Search This Blog

Monday, May 18, 2026

নির্বাসিত শিকড় ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীর আন্তর্জাতিক বিভ্রম: ছিন্নমূল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

 

জোসেফ স্তালিন বলেছিলেন, কোনো জাতিকে বুঝতে হলে তারা কী পড়ে তা দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বাঙালি হিন্দুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি উল্টো- তারা কী লিখল না বা কী পড়ল না? ১৯৪৭-এর দেশভাগ কোনো সাধারণ সীমানা নির্ধারণ ছিল না; এটি ছিল একটি জনজাতির আত্মপরিচয়ের অপমৃত্যু। অথচ অদ্ভুতভাবে, এই ছিন্নমূল হিন্দু বাঙালির সৃজনশীল জগতে দেশভাগের যন্ত্রণা ‘নস্টালজিয়া’ হিসেবে দেখা দিলেও, তার রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক কারণগুলো এক প্রকার ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিক্ষিত হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা কেন তাঁদের স্বজাতির বাস্তুচ্যুত হওয়ার মূল কারণ নিয়ে নীরব থাকলেন? আপনি ঠিকই ধরেছেন, বাঙালি হিন্দু এলিট তখন ‘আন্তর্জাতিক’। তাঁরা তখন ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রাম, কিউবার বিপ্লব কিংবা গুয়াতেমালার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই নিয়ে যতটা সোচ্চার ছিলেন, শিয়ালদহ স্টেশনে পচে মরা নিজেরই ভাই-বোনের জন্য ততটা সরব ছিলেন না।

মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতা তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কাছে এক প্রকার ‘এসক্যাপিস্ট’ ড্রাগের মতো কাজ করেছে। নিজের জাতির ওপর হওয়া সাম্প্রদায়িক আঘাতকে স্বীকার করলে পাছে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা লেগে যায়, এই ভয়ে তাঁরা শ্রেণিসংগ্রামের মোড়কে জাতিগত নিধনকে ঢেকে দিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব পশ্চিমে দুই বাংলার চিত্র আছে, কিন্তু তা মূলত সম্পর্কের টানাপোড়েনের। দেশভাগের যে বীভৎস সাম্প্রদায়িক রূপ একজন সাধারণ মানুষকে ভিটেছাড়া করল, তার শিকড় কেন উপড়ে গেল- সেই রাজনৈতিক কারণগুলো এখানে অনেক নরম তুলিতে আঁকা।

অতীনের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ বা প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’র মত উপন্যাসগুলো মহাকাব্যিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেও দেশভাগ অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো এসেছে। মানুষের হাতে মানুষের তৈরি যে পরিকল্পিত উচ্ছেদ, তাকে প্রশ্ন করার চেয়ে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পাঞ্জাবিরা তাদের বিভীষিকাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে (সাহাদাত হাসান মান্টো থেকে খুশবন্ত সিং)। কিন্তু বাঙালি তার ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের কারণে নিজের ওপর হওয়া ক্ষতকে বিশ্বের কাছে গোপন করে গেল।

ঋত্বিক ঘটক বাঙালির শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হতে পারতেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘সুবর্ণরেখা’য় তিনি ছিন্নমূল জীবনের হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনিও শেষমেশ কফি হাউসের ‘আঁতেল’ বিপ্লবের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে পারেননি। পোলানস্কি যেভাবে ইহুদি নিধনকে বিশ্ববিবেকের সামনে ন্যাংটো করে দিয়েছিলেন, ঋত্বিক সেই স্তরে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পক্ষকে দায়ী করতে পারেননি। ফলে তাঁর কাজগুলোও ‘আধা-আঁতেল’ খোরাক হয়েই রয়ে গেল।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের লড়াই। কিন্তু মার্কিন নথিপত্র এবং ব্লাড টেলিগ্রাম প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল টার্গেট ছিল বাঙালি হিন্দুরা। অথচ যুদ্ধের পরবর্তী বয়ানে কৌশলে ‘হিন্দু হত্যা’ শব্দবন্ধটিকে সরিয়ে ‘বাঙালি হত্যা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলো। এটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার এক করুণ প্রচেষ্টা, যা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।

বাংলাদেশ যেহেতু নামে শুধুমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষ হলে আদতে একটি পরিপূর্ন ইসলামি রাষ্ট্র তাই সেই রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে আলাপ কিছুটা সংকুচিত করে আমরা যদি ওপার বাংলার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাবো, সেখানকার আজকের তৃণমূল, কংগ্রেস বা বামপন্থীদের একটা বড় অংশই কিন্তু পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সন্তান। কিন্তু তাঁরা কেন নিজেদের শিকড় নিয়ে নীরব? কারণ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতিতে ‘সংখ্যালঘু ভোট’ একটি নির্ণায়ক শক্তি। তাঁরা মনে করেন, যদি ওপার বাংলায় হিন্দুদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক বা বর্তমান অত্যাচারের কথা তাঁরা জোরে বলেন, তবে তা মেরুকরণ ঘটাবে এবং প্রকারান্তরে বিজেপি-র ফায়দা হবে। এই রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আজ নিজভূমে পরবাসী হওয়ার স্মৃতিকেও তাঁরা অস্বীকার করেন।

ভারতের গণতন্ত্রে মুসলমানরা একটি শক্তিশালী ‘প্রেসার গ্রুপ’। তাঁরা ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে রাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষি করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি নেই। সেখানে কোনো প্রকৃত ‘ইলেক্টরাল কালচার’ গড়ে ওঠেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের সমালোচনা করার স্পেস সেখানে শূন্য। ফলস্বরূপ, ওখানকার সংখ্যালঘুরা আজ কোণঠাসা। তাদের আত্মরক্ষা এখন আর রাজনৈতিক নয়, তা পেশিশক্তি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। যেমন- হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা পরিষদ, রানা দাশগুপ্ত, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মত মানুষের কাঁধে গিয়ে পরেছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী : ছবি ডেইলিস্টার


চিন্ময়কৃষ্ণ দাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন। তিনি গত সত্তর বছরের ‘অ্যানেস্থেটিক’ ড্রাগে ঘুমিয়ে থাকা এক জাতির হঠাৎ জেগে ওঠার উপসর্গ। বাঙালি হিন্দু যখন দেখল তার সাহিত্যিকরা তাকে ধোঁকা দিয়েছেন, তার রাজনীতিবিদেরা তাকে ভোটের গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তখন তারা বাধ্য হয়েই ধর্মের আধারে নিজের অস্তিত্ব খুঁজছে। এটি কোনো লুম্পেন শক্তির উত্থান নয়, এটি আসলে এক দীর্ঘকালীন ‘অস্তিত্বের সংকট’-এর বহিঃপ্রকাশ।

No comments:

Post a Comment

এক অদম্য লড়াই ও কাঁচের সাম্রাজ্য জয়ের মহাকাব্য

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশ...