Search This Blog

Monday, May 18, 2026

এক অদম্য লড়াই ও কাঁচের সাম্রাজ্য জয়ের মহাকাব্য

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশভোজের দৃশ্যটি কল্পনা করুন- একপাশে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, অন্যপাশে অ্যাপল সিইও টিম কুক। আর তাদের মাঝখানে বসে আছেন এক নারী, যার শান্ত চাউনি আর আত্মবিশ্বাসী হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য জয়ের এক অবিশ্বাস্য আখ্যান। তিনি ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী নারী। তার জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি হলো হাড়ভাঙা খাটুনি, অদম্য মেধা এবং সাহসের এক জ্বলন্ত দলিল।


ঝোউ কুনফেইয়ের জন্ম ১৯৭০ সালে মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তার শৈশব ছিল বর্তমানের চাকচিক্যময় জীবনের ঠিক উল্টো। যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার মা মারা যান। তার বাবা ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর, কিন্তু এক ভয়াবহ কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারান এবং আঙুল হারান।
১৯৮০-এর দশকে চীন যখন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী কাজের সন্ধানে দক্ষিণ উপকূলে পাড়ি দিচ্ছিল। ঝোউও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, স্কুলের টিউশন ফি দিতে না পেরে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। হাতে কোনো টাকা নেই, নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা কেবল বুকে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমান গুয়াংডং প্রদেশের শেনজেনে।

ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী 


পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। ছোট্ট ঝোউকে পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের কাজ, পশুপালন এবং দৃষ্টিহীন বাবার সেবা করতে হতো। অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে, অনেক সময় একবেলা খাবার জোটাতেও তাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তার ভেতর এক ইস্পাতকঠিন মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি কেবল তার নিজের হাতেই আছে।

শেনজেনে তিনি একটি কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ শুরু করেন, যেখানে ঘড়ির কাচ পালিশ করা হতো। তার কাজ ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে এবং পরিশ্রমের। দৈনিক এক ডলারের কম মজুরিতে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু ঝোউ অন্য সবার মতো ছিলেন না। দিনের বেলা হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন তার সহকর্মীরা বিশ্রামে যেতেন, ঝোউ তখন রাতের ক্লাসে অংশ নিতেন। তিনি অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার অপারেশন এবং ফায়ার ফাইটিংয়ের মতো বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। তার এই শেখার ক্ষুধা তাকে সাধারণ শ্রমিক থেকে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ানে পরিণত করে। কয়েক বছর কারখানায় কাজ করার পর ঝোউ অনুভব করলেন যে, অন্যের অধীনে থেকে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। ১৯৯৩ সালে, নিজের জমানো মাত্র ২০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৩,০০০ ডলার) মূলধন নিয়ে তিনি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার দুঃসাহস দেখান। শেনজেনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তার ভাই, ভাবি এবং কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে তিনি ঘড়ির কাচ তৈরির একটি ছোট কারখানা খোলেন।

২০০০ সালের পর মোবাইল ফোনের বিপ্লব শুরু হয়। ঝোউ কুনফেইয়ের ভাগ্য বদলে যায় যখন তার ছোট কারখানাটি চীনের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট টিসিএল থেকে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন তৈরির একটি বড় অর্ডার পায়। ঝোউ বুঝতে পেরেছিলেন যে, কাঁচের তৈরি স্ক্রিনই হবে ভবিষ্যতের স্মার্টফোনের প্রাণ। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকে তিনি ২০০৩ সালে লেন্স টেকনোলজি (Lens Technology) প্রতিষ্ঠা করেন।
লেন্স টেকনোলজির জন্য বড় সুযোগ আসে যখন তারা মার্কিন কোম্পানি মটোরোলার সাথে কাজ করার প্রস্তাব পায়। মটোরোলা তখন তাদের আইকনিক ফোনের জন্য স্ক্রিন খুঁজছিল। তাদের শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন স্ক্রিন হতে হবে স্ক্র্যাচ-প্রতিরোধী এবং টেকসই।

সে সময় ঝোউ নিজেই ছিলেন কোম্পানির প্রধান মেকানিক, সেলস এজেন্ট এবং ডেলিভারি পারসন। মেশিন নষ্ট হলে তিনি নিজেই তা মেরামত করতেন। গ্রাহক খুঁজে বের করতে তিনি মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। দীর্ঘ চার বছর তিনি এভাবে অমানুষিক পরিশ্রম করেন। সেই সময়টি ছিল তার জন্য এক বড় পরীক্ষা, যেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। প্রাথমিক দিনগুলোতে তারা কেবল দেশীয় ব্র্যান্ড এবং কিছু ক্লোন ফোনের জন্য স্ক্রিন তৈরি করত। কিন্তু ঝোউয়ের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে হলে গুণগত মানের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রজেক্টটি ছিল ঝোউয়ের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। তিনি তার সমস্ত সম্পদ এবং পুঁজি এই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন। এমনকি নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। যদি এই প্রজেক্ট ব্যর্থ হতো, তবে তিনি নিঃস্ব হয়ে যেতেন। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস জয়ী হয়। লেন্স টেকনোলজি এমন এক গ্লাস প্যানেল তৈরি করে যা মটোরোলার মন জয় করে নেয়। মটোরোলা V3 বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়, আর রাতারাতি লেন্স টেকনোলজি বৈশ্বিক স্মার্টফোন সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে চলে আসে।

২০০৭ সাল ছিল বিশ্বপ্রযুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি। স্টিভ জবস প্রথম আইফোন উন্মোচন করেন। কিন্তু আইফোনের সেই বিখ্যাত গ্লাস টাচস্ক্রিন তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ। অ্যাপলের প্রয়োজন ছিল এমন কাচ যা অত্যন্ত পাতলা কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমের শক্ত। অনেকেই অবাক হন যে, অ্যাপলের টিম কুকের পাশাপাশি টেসলার ইলন মাস্ক কেন ঝোউ কুনফেইয়ের সাথে ঘনিষ্টতা বজায় রাখেন। এর উত্তর লুকিয়ে আছে লেন্স টেকনোলজির সাম্প্রতিক বৈচিত্র্যকরণের মধ্যে। স্মার্টফোনের বাজার জয়ের পর ঝোউ তার নজর ফেরান অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির দিকে।


১৫ বছর বয়সে স্কুল থেকে ঝরে পড়া সেই কিশোরী আজ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যের অধিপতি। ঝোউ কুনফেইয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশ মেধাকে দমাতে পারে না যদি সেখানে শ্রম আর একাগ্রতার মেলবন্ধন ঘটে। হুনানের এক অন্ধ বাবার ঘরে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তিনি আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতির টেবিলে মহাশক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশে আসন গ্রহণ করেন। স্টিভ জবসের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে অনেক অভিজ্ঞ কোম্পানি পিছিয়ে গিয়েছিল। ঝোউ কুনফেই এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগ হিসেবে লুফে নেন। তিনি নিজে অ্যাপলের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে দীর্ঘ তিন মাস দিন-রাত এক করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন। তারা এমন এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন যা স্মার্টফোনের কাচকে অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব দেয়। আইফোনের প্রথম প্রজন্মের গ্লাস প্যানেল সফলভাবে উৎপাদন করার পর লেন্স টেকনোলজি অ্যাপলের স্থায়ী অংশীদার হয়ে যায়। আইপ্যাড থেকে ম্যাকবুক অ্যাপলের প্রায় প্রতিটি ডিভাইসেই ঝোউয়ের তৈরি কাচ ব্যবহৃত হতে থাকে।

বর্তমান যুগের ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি (EV) কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি একটি "চাকা লাগানো স্মার্টফোন"। টেসলার মতো আধুনিক গাড়ির বড় বড় ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিন, উইন্ডশিল্ড এবং স্মার্ট গ্লাস লেন্স টেকনোলজি সরবরাহ করে। বর্তমানে টেসলা, বিএমডব্লিউ এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো প্রায় ৩০টি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অংশীদার ঝোউয়ের কোম্পানি। এছাড়া রোবোটিক্স খাতে প্রয়োজনীয় সেন্সর এবং জয়েন্ট মেকানিজমেও তারা বিনিয়োগ করছে। এই কারণেই মাস্ক এবং কুক উভয়ের জন্যই ঝোউ কুনফেই এক অপরিহার্য ব্যবসায়িক সহযোগী। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সাফল্য কোনো মিরাকল নয়, এটি হলো অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। তিনি একবার বলেছিলেন-

"আমার সাফল্যে কোনো রহস্য নেই। যখন অন্যরা হাল ছেড়ে দেয়, আমি তখনো চেষ্টা চালিয়ে যাই।" 

ঝোউ কুনফেই কেবল চীনের সবচেয়ে ধনী নারী নন, তিনি সারা বিশ্বের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, কাঁচের মতো স্বচ্ছ কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত মনোবল থাকলে পৃথিবীর যেকোনো বাধা চূর্ণ করা সম্ভব।

নির্বাসিত শিকড় ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীর আন্তর্জাতিক বিভ্রম: ছিন্নমূল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

 

জোসেফ স্তালিন বলেছিলেন, কোনো জাতিকে বুঝতে হলে তারা কী পড়ে তা দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বাঙালি হিন্দুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি উল্টো- তারা কী লিখল না বা কী পড়ল না? ১৯৪৭-এর দেশভাগ কোনো সাধারণ সীমানা নির্ধারণ ছিল না; এটি ছিল একটি জনজাতির আত্মপরিচয়ের অপমৃত্যু। অথচ অদ্ভুতভাবে, এই ছিন্নমূল হিন্দু বাঙালির সৃজনশীল জগতে দেশভাগের যন্ত্রণা ‘নস্টালজিয়া’ হিসেবে দেখা দিলেও, তার রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক কারণগুলো এক প্রকার ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিক্ষিত হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা কেন তাঁদের স্বজাতির বাস্তুচ্যুত হওয়ার মূল কারণ নিয়ে নীরব থাকলেন? আপনি ঠিকই ধরেছেন, বাঙালি হিন্দু এলিট তখন ‘আন্তর্জাতিক’। তাঁরা তখন ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রাম, কিউবার বিপ্লব কিংবা গুয়াতেমালার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই নিয়ে যতটা সোচ্চার ছিলেন, শিয়ালদহ স্টেশনে পচে মরা নিজেরই ভাই-বোনের জন্য ততটা সরব ছিলেন না।

মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতা তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কাছে এক প্রকার ‘এসক্যাপিস্ট’ ড্রাগের মতো কাজ করেছে। নিজের জাতির ওপর হওয়া সাম্প্রদায়িক আঘাতকে স্বীকার করলে পাছে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা লেগে যায়, এই ভয়ে তাঁরা শ্রেণিসংগ্রামের মোড়কে জাতিগত নিধনকে ঢেকে দিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব পশ্চিমে দুই বাংলার চিত্র আছে, কিন্তু তা মূলত সম্পর্কের টানাপোড়েনের। দেশভাগের যে বীভৎস সাম্প্রদায়িক রূপ একজন সাধারণ মানুষকে ভিটেছাড়া করল, তার শিকড় কেন উপড়ে গেল- সেই রাজনৈতিক কারণগুলো এখানে অনেক নরম তুলিতে আঁকা।

অতীনের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ বা প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’র মত উপন্যাসগুলো মহাকাব্যিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেও দেশভাগ অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো এসেছে। মানুষের হাতে মানুষের তৈরি যে পরিকল্পিত উচ্ছেদ, তাকে প্রশ্ন করার চেয়ে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পাঞ্জাবিরা তাদের বিভীষিকাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে (সাহাদাত হাসান মান্টো থেকে খুশবন্ত সিং)। কিন্তু বাঙালি তার ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের কারণে নিজের ওপর হওয়া ক্ষতকে বিশ্বের কাছে গোপন করে গেল।

ঋত্বিক ঘটক বাঙালির শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হতে পারতেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘সুবর্ণরেখা’য় তিনি ছিন্নমূল জীবনের হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনিও শেষমেশ কফি হাউসের ‘আঁতেল’ বিপ্লবের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে পারেননি। পোলানস্কি যেভাবে ইহুদি নিধনকে বিশ্ববিবেকের সামনে ন্যাংটো করে দিয়েছিলেন, ঋত্বিক সেই স্তরে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পক্ষকে দায়ী করতে পারেননি। ফলে তাঁর কাজগুলোও ‘আধা-আঁতেল’ খোরাক হয়েই রয়ে গেল।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের লড়াই। কিন্তু মার্কিন নথিপত্র এবং ব্লাড টেলিগ্রাম প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল টার্গেট ছিল বাঙালি হিন্দুরা। অথচ যুদ্ধের পরবর্তী বয়ানে কৌশলে ‘হিন্দু হত্যা’ শব্দবন্ধটিকে সরিয়ে ‘বাঙালি হত্যা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলো। এটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার এক করুণ প্রচেষ্টা, যা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।

বাংলাদেশ যেহেতু নামে শুধুমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষ হলে আদতে একটি পরিপূর্ন ইসলামি রাষ্ট্র তাই সেই রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে আলাপ কিছুটা সংকুচিত করে আমরা যদি ওপার বাংলার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাবো, সেখানকার আজকের তৃণমূল, কংগ্রেস বা বামপন্থীদের একটা বড় অংশই কিন্তু পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সন্তান। কিন্তু তাঁরা কেন নিজেদের শিকড় নিয়ে নীরব? কারণ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতিতে ‘সংখ্যালঘু ভোট’ একটি নির্ণায়ক শক্তি। তাঁরা মনে করেন, যদি ওপার বাংলায় হিন্দুদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক বা বর্তমান অত্যাচারের কথা তাঁরা জোরে বলেন, তবে তা মেরুকরণ ঘটাবে এবং প্রকারান্তরে বিজেপি-র ফায়দা হবে। এই রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আজ নিজভূমে পরবাসী হওয়ার স্মৃতিকেও তাঁরা অস্বীকার করেন।

ভারতের গণতন্ত্রে মুসলমানরা একটি শক্তিশালী ‘প্রেসার গ্রুপ’। তাঁরা ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে রাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষি করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি নেই। সেখানে কোনো প্রকৃত ‘ইলেক্টরাল কালচার’ গড়ে ওঠেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের সমালোচনা করার স্পেস সেখানে শূন্য। ফলস্বরূপ, ওখানকার সংখ্যালঘুরা আজ কোণঠাসা। তাদের আত্মরক্ষা এখন আর রাজনৈতিক নয়, তা পেশিশক্তি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। যেমন- হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা পরিষদ, রানা দাশগুপ্ত, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মত মানুষের কাঁধে গিয়ে পরেছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী : ছবি ডেইলিস্টার


চিন্ময়কৃষ্ণ দাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন। তিনি গত সত্তর বছরের ‘অ্যানেস্থেটিক’ ড্রাগে ঘুমিয়ে থাকা এক জাতির হঠাৎ জেগে ওঠার উপসর্গ। বাঙালি হিন্দু যখন দেখল তার সাহিত্যিকরা তাকে ধোঁকা দিয়েছেন, তার রাজনীতিবিদেরা তাকে ভোটের গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তখন তারা বাধ্য হয়েই ধর্মের আধারে নিজের অস্তিত্ব খুঁজছে। এটি কোনো লুম্পেন শক্তির উত্থান নয়, এটি আসলে এক দীর্ঘকালীন ‘অস্তিত্বের সংকট’-এর বহিঃপ্রকাশ।

মানব কর্তৃত্বের অবসান

ইতিহাসবিদ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষ, যিনি অতীতের কোনো ধূলিমলিন দলিল, কয়েকশ বছর আগের কোনো যুদ্ধ অথবা কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশের উত্থান-পতন নিয়ে গবেষণায় মগ্ন। কিন্তু আমি নিজেকে সেই প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। আমি ইতিহাসকে দেখি এক বিশাল ক্যানভাস হিসেবে, যেখানে অতীত কেবল পেছনের গল্প নয় বরং আগামীকে বোঝার একমাত্র দর্পণ। সত্তর হাজার বছর আগে আমরা যখন পূর্ব আফ্রিকায় এক তুচ্ছ প্রাণী হিসেবে ঘুরে বেড়াতাম, তখন আমাদের প্রভাব এই পৃথিবীর বুকে জেলিফিশ বা কাঠঠোকরার চেয়ে বেশি ছিল না। আজ সেই অবস্থা থেকে আমরা পুরো গ্রহের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছি। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কেন আমরা অন্য সব প্রাণীকে ছাড়িয়ে গেলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, মানুষের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত অলৌকিক ক্ষমতা। যা হলো বড় স্কেলে, অত্যন্ত নমনীয়ভাবে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করার ক্ষমতা। শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে চেনে এবং সহযোগিতা করে, কিন্তু তাদের দল ২০ বা ৩০ জনের বেশি বড় হতে পারে না। আবার মৌমাছি বা পিঁপড়েরা লাখ লাখ সংখ্যায় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু তাদের সেই সহযোগিতা অত্যন্ত যান্ত্রিক ও অনমনীয়। মৌচাকে নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে তারা তাদের সামাজিক কাঠামো রাতারাতি বদলে ফেলতে পারে না। মানুষই একমাত্র জীব, যে একই সাথে লাখ লাখ অচেনা মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে নিজের নিয়ম বদলে ফেলতে পারে।

কিন্তু এই নমনীয় সহযোগিতার আসল চাবিকাঠি কী? এর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের কল্পনাশক্তিতে। আমরা এমন সব মিথ, গল্প এবং কাল্পনিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারি এবং সম্মিলিতভাবে তা বিশ্বাস করতে পারি, যার কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বে নেই। দেশ, মুদ্রা, কোম্পানি, আইন, মানবাধিকার, ধর্ম ...... এসবই মানুষের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী একেকটি গল্প। পকেট থেকে একটি কাগজের নোট বের করে যখন আমি অন্য একজন অচেনা মানুষকে দিই, সে আমাকে খাবার দেয়। কেন? কারণ আমরা দুজনেই বিশ্বাস করি যে, এই কাগজের টুকরোটির একটি মূল্য আছে। এই যে সম্মিলিত বিশ্বাসের ক্ষমতা, এটাই আমাদের এই গ্রহের শাসক বানিয়েছে।

তবে আজ আমি এখানে অতীতের গল্প বলতে আসিনি। আজ আমি বলতে এসেছি আমাদের ভবিষ্যতের কথা। আজ আমি যে সত্যটি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, তা হয়তো অনেকের কাছে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং রূঢ় মনে হতে পারে। আমার বিশ্বাস, আমরা অর্থাৎ আজ যারা এই গ্রহে উপস্থিত আছি তারা হয়তো আধুনিক মানব প্রজাতির শেষ কয়েকটি প্রজন্মের একটি। আগামী এক বা দুই শতাব্দীর মধ্যে আমাদের মতো মানুষ এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের স্থান দখল করবে এমন কিছু সত্তা বা জীব, যারা আমাদের চেয়ে ততটাই আলাদা হবে, যতটা আমরা শিম্পাঞ্জি বা নিয়ানডার্থালদের থেকে আলাদা।

এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এটি হলো মানুষের হাত থেকে ‘কর্তৃত্ব’র স্থানান্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা নিজেদের হাতে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পুঞ্জীভূত করেছি, তা এখন আমাদের অজান্তেই চলে যাচ্ছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের হাতে। এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে তাকাতে হবে আমরা কীভাবে আজকের এই মানবকেন্দ্রিক বিশ্বে এসে পৌঁছালাম, তার দিকে।


গত দুই থেকে তিন শতক ধরে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, তা একটি বিশেষ মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত। একে আমরা বলি ‘হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ। কিন্তু মানবতাবাদের আগের যুগটি কেমন ছিল?

মানবতাবাদের পূর্বে, মানুষ বিশ্বাস করত যে এই মহাবিশ্বের এবং আমাদের জীবনের সমস্ত কর্তৃত্বের উৎস আমাদের ভেতরে নেই। কর্তৃত্বের উৎস ছিল মেঘের ওপরে, স্বর্গে- অর্থাৎ ঈশ্বরের হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি বা নৈতিকতার ক্ষেত্রে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হলে মানুষ নিজের মনের কথা শুনত না। তারা দ্বারস্থ হতো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের, কিংবা পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবিদার পুরোহিত, পোপ, রাব্বাই বা শামানদের কাছে। মানুষ বিশ্বাস করত যে ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র ঈশ্বর।

কিন্তু গত দুই-তিনশ বছরে এক অভূতপূর্ব জাগতিক ও মানসিক বিপ্লব ঘটল। আমরা কর্তৃত্বকে আকাশ থেকে নামিয়ে নিয়ে এলাম মাটির পৃথিবীতে, মানুষের নিজের বুকের ভেতর। এই হিউম্যানিস্ট বিপ্লব ঘোষণা করল: এই মহাবিশ্বে মানুষের অনুভূতি এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার  চেয়ে বড় কোনো কর্তৃত্ব নেই। মানবতাবাদ আমাদের শেখাল যখনই তুমি জীবনে কোনো সংকটে পড়বে, সে তোমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সিদ্ধান্তই হোক বা পুরো দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হোক, তোমাকে বাইবেল বা কোনো বড় নেতার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। তোমাকে তাকাতে হবে নিজের ভেতরের দিকে। শুনতে হবে নিজের হৃদয়ের আওয়াজ।

আমরা শৈশব থেকে হাজার বার এই স্লোগানগুলো শুনেছি: "নিজের মনের কথা শোনো" (Listen to yourself), "হৃদয় যা বলে তা-ই করো", "যা তোমাকে আনন্দ দেয়, সেটাই করো"। আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মানবতাবাদী দর্শন কীভাবে মিশে আছে, তা একটু বিশদভাবে দেখা যাক।

আজকের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে মানুষের অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন বলি "ভোটারই সব ক্ষমতার উৎস" বা "ভোটারই সবচেয়ে ভালো বোঝেন", তখন আমরা আসলে হিউম্যানিজমের কথাই বলি। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি কে হবেন, বা দেশের নীতি কেমন হবে—এই জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা কোনো পরম জ্ঞানী ব্যক্তি, কোনো নোবেলজয়ীদের কাউন্সিল কিংবা ঈশ্বরের প্রতিনিধিদের কাছে যাই না। আমরা দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে যাই এবং জিজ্ঞেস করি, "আপনি কী মনে করেন? আপনার কী মনে হয়?"

ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একজন মানুষ যখন ব্যালটে সিল দেন, তখন তিনি কোনো জটিল গাণিতিক হিসাব বা বিশুদ্ধ যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে ভোট দেন না; তিনি ভোট দেন তাঁর অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে। কেউ একজন প্রার্থীকে দেখে ভরসা পান, কাউকে দেখে তাঁর রাগ হয়, কেউ আশাবাদী হন। এই অনুভূতিগুলোর ওপরে কোনো উচ্চতর আদালত নেই। আধুনিক গণতন্ত্রে আপনি কোনো ভোটারকে গিয়ে বলতে পারেন না যে, "হ্যাঁ, আপনি এই নেতাকে পছন্দ করছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার চেয়ে উচ্চতর কোনো শক্তি বলছে যে আপনি ভুল করছেন।" মধ্যযুগে এমনটা বলা সম্ভব হলেও, আধুনিক মানবতাবাদী রাজনীতিতে ভোটারের অনুভূতিই শেষ কথা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে হিউম্যানিজমের রূপটি হলো "ক্রেতাই সর্বদা সঠিক" (The customer is always right)। একটি পণ্য ভালো না মন্দ, কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল—তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো পলিটব্যুরো বা রাষ্ট্রীয় কমিটির হাতে নেই। তা নির্ধারণ করে ক্রেতার ইচ্ছা, পছন্দ এবং তাঁর খেয়ালখুশি। ক্রেতারা তাদের ক্রেডিট কার্ড বা টাকা দিয়ে ভোট দেয়।

ধরা যাক, টয়োটা বা ফোর্ড কোম্পানি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও সেরা গাড়িটি তৈরি করতে চায়। এর জন্য তারা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের একত্র করল। সাথে নিল সেরা সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং অস্কারজয়ী শিল্পীদের। তারা সবাই মিলে চার বছর ধরে গবেষণা করে, নকশা তৈরি করে একটি ‘নিখুঁত গাড়ি’ উৎপাদন করল এবং বাজারে ছাড়ল। কিন্তু শোরুমে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্রেতারা সেই গাড়ি কিনছে না।

এখন হিউম্যানিস্ট অর্থনীতিতে এর অর্থ কী? এর অর্থ কি এই যে ক্রেতারা বোকা এবং তারা ভুল করছে? একদমই নয়। এর অর্থ হলো, ওই নোবেলজয়ীরা এবং বড় বড় বিশেষজ্ঞরা সবাই ভুল করেছিলেন। ক্রেতার অনুভূতির চেয়ে বড় কোনো বিশেষজ্ঞ এই বাজারে নেই। কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রে হয়তো রাষ্ট্র এসে বলতে পারত, "আমাদের পলিটব্যুরো অনেক ভেবেচিন্তে এই গাড়িটি সোভিয়েত শ্রমিকের জন্য নির্ধারণ করেছে, অতএব আপনাদের এটাই ব্যবহার করতে হবে।" কিন্তু মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ক্রেতার ইচ্ছাই পরম আইন।

শিল্পকলার জগতেও হিউম্যানিজম এক বড় পরিবর্তন এনেছে। আমরা বলি, "সৌন্দর্য থাকে দর্শকের চোখে" (Beauty is in the eye of the beholder)। হাজার বছর ধরে দার্শনিকরা থিওরি দিয়েছেন যে সৌন্দর্য একটি বস্তুনিষ্ঠ বা ঐশ্বরিক বিষয়। ঈশ্বর বা প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয় কোনটা সুন্দর আর কোনটা কুৎসিত। কিন্তু মানবতাবাদী নান্দনিকতা এই কর্তৃত্বকে মানুষের অনুভূতির ওপর ছেড়ে দিল।

ঠিক এক শতাব্দী আগে, ১৯১৭ সালে, ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ (Marcel Duchamp) বাজার থেকে একটি সাধারণ সিরামিকের ইউরিনাল বা প্রস্রাবাগার কিনে আনলেন। সেটির ওপর একটি ভুয়া নাম সই করে সেটিকে একটি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শন করলেন এবং নাম দিলেন ‘ফাউন্টেন’ (Fountain)। আজ পৃথিবীর যেকোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট হিস্ট্রির ক্লাসে প্রথম সপ্তাহে এই ছবিটা দেখানো হয়। অধ্যাপক ছবিটি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেন, "বলুন তো, এটা কি শিল্প?"

মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কেউ বলে এটা শিল্প, কেউ বলে এটা স্রেফ একটা নোংরা জিনিস। কিন্তু আলোচনার শেষে অধ্যাপক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তা হলো—শিল্পের কোনো অবজেক্টিভ বা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। মানুষ যদি কোনো কিছুকে শিল্প হিসেবে দেখে এবং তার জন্য লাখ লাখ ডলার খরচ করতে প্রস্তুত থাকে, তবে সেটাই শিল্প। আপনি যদি মনে করেন দুশাঁ-র ওই ইউরিনালটি একটি চমৎকার শিল্পকর্ম, তবে পৃথিবীর কারো ক্ষমতা নেই আপনাকে ভুল প্রমাণ করার।

ভালো ও মন্দ, পুণ্য ও পাপের ধারণাও আজ হিউম্যানিজম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মধ্যযুগে যদি কেউ সমকামিতার কথা বলত, চার্চ এসে বলত—এটা এক মহাপাপ। কেন? কারণ বাইবেলে লেখা আছে, পোপ বলেছেন, ঈশ্বর নিষেধ করেছেন। সেখানে সেই মানুষের অনুভূতি কেমন, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

কিন্তু আজ হিউম্যানিস্ট নৈতিকতার যুগে আমরা জিজ্ঞেস করি, "ঈশ্বর কী বলেছেন বা ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে, তা আমাদের প্রধান বিবেচ্য নয়। আমরা দেখতে চাই এর দ্বারা মানুষের অনুভূতিতে কী প্রভাব পড়ছে।" যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, তারা একসাথে সুখী হয় এবং এর দ্বারা অন্য কোনো মানুষের ক্ষতি না হয়—তবে এতে পাপের কী থাকতে পারে? হিউম্যানিজম বলে, যদি কোনো কাজ কাউকে আঘাত না করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনন্দ দেয়, তবে তা নৈতিকভাবে সঠিক।

এমনকি আজ যদি কোনো ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী কোনো কিছুর বিরোধিতা করতে চায়, তারাও কিন্তু এখন আর শুধু "ঈশ্বরের আদেশ" বলে চিৎকার করে না। তারা আধুনিক মিডিয়ার সামনে এসে বলে, "এই বিষয়টি আমাদের অনুভূতিতে আঘাত হানছে" (It hurts our feelings)। অর্থাৎ, তারাও বুঝে গেছে যে আধুনিক বিশ্বে নিজের দাবি টিকিয়ে রাখতে হলে ঈশ্বরের আইনের চেয়ে মানুষের অনুভূতির দোহাই দেওয়া বেশি কার্যকর।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যও হিউম্যানিজম বদলে দিয়েছে। অতীতে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল একজন শিক্ষার্থীকে বাইরের কোনো পরম শক্তির সাথে জুড়ে দেওয়া—তা সে ঈশ্বরই হোক বা প্রাচীন জ্ঞানীদের কোনো গ্রন্থই হোক। তখন মুখস্থ বিদ্যা এবং শাস্ত্রীয় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হতো।

কিন্তু আজ যেকোনো কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে যান এবং জিজ্ঞেস করুন, "আপনার শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী?" তারা সবাই একবাক্যে বলবেন, "আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের ফিজিক্স, ম্যাথ বা হিস্ট্রি যাই শেখাই না কেন, আমার মূল লক্ষ্য হলো তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখানো, যাতে তারা নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারে"। কারণ মানুষের নিজের চিন্তাই হলো তার জীবনের সর্বোচ্চ গাইড।


মানবতাবাদের এই যে বিশাল ও সুন্দর প্রাসাদ যা মানুষের অনুভূতি, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আর তার সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে- তা আজ এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। তবে এই সংকট কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বা উত্তর কোরিয়া কিংবা রাশিয়ার একনায়কদের কাছ থেকে আসছে না। এই মারাত্মক হুমকিটি ধেয়ে আসছে সিলিকন ভ্যালির গবেষণাগার, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্রগুলো থেকে।

আজকের লাইফ সায়েন্স বা জীবনবিজ্ঞান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষকেরা আমাদের বলছেন যে, হিউম্যানিজমের এই পুরো গল্পটি আসলে একটি ভুল এবং সেকেলে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। হিউম্যানিজম ধরে নেয় মানুষের একটি ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বা 'Free will' আছে এবং মানুষের অনুভূতি হলো এক পরম পবিত্র বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রমাণ করছে যে, "স্বাধীন ইচ্ছা" বলে আসলে কিছু নেই।

ভৌত ও জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানের কাছে প্রকৃতির কেবল দুই ধরনের প্রক্রিয়া জানা আছে—একটিকে আমরা বলি ‘ডিটারমিনিস্টিক’ বা পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া (Deterministic processes), আর অন্যটি হলো ‘র‍্যান্ডম’ বা সম্পূর্ণ আকস্মিক প্রক্রিয়া (Random processes)। এই দুটির মিশ্রণে একটি সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিস্টিক ফলাফল আসতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে "স্বাধীনতা" বা 'Freedom' বলে কিছু থাকে না। মানুষ যেভাবে ঈশ্বর, স্বর্গ ও নরকের ধারণা তৈরি করেছে, ঠিক একইভাবে সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে "স্বাধীন ইচ্ছা"র ধারণাটি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সত্য এটাই যে, মানবদেহের জিন, নিউরন আর হরমোনের বাইরে এমন কোনো অদৃশ্য সত্তা নেই যা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তাহলে আমাদের অনুভূতিগুলোর কী হবে? প্রেম, বিরহ, ভয়, আনন্দ—এগুলো কি মিথ্যা? না, অনুভূতিগুলো মিথ্যা নয়, এগুলো বাস্তব। কিন্তু এগুলো কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নয়। বিজ্ঞান বলছে, অনুভূতি হলো আসলে ‘বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদম’।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গত এক শতাব্দীর গবেষণাকে যদি আমি মাত্র তিনটি শব্দে প্রকাশ করতে চাই, তবে তা হবে: "Organisms are algorithms" (জীব হলো এক ধরনের অ্যালগরিদম)। শিম্পাঞ্জি, তিমি বা মানুষের অনুভূতিগুলো আসলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, এগুলো হলো জীবনসংগ্রাম ও বংশবৃদ্ধির তাগিদে প্রকৃতি দ্বারা লাখ লাখ বছর ধরে তৈরি হওয়া এক জটিল গাণিতিক হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরা যাক, আফ্রিকার সাভানাতে একটি বাবুন বানর হেঁটে যাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য তাকে খাবার খুঁজতে হবে, আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে যেন সে নিজে কারো খাবার না হয়ে যায়। হঠাৎ সে একটি গাছে অনেকগুলো পাকা কলা দেখতে পেল। কিন্তু একই সাথে সে দেখল, গাছের কিছু দূরে একটি সিংহ বসে আছে। এখন বাবুনটিকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে- সে কি কলার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখবে, নাকি ওখান থেকে চলে যাবে?

এই সিদ্ধান্তটি আসলে কিসের সিদ্ধান্ত? এটি মূলত সম্ভাবনার হিসাব-নিকাশ। বাবুনটিকে মনে মনে হিসাব করতে হবে: আমি যদি কলার দিকে না যাই, তবে ক্ষুধায় আমার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? আর আমি যদি কলার দিকে যাই, তবে সিংহটি আমাকে ধরে ফেলার সম্ভাবনা কতটুকু? কোন সম্ভাবনাটি বেশি?

এই হিসাবটি করার জন্য বাবুনটির প্রচুর তথ্যের বা ডাটার প্রয়োজন।

  • কলার ডাটা: কলাগুলো গাছ থেকে কত উঁচুতে আছে? সেখানে কয়টি কলা আছে? সেগুলো কি বড় নাকি ছোট? পাকা নাকি কাঁচা? দশটি বড় পাকা কলা হলে এক হিসাব, আর দুটি ছোট কাঁচা কলা হলে অন্য হিসাব।

  • সিংহের ডাটা: সিংহটি গাছ থেকে কত দূরে আছে? সে কি ঘুমাচ্ছে নাকি জেগে আছে? সিংহটিকে দেখে কি ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে নাকি তার পেট ভরা? সে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে?

  • নিজের ডাটা: আমি নিজে কতটুকু ক্ষুধার্ত? আমি কত জোরে দৌড়াতে পারি?

এখন এই সমস্ত ডাটা বা তথ্যকে একত্র করে বাবুনটিকে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বাবুনটি তো আর পকেট থেকে কাগজ-কলম বা ক্যালকুলেটর বের করে প্রবাবিলিটি থিওরি মেলাবে না। তাহলে সে কীভাবে এই হিসাব করে?

আসলে, বাবুনটির পুরো শরীরটাই হলো একটি ক্যালকুলেটর। তার চোখ, কান, নাক চারপাশের পরিবেশ থেকে এই ডাটাগুলো সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন এবং পুরো স্নায়ুতন্ত্র মিলে মুহূর্তের মধ্যে বায়োকেমিক্যাল প্রসেসিং সম্পন্ন করে। এই হিসাবের ফলাফলটি কিন্তু কোনো সংখ্যা বা পার্সেন্টেজ হিসেবে ভেসে ওঠে না; ফলাফলটি প্রকাশ পায় একটি তীব্র ‘অনুভূতি’ বা ইমোশন হিসেবে।

যদি হিসাবের ফল বলে যে কলার দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, তবে বাবুনের শরীরে এক বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হবে এবং সে নিজের ভেতরে ‘সাহস’ অনুভব করবে। তার বুক ফুলে উঠবে এবং সে কলার দিকে দৌড় দেবে। আর যদি হিসাবের ফল বলে যে ঝুঁকি বেশি, তবে তার শরীরে অন্য রাসায়নিক কাজ করবে যা তাকে ‘ভয়’ হিসেবে নাড়া দেবে এবং সে ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচবে।

আমরা যাকে মনের তাগিদ, অনুভূতি বা হৃদয় বলি—তা আসলে লাখ লাখ বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এক অত্যন্ত উন্নত জৈবিক অ্যালগরিদম, যা আমাদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।


এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, অর্থাৎ জীব যে একটি অ্যালগরিদম—এই তত্ত্বটি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের বাস্তব জীবনে কোনো বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ কোনো চার্চ, কোনো সরকার বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি (KGB)-র পক্ষেও একজন মানুষের শরীরের ভেতরের ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না।

ধরা যাক, কেজিবি আপনার পেছনে ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখল। আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন- সব তারা রেকর্ড করল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেজিবির পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে আপনার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর ভেতরে কী ঘটছে, আপনার রক্তচাপ কেন বাড়ছে বা আপনার ডিএনএ-র গঠন কেমন। তাদের কাছে সেই বায়োলজিক্যাল জ্ঞানও ছিল না, আর সেই বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রসেস করার মতো কম্পিউটার বা প্রসেসিং পাওয়ারও ছিল না।

তাই এতদিন পর্যন্ত হিউম্যানিজমের এই পরামর্শটিই সেরা ছিল যে "তুমি পোপের কথা শুনো না, স্টালিনের কথা শুনো না, নিজের অনুভূতির কথা শোনো।" কারণ আপনার অনুভূতিই ছিল এই পৃথিবীর সবচেয়ে পরীক্ষিত ও সফল অ্যালগরিদম।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এসে আমরা দুটি বিশাল বৈজ্ঞানিক সুনামির মুখোমুখি হয়েছি, যা পরস্পরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। ১. একদিকে, ডারউইনের পর থেকে আমরা মানবদেহ, মস্তিষ্ক এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট বায়োলজিক্যাল জ্ঞান অর্জন করছি। ২. অন্যদিকে, কম্পিউটার সায়েন্সের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রনিক অ্যালগরিদম তৈরি করছি।

আজ যা ঘটছে, তা হলো এই দুটি সুনামির মিলন—অর্থাৎ বায়োটেক এবং ইনফোটেক -এর দেয়ালটি ভেঙে এক হয়ে যাচ্ছে। গুগল, অ্যামাজন, অ্যাপল বা ফেসবুক—যারা একসময় নিছক তথ্যপ্রযুক্তির কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা আজ ক্রমেই বায়োটেক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, মানুষের শরীর এবং মনের মেকানিজমও আসলে কোডিং আর ডাটার খেলা।

আমরা এমন এক বিন্দুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যেখানে এই প্রযুক্তি জায়ান্টদের তৈরি করা বাহ্যিক অ্যালগরিদমগুলো (External algorithms) আমাদের নিজেদের চেয়েও আমাদের অনেক ভালো বুঝতে পারবে। তাদের কাছে থাকবে আমাদের বায়োলজিক্যাল ডাটা, আমাদের জিনগত কোড এবং তা বিশ্লেষণ করার মতো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং পাওয়ার। আর যেদিন এই বাহ্যিক অ্যালগরিদমটি আপনাকে আপনার নিজের চেয়ে ভালো চিনবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষের থেকে কর্তৃত্বের চাবিকাঠি চলে যাবে অ্যালগরিদমের কাছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই কর্তৃত্ব বদলের খেলা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগের হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির একটি ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি একটি ডিএনএ টেস্ট করিয়েছিলেন। সেই টেস্টের রিপোর্টে দেখা গেল তাঁর শরীরে 'BRCA1' নামক জিনের একটি বিপজ্জনক মিউটেশন রয়েছে। বিগ ডাটা (Big Data) এবং পরিসংখ্যানের হিসাব অনুযায়ী, যে নারীদের শরীরে এই নির্দিষ্ট মিউটেশনটি থাকে, তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮৭%।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এই পরীক্ষাটি করিয়েছিলেন, তখন তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তাঁর নিজের অনুভূতি বা শরীর তাঁকে বলছিল না যে তিনি অসুস্থ। কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো অস্বস্তি ছিল না। হিউম্যানিজমের ভাষায় বললে, তাঁর হৃদয় বলছিল—"তুমি একদম ঠিক আছ, জীবন উপভোগ করো।" কিন্তু বিগ ডাটার অ্যালগরিদম তাঁকে বলছিল অন্য কথা, "তোমার শরীরের ভেতরে একটি টাইম বোম টিকটিক করছে। তুমি হয়তো এখন কিছুই টের পাচ্ছ না, কিন্তু ভেতরের সত্যটা ভিন্ন।"

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের অনুভূতির চেয়ে অ্যালগরিদমের সেই গাণিতিক হিসাবকে বেশি বিশ্বাস করলেন। তিনি কোনো লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচার (Double mastectomy) করালেন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিবন্ধ লিখে অন্য নারীদেরও এই বিষয়ে সচেতন করলেন। এই যে নিজের অনুভূতিকে পাশে সরিয়ে রেখে একটি বাহ্যিক অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ওপর নিজের জীবন সঁপে দেওয়া—এটাই হলো একবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত রূপ। ভবিষ্যতে আমরা কেউই আর নিজের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত নেব না; আমাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইস (Wearable devices) সার্বক্ষণিক আমাদের রক্ত, হরমোন আর হার্টবিট মেপে আমাদের চেয়ে আগে বলে দেবে আমাদের কখন কোন ওষুধ খেতে হবে বা কোন অপারেশন করাতে হবে।


ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে আমরা দেখব, মধ্যযুগের ধর্মগুলো বলত—কর্তৃত্ব আকাশ থেকে আসে। এরপর হিউম্যানিজম এসে বলল—কর্তৃত্ব মানুষের অনুভূতি থেকে আসে। আর আজ আমাদের চোখের সামনে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বৈশ্বিক ধর্ম বা মতাদর্শ, যাকে আমি বলি ‘ডাটাইজম’ (Dataism)। ডাটাইজম বিশ্বাস করে যে এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের উৎস হলো ‘ডাটা’ বা তথ্য। এই মতাদর্শ মানুষের হাত থেকে কর্তৃত্বকে পুনরায় আকাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—তবে তা কোনো ঈশ্বরের স্বর্গ নয়, তা হলো ‘গুগল ক্লাউড’ বা ‘মাইক্রোসফট ক্লাউড’।

ডাটাইজম মানুষকে বলছে: "তোমার নিজের হৃদয়ের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি গুগলের কথা শোনো, অ্যামাজনের কথা শোনো। কারণ তুমি কী অনুভব করছ এবং কেন অনুভব করছ—তা তোমার চেয়ে তারা অনেক নিখুঁতভাবে জানে। তাই তোমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তটি তারাই নিতে পারবে।"

একজন লেখক এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি সবসময় ভালোবাসিকে মাটির কাছাকাছি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝতে। চলুন দেখা যাক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সিদ্ধান্তগুলো এই অ্যালগরিদমের প্রভাবে কীভাবে বদলে যাচ্ছে।

খুব সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত—"আমি আজ কোন বইটি পড়ব?"

  • মধ্যযুগে আপনি এই প্রশ্ন নিয়ে যেতেন চার্চের পুরোহিতের কাছে। তিনি বলতেন, "বাইবেল পড়ুন। এর বাইরে আর কোনো বই পড়ার প্রয়োজন নেই।"

  • হিউম্যানিজমের যুগে আপনি যেতেন একটি বইয়ের দোকানে। বইগুলোর তাকের মাঝখান দিয়ে হাঁটতেন, দু-একটি বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতেন এবং নিজের ভেতরের একটি ‘গাট ইনস্টিনক্ট’ বা মনের টানে একটি বই কিনে বাড়ি ফিরতেন।

  • আর আজ, ডাটাইজমের প্রাথমিক যুগে আমরা যখন অ্যামাজনের ভার্চুয়াল বুকশপে ঢুকি, একটি অ্যালগরিদম স্ক্রিনে ভেসে উঠে বলে—"আমি তোমাকে চিনি। গত কয়েক বছর ধরে তুমি কী কী বই কিনেছ, কোন বিষয়গুলো পছন্দ করেছ তা আমি জানি। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমি তোমাকে এই তিনটি বই পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।"

কিন্তু এটি তো কেবল শুরু, অত্যন্ত প্রাথমিক একটি পদক্ষেপ। এর পরের ধাপটি আরও চমকপ্রদ এবং কিছুটা ভয়ানক, যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা যখন কিন্ডল (Kindle) বা কোনো ই-রিডারে বই পড়ি, তখন আমরা ভাবি আমরা বইটি পড়ছি। কিন্তু সত্য হলো—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, আপনি যখন বইটি পড়ছেন, বইটি একই সাথে আপনাকে পড়ছে! গুটেনবার্গের ছাপাখানার বই কখনো মানুষকে পড়তে পারত না। কিন্তু কিন্ডল জানে আপনি বইয়ের কোন পাতাটি কত দ্রুত পড়ছেন, কোন লাইনে এসে আপনি থমকে গেছেন, আর কোন পৃষ্ঠায় যাওয়ার পর আপনি বইটি বন্ধ করে দিয়েছেন এবং আর কখনোই খোলেননি।

এখন কল্পনা করুন, এই ই-রিডারকে যদি আপনার ডিভাইসের ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial recognition) বা মুখাবয়ব চেনার প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা হয়, তবে কিন্ডল বুঝতে পারবে বইয়ের কোন লাইনটি পড়ে আপনি হাসলেন, কোন অংশটি পড়ে আপনার চোখে জল এলো, আর কোথায় গিয়ে আপনি বিরক্ত হলেন।

এর চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে, যখন এই রিডারকে আপনার হাতের স্মার্টওয়াচ বা শরীরের ভেতরের কোনো বায়োমেট্রিক সেন্সরের সাথে যুক্ত করা হবে, তখন অ্যামাজন বা গুগল জানতে পারবে তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়ার সময় কোন বাক্যটিতে আপনার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, কোন দৃশ্যে আপনার হার্টবিট দ্রুত হয়েছিল আর কোথায় আপনার শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসৃত হয়েছিল।

আপনি হয়তো বইটি শেষ করার পর তার অর্ধেকের বেশি ভুলে যাবেন, কিন্তু অ্যামাজন কিছুই ভুলবে না। বইটি পড়া শেষ হওয়ার পর অ্যামাজন আপনার মনস্তত্ত্বের এমন একটি নিখুঁত প্রোফাইল তৈরি করে ফেলবে, যা দিয়ে সে আপনার ইমোশনাল বোতামগুলো ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

বই কেনার চেয়েও মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো সঙ্গী নির্বাচন—কাকে আমি বিয়ে করব, কার সাথে আমি জীবন কাটাব? বিবর্তনের পরিভাষায় এটি হলো 'Mate selection', যা যেকোনো প্রাণীর বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।

ধরা যাক, আমি একটি সম্পর্কে আছি এবং আমার সঙ্গী আমাকে আলটিমেটাম দিল—"হয় তুমি আমাকে বিয়ে করো, না হয় আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।" এখন আমি এক চরম সংকটে।

  • মধ্যযুগে আমি হয়তো কোনো কাজীর কাছে বা পুরোহিতের কাছে যেতাম দোয়ার জন্য বা উপদেশের জন্য।

  • বিংশ শতাব্দীতে আমার বন্ধুরা আমাকে বলত, "নিজের মনের কথা শোনো, তোমার মন যার দিকে টানে, তাকেই বেছে নাও।"

  • কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই ডাটাইজমের যুগে আমি গুগলের কাছে গিয়ে বলব, "গুগল, আমার সামনে এই কঠিন সিদ্ধান্ত। আমি এখন কী করব? আমার কি একে বিয়ে করা উচিত?"

গুগল তখন তার বিশাল সার্ভার থেকে আমার সমস্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে বলবে: "দেখো, আমি তোমার জন্মের পর থেকে তোমাকে ট্র্যাক করছি। আমি তোমার জীবনের প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি সার্চ হিস্ট্রি, তোমার করা প্রতিটি ফোন কল জানি। তুমি যখনই থিয়েটারে কোনো সিনেমা দেখেছ বা কোনো গান শুনেছ, তোমার হার্টবিট কেমন ছিল তা আমি রেকর্ড করেছি। এমনকি তুমি যখন এই মানুষটির সাথে ডেটিংয়ে গিয়েছ, তখন তোমার রক্তচাপ কতটা বেড়েছিল, তাও আমার জানা আছে। আমার কাছে তোমার ডিএনএ রিপোর্ট এবং মেডিকেল রেকর্ডও আছে। শুধু তাই নয়, তোমার সঙ্গীর সমস্ত ডাটাও আমার কাছে আছে। আর আমার সার্ভারে আছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সফল ও ব্যর্থ দাম্পত্য জীবনের ডাটাবেজ। এই সমস্ত তথ্যকে আমাদের কোয়ান্টাম অ্যালগরিদমে প্রসেস করে আমি তোমাকে ৮৭% নিশ্চিতmap দিয়ে বলছি যে—একে বিয়ে করলেই তুমি দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুখী হবে।"

গুগল এখানেই থামবে না। সে আরও যোগ করবে: "আমি তোমাকে এত ভালো চিনি যে, আমি জানি আমি এখন যে পরামর্শটি দিলাম, তা তোমার পছন্দ হয়নি। তোমার মন খারাপ হয়েছে। আমি এটাও জানি কেন তোমার মন খারাপ হয়েছে। কারণ তোমার যে আদিম বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদমটি এক লাখ বছর আগে আফ্রিকার সাভানাতে তৈরি হয়েছিল, তা বাহ্যিক সৌন্দর্য বা লুকসকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। আদিম যুগে ভালো চেহারা সুস্থতার লক্ষণ ছিল বলে তোমার জিন ওদিকেই টানছে। তুমি ভাবছ এই ছেলে বা মেয়েটি দেখতে ততটা সুন্দর নয়, তাই তোমার মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আমার আধুনিক পোস্ট-মডার্ন অ্যালগরিদম জানে যে দীর্ঘমেয়াদী সুখী দাম্পত্যে বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভূমিকা মাত্র ১১%, যেখানে তোমার আদিম মন একে ৩০% গুরুত্ব দিচ্ছে। অতএব, নিজের প্রাচীন মনকে বাদ দিয়ে আমার কথা শোনো। বিয়েটা করেই ফেলো।"

এখানে একটি বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। গুগলকে কিন্তু ১০০% নিখুঁত বা অন্তর্যামী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাকে কেবল একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে কত বড় বড় ভুল করে! ভুল সাবজেক্টে পড়াশোনা করে, ভুল মানুষকে বিয়ে করে, ভুল পেশা বেছে নেয় এবং ১০ বছর পর মাথায় হাত দিয়ে বলে—"হায়! আমি কী ভুলই না করেছিলাম!" গুগলকে কেবল মানুষের এই গড়পড়তা ভুলের চেয়ে একটু কম ভুল করতে হবে। আর যখনই আমরা দেখব যে গুগলের দেওয়া পরামর্শগুলো মেনে চললে আমাদের জীবন আসলেই সহজ আর সুন্দর হচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুগলের হাতে তুলে দেব।

আজকে আমরা যখন শহরের কোনো অচেনা রাস্তায় গাড়ি চালাই, আমরা কি আমাদের নিজেদের দিকবিদিকের অনুভূতির ওপর ভরসা করি? না। আমরা চোখ বন্ধ করে গুগল ম্যাপস (Google Maps) বা ওয়েজ (Waze)-এর নির্দেশ মেনে চলি। ডানে মোড় নিতে মন চাইলেও ম্যাপ যদি বলে বাঁয়ে যেতে, আমরা বাঁয়েই যাই। কারণ আমরা জানি ম্যাপ আমাদের চেয়ে বেশি তথ্য জানে। এর ফলে আজ আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক দিক চেনার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। স্মার্টফোনটি বন্ধ হয়ে গেলে আমরা অনেকেই আজ সম্পূর্ণ অন্ধ ও অসহায় বোধ করি। এভাবেই খুব ছোট ছোট পদক্ষেপে, স্বেচ্ছায়, কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়াই আমরা আমাদের কর্তৃত্ব অ্যালগরিদমের কাছে হস্তান্তর করছি।


কর্তৃত্বের এই যে স্থানান্তর, তা আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে? এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অ্যালগরিদম যখন আমাদের অনুভূতিকে হ্যাক করতে পারবে, তখন দুটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার জন্ম হতে পারে।

১. ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্রের চরম রূপ (Digital Dictatorship)

যদি এই প্রযুক্তি কোনো সর্বগ্রাসী বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারের হাতে পড়ে—যেমন উত্তর কোরিয়া—তবে তা এক ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। আজকের দিনে উত্তর কোরিয়ার মানুষ মুখে একনায়ক কিম জং উনের প্রশংসা করলেও মনে মনে হয়তো তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু স্বৈরশাসক মানুষের মনের খবর জানে না বলে তারা বেঁচে যায়।

কিন্তু ভবিষ্যতে যখন উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি নাগরিককে একটি বাধ্যতামূলক বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট বা চিপ পরতে হবে, এবং তারা যখন কোনো ঘরের দেওয়ালে কিম জং উনের ছবি দেখবে—তখন যদি তাদের রক্তচাপ, হার্টবিট বা মস্তিষ্কের নিউরনের কম্পন সামান্যতম রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অ্যালগরিদম সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় পুলিশকে অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে। সেই মানুষটির অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যাবে। এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত এবং নিশ্ছিদ্র স্বৈরতন্ত্র, যেখানে মানুষের মনে মনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হবে।

২. উদারনৈতিক সমাজের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

অন্য দিকে, আমেরিকার মতো একটি লিবারেল বা মুক্ত সমাজে এই প্রযুক্তি স্বৈরতন্ত্রের রূপ না নিয়ে হয়তো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের রূপ নেবে। সেখানে অ্যালগরিদম আপনাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে না, কিন্তু সে আপনাকে এত সূক্ষ্মভাবে প্ররোচিত (Nudge) করবে যে আপনি ভাববেন আপনি নিজের ইচ্ছাতেই কাজটি করছেন। আপনার মন খারাপের মুহূর্তে সে আপনার সামনে এমন পণ্যের বিজ্ঞাপন আনবে যা আপনি কিনে ফেলবেন। আপনার ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য আপনার ভয়ের বোতামগুলোতে চাপ দেবে। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা সেখানে পরিণত হবে একটি নিয়ন্ত্রিত পণ্যে।


আমার এই পুরো বক্তব্য শোনার পর আপনাদের মনে হতে পারে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ তবে সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং আমরা এক অনিবার্য নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শেষ করার আগে আমি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা ‘ক্যাভিয়েট’ (Caveats) আপনাদের সামনে রাখতে চাই, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।

প্রথম সংশয়: মন এবং মস্তিষ্কের পার্থক্য (Mind vs. Brain)

আমার এই পুরো থিওরি বা ডাটাইজমের মূল ভিত্তি হলো একটি ধারণা—"Organisms are algorithms" (জীব হলো অ্যালগরিদম)। কিন্তু বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত মস্তিষ্কের (Brain) মেকানিজম কিছুটা বুঝতে পারলেও, মানুষের ‘মন’ বা চেতনা (Mind) সম্পর্কে এখনও প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছে।

মস্তিষ্ক হলো নিউরন, সিন্যাপ্স আর কেমিক্যালের একটি ভৌত নেটওয়ার্ক। কিন্তু ‘চেতনা’ বা ‘মন’ হলো আমাদের অনুভূতি—ভয় পাওয়ার অনুভূতি, ভালোবাসার অনুভূতি, কোনো কিছুর স্বাদ নেওয়ার ভেতরের অভিজ্ঞতা (Subjective experiences)। বিজ্ঞান আজও জানে না কীভাবে মস্তিষ্কের কোটি কোটি ইলেকট্রনিক সিগন্যাল থেকে একটি জীবন্ত অনুভূতির জন্ম হয়।

যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে মানুষের মন বা চেতনাকে কেবল গাণিতিক অ্যালগরিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে কম্পিউটারের পক্ষে কখনোই মানুষকে পুরোপুরি হ্যাক করা সম্ভব হবে না। তখন এই পুরো ‘হোমো ডিউস’ বা অ্যালগরিদমিক রাজত্বের গল্পটি একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বা ফ্যান্টাসি হিসেবেই থেকে যাবে।

দ্বিতীয় সংশয়: প্রযুক্তি কখনো পূর্বনির্ধারিত নয় (Technology is not deterministic)

ইতিহাস থেকে আমরা যে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পাই, তা হলো—প্রযুক্তি আমাদের কেবল একটি পথ দেখায়, কিন্তু আমরা সেই প্রযুক্তি দিয়ে কেমন সমাজ তৈরি করব, তা কিন্তু আমাদের ওপরই নির্ভর করে। প্রযুক্তি কোনো ভাগ্য বা নিয়তি নয়।

বিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের কথা ধরা যাক। ট্রেন, বিদ্যুৎ, রেডিও, গাড়ি—এই প্রযুক্তিগুলো যখন আবিষ্কৃত হলো, তখন কিন্তু ট্রেন এসে মানুষকে বলে দেয়নি যে তাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। মানুষ এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দিকে তৈরি করেছে হিটলারের ফ্যাসিবাদের অমানবিক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, স্টালিনের কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রের গুলাগ, আবার অন্য দিকে তৈরি করেছে পশ্চিমের উদারনৈতিক গণতন্ত্র।

আমি প্রায়ই একটি চমৎকার এবং দৃশ্যমান উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝানোর চেষ্টা করি। আপনারা যদি রাতের বেলায় মহাকাশ থেকে তোলা পূর্ব এশিয়ার একটি স্যাটেলাইট ছবি দেখেন, তবে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়বে।

  • ছবির নিচের ডান কোণায় দেখা যাবে আলোর এক সুবিশাল সমুদ্র—সেটি হলো আধুনিক, উন্নত দক্ষিণ কোরিয়া।

  • ছবির ওপরের অংশে দেখা যাবে আলোর আরেকটি বিশাল অবয়ব—সেটি হলো চীন।

  • আর এই দুই আলোর সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিশাল অন্ধকার গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল দেখা যায়। সেটি কিন্তু কোনো সমুদ্র বা মহাসমুদ্র নয়; ওটি হলো উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়ার মানুষ কি বিদ্যুৎ বা লাইট বাল্বের প্রযুক্তি সম্পর্কে জানে না? অবশ্যই জানে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া বা চীন বিদ্যুৎ দিয়ে যে ধরনের সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার শাসকরা বিদ্যুৎ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অন্ধকার একটি সমাজ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি এক হলেও মানুষের সিদ্ধান্তের কারণে ফলাফল সম্পূর্ণ আলাদা হয়েছে।


তাই আজ আমি আপনাদের সামনে যে অ্যালগরিদমিক ভবিষ্যতের চিত্রটি তুলে ধরলাম—যেখানে আমাদের অনুভূতিগুলো তার সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে, যেখানে গুগল বা অ্যামাজন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে—তা কিন্তু কোনো অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। এটি কেবল একটি সম্ভাবনা, একটি সতর্কবার্তা।

যদি আপনাদের এই আসন্ন ভবিষ্যতের রূপরেখা পছন্দ না হয়, যদি আপনারা মনে করেন যে মানুষের অনুভূতি আর তার স্বাধীন ইচ্ছার মর্যাদা অ্যালগরিদমের গাণিতিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, তবে আজই আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে এই প্রযুক্তিগুলো কাজ করছে, কীভাবে আমাদের ডাটা নিয়ে আমাদের অজান্তেই আমাদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে।

আমরা যদি আজ সচেতন না হই, আমরা যদি আমাদের সমস্ত তথ্য ও মনোযোগ অন্ধের মতো এই বড় বড় টেক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দিতে থাকি, তবে কর্তৃত্বের এই স্থানান্তর কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি এই প্রযুক্তির সঠিক ও মানবিক ব্যবহারের আইনি ও নৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারি, তবে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে আমাদের গৌরবময় অস্তিত্ব আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারব।

ভবিষ্যৎ কিন্তু ইতিমধ্যেই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি আমাদের জীবনের ম্যাপটি গুগলের হাতে দিয়ে অন্ধের মতো গাড়ি চালিয়ে যাব, নাকি মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং চাকাটি নিজের হাতে ধরে ম্যাপের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো পথ আবিষ্কার করব?

Tuesday, May 5, 2026

অনুকুল: সত্যজিৎ রায়ের এআই নিয়ে ভাবনা

সত্যজিৎ রায়ের মূল ছোটগল্প অনুকূল প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে; যা তাঁর জনপ্রিয় সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে তাঁর গল্প সংকলন অশ্বমেধের ঘোড়া-তেও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর ২০১৭ সালে পরিচালক সুজয় ঘোষ সত্যজিৎ রায়ের এই ছোটগল্প অবলম্বনে একটি শর্টফিল্ম নির্মান করেন যার নাম- অনুকুল। আমি যখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, আমার বারবার সত্যজিৎ রায়ের সেই কালজয়ী গল্প 'অনুকূল'-এর কথা মনে পড়ে। ২০১৭ সালে এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত শর্ট ফিল্মটি যারা দেখেছেন, তারা হয়তো আমার সাথে একমত হবেন। সেখানে দেখা যায়, অনুকূল নামের একটি রোবট মানুষের চেয়েও বেশি নিয়মনিষ্ঠ, বেশি দক্ষ; এমনকি এক পর্যায়ে সে তার মালিকের প্রতি এমন এক ধরনের 'যান্ত্রিক আনুগত্য' প্রদর্শন করে যা একই সাথে বিস্ময়কর এবং আতঙ্কজনক। অনুকূলের সেই নির্লিপ্ত চাহনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যন্ত্র যখন মানুষের জায়গা নিতে শুরু করে, তখন মানবিক আবেগ আর যান্ত্রিক যুক্তির লড়াইটা কতটা অসম হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সত্যজিতের সেই দূরদর্শী ভাবনাকে আমার খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হচ্ছে। কারন ইতিহাসকে আমি কেবল গত হয়ে যাওয়া দিনগুলোর দলিল মনে করি না; আমার কাছে ইতিহাস হলো পরিবর্তনের পাঠশালা। কিন্তু বর্তমানের এই এআই বিপ্লব অতীতের যেকোনো পরিবর্তনের চেয়ে আলাদা। এর কারণ হলো এর 'গতি'। আমরা মানুষ হিসেবে যেহেতু জৈবিক প্রাণী, তাই আমাদের বিবর্তন হতে, কোনো কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে বা শিখতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু এআই হলো অজৈব, ফলে এর বিবর্তন ঘটে আলোর গতিতে। আমার ভয় হয়, অনুকূলের মতো নিখুঁত হতে গিয়ে আমরা আমাদের ধীরস্থির মানবিক সত্তা নিয়ে এই অতিদ্রুত দৌড়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খেই হারিয়ে ফেলব না তো?



প্রথম বিশ্বের উদ্যোক্তারা আমাদের চমৎকার সব স্বপ্ন দেখান- ক্যানসার নিরাময় হবে, জলবায়ু সংকট মিটে যাবে, ব্যক্তিগত টিউটর সবার হাতে পৌঁছাবে। আমি তাদের এই আশাবাদকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু একজন সমাজ ও পরিবেশ সচেতন মানুষ হিসেবে আমার মন তাতে পুরোপুরি সায় দেয় না। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় বলশেভিকরাও কিন্তু এক নিখুঁত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ইউটোপিয়া বা স্বর্গরাজ্য গড়তে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী পথ বেছে নিয়েছিল, তা আমাদের সবার জানা। আমার প্রশ্ন হলো- একটি অমলেট বানানোর জন্য আমরা ঠিক কতগুলো ডিম ভাঙতে রাজি আছি? এআই-এর সুফল পাওয়ার লোভে আমরা কি আমাদের গণতন্ত্র বা মানবিক আস্থাকে বিসর্জন দিতে পারি?
আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র হলো একটি সুস্থ কথোপকথনও যা শুধু নিজে বল্লেই চলবে না বরংচ অন্যেরটাও মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কিন্তু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালে আমি কী দেখি? আমি দেখি, অ্যালগরিদমগুলো আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে। এই এআই-র কোনো দেশপ্রেম নেই, কোনো নৈতিকতা নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ইউজার এনগেজমেন্ট। আর মানুষ হিসেবে আমরা রাগ বা ঘৃণার খবরে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে- সমাজ ভাগ হয়ে যাচ্ছে, আমরা একে অপরের কথা শোনার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। একটি সমাজ যখন কথা বলার ক্ষমতা হারায়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
আমার কাছে সবচেয়ে আতঙ্কজনক মনে হয় বট বা নকল মানুষের ধারণাটি। আমরা যদি এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে আমি কার সাথে কথা বলছি; মানুষ নাকি বট? সেটাই বুঝতে না পারি, তবে আস্থার জায়গাটা কোথায় থাকবে? আমরা যেমন জাল টাকা রুখতে কঠোর আইন করি, তেমনি ইন্টারনেটে ছদ্মবেশী এই নকল সত্তাদের রুখতেও আমাদের শক্ত হতে হবে। আমি মনে করি, কোনো এআই যদি মানুষের পরিচয় দিয়ে আমার সাথে কথা বলে বা আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তবে তা মানবসভ্যতার ওপর এক ধরনের ডিজিটাল হামলা।
অনেকে বলেন, এআই-কে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব কারণ এতে উদ্ভাবন থমকে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি, রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ মানেই বাধা দেওয়া নয়। একটি গাড়িতে ব্রেক থাকে বলেই আমরা তা দ্রুত চালাতে পারি। এআই-এর ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু মূল নীতি ঠিক করতে হবে। এআই-কে সবসময় প্রকাশ করতে হবে যে সে একজন যান্ত্রিক সত্তা। কোনো কোম্পানির অ্যালগরিদম যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তবে সেই দায়ভার সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেই নিতে হবে। আমরা এআই-কে স্মার্ট করার জন্য যত টাকা খরচ করছি, তার অন্তত কিছু অংশ কি আমাদের নিজেদের বিবেক ও সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে পারি না?
আমরা কি সেই শিশুর মতো হবো যে এখনই একটা মার্শমেলো খাওয়ার লোভে ভবিষ্যতের দুটো মার্শমেলো পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে? পৃথিবীজুড়ে এখন এআই নিয়ে এক পাগলাটে প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই সবার আগে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু এই দৌড়ে যদি আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলি, তবে সেই বিজয়ের কোনো মূল্য থাকবে না। আমি চাই এআই আমাদের অনুকূল হোক, আমাদের সহযোগী হোক; কিন্তু আমাদের হৃদয়ের মালিক যেন সে না হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির এই বিশাল জোয়ারে দাঁড়িয়ে আমি কেবল এটুকুই বলতে চাই; আসুন আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের প্রজ্ঞা এবং করুণাকেও লালন করি।
কারন দিনশেষে, যন্ত্র কেবল গণিতে দক্ষ হতে পারে
কিন্তু সহমর্মিতা কেবল মানুষেরই ভূষণ।

কাজল দাস
সম্পাদক
কালেরধ্বনি
৬ মে ২০২৬

Tuesday, July 7, 2020

জয়দেব মুখোপাধ্যায় : চৈতন্য মৃত্যুরহস্যের কিনারা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন যে গবেষক



জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের যেন এক কিংবদন্তির নাম যার কথা অনেকেই শুনেছে , বহু মানুষই তাকে খুঁজে ফেরে কিন্ত তার ব্যাপারে বিশদে কেউ কিছু বলতে পারেনা। শ্রী চৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে ঘুরে ফিরে বারবার উঠে আসে এই গবেষকের রহস্যময় মৃত্যুর কথা। মানুষটা গোটা জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এই রহস্য সমাধানের জন্য। তারপর দেখতে দেখতে তার মৃত্যুর পর ২৫ টা বছর পেরিয়ে গেল অথচ খুব অদ্ভুত ভাবেই ইন্টারনেট এই অসাধারণ মানুষটাকে নিয়ে আজও নীরব ! সমসাময়িক লেখাতে ‘আজকাল পত্রিকায়’ প্রকাশিত কুড়ি বছরের পুরনো এক প্রবন্ধ ছাড়া আর বিশেষ কোন সোর্সের উল্লেখ পাওয়া যায়না । খুব যত্ন করে কেউ বা কারা যেন এই মানুষটাকে বাঙালি জনমানস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে । আজকালের মূল প্রবন্ধটা দুর্লভ এবং বিস্ফোরক তথ্যে ঠাঁসা । তাই স্থাপত্যের পক্ষ থেকে আজ মূল প্রবন্ধটাই টাইপ করে তুলে দেওয়া হল জনসমক্ষে ।


‘চৈতন্য খুনের’ কিনারা করতে গিয়ে খুন ?

লেখক – অরুপ বসু , শারদীয় আজকাল (বিশেষ সংখ্যা) ১৪০৭ , পৃষ্ঠা ৩৯২ 

আজকাল পত্রিকায় অরুপ বসুর লেখা আর্টিকেলের কভার (পুরনো সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলো তারিখসহ উল্লেখ করা আছে)

এক
‘বিশ্ব যখন নিদ্রা মগন গগন অন্ধকার / কে দেয় আমার বীণার তারে এমন ঝঙ্কার’ । এ গান যখন লিখেছিলেন তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ঊনপঞ্চাশ । আর আটচল্লিশ বছর বয়সে চৈতন্য যখন বলছেন ‘গোবিন্দ বিরহে আমার কাছে মুহূর্ত হয় যুগের মতন সুদীর্ঘ । চোখে নেমে আসে ঘন বরষা । সমস্ত সংসার আমার কাছে হয়ে যায় শূন্য’। তখন তার মৃত্যু হয় । ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন । এখনও পর্যন্ত রহস্যাবৃত সেই মৃত্যু । খুন বা আত্মহত্যা যাই হোক, দেহটা গেল কোথায় ?
৪৬২ বছর বাদে এই সত্যের অনুসন্ধানে নেমে যখন প্রায় প্রমান করতে চলেছেন চৈতন্যকে কিভাবে কারা খুন করেছিল এবং দেহ কোথায় পুঁতে দিয়েছে , ঠিক তখনই মৃত্যু হল সত্যান্বেষী ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের, ১৯৯৫ সালের ১৭ এপ্রিল । ৫ বছর বাদেও জয়দেববাবুর মৃত্যু রহস্যাবৃত । স্থানীয় লোকেরা যাকে সরাসরি খুন বলে সন্দেহজনক ব্যক্তির শাস্তি চায়, সরকারি খাতায় তাকেই আত্মহত্যা বলে দেখানো হয়েছে ।
জয়দেববাবু ও তার মা বিমলা মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর যদি সঠিক কিনারা হয়, তাহলে বহু মূল্যবান নথি উদ্ধার হবে, এমনকি চৈতন্য মৃত্যুর রহস্যজালও উন্মোচিত হবে । তাই আমরা একটু খননকাজ চালিয়ে দেখি, জয়দেববাবু কে ? কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল , তা নিয়ে সরকারি তদন্তই বা কতটুকু এগিয়েছিল ।
দুই
১৯৯৬ সালে কলকাতায় জয়েদেববাবুকে নিয়ে একটি তদন্তমূলক নাটক দেখি । তার আগে একটি গল্প পড়ি । কোথাও স্পষ্ট করে কিছু বলা ছিল না । কিন্ত ইঙ্গিত ছিল ।
১৯৯৫ সালের কাগজগুলো উল্টেপাল্টে দেখি । দু-চার লাইনের একটা খবর বেরিয়েছিল বটে – ‘পুরীতে বাঙালি গবেষকের রহস্যময় মৃত্যু । পুরীর আনন্দময়ী মার আশ্রমে এক বাঙালি গবেষক ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায় ও তার মা বিমলা মুখোপাধ্যায়কে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে । স্থানীয় মানুষের ধারনা এটা খুন । পুলিস তদন্তের কাজ শুরু করেছে’ ।
অতঃপর সংবাদমাধ্যম নীরব । কোনও ফলোআপ স্টোরি নেই । অথচ এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে । সন্দেহ গভীর হল । এটা যে কোন চক্রের কাজ তাতে আর কোন কিন্ত নেই ।
প্রথমেই চৈতন্যের মৃত্যুরহস্য নিয়ে পড়া শুরু করলাম । সাম্প্রতিককালের সব গবেষকের লেখাতেই উঠে এল একটি নাম । জয়দেব মুখোপাধ্যায় । তিনিই নাকি পারেন মুশকিল আসান করতে ।
হাতে এল একটি বই । জয়দেববাবুর লেখা ‘কাঁহা গেলে তোমা পাই’ । উপন্যাসের আঙ্গিকে লেখা চৈতন্যের সমাধির খোঁজে একটি তদন্তমূলক গ্রন্থের প্রথম খণ্ড । চৈতন্যের সমাধি কোথায় হয়েছিল এখনও পর্যন্ত তা অজ্ঞাত । গ্রন্থের শুরুতে জয়দেববাবু লিখেছেন , পুরীর ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কর্মসচিব স্বামী অভিনবানন্দজি এক পত্র লিখে তাকে জানিয়েছেন যে, তার সুনিশ্চিত ধারনা, মহাপ্রভুর দেহটিকে মনিকোঠার রত্নবেদীর নিম্নেই সমাহিত করা হয়েছিল । একই কথা বলেছেন ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন, যিনি প্রথম স্পষ্ট করে বলেছিলেন পুরীর মন্দিরের ভেতর চৈতন্যকে খুন করে পুঁতে ফেলা হয়েছে । ‘Chaitanya and His Age’ গ্রন্থে লিখেছেন,
‘This they did to make time for burying him within the temple. If he left the world at 4 pm, the doors, windows were kept closed till 11 pm.  This was taken for burying him and repairing the floor after burial. The priest at 11 pm opened the gate and gave out that Chaitanya was incorporated with the image of Jagannath.’
একই কথা জানা যায় হালে আবিষ্কৃত প্রত্যক্ষদর্শী বৈষ্ণব দাসের পুঁথি ‘চৈতন্য চকড়া’ থেকে । ‘রাত্রি দশ দণ্ডে চন্দন বিজয় যখন হল, তখন পড়িলা প্রভুর অঙ্গ স্তম্ভ পছ আড়ে’ । দশ দন্ড মানে রাত এগারোটায় তিনি গড়ুর স্তম্ভের কাছে চৈতন্যের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন।
কাঁহা গেলে তোমা পাই এর প্রধান চরিত্র আনন্দ (জয়দেববাবু) । উপন্যাসের মাঝামাঝি জায়গায় আনন্দকে প্রভুজি বলেছেন, চৈতন্য মৃত্যু রহস্যের কিনারা, তার সমাধির খোঁজ করতে গেলে এই পুরীতেই খুঁজতে হবে । যেখানে চৈতন্য জীবনের শেষ এবং মূল্যবান ১৮ বছর কাটিয়েছেন । ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুরীতে আসেন । ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান । মাঝে কয়েকটা বছর দাক্ষিণাত্যে কাটিয়েছেন মাত্র ।
সমসাময়িক চরিতকারদের সাহায্য নিয়ে সুকুমার সেন ‘চৈতন্যাবদান’ গ্রন্থের শেষে লিখলেন, ‘দিব্যোন্মাদের সময় তার চিত্তকে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনতেন , শেষ বয়সে তার দুই প্রধান সহচর – রামানন্দ রায় ও স্বরুপ দামোদর । দিব্যোন্মাদের চরম অবস্থায় কোনরকম বাহ্যজ্ঞান থাকত না । তাকে রাত্রিকালে রক্ষা করতে সঙ্গীদের প্রায়ই সারা রাত্রি জেগে থাকতে হত ।
১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন চৈতন্য গান গাইতে গাইতে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকেছিলেন । সেই প্রথম আর শেষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের দরজা বন্ধ ছিল । তারপর চৈতন্যকে আর পাওয়া যায় না । এই ব্যাপারে বেশিরভাগ চরিতকার একমত ।
সেই সময় স্বরুপ দামোদর ভেতরে ছিলেন । তাকেও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং উধাও হয়ে যায় তার লেখা পুঁথি চকড়া বা কড়চা ।
জয়দেববাবু বলতেন স্বরুপ দামদরের সেই নিখোঁজ পুথিটি তিনি আবিষ্কার করেছেন। শুধু তাই নয় তার সময়ের আরও বহু খ্যাত অখ্যাত বাঙালি ও ওড়িয়া লেখকের পুঁথি তিনি পেয়েছেন । তার জোরালো দাবী ছিল, আর কিছুদিনের মধ্যে তিনি প্রমান করে দেবেন চৈতন্য খুন হয়েছিল কোথায়, কখন , কীভাবে । এই সবই পাওয়া যাবে “কঁহা গেলে তোমা পাই” এর দ্বিতীয় খণ্ডে । প্রথম খণ্ডের শেষ দিকে প্রভুজির ভ্রাতুষ্পুত্রী বিদুষী মাধবী আনন্দকে বলেছেন, ‘সে জায়গাটা আমিই দেখিয়ে দিতে পারি তোমাকে, যদি অবশ্য একটি শর্ত রক্ষা করতে রাজী হও তুমি’ ।
কথা হচ্ছে টোটো গোপীনাথ মন্দিরের সামনে কাঁঠাল গাছের মত দেখতে পলাং গাছের ছায়ায় । তার মানে কি টোটো গোপীনাথের মন্দিরেই চৈতন্য সমাধিস্থ ? শোনা যায় টোটো গোপীনাথের দেওয়ালে এক সময় মানুষ মাথা খুঁটত । বিশ্বাস ছিল চৈতন্যের কঙ্কাল সেখানে পোঁতা আছে । বছর পঞ্চাশ আগে প্রবাসীতেও এরকম একটা খবর বেরিয়েছিল । তাছাড়া বিশিষ্ট ওড়িয়া পণ্ডিত সদাশিব রঘুশর্মার স্থির বিশ্বাস, টোটো গোপীনাথ মন্দিরের উঠোনে যে দুটি তুলসী মন্দির আছে, তার অপেক্ষাকৃত প্রাচীন মন্দিরের নিচে চৈতন্যকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল । ‘কঁহা গেলে তোমা পাই’ এর শেষে দেখেছি, প্রভুজি আনন্দকে চিঠি দিয়েছেন, ‘আর মাত্র দশদিন’ । রাজমহেশ্বরী থেকে ফিরলেই সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে। রাজমহেশ্বরী পুরীর কাছেই তৎকালীন একটি প্রদেশ, যার শাসক ছিলেন চৈতন্যভক্ত রায় রামানন্দ ।
এই দশদিন আর শেষ হয়নি । দ্বিতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের ঘরে পৌঁছানর আগেই জয়দেববাবুর মৃত্যু হয় ।
তিন
পুরীর স্বর্গদ্বার , চৈতন্য চক বা চৈতন্য মোড় । পাঁচশো বছর বাদে পুরীতে প্রথম চৈতন্যমূর্তি স্থাপিত হয় জয়দেববাবুর উদ্যোগেই । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি জৈল সিং এবং কেন্দ্রীয় মানবাধিক কমিশনের চেয়ারম্যান  রঙ্গনাথ মিশ্র । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জয়দেববাবু বলেছিলেন, ‘যে কারণে মহাপ্রভু অন্তর্ধানের পর পঞ্চাশটি বছর উৎকল এবং বঙ্গের বৈষ্ণবমণ্ডলী নিদারুন আতঙ্কে স্তব্ধ করে রেখেছিল নিজেদের পরমপ্রিয় নাম সংকীর্তনকে, ঠিক সেই কারনেই চৈতন্যদেবের উপর লেখা প্রায় সমস্ত গ্রন্থেই ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে চৈতন্য তিরোধানের শেষ মুহূর্তের দৃশ্য বর্ণনাকে’।
স্বর্গদ্বারের ডানদিকে শ্মাশান ছাড়িয়ে আরো কিছুদূর গেলে, মীনাক্ষী হোটেল, তার পাশে ট্রাভেলিং এজেন্ট কার্তিক দাসের দপ্তর । পাশে একটা সরু গলি সমুদ্রের দিকে নেমে গেছে । গলির শেষে আনন্দময়ীর আশ্রম বাড়ি। কিন্ত গলির মাঝামাঝি গেলেই ডান হাতে ছোট দরজা । দরজা দিয়ে ঢুকলেই উঠোন । বাঁদিকে বিশাল আশ্রমবাড়ি । ডানদিকে দুটো ঘর , বারান্দা , চাতাল । চাতালের একদিকে দুটো অগভীর চৌবাচ্চা ।

‘… ঐ চৌবাচ্চার মধ্যেই দাদুর দেহটা পড়েছিল । ভেতরে মাথা , বাইরে পা । ভেতরে আধ চৌবাচ্চা জল । মাথাটা পুরো জলে ডোবা ছিল’ । অনন্দময়ী আশ্রমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কার্তিক দাস। ‘এখানে সবাই জয়দেববাবুকে দাদু বলে ডাকত’ । যার যা বিপদ , যার যা সমস্যা – সব ব্যাপারেই দাদুর কাছে আসত । কত বেকার ছেলেকে দাদু চাকরি জুটিয়ে দিত , ব্যবসার জন্য ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দিত, গরিব মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করত ।  দাদু রাস্তা দিয়ে হাঁটলে ভিড় জমে যেত । কত নামীদামী লোক দেখা করতে আসত’।

‘কি যেন একটা বই লিখছিলেন দাদু। চিঠিতে টেলিগ্রামে হুমকি দিত । পুলিসকেও জানিয়েছিল দাদু । ভয় পেত না দাদু । বলত এত মানুষ ভালোবাসে, গুণ্ডারা মেরে গেলেই হল’ !
‘সেদিন, কালুর মাকে চেনেন তো, নীলমণি প্রধান, ওর মেয়ে দাদুর ঘরদোর পরিষ্কার করে দিত । রান্না করে দিত। সকালে এসে দেখছে , দরজা বন্ধ । ধাক্কালেও খুলছে না । দাদু তো অনেক সকালে ওঠে’।
‘মেয়েটি কালুর মাকে , আমাকে ডেকে আনে’ ।
‘পাঁচিলে উঠে দেখি ঐ দৃশ্য । মাথা চৌবাচ্চায় , পা বাইরে , হাত দুটো পিছন দিকে দড়ি দিয়ে বাঁধা। ঘরের দরজা খোলা। খাটের তলায় মেঝেতে দাদুর মা উপুড় হয়ে পড়ে আছে । মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরোচ্ছে’।
‘লাফিয়ে নামলাম । আরও অনেকে এল । তখনও জ্ঞান আছে দাদুর মার । ঘরের মধ্যে ঘুমের ওষুধের ছেঁড়া রাংতা । ইংরেজিতে লেখা দুটো সুইসাইড নোট । আর প্রচুর বই , প্রাচীন পুঁথি – সব লন্ডভণ্ড করা’ ।
কার্তিকবাবুর সাথে আনন্দময়ী আশ্রমে দাঁড়িয়ে এসব কথা হচ্ছিল । জয়দেববাবুর মৃত্যুর দেড় বছর বাদে। ১৯৯৬ সালের ২৮ অক্টোবর ।
গলির মুখে একটা পানের দোকান । নীলমনির স্বামীপরিত্যক্তা কন্যার দোকান । নীলমণির সাথে কথা হচ্ছিল , জয়দেববাবুই দোকান করতে সাহায্য করেছেন । বেঁচে থাকতে রোজ কত মানুষ আসত । রাজীব গান্ধীকেও দেখেছি আসত ! সেই মানুষটিকে যখন দাহ করতে আনল , ভয়ে কেউ শ্মশানে গেল না ! পুলিশ দাহ করে দিয়ে চলে গেল । আর ঘরের সব বইপত্র নিয়ে কোথায় গেল, কে জানে ! বলতেন মহাপ্রভুর শেষটা বড় কষ্টের । কারা কষ্ট দিয়েছিল , তাদের নাম ফাঁস করে দেব । সব পুঁথি পেয়েছি । পুজোর সময় গরীবদের কাপড় দিতেন । প্রসাদ খাওয়াতেন । কোত্থেকে টাকা পেতেন , কে জানে’ !
১৭ এপ্রিল মারা যান জয়দেববাবু । তার মা বিমলাদেবী মারা যান তিনদিন পর ২০ এপ্রিল । এই তিনদিনে কি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছিল ? তার কাছ থেকে তো অনেক কিছু জানা যেত !
‘বাঁচানো ? দাদুর মাকে মেরে ফেলা হয়’।
বললেন কার্তিকবাবু । পুরী হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রেখেছিল । এখানকার লোকেরা চেঁচামেচি করায় তাকে কটক মেডিকেল কলেজে সরিয়ে দেওয়া হয় , কী না, সেখানে ভাল চিকিৎসা হবে’ ।
চার

‘আনন্দময়ী আশ্রমের তপন মহারাজ বললেন, জয়দেব মুখোপাধ্যায় খুন হয়েছিলেন । খুন হওয়ার দিনই আগরতলা , হরিদ্বার , উত্তর কাশী , কংখল – সব আশ্রমেই খবর গেছিল । আশ্চর্য , কেউ আর যোগাযোগ করেনি ।’

তপন মহারাজ অরফে গোপালানন্দ ওরফে তপন ব্যানার্জি । কলকাতার বরানগরের ছেলে । অনাথ । সাধুসঙ্গে পড়ে আনন্দময়ী মার শিষ্য । উত্তর কাশীর আশ্রম তিনিই দাঁড় করিয়েছেন । ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পুরীর আশ্রমের দায়িত্বে তিনি । সংস্কারের কাজ চলছে । জয়দেববাবুর ঘর দুটো বন্ধ ।
তপন মহারাজ বললেন, আমাকে এখানে আসার আগে বলা হয়েছে, ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না । অথচ ১৯৭৫ সাল থেকে জয়দেববাবু এই আশ্রমের দায়িত্বে । আমাকে বলা হয়েছে তিনি শিষ্য ছিলেন না । অথচ এই আশ্রমের দায়িত্বে তিনিই ছিলেন । এবং সেটা মার নির্দেশে ।
১৯৯৬ সালের ২৯ অক্টোবর । তখন দুপুর । কথা বলতে বলতে তপন মহারাজ দরজা বন্ধ করে দিয়ে এলেন । বললেন ১৯৮২ সালে মা এখানে আসেন । মা ওনাকে স্নেহ করতেন । জানতেন উনি পণ্ডিত , ভাষাবিদ । ওনার গবেষণার বিষয় চৈতন্যের অন্তর্ধান । মা কিন্ত নিষেধ করেছিলেন । বলেছিলেন, ‘যা বলছ, তা হয়তো ঠিক । কিন্ত মনে হচ্ছে বিপদে পড়বে । এতদিন যখন কেউ কিছু করেনি , তুমি একা কেন বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছ ?’
এসব শোনার পর কংখলে ফোন করি । স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয় যে জয়দেববাবু আশ্রমের কেউ ছিলেন না।
আশ্রমের কেউ নন অথচ ২০ বছর ধরে আশ্রমের সেক্রেটারি ! সাগর তীরে আশ্রমের জমি পাণ্ডারা দখল করবে বলে লড়াই করছেন ?
বালানন্দ তীর্থাশ্রম । ভারপ্রাপ্ত কর্তার নাম গোকুলানন্দ । দেওঘরে ছিলেন । কংখলে আনন্দময়ী মাকে দেখেছেন । ইংরেজি , হিন্দি , বাংলা , ওড়িয়া ভালো বলেন । পুরীতে এর আগে বছর কয়েক থেকে গেছেন । ফের এসেছেন ১৯৯৫ সালের এপ্রিলেই । জয়দেববাবুর প্রসঙ্গ তুলতেই – ‘ও সেই ভদ্রলোক ! শুনেছি বটে চৈতন্য নিয়ে কি সব কাজ করছিলেন । ছেলেবেলায় শুনেছি, সমুদ্রের জলে মিলিয়ে গেছেন । আত্মহত্যা । বড় হয়ে নতুন করে জানলাম পাণ্ডারা খুন করেছিল । আমরা ধর্মকর্ম নিয়ে থাকি । এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না । জয়দেববাবু তো গৃহী ছিলেন । দুর্ঘটনায় মারা গেছেন’ ।
দুটো আশ্রমের মধ্যে দূরত্ব দশ মিনিটের হাঁটা পথ । যা নিয়ে সে সময়ে পুরী তোলপাড়, তা নিয়ে গোকুলানন্দের নিরাসক্ত এবং ‘গৃহী’ মন্তব্যটির মধ্যে যে খোঁচা, তা গভীর চক্রান্ত এবং পরিকল্পিত খুনের ইঙ্গিত দেয় নাকি ?
পাঁচ












































