনের কারণে সোনার দাম কমে ৩,৯০০ বা ৩,৫০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে, তবে সেটিকে বিক্রির ভয় হিসেবে না দেখে “নতুন করে সোনা কেনার সুবর্ণ সুযোগ” হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমীকরণ স্বর্ণের পক্ষেই কথা বলছে।
পরিশেষে বলা যায়, স্বর্ণের দামের এই অভূতপূর্ব উত্থান কেবল একটি ধাতুর দাম বাড়ার সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আসলে বিশ্ব অর্থনীতির একটি গভীর অসুখের লক্ষণ। এটি প্রমাণ করে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন ডলারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোটি এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন এক মেরু থেকে বহু-মেরুকেন্দিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে কাগজের মুদ্রার চেয়ে বাস্তব সম্পদ (Real Assets) এবং স্বর্ণের গুরুত্ব অনেক বেশি।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সোনা কেনা বা বেচার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত লাভের অঙ্ক নয়, বরং তা বিশ্ব রাজনীতির হাওয়া কোন দিকে বইছে তা বোঝার ওপর নির্ভর করে। যতদিন পর্যন্ত বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস থাকবে, যতদিন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঋণের টাকা শোধ করতে দেদারসে কাগজের ডলার ছাপাবে, এবং যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের বিকল্প খুঁজবে—ততদিন পর্যন্ত স্বর্ণের সিংহাসন থাকবে অটুট। স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতে ১০,০০০ ডলারে পৌঁছাবে কিনা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির আস্থা, ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের আধিপত্য হ্রাসের গতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের মধ্যে। তাই পুঁজির নিরাপত্তা ও চরম সংকটে টিকে থাকার জন্য সোনা সবসময়ই মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
No comments:
Post a Comment