ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশভোজের দৃশ্যটি কল্পনা করুন- একপাশে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, অন্যপাশে অ্যাপল সিইও টিম কুক। আর তাদের মাঝখানে বসে আছেন এক নারী, যার শান্ত চাউনি আর আত্মবিশ্বাসী হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য জয়ের এক অবিশ্বাস্য আখ্যান। তিনি ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী নারী। তার জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি হলো হাড়ভাঙা খাটুনি, অদম্য মেধা এবং সাহসের এক জ্বলন্ত দলিল।
ঝোউ কুনফেইয়ের জন্ম ১৯৭০ সালে মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তার শৈশব ছিল বর্তমানের চাকচিক্যময় জীবনের ঠিক উল্টো। যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার মা মারা যান। তার বাবা ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর, কিন্তু এক ভয়াবহ কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারান এবং আঙুল হারান।
১৯৮০-এর দশকে চীন যখন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী কাজের সন্ধানে দক্ষিণ উপকূলে পাড়ি দিচ্ছিল। ঝোউও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, স্কুলের টিউশন ফি দিতে না পেরে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। হাতে কোনো টাকা নেই, নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা কেবল বুকে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমান গুয়াংডং প্রদেশের শেনজেনে।
![]() |
| ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী |
পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। ছোট্ট ঝোউকে পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের কাজ, পশুপালন এবং দৃষ্টিহীন বাবার সেবা করতে হতো। অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে, অনেক সময় একবেলা খাবার জোটাতেও তাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তার ভেতর এক ইস্পাতকঠিন মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি কেবল তার নিজের হাতেই আছে।
শেনজেনে তিনি একটি কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ শুরু করেন, যেখানে ঘড়ির কাচ পালিশ করা হতো। তার কাজ ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে এবং পরিশ্রমের। দৈনিক এক ডলারের কম মজুরিতে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু ঝোউ অন্য সবার মতো ছিলেন না। দিনের বেলা হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন তার সহকর্মীরা বিশ্রামে যেতেন, ঝোউ তখন রাতের ক্লাসে অংশ নিতেন। তিনি অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার অপারেশন এবং ফায়ার ফাইটিংয়ের মতো বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। তার এই শেখার ক্ষুধা তাকে সাধারণ শ্রমিক থেকে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ানে পরিণত করে। কয়েক বছর কারখানায় কাজ করার পর ঝোউ অনুভব করলেন যে, অন্যের অধীনে থেকে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। ১৯৯৩ সালে, নিজের জমানো মাত্র ২০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৩,০০০ ডলার) মূলধন নিয়ে তিনি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার দুঃসাহস দেখান। শেনজেনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তার ভাই, ভাবি এবং কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে তিনি ঘড়ির কাচ তৈরির একটি ছোট কারখানা খোলেন।
২০০০ সালের পর মোবাইল ফোনের বিপ্লব শুরু হয়। ঝোউ কুনফেইয়ের ভাগ্য বদলে যায় যখন তার ছোট কারখানাটি চীনের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট টিসিএল থেকে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন তৈরির একটি বড় অর্ডার পায়। ঝোউ বুঝতে পেরেছিলেন যে, কাঁচের তৈরি স্ক্রিনই হবে ভবিষ্যতের স্মার্টফোনের প্রাণ। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকে তিনি ২০০৩ সালে লেন্স টেকনোলজি (Lens Technology) প্রতিষ্ঠা করেন।
লেন্স টেকনোলজির জন্য বড় সুযোগ আসে যখন তারা মার্কিন কোম্পানি মটোরোলার সাথে কাজ করার প্রস্তাব পায়। মটোরোলা তখন তাদের আইকনিক ফোনের জন্য স্ক্রিন খুঁজছিল। তাদের শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন স্ক্রিন হতে হবে স্ক্র্যাচ-প্রতিরোধী এবং টেকসই।
সে সময় ঝোউ নিজেই ছিলেন কোম্পানির প্রধান মেকানিক, সেলস এজেন্ট এবং ডেলিভারি পারসন। মেশিন নষ্ট হলে তিনি নিজেই তা মেরামত করতেন। গ্রাহক খুঁজে বের করতে তিনি মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। দীর্ঘ চার বছর তিনি এভাবে অমানুষিক পরিশ্রম করেন। সেই সময়টি ছিল তার জন্য এক বড় পরীক্ষা, যেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। প্রাথমিক দিনগুলোতে তারা কেবল দেশীয় ব্র্যান্ড এবং কিছু ক্লোন ফোনের জন্য স্ক্রিন তৈরি করত। কিন্তু ঝোউয়ের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে হলে গুণগত মানের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রজেক্টটি ছিল ঝোউয়ের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। তিনি তার সমস্ত সম্পদ এবং পুঁজি এই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন। এমনকি নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। যদি এই প্রজেক্ট ব্যর্থ হতো, তবে তিনি নিঃস্ব হয়ে যেতেন। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস জয়ী হয়। লেন্স টেকনোলজি এমন এক গ্লাস প্যানেল তৈরি করে যা মটোরোলার মন জয় করে নেয়। মটোরোলা V3 বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়, আর রাতারাতি লেন্স টেকনোলজি বৈশ্বিক স্মার্টফোন সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে চলে আসে।
২০০৭ সাল ছিল বিশ্বপ্রযুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি। স্টিভ জবস প্রথম আইফোন উন্মোচন করেন। কিন্তু আইফোনের সেই বিখ্যাত গ্লাস টাচস্ক্রিন তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ। অ্যাপলের প্রয়োজন ছিল এমন কাচ যা অত্যন্ত পাতলা কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমের শক্ত। অনেকেই অবাক হন যে, অ্যাপলের টিম কুকের পাশাপাশি টেসলার ইলন মাস্ক কেন ঝোউ কুনফেইয়ের সাথে ঘনিষ্টতা বজায় রাখেন। এর উত্তর লুকিয়ে আছে লেন্স টেকনোলজির সাম্প্রতিক বৈচিত্র্যকরণের মধ্যে। স্মার্টফোনের বাজার জয়ের পর ঝোউ তার নজর ফেরান অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির দিকে।
১৫ বছর বয়সে স্কুল থেকে ঝরে পড়া সেই কিশোরী আজ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যের অধিপতি। ঝোউ কুনফেইয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশ মেধাকে দমাতে পারে না যদি সেখানে শ্রম আর একাগ্রতার মেলবন্ধন ঘটে। হুনানের এক অন্ধ বাবার ঘরে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তিনি আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতির টেবিলে মহাশক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশে আসন গ্রহণ করেন। স্টিভ জবসের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে অনেক অভিজ্ঞ কোম্পানি পিছিয়ে গিয়েছিল। ঝোউ কুনফেই এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগ হিসেবে লুফে নেন। তিনি নিজে অ্যাপলের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে দীর্ঘ তিন মাস দিন-রাত এক করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন। তারা এমন এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন যা স্মার্টফোনের কাচকে অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব দেয়। আইফোনের প্রথম প্রজন্মের গ্লাস প্যানেল সফলভাবে উৎপাদন করার পর লেন্স টেকনোলজি অ্যাপলের স্থায়ী অংশীদার হয়ে যায়। আইপ্যাড থেকে ম্যাকবুক অ্যাপলের প্রায় প্রতিটি ডিভাইসেই ঝোউয়ের তৈরি কাচ ব্যবহৃত হতে থাকে।
বর্তমান যুগের ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি (EV) কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি একটি "চাকা লাগানো স্মার্টফোন"। টেসলার মতো আধুনিক গাড়ির বড় বড় ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিন, উইন্ডশিল্ড এবং স্মার্ট গ্লাস লেন্স টেকনোলজি সরবরাহ করে। বর্তমানে টেসলা, বিএমডব্লিউ এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো প্রায় ৩০টি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অংশীদার ঝোউয়ের কোম্পানি। এছাড়া রোবোটিক্স খাতে প্রয়োজনীয় সেন্সর এবং জয়েন্ট মেকানিজমেও তারা বিনিয়োগ করছে। এই কারণেই মাস্ক এবং কুক উভয়ের জন্যই ঝোউ কুনফেই এক অপরিহার্য ব্যবসায়িক সহযোগী। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সাফল্য কোনো মিরাকল নয়, এটি হলো অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। তিনি একবার বলেছিলেন-
"আমার সাফল্যে কোনো রহস্য নেই। যখন অন্যরা হাল ছেড়ে দেয়, আমি তখনো চেষ্টা চালিয়ে যাই।"
ঝোউ কুনফেই কেবল চীনের সবচেয়ে ধনী নারী নন, তিনি সারা বিশ্বের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, কাঁচের মতো স্বচ্ছ কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত মনোবল থাকলে পৃথিবীর যেকোনো বাধা চূর্ণ করা সম্ভব।

No comments:
Post a Comment