জয়দেববাবু কলকাতার ভোলানাথ প্রকাশনীর সুরেশ দাস’কে লেখা শেষ চিঠিতে কিছুদিন ধৈর্য ধরার জন্য
 অনুরোধ করেছিলেন । তথ্যসূত্র – ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে (দ্বিতীয় খণ্ড) ।

ঝাড়গ্রামে গিয়ে দেখা করি ঝাড়গ্রাম বার্তার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র ভকতের সাথে । মায়ের শিষ্য । আনন্দময়ী মায়ের কথাতেই ‘কঁহা গেলে তোমা পাই’ ছেপেছেন । বললেন ‘জয়দেববাবু একবার এখানে অজ্ঞাতবাসে ছিলেন। সঙ্গে মা বিমলা । বেনারসের পাথু মহারাজ বলেছেন, ওনাকে খুন করা হয়েছে চৈতন্য গবেষণার জন্যই । সুরেশ তুমি আর পুরীতে যেও না’ । ছেলে চিত্তরঞ্জনের টাটা কলেজে পড়ে । গেছিল পুরীতে । তখন জয়দেববাবু মারা গেছেন । ভারত সেবাশ্রমের মহারাজ চিত্তকে বলেছিল বাবা যেন এদিকে না আসে ।
সুরেশবাবু বললেন, অনেক প্রাচীন পুঁথি আর দ্বিতীয় খণ্ড বইয়ের পাণ্ডুলিপি মে মাসেই আমাকে দেবেন বলেছিলেন । বলতেন গৌরস্তম্ভের তলায় চৈতন্যকে পুঁতে ফেলেছিল । অনেকেই ওনাকে উৎসাহ দিতেন । বেনারসে , কংখলে , ত্রিগুনা সেন , হরেকৃষ্ণ মহতাব আর রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজেরা তাকে উৎসাহ দিতেন।
শুনেছি জয়দেববাবুরা ঢাকার লোক । বাবা সি আই এস ছিলেন । নিজে কেন্দ্রীয় তথ্য দপ্তরে ছিলেন । বলতেন, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের পর সব পরিচয় জানিয়ে দেব।
অজ্ঞাতবাসের সময় ঝাড়গ্রামে সরস্বতী বৈজনাথ কেডিয়া স্কুলে থাকতেন । লালজলের কাছে জঙ্গলের কাছে একটি আশ্রমেও যেতেন ।
‘লালজল, জঙ্গলের মধ্যে এক দুর্গম আশ্রম । আদিবাসীরা আমাকে বলেছিল, এক সাধুবাবা বাগালদের প্রশ্ন করতেন, এইরকম কোন পাথর দেখেছ ?  কোন পাথরের কোনও চিহ্ন দেখেছ’?
শোনা যায় চৈতন্য এদিকে এসেছিলেন এবং পাথরের গায়ে নানারকম খোদিত চিহ্নও দেখা যায়। জয়দেববাবু ঝাড়গ্রামে কতটা কি পেয়েছিলেন জানা যায়নি । তবে সুরেশবাবুর কথায় এটা স্পষ্ট জয়দেববাবু যে খুন হয়েছেন, ভারত সেবাশ্রমের মহারাজ সেটা টের পেয়েছেন। আর পুরীতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও পাণ্ডুলিপির জন্য সুরেশবাবুকেও খুন করতে পারে তারা !
ছয়
সার্কিট হাউসে উঠেছিলাম । সেখান থেকে কোনওদিন কটকে যাই ডিআইজি ক্রাইমের সাথে কথা বলতে , কোনওদিন পুরীর এসপি । একদিন সার্কিট হাউসে ফিরে দেখি একজন পুলিস অফিসার আমার জন্যই অপেক্ষা করছেন। বললেন একটা বড় ভালো কাজে হাত দিয়েছেন । ঠিক পথেই এগোচ্ছেন । কলকাতার সিবিআই এর এসপি (স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ) লোকনাথ বেহরার সাথে কথা বলুন । ওর মা ক্ষুব্ধ । জয়দেববাবুর ভক্ত ছিলেন । এখানকার পুলিস আত্মহত্যা বলে চালাচ্ছে । আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যান । পরে সঙ্গে লোক নিয়ে আসবেন । একা ঘুরবেন না ।
পরদিন কটকে গিয়েই বুঝলাম , অজ্ঞাত পরিচয় পুলিস অফিসারটি ঠিক বলেছেন । আই জি ক্রাইম যিনি ঘটনার সময় পুলিসের এসপি ছিলেন, একজন ইন্সপেক্টরকে ডাকলেন । তিনি আমার প্রশ্ন না শুনেই বললেন, ওটা তো আত্মহত্যা । ডিসেম্বরে ফাইল ক্লোজ করে দেওয়া হয়েছে ।
– আত্মহত্যা কেন করবে ?
-টাকার অভাব । পাস বইয়ে দেখলাম, টাকা তেমন ছিল না । তাছাড়া ঐ ভদ্রমহিলার সঙ্গে তো অবৈধ …
-আত্মহত্যা যিনি করেছেন তার হাত পিছন থেকে বাঁধা !
১৯৯৬ সালের অক্টোবরে যিনি আই জি ক্রাইম ছিলেন তিনি এবার বেশ ক্ষুব্ধ ! ‘আপনার এ নিয়ে এত মাথাব্যাথা কেন ? ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর রত্নাকর দাস বডি দেখে এটাকে আত্মহত্যা বলেছেন । কয়েক বস্তা বই , পুঁথি , রঙ্গনাথ মিশ্রকে লেখা চিঠি পেয়েছি ; দেখি কি করা যায়’।
কটক মেডিকেল কলেজের ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডঃ রত্নাকর দাস বললেন, ‘দেহ আমি দেখিনি’। কয়েকটা ছবি আমাকে দেখানো হয়েছিল । আত্মহত্যা আমি বলিনি । আমি এখানে থাকি । চাকরি করি । যা বলার তাই বলেছি’ । 
সাত
ধরে নিলাম, বিমলাদেবী জয়দেববাবুর মা নন । ধরে নিলাম, পিছন দিকে হাত বেঁধে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে মুণ্ডিতমস্তক সন্ন্যাসী জয়দেববাবু চৌবাচ্চার জলে মাথা ডুবিয়ে আত্মহত্যা করেছেন । কিন্ত সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এবং কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রঙ্গনাথ মিশ্র এবং রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠি, ২৫ বছরের পরিশ্রমে আবিষ্কৃত দুর্লভ পুঁথি , জয়দেববাবুর পাণ্ডুলিপি হজম করার অধিকার পুলিসকে কে দিল ?
১৯৭৬ সালের ৫ ই আগস্ট জয়দেববাবুকে লেখা ডঃ নীহাররঞ্জন রায়ের চিঠিতে আছে,
‘চৈতন্যদেবকে গুম খুন করা হয়েছিল পুরীতেই এবং চৈতন্যদেবের দেহের কোন অবশেষের চিহ্নও রাখা হয়নি কোথাও। এবং তা হয়নি বলেই তিনটে কিংবদন্তী প্রচারের প্রয়োজন হয়েছিল । …এই বয়সে শহীদ হবার ইচ্ছে নেই বলেই বলতে পারবো না ঠিক কোথায় চৈতন্যকে খুন করা হয়েছিল’ ।
আর তা বলতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত জয়দেববাবু জীবন দিলেন । ১৫৩৩ সালে চৈতন্য , ১৯৯৫ সালে জয়দেব । এর কোনও প্রতিকার নেই ? পৃথিবী কি একবিন্দু এগোয়নি ?

উপরের আর্টিকেলটার সমস্ত স্বত্বাধীকারি হল আজকাল পত্রিকা এবং লেখক তথা অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক অরুপ বসু। কালের ধ্বনি কোনভাবেই এই লেখার কোনরকম স্বত্ব দাবী করেনা । জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু সম্পর্কিত একমাত্র প্রামাণ্য লেখা এবং মূল সোর্স হিসেবে , কুড়ি বছর আগে প্রকাশিত শারদীয় আজকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এই লেখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল। অরুপ বসুই একমাত্র সাংবাদিক যিনি সেসময় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে খোদ পুরীতে গিয়ে ঘটনাটা কভার করেছিলেন ; যার জন্য তাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই ।  

সত্যি বলতে কি , প্রবন্ধটা পড়ে কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয় । গোটা ঘটনাটাকে অন্তঃকরণ করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে ।
জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে বোলপুরে । সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন ; বাবা এবং দাদামশাই , দুজনেই ছিলেন বিচারপতি। দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায় তার বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন যে জয়দেববাবু ছিলেন আই.সি.এস পিতার একমাত্র সন্তান । তিনি প্রাচ্য দর্শনের উপর ডক্টরেট করেন এবং ভারতীয় সভ্যতার শেকড় খুঁজতে একসময় এশিয়ার বহু দেশে ঘুরেছিলেন । শিবের ঐতিহাসিকতা বিষয়ে গবেষণা করার জন্য বহুবার প্রাণ বিপন্ন করে কৈলাসের মানস সরোবর এবং সংলগ্ন বরফে ঢাকা পাহাড়ের আনাচে কানাচে খুঁজে বেড়িয়েছেন । একাধিক ভাষা জানতেন এবং প্রাচীন সাহিত্য , সংস্কৃত এবং শাস্ত্রজ্ঞানের জন্য তিনি একাডেমিক সার্কেলে অত্যন্ত পরিচিত ছিলেন সেসময় । জগন্নাথদেবকে নিয়ে তার লিখিত বইগুলো এখনো বেস্টসেলার । কিছু বই অবশ্য এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়না , কিছু তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি । ভদ্রলোক সমস্ত সুখ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে একদমই সাধারন দীনহীনের মত জীবন যাপন করতেন । দুঃখের বিষয় হল , গোটা মানুষটার অস্তিত্বটাকেই আজ এমন ভাবে ‘ভ্যানিশ’ করে দেওয়া হয়েছে যে তার একটা ছবিও আর খুঁজে পাওয়া যায়না ইন্টারনেটে ! ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় প্রকাশক সুরেশ দাস ১৯৮৯ সালে কলকাতা থেকে লিখেছেন যে ১৯৭৮ সালে প্রথম পর্ব প্রকাশিত হবার পর কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসু এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ডঃ শান্তি কুমার দাশগুপ্তের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয় । জয়দেববাবুর সাথে পরিচয় হবার পরই এনারা এই বিষয়ে বই লিখেছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল , সুরেশ দাস সেই ১৯৮৯ সালে লিখেছিলেন যে ‘কাঁহা গেলে তোমা পাই’ এর দ্বিতীয় খণ্ড রচনা প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন জয়দেববাবু এবং এর জন্য তিনি বাংলা ও উড়িষ্যার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চৈতন্যের সমসাময়িক বহু প্রাচীন পুঁথিও আবিষ্কার করেছিলেন। এর বছর ছয়েক বাদে তার রহস্যমৃত্যু ঘটে । 

জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের লেখা তিনটি বিখ্যাত গ্রন্থ (কাঁহা গেলে তোমা পাই , দারুব্রহ্ম রহস্য এবং ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে )

তার মৃত্যুর পর বেশ কিছু গুজব রটানো হয়েছিল । পুলিস বলেছিল আত্মহত্যা আবার কেউ কেউ দাবী করেছিলেন যে মন্দিরের জমি সংক্রান্ত বিবাদের কারণেই তাকে খুন করা হয় । একটা ব্যাপার খুব আশ্চর্যজনক যে এরকম একটা অসাধারণ মানুষ, বহুবার হুমকি পেয়েও কেন তার বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের একাধিক পাণ্ডুলিপি বানিয়ে যান নি ?
এই নিয়েও কিছু গল্প প্রচলিত আছে । দু-একজন দাবী করেছিলেন যে জয়দেববাবু নাকি একাধিক পাণ্ডুলিপি আলাদা আলাদা ভাবে কপি করে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে তার ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষকে পাঠিয়ে যান । আবার কেউ বলে যে পাণ্ডুলিপি সহ সমস্ত প্রাচীন পুঁথি এখনো সিবিআই কিম্বা উড়িষ্যা পুলিসের গোপন লকারে জমা করা আছে । কেউ বলে সেই পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া কয়েকটা পাতা বহুদিন বাদে পুরীর সমুদ্রসৈকতে পাওয়া গিয়েছিল । আবার একজন সাংবাদিককে ফেসবুকে দাবী করতে দেখলাম যে এই বইটা আজও ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট হিসেবে ভুবনেশ্বর মিউজিয়ামের ভল্টে রাখা আছে। জয়দেববাবু সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য অন্য শিরনাম ব্যবহার করে বইটা লিখেছিলেন । তবে এই নিয়ে বিশদে কিছু বলা সম্ভব নয় কারণ পুরোটাই কিংবদন্তী বা মিথের মত ভেসে বেড়ায় ! জয়দেববাবুর মৃত্যুর খবর – যুগান্তর পত্রিকা ( আনন্দময়ী আশ্রমে রহস্যজনক মৃত্যু – ১৯.৮.১৯৯৫) , The Telegraph (Diary entry hints at dispute over property : New Twist to Puri Death – 30.4.1995) এবং The Statesman (Death of two ashram-dwellers baffle Police in Puri – 28.4.1995) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । আগ্রহীরা খুঁজে দেখতে পারেন । আমি এত পুরনো পেপার জোগাড় করতে পারিনি ।
জয়দেববাবুর মৃত্যুর বছর পাঁচেক বাদে ২০০০ সালের ১৫ই জুন (তারিখটা দুচারদিন আগে পরে হতে পারে । জোর দিয়ে কেউ বলতে পারেনি)  , আনন্দবাজার পত্রিকার পাঁচ নম্বর পাতায় একটা খবর প্রকাশিত হয়েছিল । সেখানে লেখা ছিল যে ASI জগন্নাথ মন্দিরের সংরক্ষণ করার সময় মন্দির গাত্রের এক প্রাচীরের মধ্যে থেকে একটা/দুটো কঙ্কাল উদ্ধার করেছে । এরপর কঙ্কালটাকে/ কঙ্কালগুলোকে ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবেও পাঠানো হয়েছিল । কিন্ত খুব আশ্চর্যের কথা হল , এরপর কোন প্রভাবশালী মহল থেকে পুরো ঘটনাটাকে চেপে দেওয়া হয় । এরপর আর সেই কঙ্কালের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি ! আমি ASI এর Annual Report পড়ে দেখেছি যে ১৯৯৯ সালে জগন্নাথ মন্দির কর্তৃপক্ষ ASI’এর কর্মীদের সত্যিই মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করে Measure Drawing করার অনুমতি দেয় এবং ২০০০ সালে জগন্নাথ মন্দিরের বেশ কিছু অংশ সংরক্ষণও করা হয়েছিল । ২০০০ সালের জুন মাসের আনন্দবাজার পত্রিকাগুলো কারোর কাছে থাকলে খুঁজে দেখতে পারেন , আমি জোগাড় করতে পারিনি । গোপালকৃষ্ণ রায়ের লেখা -জ্ঞাননৌকা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বইতেও ঘটনাটার উল্লেখ আছে । এই প্রসঙ্গে গবেষক এবং অধ্যাপক তমাল দাশগুপ্তের সাথে আমার দিন কয়েক আগেই কথা হয়েছিল । তমালদাই প্রথম দীর্ঘ গবেষণা করে ‘চৈতন্য হত্যার অনুসন্ধানে‘ নামে একটা অসাধারণ প্রবন্ধ লেখেন , যার পর বাঙালি নেটিজেনদের মধ্যে এই বিষয়ে আবার নতুন করে আগ্রহ জন্মায় । তমালদা বলছিলেন, সেসময় কঙ্কালের খবরটা বেশ কয়েকটা সংবাদপত্রে ছাপা হয় এবং আজ থেকে সাত-আট বছর আগেও নেটে এই নিয়ে সার্চ করলে একটা আর্টিকেল পাওয়া যেত । উনি নিজেই দেখেছেন ! কিন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার মাঝে কোন একটা সময়ে ইন্টারনেট থেকে সেটা সরিয়ে নেওয়া হয় । ঘটনাটার পর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের যিনি স্থানীয় অধিকর্তা তাকেও সেদিনই বদলি করে দেওয়া হয় কেরালায় । দুটো কঙ্কালের মধ্যে একটার আকার ছিল দীর্ঘ ; প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের মত এবং অপর কঙ্কালটার আকার ছিল ছোট । তবে কি ছোট কঙ্কালটা স্বরুপ দামোদরের ? উত্তর দেওয়ার কেউ নেই । হয়তো এতদিন বাদে আর উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভবও নয় ।
এই প্রসঙ্গে আরেকটা ভীষণ আশ্চর্যজনক তথ্য দিয়ে লেখাটা শেষ করি । সাংবাদিক অরুপ বসু লিখেছেন যে জয়দেববাবু ঝাড়গ্রামের লালজল জঙ্গলে পাথরের উপর চিহ্নের খোঁজে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতেন দিনের পর দিন । সাম্প্রতিককালের চৈতন্য গবেষক তুহিন মুখোপাধ্যায়ও কিন্ত তার বই ‘ চৈতন্যের শেষ প্রহর’ বইতে উড়িষ্যার চুরঙ্গগড় /সারঙ্গগড় দুর্গের পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে এমনই এক পাথুরে সাঙ্কেতিক লিপির উল্লেখ করেছেন । সিদ্ধেশ্বর মন্দিরের পিছনের দুর্গম অরণ্যের মধ্যে এক পাথরের উপর কিছু সাঙ্কেতিক লিপি এবং প্রাচীন এক অজ্ঞাতপরিচয় সাধকের সমাধির উল্লেখ আছে । তুহিন বাবু তার লেখায় তৎকালীন সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করে যুক্তি দিয়েছেন সে সময়ের ধর্মভিরু হিন্দুদের পক্ষে খোদ মন্দির প্রাঙ্গনেই সচল জগন্নাথকে হত্যা করাটা বেশ অস্বাভাবিক শোনায় । তাছাড়া মন্দিরের মাদলপঞ্জিতেও সে সময় মন্দির শুদ্ধিকরণেরও কোন উল্লেখ পাওয়া যায়না । তাই হয়তো শ্রী চৈতন্য নিজেই কোন গুপ্তপথে মন্দির থেকে বেরিয়ে আসেন কিম্বা বিগ্রহ দর্শনের পর তার প্রবল উত্তেজনায় যে ভাবসমাধি হয়েছিল তার সুযোগ নিয়ে গোবিন্দ বিদ্যাধর ও তার দলবল নদীপথ বেয়ে পার্শ্ববর্তী দুর্গম চুরঙ্গগড় (Chudanga Gada) দুর্গে এনে তাকে বন্দী করে রাখে । মনে রাখতে হবে যে এই গোবিন্দ বিদ্যাধরই কিন্ত কয়েকবছর বাদে ঘৃণ্য চক্রান্ত করে রাজা প্রতাপরুদ্রের সমস্ত বংশধরদের হত্যা করে উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেছিল। তবে কোন আশ্চর্য কারণে তুহিনবাবু , মন্দির চত্বর থেকে পাওয়া কঙ্কালের খবরটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেন নি তার বইতে।

নন্দনকাননের (প্রাচীন চন্দকা অরণ্য) উত্তরে গহন জঙ্গলের মধ্যে স্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত সেই চুরঙ্গগড় /সারঙ্গগড় দুর্গ যার কথা তুহিনবাবু তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। চৈতন্যের সময় এই দুর্গ ছিল গোবিন্দ বিদ্যাধরের অধীনে এবং প্রাচী নদীর মোহনা থেকে কাকতপুর হয়ে জলপথে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এখানে পৌঁছানো সম্ভব ছিল  ।

এছাড়া সাম্প্রতিক কালের চৈতন্য গবেষক স্নেহাশিস মুখার্জিও তার লেখায় (তারেই খুঁজে বেড়াই) এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন । তিনি নিজে পুরীতে গিয়ে গবেষণা করে বলেন  যে জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ দ্বারের দিক থেকে একটা গুপ্তপথ এসে শেষ হয়েছে বাসুদেব সার্বভৌমের বাড়ি বা বর্তমান গঙ্গামাতা মঠ । এখনো এই সুরঙ্গ পথের অস্তিত্ব আছে । তিনি এর ছবি দিয়েছিলেন তার ফেসবুক পোস্টে । ভদ্রলোক এই বিষয়ে অনুসন্ধান করে এখন অব্দি ঊনিশটা পর্ব লিখেছেন ।
তবে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , ডঃ নীহাররঞ্জন রায় , নির্মল নাগ , ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায় ,  যুধিষ্ঠির জানা (মালীবুড়ো) , ডঃ দীপক চন্দ্র , দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায়ের মত অসংখ্য গবেষক সরাসরি দাবী করেছিলেন যে নীলাচলেই চৈতন্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার মৃতদেহ খুব গোপনে সমাধিস্থ করা হয়েছিল যা এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি । সত্যি বলতে কি , প্রত্যক্ষ প্রমানের অভাবে আজকে এই সমস্ত দাবীগুলোর সত্যতা নিরূপণ করা প্রায় অসম্ভব । তাই Circumstantial Evidence এবং Inductive Reasoning এর ভিত্তিতে সত্যান্বেষণ করা ছাড়া উপায় নেই । জোরালো প্রমান হয়তো পাওয়া সম্ভব ছিল যদি সেই কঙ্কালের ডিএনএ টেস্ট করা যেত কিম্বা মুরারি গুপ্ত , বৈষ্ণবদাস , স্বরুপ দামদর বা বৃন্দাবন দাসের লেখার হারানো অংশগুলো খুঁজে পাওয়া যেত যেগুলো জয়দেববাবু উদ্ধার করেছিলেন । কে বলতে পারে , হয়তো ‘কাঁহা গেলে তোমা পাই’ এর দ্বিতীয় পর্বটা এখনো অন্ধকার ঘরের কোন ধুলোমাখা আলমারির কোনায় অবহেলায় অনাদরে পড়ে রয়েছে ! শুনেছি জয়দেববাবুর জন্ম বোলপুরে । ঐ অঞ্চলের কেউ খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন ওনাদের বাড়িটা এখনো রয়েছে কিনা ।
আসলে একটা বিষয় ভেবে আমার খুব অবাক লাগে যে বাংলার ইতিহাসের দুই যুগনায়ক , যারা বাংলার সমাজজীবনে বিপ্লব নিয়ে এসেছিলেন সেই – শ্রী চৈতন্য এবং সুভাষচন্দ্র বসু , দুজনের মৃত্যুই কি অদ্ভুত রহস্যের মোড়কে জড়ানো । ইতিহাসের কি আশ্চর্য সমাপতন না ! হয়তো এই জন্যই একজন বাঙালি হিসেবে এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি এই বিষয়ে ।
মাস খানেক আগে ঠিক এই কথাগুলোই হচ্ছিল নিজের বন্ধু সার্কেলে । এমবিএ’র সহপাঠী অরিজিতের সাথে আমার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় । অরিজিতের পদবী পাত্র । শেকড় উৎকলে হলেও গত কয়েক প্রজন্ম ধরেই বাংলার বাসিন্দা এবং একজন খাঁটি বাঙালি তথা যদুবংশীয় (JU) । অরিজিতকে এই রহস্যমৃত্যুর কথা বলতেই ও প্রথমে কিছুক্ষণ থমকে গেল । তারপর দ্বিধা কাটিয়ে বলল যে পুরীতে আমাদের পরিবারের পাণ্ডারা অন্তত ১৫-২০ প্রজন্ম ধরে ওখানেই বাস করছে । বর্তমানে যিনি পাণ্ডা , তিনি ছোটবেলায় ওকে এরকমই এক ঘটনার কথা বলেছিল । সেই পাণ্ডাও নিজে বংশপরম্পরায় এই হত্যার ঘটনাটা শুনে আসছে । ছোটবেলায় ও ঘটনাটার গুরুত্বটা বুঝতে পারেনি , কিন্ত আজকে বহুবছর বাদে আবার শোনার পর পুরো ঘটনাটা কানেক্ট করতে পারল । ওর মুখ থেকে শোনার পর আমার শরীরে একটা মৃদু শিহরন খেলে গেছিল সেদিন !
সেদিনই ঠিক করেছিলাম এই ঘটনাটা নিয়ে লিখব । জয়দেববাবুকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ।  সে সময় ইন্টারনেট ছিলনা ,  সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না । কিন্ত আজকের পৃথিবীতে মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মত ইনফরমেশন আমাদের আঙুলের ছোঁয়ায় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যায় । যে বা যারা সত্যিটাকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তারা হয়তো সেদিন বোঝে নি যে একজন জয়দেব মুখোপাধ্যায়কে চুপ করিয়ে দিলেও ভবিষ্যতে তার জায়গায় আরো দশজন বাঙালি আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসবে একদিন । সত্যিটাকে বেশিদিন চেপে রাখা যায়না । একদিন না একদিন সে প্রকাশ পাবেই ।
আজকের মত এটুকুই । ভালো থাকবেন ।

পুনশ্চ – ১। জয়দেব বাবুর কোন ছবি বা পুরনো পেপার কাটিংগুলো থাকলে, ফেসবুকে পোস্ট করে স্থাপত্যকে ট্যাগ করে দিতে পারেন । এই নির্ভীক জ্ঞানতাপসকে এভাবে ভুলে গেলে জাতি হিসেবে আমরা এক ক্ষমাহীন ভুল করব ।
২। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক ডঃ নীহাররঞ্জন রায়ের ৫/৮/১৯৭৬ তারিখে জয়দেববাবুকে লেখা চিঠির মূল বয়ানটা ছিল এরকম-
” শ্রী মহাপ্রভু চৈতন্যদেবকে গুমখুন করা হয়েছিল পুরীতেই এবং সন্ন্যাসী চৈতন্যদেবের দেহের কোন অবশেষের চিহ্নও রাখা হয়নি কোথাও। এবং তা হয়নি বলেই তিনটে কিংবদন্তী প্রচারের প্রয়োজন হয়েছিল । ঐ গুমখুনের সমস্ত ব্যাপারটাই একটা বহুদিনের চিন্তিত , বহুজন সমর্থিত চক্রান্তের ফল । কে বা কারা ঐ চক্রান্ত করেছিল সে সম্পর্কে আমার অনুমান একটা আছে কিন্ত তা বলতে পারব না । কারণ এখনও আর কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই । চৈতন্যদেব , গান্ধী martyr হতে পারেন, আমার martyr হবার বিন্দুমাত্র বাসনা নেই ।”
– তথ্যসূত্র –  শ্রীচৈতন্য অনন্ত জীবনের সত্যান্বেষণ (দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়) , পৃষ্ঠা – ৩১৫
৩। দীর্ঘ ৫০০ বছর ধরে ধামাচাপা দিয়ে রাখা এই সত্যিটা সমস্ত বাঙ্গালির জানা উচিত ।

চৈতন্যের রহস্যমৃত্যু বিষয়ে জানতে যে লেখাগুলো পড়তে পারেন :
২। বই – কাঁহা গেলে তোমা পাই (ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়) ,চৈতন্যের শেষ প্রহর (তুহিন মুখোপাধ্যায়) , ক্ষমা কর হে প্রভু (রুপক সাহা) , শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য – যুধিষ্ঠির জানা (মালীবুড়ো) , সচল জগন্নাথ শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য (ডঃ দীপক চন্দ্র) , জ্যেতির্ময় শ্রীচৈতন্য (কালকূট – সমরেশ বসু) , চৈতন্য শেষ কোথায় ? (রজত পাল) , শ্রী চৈতন্যের দিব্যজীবন এবং অজ্ঞাত তিরোধান পর্ব (বিষ্ণুপদ পাণ্ডা) , গোরা (শৈবাল মিত্র) , শ্রী চৈতন্য অন্তর্ধান রহস্য (দেবাশিস পাঠক) , শ্রীচৈতন্য অনন্ত জীবনের সত্যান্বেষণ (দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়)
এছাড়া কিছু বই আছে যেগুলো নিষিদ্ধ কিম্বা আউট অফ প্রিন্ট যেমন – ইতিহাসে শ্রীচৈতন্য (অমূল্য চরণ সেন)

Featured Image এর ছবিটা এঁকেছেন – অনিকেত মিত্র

Thursday, July 25, 2019

গুজব আর অন্ধবিশ্বাসে বেড়ে ওঠা এক জাতি

আমাদের একটা পুরনো ঐতিহ্য আছে; বলতে পারেন এটা আমাদের একটা অর্জনও। “হুজুগে বাঙ্গালী”- শব্দটার সাথে আপনারা অনেকেই কম-বেশী পরিচিত। আমাদের পূর্বপুরষরাও সে ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করে রেখেছিলেন- তাদের কর্মের মাধ্যমে। বাংলায় আমাদের একটি অতি পরিচিত শব্দ আছে- “গুজব” যার ইংরেজীতে অর্থ অনেক- Rumor, Idle Gossip, Bruit এরকম। এসব শব্দকে বিভিন্ন দেশের ভাষাভাষিরা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করলেও এর মূলকথা- “গুজব”। গুজবের ইতিহাস অনেক পুরনো- সেই অন্ধকারের সময় থেকেই গুজবের জন্ম। কিন্তু সেসব ইতিহাসে আমার অত বেশী আগ্রহ নেই। আমরা বরংচ আমাদের গুজবের সভ্যতা আর ইতিহাসকেই একটু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

আসুন, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দিয়েই শুরুটা করা যাক্। ৭১’এ এদেশে দুটো পক্ষ ছিলো; একদল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং অন্যদল স্বাধীনতার বিপক্ষে। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিলো তারা মূলত এদেশের মানুষের উপর পাকিস্থানের বর্বরতা-অত্যাচার আর স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেননি। আর অন্যদল চাচ্ছিলেননা যে- পাকিস্থান ভেঙ্গে যাক। কিন্তু যেহেতু তারা এ বিষয়টিকে এভাবে এদেশের সাধারন মানুষকে বোঝাতে অক্ষম ছিলেন; কারন তাতে সাধারন মানুষের মনে তাদের বিরুদ্ধে একটা বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে- তাই তারা বেছে নিলেন ভিন্নপথ। কি সেই পথ? তারা বিভিন্ন মসজিদে-মাদ্রাসায়-আলোচনায় এদেশের সহজ-সরল মানুষকে বোঝাতে (গুজব) শুরু করলেন যে- “যেহেতু দেশভাগ হয়েছে হিন্দু-মুসলিম জাতিভেদের ভিত্তিতে তাই অখন্ড পাকিস্থানই হলো ইসলামের প্রকৃত ধারক ও বাহক। আর পাকিস্তানের সাথে ভাগ হয়ে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের যুদ্ধ। এটা ইসলামকে খন্ডিত করে ফেলার একটা চক্রান্ত; একজন মুসলিম কখনই ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের এ যুদ্ধ সমর্থন করে না। এটা হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের একটা চক্রান্ত……..” এবং অদ্ভুদভাবে এদেশের একটা অংশের মানুষ সেই গুজবকে নিজের মস্তিস্কে ধারন করেই রইলেন। কিন্তু যেহেতু বিষয়টা ছিলো দেশের স্বাধীনতার-সার্বভৈমত্বের প্রশ্ন, লড়াইটা ছিলো অধিকার ছিনিয়ে আনার লড়াই; তাই দেশের একটা বিরাট অংশের মানুষ তাদের সেই গুজবকে উপেক্ষা করেও যুদ্ধে নেমে দেশকে স্বাধীন করেছিলো।
এবার স্বাধীনতাত্তর বাংলাদেশ যখন নুতন করে নিজের পায়ে দাড়াবে- সেই সময়ে একদল হত্যা করলো শেখ মুজিবকে। হত্যা করা হলো এদেশের বুদ্ধিজীবি আর প্রগতিশীল মানুষগুলোকে। সেখানেও তাদের গুজবই ভরসা। এলো সামরিক শাসন- এলো স্বৈরাচারী শাষন কিন্তু মানুষ চুপ করে আছে কেন? কারন, দেশকে পরানো হলো ধর্মের টুপি; এখানেও ভরসা গুজব। এই ৪৮ বছরে দেশের মানুষকে অন্ধের মতো হিংসাত্মক, কদর্য, বিদ্বেষমূলক মানসিকতায় অনেক গুজব বিশ্বাস করতে দেখা গেছে, যার ইতিহাস অসীম।
ভারতে রামমন্দির নির্মানের গুজবে এদেশের সংখ্যাগুরু মানুষদের একটা বিরাট অংশ পুড়িয়ে দিয়েছে নিজেদেরই প্রতিবেশী সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়ি; ধর্ষন করেছে প্রতিবেশীর স্ত্রী-কন্যাকে। গুজব ছড়িয়ে রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়েছে; নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে সে অঞ্চলের বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের। গুজবে বিশ্বাসী জনতা অন্ধ বিশ্বাসে নিরক্ষর রসরাজ দাসের নামে মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে, দল বেঁধে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসিরনগরের হিন্দু সংখ্যালঘুদের। গুজবে বিশ্বাসী বাবা-মা অন্ধ বিশ্বাসে ও প্রাপ্তির মোহে নিজের সন্তানকেও হত্যা করতে এতটুকু পিছপা হননি। গুজবে বিশ্বাসী আমরা চাঁদে দেখি সাইদী হুজুরকে। পিতলের গোপাল দুধ খায়, তন্ত্র-মন্ত্র-তাবিজ-কবচে বিশ্বাস এমনসব গুজবে বিশ্বাস করে ভারতীয় উপমহাদেশের একটা বিরাট অংশের মানুষ। সেসব ইতিহাসের পান্ডুলিপি অনেক বড়; এক জীবনে এটা পড়ে শেষ করা যাবে না।

২০১৩ সালের ৫ মে’র কথা মনে আছে আপনাদের। মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্ররা জানতোই না নাস্তিকরা কি করেছে? কি বলেছে? কিন্তু ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতের গুজবে তারা তান্ডব চালিয়ে পুরো দেশ যখন অচল করে দিয়েছে; তখন তাদের উচ্ছেদের ঘটনাকেও গুজব হিসেবে ছড়ানো হয়েছে- “মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে”। যে হেফাজত বায়তুল মোকাররমের বারান্দায় কোরআন পুড়িয়ে গুজব ছড়িয়েছে “সরকার কোরান পুড়িয়েছে”। এরকম আর কত গুজবের ঘটনা শুনবেন আপনারা? কারন, অন্ধ আর বধিরের সমাজে বদমায়েশদের গুজবই শেষ ভরসা। বদমায়েশরা জানে কি করে সাধারন আর সহজসরল মানুষের মগজে গুজব ঢুকিয়ে দেয়া যায়!
আমাদের দেশে এখন গুজবের মহামারি চলছে। গুজবে ছড়ানো হচ্ছে- ব্রিজ তৈরিতে মানুষের মাথা চাই। গুজব ছড়িয়ে মূল হত্যাকারী ফাসিয়ে দিচ্ছে অসহায় মিন্নিদের। ছেলেধরা গুজব রটিয়ে প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে মারছে অসহায় আর নিরপরাধ মানুষকে। সাধারন মানুষ আজ আর নিরাপদ নয় এই সমাজে; বাবা-মা ঘরে ফিরতে পারবে কিনা তাঁর কোন নিশ্চয়তা নেই। প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ পিটিয়ে মারছে মানুষকেই। আর সে একজন-দুজন নয় সবাই যেন সংঘবদ্ধ। কোন মানবিকতা নেই! কিন্তু আচ্ছা আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন একটা জাতি এভাবে “গুজবে জাতিতে” কিভাবে পরিনত হলো? সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কখনো প্রশ্ন তুলেছেন- আমাদের কেন অন্ধকার থেকে আর ফেরা হলো না? 

কারন, আপনারা বিজ্ঞানহীন শিক্ষা তুলেফেলে সেখানে এনেছেন ধর্মীয় মাদ্রাসা শিক্ষা। যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রয়োজন ছিলো উন্মুক্ত পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার তখন আপনার করেছেন মাদ্রাসা। যে বয়সে একজন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করা প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ, তখন আপনার তাদের করেছেন ধর্মীয় মতান্ধ। যখন প্রয়োজন ছিলো বিজ্ঞান বিতর্কের তখন আপনারা খোলা মাঠে, রাস্তায় হাজারো মাইক দিয়ে করেছেন মাহফিল। যখন প্রয়োজন ছিলো কো-এডুকেশনের ব্যবস্থাকরা তখন আপনাদের মগজে জেঁকে বসেছে “নারী মানে তেতুল”। অভিজিৎ রায়ের মত মানুষকে হত্যা করার জন্য মৌলবাদীরা তখন প্রকাশ্যে হুংকার দিয়েছে “নাস্তিকদের কতল করা ওয়জিব হয়ে গেছে”। মানুষের মধ্যে জাতীভেদ, সাম্প্রদায়ীকতা, অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, ক্রোধ, হিংসা ও বিদ্বেষের এ বৈষম্যমূলক সমাজ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আপনাদের প্রচ্ছন্ন মদদে আর ধর্মভিত্তিক ভূখন্ড গড়ার সুপ্ত বাসনাই আজকের এ অস্থির সমাজের জন্ম দিয়েছে। আপনারা চেয়েছিলেন শুধু একটা ধর্মীয় রাষ্ট্র; সেটাতো করেছে! কিন্তু সেই রাষ্ট্রের মানুষগুলোকে মানবিকতা আর মূল্যবোধ শেখানোর প্রয়োজন কখনোই অনুভব করেননি তাই সভ্য আর বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিকও সৃষ্টি হয়নি। হেফাজতের নির্দেশে আপনারা পাঠ্যপুস্তক থেকে বিজ্ঞান, বিবর্তনবাদ আর সংস্কৃতিকে তুলে দিয়ে আপনার কি আশা করেন; এদেশে আইনস্টাইন আর ব্রুনো জন্মাবে?

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আজ আর কান্না করে কোনই লাভ নেই; বরংচ সত্যিই যদি এর থেকে বেড়িয়ে আসতে চান তবে সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পাঠিয়ে বিজ্ঞান আর বিবর্তনের শিক্ষা দিন। তাকে মানবিক করে গড়ে তুলতে আপনাকেও অনেক অবদান রাখতে হবে। আপনাকে দেখে এতদিন যা-যা শিখেছে আপনার সন্তান; আজ থেকে-এখন থেকেই অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতা এসব আপনার কাছ থেকেই শিখুক আগামী প্রজন্ম।

ব্রুনোর কথা মনে আছে তো আপনাদের?

১৬০০ সালের ২০ জানুয়ারি পোপ ৮ম ক্লেমেন্ট ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী বলে রায় দিয়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রোমের কেন্দ্রীয় বাজার Campo de’ Fioriএ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে সবার সামনে খুঁটির সাথে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- “এই মহাবিশ্বের মতো আরো মহাবিশ্ব আছে, পৃথিবী গোল, সূর্য এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং এটি একটি নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু নয়”- এই ধারণা পোষণ করা। এভাবেই ‍গুজবে বিশ্বাস করে হত্যা করা হয়েছে কত মহামানবদের, তার হিসেব নেই। যে দেশ আর সমাজ একদিন ব্রনোকে হত্যা করেছিল তারাই জ্ঞানের আলোতে এসে স্বীকার করেছিলো ব্রুনোই ঠিক; সেদিন তারা ভুল ছিলো! 

ব্রুনোকে যারা হত্যা করেছিল তারা তো একদিন সভ্য হয়ে স্বীকার করেছে ব্রুনোকে হত্যা ছিলো তাদের ভুল! আপনারা কবে স্বীকার করছেন, “গুজব” ছড়িয়ে এভাবে সাধারন মানুষ, হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ, অনন্ত, দীপনদের… হত্যা ছিলো আপনাদের ভুল?

লিখেছেন: কাজল ‍কুমার দাস, ব্লগার ও প্রাবন্ধিক
(প্রথম প্রকাশ ২৪ জুলাই ২০১৯- মুক্তমনা ব্লগ)


নারী-শিশু নির্যাতন; ধর্মান্ধতা আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি

সমাজ নামক এই কূপমুন্ডক সামাজিক সংস্কারে বাস করা নির্যাতিত মানুষ সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে ভেবে ধর্ষণের শিকার হলেও মুখ খোলেন না। বেশির ভাগ মানুষেরই এই দশা। এছাড়া ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়ার দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রিতা ও পুরুষতান্ত্রিক হয়রানির কারণে ধর্ষণের শিকার অনেক নারীই শেষব্দি আর কোন অভিযোগ করতে ভরসা পান না।
পূর্নিমা শীলকে চেনেন তো আপনারা? ভোলার পূর্নিমা শীল! এদেশের সংখ্যাগুরুদের বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়েছিলো এই মেয়েটি। দলবেঁধে পালাক্রমে যাকে ধর্ষন করা হয়েছিলো। যার মা সেদিন অনুনয় করে ধর্ষকদের বলেছিলো “বাবারা তোমরা একজন একজন করে করে যাও, ও ছোটতো পারবে না…”। শুধু পুর্নিমাই নয় সেবার এরকম হাজারো পূর্নিমা ধর্ষিত হয়ে দেশত্যাগ করেছিলো।

তনুকে মনে তনুকে মনে আছে আপনাদের? কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপ থেকে এই কলেজছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সেনানিবাস চেনেন তো আপনি, কখনো গেছেন? যেখানে ব্যানেট আর বুটজুতার দাপট চলে! ওইসব জায়গাতে! পুরো এলাকাটায়ই কেমন একটা গা ছমছমে অবস্থা। একটি পর্দাশীল মেয়েকে সেখানে হত্যা করা হলো কি করে? তনু কিন্তু উশৃঙ্খল ছিলো না বরংচ হিজাব পরা, নাটক-থিয়েটার করা ভদ্র মেয়ে। আজ প্রায় তিন বছর কেটে গেল তবুও হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এমনকি এ মামলার আসামিও শনাক্ত হয়নি। আর হবেইবা কি করে, কার সে সাধ্যি আছে?

একইভাবে ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি৷ ২০১৯ এর ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত। নুসরাত এর ভাষ্য মতে সেখানে হাত মোজা, পা মোজাসহ বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। সে অস্বীকৃতি জানালে গায়ে কেরোসিন জাতীয় পদার্থ ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় তারই সহপাঠি আর মাদ্রাসার লোকজন। ১০ এপ্রিল ২০১৯ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নুসরাতের মৃত্যু ঘটে। ফেনীর নুসরাতের পর রাজধানীর মুগদার হাসি। একজন মাদ্রাসাছাত্রী, অপরজন গৃহবধূ। দুজনই কেরোসিনের আগুনের নির্মম বলি। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ঘটে আলোচিত এই দুই ঘটনা। 

ছোট্ট শিশু। বয়স কত? সাত বছর। গত ৭ জুলাই ২০১৯ ঢাকার ওয়ারীতে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। ছাদ দেখানোর কথা বলে সে শিশুটিকে লিফট থেকে সবচেয়ে ওপর তলায় অবিক্রীত একটি শূন্য ফ্লাটের ভেতর নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটিকে প্রথমে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। তাতে ব্যর্থ হয়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করে অচেতন করে। এরপরে সে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। কিন্তু তার পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে শিশুটিকে হত্যা করে গলায় রশি বেধে ঝুলিয়ে রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

১৮ জুলাই ২০১৯ নওগাঁর মান্দায় কলা ও কাঁঠাল বিচি খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে ৩ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে তিন সন্তানের জনক আছির উদ্দিন। গুরুতর অবস্থায় ওই শিশুকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ব্লেড দিয়ে যৌনাঙ্গের প্রবেশ পথ কেটে বড় করে রাতভর ধর্ষন করে দিনাজপুরের ৫ বছরের শিশু পূজাকে। সারারাত ধরে ২টা জানোয়ার টানা ধর্ষন করে সকালে বাড়ির কাছে ফেলে রেখে গিয়েছিলো তাকে। বিচার হয়নিতো তাঁর, ওসব এখন ইতিহাস! আপনাদের চরিত্র আর সভ্যতার ইতিহাস।

ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে এমন খবরও পত্রিকার পাতায় স্থান পেয়েছে। ধর্ষণের এমন লাগামহীন চিত্র এদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাসহ পুরো সিস্টেমের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রহসনের এসব বিচার সম্পন্ন করে ধর্ষণের কলঙ্ক থেকে বাংলাদেশ রেহাই পাবে কিনা! সে ভাবনাটা অনেকটাই অপরিষ্কার। অসুস্থ সংস্কৃতির ঘুণে ধরা এই সমাজের মগজ পরিষ্কার না করলে ধর্ষণ নির্মূল কোনো ভাবেই সম্ভব না, আশা করি সেটা নিয়ে আজ আর কারো দ্বিমত নেই।

কত ঘটনার বিবরন শুনবেন আর! প্রতিদিন এদেশে ধর্ষনের এই তালিকা দীর্ঘ্য থেকে দীর্ঘ্যতর হচ্ছে। এরকম কতইনা ঘটনা কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে তা আমাদের জানা নেই, ভয়ে-লজ্জায় যা প্রকাশ পায়নি। সম্প্রতি শুধুমাত্র সাংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশিত অগনিত ঘটনাপ্রবাহের তথ্যানুসারে এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে সারাদেশে ৩ শ ৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে । এর মধ্যে ৮ জন ছেলে শিশু । ধর্ষণের পরে ১ জন ছেলে শিশুসহ মারা গেছে ১৬ টি শিশু। বাংলাদেশে এখন একমাত্র আলোচ্য বিষয়- ধর্ষন, যে শব্দটি আজ আড্ডা-আলোচনা-অফিস টেবিলে কিংবা পথে স্থান করে নিয়েছে। আজ এমন একটি দিনও যাচ্ছে না, যেদিন ধর্ষণ নামক যৌন আক্রমণের শিকার হচ্ছে না শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীরা। ঘরে-বাইরে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র কিংবা গণ-পরিবহন কোথাও যেন শিশু বা নারীর নিরাপত্তা নেই। এ দেশটা যেন শ্বাপদের গভীর অরন্যের পরিণত হয়েছে।

কিন্তু দেশে এই যে ধর্ষনের মহামারি এর কারন কি ভেবে দেখেছেন কখনো? ধর্ষনের জন্য যারা পোষাককে দায়ী করেন; তারা বলবেন কি? তনুর পোষাক কি ছিলো? নুসরাতেই বা কি ছিলো? দুই থেকে ৭ বছরের শিশুর পোষাকইবা কতটা অশ্লীল হতে পারে! যা দেথে আপনাদের হিংস্ত্র দানবগুলো জেগে ওঠে? আসলে সমস্যাটা আপনাদের মগজে- সেই মগজে, যে মগজে আপনি আপনার ধর্ম নামের নোংরা অন্ধত্ব পুষে রেখেছেন। আর প্রায় প্রতিটি প্রথাগত ধর্মই নারীকে কৃতদাস-যৌনদাস-সন্তানোৎপাদনের শষ্যক্ষেত্র-সঙ্গী করে রেখেছে। এবং এরই প্রতিফিলন আপনারা জন্মের পর থেকেই আপনাদের পরিবারগুলোতে দেখে এসেছেন; পুরুষত্বের সীমাহীন বর্বরতায়। আর তার বাকী শিক্ষাটুকু সম্পন্ন হয়েছে আপনার জন্মগত সমাজ থেকে। ধম্ম আপনাকে মানুষ করতে না পারলেও বর্বর পুরুষ তৈরি করেছে ঠিকভাবেই। নইলে সীমাহীন ধর্ষন দেখে আপনার মাথায় আসে কি করে; এসব বন্ধ করতে পতিতালয় চাই! পতিতালয়, যার খদ্দের হবেন আপনি। সেই আপনি, যে নারীর সতীত্ব পরীক্ষায় বিশ্বাসী একজন পুরুষ- আপনার পতিতালয় চাই! কতটা নোংরা আপনার ভেতরের পুরুষত্ব যে, নিজের কন্যাও আজ আপনার কাছে নিরাপদ নয়। পিতৃত্বকে বিসর্জন দিয়ে পুরুষত্বকে আপনি লালন করছেন। তাহলে কে নিরাপদ আপনার কাছে? আপনার কন্যা-ভগ্নি-প্রতিবেশী…… কেউ নয়। কারন আপনি প্রচন্ডভাবে ধর্মবিশ্বাসী, সেই পুরুষ।

কেন বাংলাদেশে এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সমাজবজ্ঞিানের দৃষ্টিতে তার ব্যাখ্যা খুঁজুন। গ্রামের সহজ সরল নারী-শিশু থেকে সমাজের উঁচু দালানের নারী-শিশু কারোরই ছাড় নেই। মাদ্রাসায়-স্কুলে-কলেজে-গনপরিবহনে-অফিসে-পুলিশ স্টেশনে-বাড়িতে কোথাও যৌন আক্রমণ থেকেও রেহাই নেই নারী-শিশুদের। গণ-পরিবহণেতো আজকাল ধর্ষকদের সম্মিলিতভাবে ধর্ষনের কিংবা অন্যান্য যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারী যাত্রীরা। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। মাদ্রাসায় হুজুর-মোল্লাদের বিকৃত রুচির বিকৃতি থেকে রেহাই নেই কোমলমতি শিশুদের। এদের পাশবিক প্রবৃত্তি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। একের পর এক ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। কেউ যেন কোন কথাও বলতে চাইছে না এসব মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে; এটা কি দোজখের ভয় নাকি বেহেস্তের মোহ। নইলে যে নুসরাতকে মাদ্রাসায় বসে মাদ্রাসারই অধ্যক্ষ ধর্ষন করে তাঁকে হত্যা করলো সেই নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বলেন, “আমার মেয়ে আখেরাতের পরীক্ষায় পাস করবে।” খুব বেশী আশ্চর্য্য লাগার কোন কারন নেই! কারন এটাই ধ্রুব সত্য যে, এদেশের বাবা-মা- অভিভাবকেরা এই বিশ্বাসেই তাদের সন্তানকে মাদ্রাসায় দেন যে, তাদের সন্তান আখেরাতের জন্য কাজ করছে। আর সেই আখেরাত শুধু সন্তানদের জন্যই নয়- তাদের পথকেও করবে নিশ্চিত। তাতে যদি তাদের সেই সন্তানরা (ছেলে হোক বা মেয়ে) মাদ্রাসায় বসে যৌন নির্যাতনের শিকার বা শারিরিক অত্যাচারেরও শিকার হয় বা তাদের হত্যাও করা হয় তাতে তাদের আফসোস নেই। কারন, মূলকথা “আখেরাত”!

ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। সম্মিলিতভাবে মানুষ যেন অসভ্যতার দিকেই হাঁটতে শুরু করেছে। কিন্তু এর পেছনে কারনও রয়েছে অনেক- শিল্প, সংস্কৃতি থেকে মানুষের সরে যাওয়া আর বিজ্ঞান বিমুখতাও এর একটা অন্যতম কারন। ছেলেবেলা থেকেই পারিবারিকভাবে ছেলে এবং মেয়ে শিশুদের খেলাধুলা-চালচলন-শিক্ষা-পোষাক সহ সকলক্ষেত্রেই শুরু হয় চরম বৈষম্য। ছেলেশিশুটিকে খেলার জন্য বল-ব্যাট-প্লেন-কার দিলেও মেয়েটির জন্য সেই পরীমার্কা পুতুলই, এবং তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় “তুমি মেয়ে এবং এই সীমানাটা তোমার জন্য নির্ধারিত”। ছেলেটির সাথে সমান তালে সে ছুটতে পারে না। শিক্ষার আধুনিকায়ন করে যখন কো-এডুকেশন চালু করার কথা ছিলো তখন আমরা করেছি মাদ্রাসা। ধর্মভিত্তিক অন্ধকারাচ্ছন্ন এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছড়িয়েছে কেবলই নারীদ্বেষ আর হিংসার মত ভয়ংকর ভাইরাস। রাষ্ট্রের প্রচ্ছনান মদদে আর পৃষ্ঠপোষকতায় যা আজ দানবের আকার ধারন করেছে, সেই দানবের করাল গ্রাস থেকে এ দেশটাকে বাঁচানো কষ্টকর। তার সাথে রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতার সাংস্কৃতি তো আছেই; সব মিলিয়ে একটা হিংস্ত্র শ্বাপদের অরন্যে আমরা কেবল বেঁচেই আছি। যেখানে বিচার চাওয়া যায় না, তবে আসামীরা জামিন পেয়ে যায় ঠিকই। এসব আপনারাও জানেন আমরাও জানি! ক্ষমতাধর আসামীকে বাঁচাতে ফাঁসানো হয় অসহায় মিন্নিদের। কেন হয় এসব? কেন ঠিকপথে শেষ হয় না এসব বিচার? কেন ধরা যাবে না অপরাধীদের? রাষ্ট্র নির্বাক হলেও এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের অজানা নয়।

পূর্নিমা-তনু-নুসরাতরাতো মরে গিয়ে বাঁচলো, এ অভিষপ্ত ভূমিতে আমরা বেঁচে আছি কেন?
মানুষ বেঁচে আছে কেন? এভাবে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলে?
মানুষ কি বেঁচে থাকে, এভাবে!


লিখেছেন: কাজল ‍কুমার দাস, ব্লগার ও প্রাবন্ধিক

(প্রথম প্রকাশ ২২ জুলাই ২০১৯- মুক্তমনা ব্লগ)

এক অদম্য লড়াই ও কাঁচের সাম্রাজ্য জয়ের মহাকাব্য

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশ...