Search This Blog

Friday, May 22, 2026

স্বর্ণের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: সংকট, ডলারের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের রূপান্তর

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যুদ্ধ, মহামারি, সাম্রাজ্যের পতন কিংবা আধুনিক অর্থনৈতিক মন্দা- যেকোনো চরম সংকটে যখনই মানুষ তার প্রচলিত ব্যবস্থা বা কাগজের মুদ্রার ওপর আস্থা হারিয়েছে, তখনই সে বুক পেতে আশ্রয় নিয়েছে স্বর্ণের নিরাপদ বলয়ে। কাগজের মুদ্রা বা আধুনিক ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা যেখানে সরকারের নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে স্বর্ণের আবেদন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সার্বজনীন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে, বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণের দামের যে অভাবনীয় ও রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, তা সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে এক গভীর চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সোনার দামের এই উল্লম্ফন কেবল অলংকার তৈরির চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ঘটেনি; এর পেছনে রয়েছে গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের ক্ষয় এবং এক নতুন বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে- সাধারণ মানুষ বা বিনিয়োগকারীরা এখন কী করবেন? সোনা কি আরও কিনে রাখবেন, নাকি চড়া দামে বিক্রি করে লাভ তুলে নেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে স্বর্ণের দীর্ঘ ইতিহাস এবং বিশ্ব অর্থনীতির জটিল গোলকধাঁধায়।

স্বর্ণের মূল্যের দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন বুঝতে হলে আমাদের দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং বৈশ্বিক চিত্রের তুলনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ দশকে মুদ্রাস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার যে রূপান্তর ঘটেছে, তার সবচেয়ে বড় সূচক হলো স্বর্ণের দাম।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম ছিল মাত্র ১৫৪ টাকা। সেই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল বার্ষিক প্রায় ৭০ মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী ছিল প্রায় ৫১০ টাকা। অর্থাৎ, স্বাধীনতার ঠিক পর পর একজন সাধারণ নাগরিকের গড় বার্ষিক আয় দিয়ে প্রায় তিন ভরি সোনা অনায়াসে কিনে ফেলা সম্ভব হতো।

অথচ, ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। সরকারের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫১ টাকায়। আপাতদৃষ্টিতে টাকার অঙ্কে এই আয় বিশাল মনে হলেও, স্বর্ণের বর্তমান আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে এই বিপুল পরিমাণ বার্ষিক আয় দিয়ে এখন বাজারে দেড় ভরি সোনাও কেনা সম্ভব নয়। এই সাধারণ সমীকরণটিই প্রমাণ করে যে, গত ৫৫ বছরে কাগজের টাকা বা দেশীয় মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কতটা হ্রাস পেয়েছে এবং তার বিপরীতে স্বর্ণ নিজের অন্তর্নিহিত মূল্যকে কীভাবে ধরে রেখেছে।

স্বর্ণের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে ২০২৫ সালে। বিগত বছরগুলোতে স্বর্ণের দাম পর্যায়ক্রমে বাড়লেও ২০২৫ সালের উত্থান ছিল অবিশ্বাস্য ও দ্রুতগতির। উদাহরণস্বরূপ, যদি ২০২৫ সালের একেবারে শুরুতে কোনো বিনিয়োগকারী স্বর্ণের পেছনে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে রাখতেন, তবে মাত্র এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৬ সালের শুরুতে সেই স্বর্ণের বাজারমূল্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টাকায়।

মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে প্রায় ৬০ শতাংশ মুনাফা বা রিটার্ন সাধারণ যেকোনো বৈধ বিনিয়োগ মাধ্যমের (যেমন ব্যাংক এফডিআর, সঞ্চয়পত্র বা শেয়ার বাজার) তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণত স্বর্ণের দাম এত অল্প সময়ে এত তীব্র গতিতে বাড়ে না। এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধিই ইঙ্গিত করে যে, বিশ্ব অর্থনীতির অন্দরমহলে এক বড় ধরনের ওলটপালট বা কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে চলেছে।

অর্থনীতিতে একটি চিরন্তন সত্য রয়েছে- স্বর্ণের দাম বাড়ার মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের ‘আস্থা’ এবং ‘ভয়’। মানুষ যখনই বুঝতে পারে যে তার পকেটে থাকা কাগজের টাকা, ব্যাংকে জমানো আমানত কিংবা দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হচ্ছে, তখনই সে স্বর্ণের দিকে ধাবিত হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চাইলেই যেকোনো সময় দেশের অর্থনীতি সচল রাখার নামে বা ঋণ শোধ করার জন্য কাগজের টাকা বা নোট ছাপাতে পারে। একে বলা হয় ‘ফিয়াট কারেন্সি’। অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা দেয় তীব্র মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এছাড়া শেয়ার বাজারের পতন ঘটতে পারে, বন্ডের বাজার ধসে যেতে পারে এবং ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। সোনা কোনো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে বা কোনো সরকারি ছাপাখানায় বোতাম চেপে তৈরি করা যায় না। এটি একটি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খনি থেকে তুলতে বিপুল শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলস্বরূপ, হাজার বছর ধরে চলে আসা এই ধাতুর ওপর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আস্থা কখনো নষ্ট হয় না। যখন কাগজের টাকার মান কমতে থাকে, তখন সমপরিমাণ স্বর্ণ কিনতে বেশি পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হয়, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি “সোনার দাম বাড়ছে”। আসলে অনেক সময় সোনার দাম বাড়ে না, বরং কাগজের মুদ্রার মান কমে যায়।

বিশ্ব অর্থনীতি ও স্বর্ণের ভাগ্য বহু বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা স্বর্ণের নিয়ন্ত্রণে মার্কিন সরকারের তিনটি বড় এবং বিতর্কিত পদক্ষেপ দেখতে পাই।

১৯৩০-এর দশকে সমগ্র বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রাস করেছিল ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দা। ব্যাংকগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়ে রাস্তায় বসেছিল এবং পুরো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই চরম সংকটের মুখে মার্কিন নাগরিকেরা কাগজের ডলারের ওপর আস্থা হারিয়ে দলে দলে সোনা কিনতে শুরু করে এবং ঘরে সোনা মজুত করতে থাকে। সে সময় মার্কিন মুদ্রানীতির নিয়ম ছিল- সরকারকে প্রতি এক ডলার ছাপানোর বিপরীতে তার ৪০ শতাংশ মূল্যমানের সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বা ফেডারেল রিজার্ভে সংরক্ষণ করতে হতো। কিন্তু মানুষ সমস্ত সোনা নিজেদের ঘরে লুকিয়ে ফেলায় সরকারের পক্ষে নতুন ডলার ছাপানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৩৩ সালের ৫ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এক ঐতিহাসিক ও চরম বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এই আদেশের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে সোনা মজুত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হয়। সমস্ত নাগরিককে তাদের ঘরে থাকা সোনা সরকারের কাছে নির্দিষ্ট মূল্যে (আউন্স প্রতি ২০.৬৭ ডলার) জমা দিতে বাধ্য করা হয়। ইতিহাসে একে অনেক অর্থনীতিবিদ The Great Gold Robbery বলে অভিহিত করেন।

জনগণের কাছ থেকে সমস্ত সোনা বাজেয়াপ্ত করার পর, রুজভেল্ট এক ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ২০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ ডলার করে দেন। অর্থাৎ রাতারাতি সোনার দাম ৬৯ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং মার্কিন সরকার প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টনেরও বেশি সোনা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে মার্কিন নাগরিকদের এই সোনা কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। অবশেষে ১৯৭৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে মার্কিন নাগরিকেরা পুনরায় ব্যক্তিগতভাবে সোনা কেনা ও রাখার অধিকার ফিরে পান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হবে মার্কিন ডলার এবং এই ডলারের মান সরাসরি স্বর্ণের সাথে যুক্ত থাকবে (প্রতি আউন্স সোনা = ৩৫ ডলার)। বিশ্বের যেকোনো দেশ চাইলে মার্কিন সরকারকে ডলার দিয়ে তার বিপরীতে সোনা তুলে নিতে পারত।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ নানা সামাজিক কর্মসূচির কারণে আয়ের চেয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা শুরু করে। এই বিপুল খরচের জোগান দিতে মার্কিন সরকার তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি কাগজের ডলার ছেপে বাজারে ছেড়ে দেয়। এটি বুঝতে পেরে ইউরোপের দেশগুলো (বিশেষ করে ফ্রান্স) তাদের ডলার ফেরত দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সোনা দাবি করতে শুরু করে। এতে মার্কিন স্বর্ণের রিজার্ভ দ্রুত খালি হতে থাকে।

এই ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন (Richard Nixon) টেলিভিশনে এসে এক আকস্মিক ঘোষণা দেন, যা অর্থনীতিতে ‘নিক্সন শক’ নামে পরিচিত। তিনি ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সোনা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা আমেরিকা আর মানবে না। অর্থাৎ, ডলার ও স্বর্ণের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কটি ছিন্ন করা হলো।

এর ফলে বিশ্ব এক সম্পূর্ণ নতুন ‘ফিয়াট মানি’ বা কাগজের মুদ্রার যুগে প্রবেশ করে। সোনা থেকে মুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৩৫ ডলারের কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে এবং ১৯৮০ সালের মধ্যে তা আউন্স প্রতি ৮৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

ডলার ও স্বর্ণের সম্পর্কের বিবর্তন:
[১৯৪৪ (ব্রেটন উডস)] -> ১ আউন্স সোনা = ৩৫ ডলার (স্থির হার)
[১৯৭১ (নিক্সন শক)]   -> স্বর্ণের সাথে ডলারের সম্পর্ক ছিন্ন (মুক্ত বাজার)
[১৯৮০ সালের মধ্যে]   -> স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়ে আউন্স প্রতি ৮৫০ ডলারে পৌঁছায়
স্বর্ণের সমর্থন হারানোর পর ডলারের মান যখন বিশ্বজুড়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, তখন মার্কিন হেনরি কিসিঞ্জার এক অভাবনীয় কূটনৈতিক চাল চালেন। ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের সাথে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব তাদের সমস্ত খনিজ তেল কেবল এবং কেবলমাত্র মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করবে এবং তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অতিরিক্ত ডলার মার্কিন বন্ড ও ব্যাংকে বিনিয়োগ করবে। এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাজপরিবারকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে।

যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই তেল কেনার প্রয়োজন ছিল, তাই তেল কেনার জন্য প্রতিটি দেশকে বাধ্য হয়েই ডলারের রিজার্ভ রাখতে হতো। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থা। এই কৌশলের কারণে স্বর্ণের ব্যাকআপ ছাড়াই মার্কিন ডলার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একক আধিপত্যশীল মুদ্রায় পরিণত হয়।

পেট্রোডলার ব্যবস্থার ওপর ভর করে বিশ্ব অর্থনীতি ভালোই চলছিল, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে মার্কিন পুঁজিবাদী অর্থনীতি পুনরায় বড় ধরনের সংকটে পড়ে।

২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতের ঋণের ওপর ভিত্তি করে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এই মন্দা কাটিয়ে উঠতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (Fed) এক নতুন এবং বিতর্কিত আর্থিক নীতি গ্রহণ করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ (Quantitative Easing - QE)। এটি আসলে আধুনিক উপায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা তৈরি বা ছাপানোর একটি প্রক্রিয়া।

এই নীতিমালার অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নতুন মুদ্রা তৈরি করে বাজার থেকে সরাসরি বাণিজ্যিক বন্ড এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ কিনে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়ানো এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনে ঋণ নেওয়া সহজ করা। কিন্তু অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের নিজস্ব মান কমতে শুরু করে। বিনিয়োগকারীরা আবারও বুঝতে পারেন যে কাগজের টাকা নিরাপদ নয়। ফলে স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৮০০ ডলার থেকে এক লাফে ১,৯০০ ডলারে উঠে যায়।

২০২০ সালে যখন করোনা ভাইরাস মহামারি পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়, তখন অর্থনৈতিক লকডাউন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সহ বিশ্বের প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও একই পথ অবলম্বন করে। তারা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়ে। এই বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ বাজারে আসার কারণে শেয়ার বাজার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির (যেমন বিটকয়েন) দাম যেমন কৃত্রিমভাবে বাড়ে, তেমনি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দামও পুনরায় রেকর্ড উচ্চতা স্পর্শ করে।

বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে স্বর্ণের বাজারের যে পরিস্থিতি, তার মূল সূত্রপাত হয়েছে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর। এই ঘটনাটি বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর অংশ হিসেবে পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত থাকা রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার ও ইউরো) রিজার্ভ রাতারাতি জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়। শুধু তাই নয়, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম ‘সুইফট’ (SWIFT) ব্যবস্থা থেকেও বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এই ঘটনাটি বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত, উদীয়মান এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক) কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চোখ খুলে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, ডলার বা ইউরোর মতো কাগজে মুদ্রা যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বা ডিজিটাল সার্ভারে থাকবে, ততক্ষণ তা নিরাপদ নয়। কোনো দেশের নীতি যদি ওয়াশিংটনের পছন্দ না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে সেই দেশের কষ্টার্জিত রিজার্ভকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জব্দ করা হতে পারে।

এই চরম রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) বা ডলার বর্জন এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর ডলারের একমাত্র এবং সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ‘স্বর্ণ’। কারণ স্বর্ণ কোনো দেশের দায় (Liability) নয়; এটি নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে শারীরিকভাবে (Physical Gold) সংরক্ষণ করা যায়, যা কোনো বিদেশি নিষেধাজ্ঞা বা ডিজিটাল আদেশের মাধ্যমে জব্দ করা অসম্ভব। রাশিয়া এবং চীন ইতিমধ্যে তাদের স্বর্ণের শতভাগ মজুত নিজেদের দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নিয়েছে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। দেশটির জাতীয় ঋণের (National Debt) পরিমাণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা আমেরিকার মোট বার্ষিক জিডিপির (GDP) চেয়েও বেশি। ১ ট্রিলিয়ন মানে ১ হাজার বিলিয়ন, সুতরাং ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা কতটা বিশাল তা সহজেই অনুমেয়।

এই ঋণের পাহাড় কেবল একটি সংখ্যা নয়। এই ঋণের জন্য মার্কিন সরকারকে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের সুদ গুণতে হচ্ছে। পুরনো ঋণ শোধ করতে এবং সুদের টাকা দিতে মার্কিন সরকারকে প্রতিনিয়ত নতুন করে আরও ঋণ নিতে হচ্ছে এবং নতুন ডলার ছাপাতে হচ্ছে। অর্থনীতি যখনই চাপে পড়ে, তখনই সুদের হার কমাতে হয়, যা ডলারের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ঋণের ভয়াল রূপ দেখে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন বন্ড বিক্রি করে দিয়ে সোনা কিনছেন।

সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতিকর চক্র:
[বিশাল মার্কিন ঋণ (৩৯ ট্রিলিয়ন$)] -> [ঋণ ও সুদ শোধের জন্য অতিরিক্ত ডলার তৈরি] -> [ডলারের অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি] -> [স্বর্ণের নিরাপদ আশ্রয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি]

১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বলেছিলেন ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ (End of History) ঘটেছে, কারণ তখন মনে হয়েছিল মার্কিন পুঁজিবাদ এবং ডলার ব্যবস্থার কোনো প্রতিদ্বন্দী নেই। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতায় বিশ্ব আবার পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার যুগে ফিরে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।

প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চীন এখন আমেরিকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। একসময় আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তা থাকলেও, এখন তারা নিজেরাই নিজেদের বাজার বাঁচাতে চীনের ওপর পাল্টা শুল্ক (Tariff) আরোপ করছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বাণিজ্যের জন্য আমেরিকার চেয়ে চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেওয়ার একক ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হারাচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পেট্রোডলারের মূল অংশীদার দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে নিরাপত্তার জন্য শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে না রেখে নিজেদের শিল্পে এবং স্বর্ণে রূপান্তর করছে।

স্বর্ণের বাজারে সাধারণ খুচরা ক্রেতাদের চেয়ে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় হলো বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকেই বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর (যেমন চীন, ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার, পোল্যান্ড ইত্যাদি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একনাগাড়ে সোনা কিনে চলেছে।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ছিল স্বর্ণের নিট বিক্রেতা (Net Sellers)। তারা স্বর্ণ বিক্রি করে ডলার রিজার্ভে রাখত। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে তারা নিট ক্রেতায় (Net Buyers) পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ দাম থাকা সত্ত্বেও নিট ২৪৪ টন সোনা কিনে নিজেদের ভল্টে যোগ করেছে।

যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেরা টাকা ছাপে, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করে—তারা যখন কাগজের ডলারের চেয়ে সোনাকে বেশি নিরাপদ মনে করে নিজেদের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, তখন বুঝতে হবে আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে কোনো বড় গলদ রয়েছে। এটি কাগজের মুদ্রার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিজেদেরই একটি ‘আস্থাহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ভোট’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই বিপুল ক্রয়ের কারণে বাজারে সাধারণ স্বর্ণের সরবরাহ কমে গেছে, যা দামকে প্রতিনিয়ত ওপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (World Gold Council)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে সর্বমোট প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন সোনা খনি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মাটির নিচে উত্তোলনযোগ্য আর মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সোনা অবশিষ্ট আছে, অর্থাৎ প্রাকৃতিক সরবরাহ এমনিতেই সীমিত।

বিশ্বের মোট উত্তোলিত স্বর্ণ প্রধানত চারটি খাতে বিভক্ত হয়ে রয়েছে: ১. অলংকার বা গয়না (Jewelry): প্রায় ৪৪ শতাংশ (যা মূলত ভারত ও চীনের সাধারণ মানুষের ঘরে রয়েছে)। ২. বিনিয়োগ (Private Investment): প্রায় ২১ শতাংশ (ব্যক্তিগত বার, কয়েন ইত্যাদি)। ৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান: প্রায় ১৮ শতাংশ (রিজার্ভ হিসেবে ভল্টে রক্ষিত)। ৪. শিল্প ও প্রযুক্তি (Industrial/Technology): প্রায় ১০ শতাংশ (ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য চিকিৎসা খাতে ব্যবহৃত)।

বৈশ্বিক স্বর্ণের ব্যবহার (শতকরা হার):
██████████████████████░░░░░░░░░░ ৪৪% অলংকার
███████████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ২১% ব্যক্তিগত বিনিয়োগ
█████████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ১৮% কেন্দ্রীয় ব্যাংক
█████░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ১০% শিল্প ও প্রযুক্তি
███░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░ ৭% অন্যান্য/অনির্ণীত

২০২৫ সালে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে ওই এক বছরেই সোনার দাম ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ৫,৩০০ ডলার অতিক্রম করে।

২০২৬ সালের শুরুতে, বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে দাম আরও কিছুটা বাড়লেও, পরবর্তী মাসগুলোতে বাজারে কিছুটা ‘কারেকশন’ বা মূল্য সংশোধন হয়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সোনার গড় মূল্য ছিল আউন্স প্রতি ৪,৮৭৩ ডলার, যা এখনো ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করছে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের মূল্য কত হতে পারে, তার কিছু চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছে:

  • গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs): মার্কিন এই বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংকের মতে, স্বর্ণের এই দাম কেবল সাময়িক যুদ্ধ বা আতঙ্কের কারণে বাড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত রূপান্তর। তারা পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০Check সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৫,৪০০ ডলার স্পর্শ করতে পারে। (উল্লেখ্য, ১ আউন্স হলো ২.৬৭ ভরির সমান)।

  • ইউবিএস (UBS): সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এই ব্যাংকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সোনা ৬,২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। এমনকি বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হলে তাদের সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস হলো সোনা আউন্স প্রতি ৭,২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

  • সোসিয়েতে জেনারেল (Société Générale): ফ্রান্সের এই বহুজাতিক ব্যাংকটির ধারণা, সোনার দাম খুব দ্রুতই ৬,০০০ ডলারে পৌঁছাবে।

  • ডয়েচে ব্যাংক (Deutsche Bank): জার্মানির এই শীর্ষ ব্যাংকটি আগামী ৫ বছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারা যদি বজায় থাকে, তবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভের মধ্যে স্বর্ণের অনুপাত বর্তমানের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু নয়। আর যদি সত্যিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভের ৪০ শতাংশ স্বর্ণে রূপান্তর করে, তবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্স প্রতি ৮,০০০ ডলার থেকে ১০,০০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

প্রবন্ধের মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীর করণীয় কী? সোনা কি এখন কেনা উচিত নাকি বিক্রি করা উচিত?

অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের উত্তর নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য এবং মেয়াদের ওপর। যারা দ্রুত লাভের আশায় বা ফটকা কারবারের জন্য সোনা কেনেন, ২০২৫ সালের বিশাল উত্থানের পর বর্তমান উচ্চ মূল্যে তাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ, যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো যুদ্ধের অবসান ঘটে বা সাময়িকভাবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হয়, তখন স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে এবং লাভ তুলে নিতে (Profit Booking) একযোগে সোনা বিক্রি শুরু করেন।

যদি বড় ধরনের বিক্রির চাপ আসে, তবে সোনার দামে একটি বড় পতন বা সংশোধন দেখা দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িকভাবে দাম পড়ে গিয়ে আউন্স প্রতি ৪,১০০ ডলার, ৩,৯০০ ডলার বা এমনকি ৩,৫০০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে চড়া দামে অলংকার বা সোনা কিনে দ্রুত লাভের আশা করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যারা আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য নিজেদের পুঁজিকে নিরাপদ রাখতে চান, মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঞ্চয়ের জন্য ভাবছেন—তাদের জন্য সোনা এখনো সেরা বিকল্প। দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ঋণের বোঝা, কাগজের টাকার অবমূল্যায়ন এবং ডলারের পতন অনিবার্য বলেই মনে হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, যদি বাজারে কোনো সাময়িক সংশোধনের কারণে সোনার দাম কমে ৩,৯০০ বা ৩,৫০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে, তবে সেটিকে বিক্রির ভয় হিসেবে না দেখে “নতুন করে সোনা কেনার সুবর্ণ সুযোগ” হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমীকরণ স্বর্ণের পক্ষেই কথা বলছে।

পরিশেষে বলা যায়, স্বর্ণের দামের এই অভূতপূর্ব উত্থান কেবল একটি ধাতুর দাম বাড়ার সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আসলে বিশ্ব অর্থনীতির একটি গভীর অসুখের লক্ষণ। এটি প্রমাণ করে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন ডলারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোটি এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন এক মেরু থেকে বহু-মেরুকেন্দিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে কাগজের মুদ্রার চেয়ে বাস্তব সম্পদ (Real Assets) এবং স্বর্ণের গুরুত্ব অনেক বেশি।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সোনা কেনা বা বেচার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত লাভের অঙ্ক নয়, বরং তা বিশ্ব রাজনীতির হাওয়া কোন দিকে বইছে তা বোঝার ওপর নির্ভর করে। যতদিন পর্যন্ত বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস থাকবে, যতদিন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঋণের টাকা শোধ করতে দেদারসে কাগজের ডলার ছাপাবে, এবং যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের বিকল্প খুঁজবে—ততদিন পর্যন্ত স্বর্ণের সিংহাসন থাকবে অটুট। স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতে ১০,০০০ ডলারে পৌঁছাবে কিনা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির আস্থা, ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের আধিপত্য হ্রাসের গতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের মধ্যে। তাই পুঁজির নিরাপত্তা ও চরম সংকটে টিকে থাকার জন্য সোনা সবসময়ই মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

Tuesday, May 19, 2026

আমরা কি আসলেই একটি স্বাধীন দেশে বাস করছি?


 একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের চিন্তার স্বাধীনতা দিতে ব্যর্থ হয় এবং ভিড়ের উন্মাদনার কাছে নতিস্বীকার করে, তখন সেই রাষ্ট্রের পরিচয় সংকটে পড়ে যায়। সাতক্ষীরার বল্লী মুজিবর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকারকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা কেবল একজন ব্যক্তির অবমাননা নয় বরং বাকস্বাধীনতার কফিনে একটি নতুন পেরেক। শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার যা বলেছিলেন, তা কোনো ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য ছিল না। আধুনিক নাগরিক জীবনের শব্দদূষণ এবং সবার সমান অধিকারের জায়গা থেকেই তিনি একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের সমাজ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে যুক্তি পরাজয় বরণ করে ধর্মের অনুভূতি-এর কাছে। যখন যুক্তিবাদী কথাকে "র্মীয় অনুভূতিতে আঘাত"হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন সমাজ তার বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে।

বিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চার চারণভূমি। কিন্তু বর্তমান সময়ে শ্রেণিকক্ষগুলো যেন এক একটি নজরদারি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের হাত ধরে একজন শিক্ষককে হাতকড়া পরাতে বাধ্য করা সমাজের নৈতিক পতনের চূড়ান্ত নিদর্শন। ছাত্র যখন শিক্ষকের অভিভাবক হয়ে দাঁড়ায় এবং তার বিচারক হিসেবে তৌহিদী জনতা নামক অদৃশ্য শক্তিকে বেছে নেয়, তখন বুঝতে হবে শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সবার সমান অধিকার থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে জনসম্মুখে উগ্রতা বা বিদ্বেষমূলক কথা বলেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। সামান্য ব্যক্তিগত মতামত বা যৌক্তিক কথা বললেই তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা গণপিটুনির ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে হচ্ছে। এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে, বাকস্বাধীনতা এখানে কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার। ভিন্নমতের কোনো স্থান এখানে নেই।

একটি দেশ কেবল ভূখণ্ড বা পতাকা দিয়ে আধুনিক হয় না। আধুনিকতার মাপকাঠি হলো মানবাধিকার এবং চিন্তার মুক্তি। যখন ঝাঁক ঝাঁক মানুষ ধর্মের ধোঁয়া খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকে এবং অন্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তখন সেই সমাজ মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। গৌরাঙ্গ সরকারের হাতে পরানো হাতকড়া আসলে বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্তমনা মানুষের বিবেকের ওপর পরানো হাতকড়া। রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তর্জনি নির্দেশে পরিচালিত হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। গৌরাঙ্গ সরকারদের রক্ষা করতে না পারলে এই দেশ অচিরেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মরুভূমিতে পরিণত হবে। সময় এসেছে প্রশ্ন করার- আমরা কি আসলেই একটি স্বাধীন দেশে বাস করছি, নাকি অদৃশ্য এক খাঁচায় বন্দি হয়ে আছি?

আমাদের মেয়েরা মরে যাচ্ছে

বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত আঁধারে নিমজ্জিত। যে জনপদে ভোরের আলোয় শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ প্রতিটি ভোরে পত্রিকার পাতা খুললেই ভেসে আসে কোনো না কোনো নিথর দেহের ছবি। কখনো সেই দেহ পড়ে থাকে স্যুয়ারেজ লাইনে, কখনো ড্রামে, আবার কখনো বা নিজ ঘরের ঠিক পাশের ফ্ল্যাটের কোনো এক অন্ধকার কোণে। মিরপুরের সাত-আট বছরের শিশু লামিসার পরিণতি আমাদের সমাজের সেই বীভৎস চেহারাটিকেই উন্মোচিত করেছে, যা আমরা সভ্যতার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি।

একটি জুতো দরজার সামনে পড়ে আছে, আর অন্যটি নিখোঁজ এই দৃশ্যটি একজন মা বা বাবার কাছে কেবল একটি হারানো বস্তু নয়, এটি একটি অশুভ সংকেত, একটি কলিজা ছিঁড়ে যাওয়া হাহাকার। যখন সেই বাবা বা মা পাগলের মতো প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়েন, তখন তিনি আসলে কড়া নাড়েন আমাদের বিবেকের দ্বারে। কিন্তু আমরা কি সেই দুয়ার খুলি? যখন ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশ এসে পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙে, তখন যা দেখা যায়, তা কোনো সুস্থ মানুষের কল্পনারও অতীত। একটি নিথর দেহ, চারপাশ লালিমায় সিক্ত। আর বাথরুমের বালতিতে পড়ে আছে সেই চিরচেনা মুখটি—যে মুখে প্রতিদিন অজস্র চুমু একেঁ দিতেন তার বাবা-মা। যে চুলগুলোকে পরম মমতায় বেণী করে দিতেন মা, সেই চুল ধরেই ঘাতক সোহেল রানা তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর ওপাড়ে।

লামিসার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যে কারণগুলো উঠে আসছে, তা কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাধি। ঘাতক সোহেল রানার মতো মানুষরা আমাদের মাঝেই বিচরণ করছে। তারা প্রতিবেশী সেজে থাকে, সুযোগ বুঝে শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোহেলের স্ত্রীর জবানবন্দি অনুযায়ী, সে নিজেও ছিল তার স্বামীর বিকৃত যৌনাচারের শিকার। প্রশ্ন হলো, এই বিকৃতি সমাজ বা রাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে কীভাবে মহীরুহে পরিণত হয়?

কেন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একটি সাত-আট বছরের শিশুর প্রতি কামাতুর হয়? এটি কি কেবল ব্যক্তিগত বিচ্যুতি, নাকি আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পচনের ফলাফল? ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত দুনিয়ায় পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের চারপাশের অপরাধীদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, অপরাধ করলেও পার পাওয়া সম্ভব।

লামিসার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। আমাদের সমাজের শিকড় যে কতটা গভীরে পচে গিয়েছে, তার প্রমাণ মেলে গলির মোড়ে ৯-১০ বছরের শিশুদের কর্মকাণ্ডে। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল গল্পের বই বা খেলার বল, সেই বয়সে তারা সিগারেট টানছে, পাহারাদার বসাচ্ছে এবং বিকৃত যৌন অনুকরণ করছে। ৯-১০ বছরের ছেলে-মেয়েরা ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে 'সংসার' করার নেশায় এই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আমাদের সন্তানদের এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

এই শিশুরা এসব শিখছে কোথায় থেকে? তারা যা দেখছে, তা-ই অনুকরণ করছে। আকাশ সংস্কৃতি, স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার এবং বাবা-মায়ের চরম উদাসীনতা তাদের এই পথে ধাবিত করছে। সন্তানকে জন্ম দেওয়াটাই শেষ কথা নয়; তাকে মানুষের মতো বড় করার দায়িত্বও পরিবারের। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক বাবা-মা সন্তানদের 'রাস্তার প্রাণীর' মতো ছেড়ে দেন। তারা কার সাথে মিশছে, কার কাছে যাচ্ছে, মোবাইল বা ইন্টারনেটে কী দেখছে এই নূন্যতম খবরটুকু রাখার প্রয়োজনীয়তা অনেকে অনুভব করেন না। ফাহিমা নামের যে শিশুটি প্রতিবেশী চাচার কাছে সিগারেট আনতে গিয়ে নিজের জীবন দিল, তার রক্ত আমাদের সবার হাতে লেগে আছে। কারণ, আমরা আমাদের প্রতিবেশীকেও আর বিশ্বাস করতে পারছি না।

লামিসা বা ফাহিমার মতো হাজারো শিশুর লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে কারণ রাষ্ট্র এখানে একটি নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। যখন কোনো অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া এতই দীর্ঘ এবং জটিল যে, অনেক সময় বিচার পেতে পেতে ভুক্তভোগীর পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল ভিআইপিদের জন্যই কি সীমাবদ্ধ? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের যে দায়বদ্ধতা থাকার কথা ছিল, তা আজ ভোটের রাজনীতি আর দুর্নীতির আড়ালে চাপা পড়েছে। অপরাধীদের অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালন-পালন করা হয়। ফলে, সোহেল রানার মতো ঘাতকরা গ্রিল কেটে পালানোর সাহস পায়। বিচার ব্যবস্থা যদি কার্যকর হতো, যদি প্রতিটি শিশু হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হতো, তবে হয়তো লামিসাদের রক্তে মেঝের লালিমা আজ আমাদের দেখতে হতো না।

বর্তমানে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে বাবা-মাকে প্রতিটি মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখতে হয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি পরিস্থিতি। যে প্রতিবেশী বিপদে এগিয়ে আসার কথা, তাকেই আজ ঘাতক হিসেবে ভাবতে হচ্ছে। সন্তানকে 'সেফটি স্কিল' বা 'গুড টাচ/ব্যাড টাচ' শেখানো আজ বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অন্যতম অংশ।

সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তারা যাতে কোনো ছোটখাটো অস্বস্তিও বাবা-মাকে খুলে বলতে পারে, সেই বিশ্বস্ততার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ, শিশুদের ওপর হওয়া অধিকাংশ নির্যাতনই ঘটে অতি পরিচিত মানুষদের দ্বারা। দারোয়ান, শিক্ষক, প্রতিবেশী এমনকি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও শিশুরা আজ নিরাপদ নয়।

একজন মা বা বাবার হাহাকার যখন এই পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিনি বলেন, "মেয়েদেরকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন... তাহলে আমাদের বলেন, আমরা এই দেশে মেয়ে জন্ম দেওয়া বন্ধ করে ফেলি," তখন বুঝতে হবে সমাজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই চরম উক্তিটি আসলে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার স্মারক।

লামিসা আজ নেই। কিন্তু আপনার ঘরে যে সন্তানটি এখনো হাসছে, খেলছে, সে কি নিরাপদ? তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি কে দেবে? রাষ্ট্র? আইন? নাকি সমাজ? বাস্তব সত্য হলো, কেউ আপনাকে গ্যারান্টি দেবে না। আপনাকে আপনার সন্তানের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি সেকেন্ড তাদের চোখে চোখে রাখতে হবে।

লামিসার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল যে, আমরা একটি অসুস্থ সমাজে বাস করছি। এই লাশের মিছিল থামানোর একমাত্র পথ হলো সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। সরকারকে বুঝতে হবে, উন্নয়নের বড় বড় অট্টালিকা কোনো কাজে আসবে না যদি সেই অট্টালিকার ভেতরের শিশুরা নিরাপদ না থাকে।

লামিসার রক্তমাখা নিথর দেহটি আমাদের একটি বার্তাই দিয়ে গেল হয় আমরা আমাদের সমাজকে আমূল বদলে ফেলবো, নয়তো একের পর এক লামিসাদের রক্তে আমাদের হাত রঞ্জিত হতে থাকবে। আজ আপনার সন্তান নিরাপদ আছে বলে আপনি শুকরিয়া আদায় করতে পারেন, কিন্তু আগামীকালের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। 

তাই সজাগ হতে হবে এখনই। 

Monday, May 18, 2026

এক অদম্য লড়াই ও কাঁচের সাম্রাজ্য জয়ের মহাকাব্য

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের গল্প থাকে যা কল্পবিজ্ঞানের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আয়োজিত সেই হাই-প্রোফাইল নৈশভোজের দৃশ্যটি কল্পনা করুন- একপাশে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, অন্যপাশে অ্যাপল সিইও টিম কুক। আর তাদের মাঝখানে বসে আছেন এক নারী, যার শান্ত চাউনি আর আত্মবিশ্বাসী হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য জয়ের এক অবিশ্বাস্য আখ্যান। তিনি ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী নারী। তার জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি হলো হাড়ভাঙা খাটুনি, অদম্য মেধা এবং সাহসের এক জ্বলন্ত দলিল।


ঝোউ কুনফেইয়ের জন্ম ১৯৭০ সালে মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। তার শৈশব ছিল বর্তমানের চাকচিক্যময় জীবনের ঠিক উল্টো। যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার মা মারা যান। তার বাবা ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর, কিন্তু এক ভয়াবহ কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারান এবং আঙুল হারান।
১৯৮০-এর দশকে চীন যখন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী কাজের সন্ধানে দক্ষিণ উপকূলে পাড়ি দিচ্ছিল। ঝোউও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, স্কুলের টিউশন ফি দিতে না পেরে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। হাতে কোনো টাকা নেই, নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা কেবল বুকে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমান গুয়াংডং প্রদেশের শেনজেনে।

ঝোউ কুনফেই, লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনের একসময়ের শীর্ষ ধনী 


পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। ছোট্ট ঝোউকে পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের কাজ, পশুপালন এবং দৃষ্টিহীন বাবার সেবা করতে হতো। অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে, অনেক সময় একবেলা খাবার জোটাতেও তাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তার ভেতর এক ইস্পাতকঠিন মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি কেবল তার নিজের হাতেই আছে।

শেনজেনে তিনি একটি কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ শুরু করেন, যেখানে ঘড়ির কাচ পালিশ করা হতো। তার কাজ ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে এবং পরিশ্রমের। দৈনিক এক ডলারের কম মজুরিতে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু ঝোউ অন্য সবার মতো ছিলেন না। দিনের বেলা হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন তার সহকর্মীরা বিশ্রামে যেতেন, ঝোউ তখন রাতের ক্লাসে অংশ নিতেন। তিনি অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার অপারেশন এবং ফায়ার ফাইটিংয়ের মতো বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। তার এই শেখার ক্ষুধা তাকে সাধারণ শ্রমিক থেকে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ানে পরিণত করে। কয়েক বছর কারখানায় কাজ করার পর ঝোউ অনুভব করলেন যে, অন্যের অধীনে থেকে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। ১৯৯৩ সালে, নিজের জমানো মাত্র ২০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৩,০০০ ডলার) মূলধন নিয়ে তিনি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার দুঃসাহস দেখান। শেনজেনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তার ভাই, ভাবি এবং কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে তিনি ঘড়ির কাচ তৈরির একটি ছোট কারখানা খোলেন।

২০০০ সালের পর মোবাইল ফোনের বিপ্লব শুরু হয়। ঝোউ কুনফেইয়ের ভাগ্য বদলে যায় যখন তার ছোট কারখানাটি চীনের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট টিসিএল থেকে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন তৈরির একটি বড় অর্ডার পায়। ঝোউ বুঝতে পেরেছিলেন যে, কাঁচের তৈরি স্ক্রিনই হবে ভবিষ্যতের স্মার্টফোনের প্রাণ। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকে তিনি ২০০৩ সালে লেন্স টেকনোলজি (Lens Technology) প্রতিষ্ঠা করেন।
লেন্স টেকনোলজির জন্য বড় সুযোগ আসে যখন তারা মার্কিন কোম্পানি মটোরোলার সাথে কাজ করার প্রস্তাব পায়। মটোরোলা তখন তাদের আইকনিক ফোনের জন্য স্ক্রিন খুঁজছিল। তাদের শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন স্ক্রিন হতে হবে স্ক্র্যাচ-প্রতিরোধী এবং টেকসই।

সে সময় ঝোউ নিজেই ছিলেন কোম্পানির প্রধান মেকানিক, সেলস এজেন্ট এবং ডেলিভারি পারসন। মেশিন নষ্ট হলে তিনি নিজেই তা মেরামত করতেন। গ্রাহক খুঁজে বের করতে তিনি মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। দীর্ঘ চার বছর তিনি এভাবে অমানুষিক পরিশ্রম করেন। সেই সময়টি ছিল তার জন্য এক বড় পরীক্ষা, যেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। প্রাথমিক দিনগুলোতে তারা কেবল দেশীয় ব্র্যান্ড এবং কিছু ক্লোন ফোনের জন্য স্ক্রিন তৈরি করত। কিন্তু ঝোউয়ের লক্ষ্য ছিল আকাশচুম্বী। তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে হলে গুণগত মানের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রজেক্টটি ছিল ঝোউয়ের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি। তিনি তার সমস্ত সম্পদ এবং পুঁজি এই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন। এমনকি নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। যদি এই প্রজেক্ট ব্যর্থ হতো, তবে তিনি নিঃস্ব হয়ে যেতেন। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস জয়ী হয়। লেন্স টেকনোলজি এমন এক গ্লাস প্যানেল তৈরি করে যা মটোরোলার মন জয় করে নেয়। মটোরোলা V3 বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়, আর রাতারাতি লেন্স টেকনোলজি বৈশ্বিক স্মার্টফোন সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে চলে আসে।

২০০৭ সাল ছিল বিশ্বপ্রযুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি। স্টিভ জবস প্রথম আইফোন উন্মোচন করেন। কিন্তু আইফোনের সেই বিখ্যাত গ্লাস টাচস্ক্রিন তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ। অ্যাপলের প্রয়োজন ছিল এমন কাচ যা অত্যন্ত পাতলা কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমের শক্ত। অনেকেই অবাক হন যে, অ্যাপলের টিম কুকের পাশাপাশি টেসলার ইলন মাস্ক কেন ঝোউ কুনফেইয়ের সাথে ঘনিষ্টতা বজায় রাখেন। এর উত্তর লুকিয়ে আছে লেন্স টেকনোলজির সাম্প্রতিক বৈচিত্র্যকরণের মধ্যে। স্মার্টফোনের বাজার জয়ের পর ঝোউ তার নজর ফেরান অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির দিকে।


১৫ বছর বয়সে স্কুল থেকে ঝরে পড়া সেই কিশোরী আজ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যের অধিপতি। ঝোউ কুনফেইয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশ মেধাকে দমাতে পারে না যদি সেখানে শ্রম আর একাগ্রতার মেলবন্ধন ঘটে। হুনানের এক অন্ধ বাবার ঘরে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তিনি আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতির টেবিলে মহাশক্তিধর দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশে আসন গ্রহণ করেন। স্টিভ জবসের কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে অনেক অভিজ্ঞ কোম্পানি পিছিয়ে গিয়েছিল। ঝোউ কুনফেই এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগ হিসেবে লুফে নেন। তিনি নিজে অ্যাপলের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে দীর্ঘ তিন মাস দিন-রাত এক করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন। তারা এমন এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন যা স্মার্টফোনের কাচকে অভূতপূর্ব স্থায়িত্ব দেয়। আইফোনের প্রথম প্রজন্মের গ্লাস প্যানেল সফলভাবে উৎপাদন করার পর লেন্স টেকনোলজি অ্যাপলের স্থায়ী অংশীদার হয়ে যায়। আইপ্যাড থেকে ম্যাকবুক অ্যাপলের প্রায় প্রতিটি ডিভাইসেই ঝোউয়ের তৈরি কাচ ব্যবহৃত হতে থাকে।

বর্তমান যুগের ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি (EV) কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি একটি "চাকা লাগানো স্মার্টফোন"। টেসলার মতো আধুনিক গাড়ির বড় বড় ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিন, উইন্ডশিল্ড এবং স্মার্ট গ্লাস লেন্স টেকনোলজি সরবরাহ করে। বর্তমানে টেসলা, বিএমডব্লিউ এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো প্রায় ৩০টি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অংশীদার ঝোউয়ের কোম্পানি। এছাড়া রোবোটিক্স খাতে প্রয়োজনীয় সেন্সর এবং জয়েন্ট মেকানিজমেও তারা বিনিয়োগ করছে। এই কারণেই মাস্ক এবং কুক উভয়ের জন্যই ঝোউ কুনফেই এক অপরিহার্য ব্যবসায়িক সহযোগী। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সাফল্য কোনো মিরাকল নয়, এটি হলো অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। তিনি একবার বলেছিলেন-

"আমার সাফল্যে কোনো রহস্য নেই। যখন অন্যরা হাল ছেড়ে দেয়, আমি তখনো চেষ্টা চালিয়ে যাই।" 

ঝোউ কুনফেই কেবল চীনের সবচেয়ে ধনী নারী নন, তিনি সারা বিশ্বের কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, কাঁচের মতো স্বচ্ছ কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত মনোবল থাকলে পৃথিবীর যেকোনো বাধা চূর্ণ করা সম্ভব।

নির্বাসিত শিকড় ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীর আন্তর্জাতিক বিভ্রম: ছিন্নমূল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

 

জোসেফ স্তালিন বলেছিলেন, কোনো জাতিকে বুঝতে হলে তারা কী পড়ে তা দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বাঙালি হিন্দুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি উল্টো- তারা কী লিখল না বা কী পড়ল না? ১৯৪৭-এর দেশভাগ কোনো সাধারণ সীমানা নির্ধারণ ছিল না; এটি ছিল একটি জনজাতির আত্মপরিচয়ের অপমৃত্যু। অথচ অদ্ভুতভাবে, এই ছিন্নমূল হিন্দু বাঙালির সৃজনশীল জগতে দেশভাগের যন্ত্রণা ‘নস্টালজিয়া’ হিসেবে দেখা দিলেও, তার রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক কারণগুলো এক প্রকার ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’-এর কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিক্ষিত হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা কেন তাঁদের স্বজাতির বাস্তুচ্যুত হওয়ার মূল কারণ নিয়ে নীরব থাকলেন? আপনি ঠিকই ধরেছেন, বাঙালি হিন্দু এলিট তখন ‘আন্তর্জাতিক’। তাঁরা তখন ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রাম, কিউবার বিপ্লব কিংবা গুয়াতেমালার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই নিয়ে যতটা সোচ্চার ছিলেন, শিয়ালদহ স্টেশনে পচে মরা নিজেরই ভাই-বোনের জন্য ততটা সরব ছিলেন না।

মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতা তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কাছে এক প্রকার ‘এসক্যাপিস্ট’ ড্রাগের মতো কাজ করেছে। নিজের জাতির ওপর হওয়া সাম্প্রদায়িক আঘাতকে স্বীকার করলে পাছে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা লেগে যায়, এই ভয়ে তাঁরা শ্রেণিসংগ্রামের মোড়কে জাতিগত নিধনকে ঢেকে দিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব পশ্চিমে দুই বাংলার চিত্র আছে, কিন্তু তা মূলত সম্পর্কের টানাপোড়েনের। দেশভাগের যে বীভৎস সাম্প্রদায়িক রূপ একজন সাধারণ মানুষকে ভিটেছাড়া করল, তার শিকড় কেন উপড়ে গেল- সেই রাজনৈতিক কারণগুলো এখানে অনেক নরম তুলিতে আঁকা।

অতীনের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ বা প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’র মত উপন্যাসগুলো মহাকাব্যিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেও দেশভাগ অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো এসেছে। মানুষের হাতে মানুষের তৈরি যে পরিকল্পিত উচ্ছেদ, তাকে প্রশ্ন করার চেয়ে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পাঞ্জাবিরা তাদের বিভীষিকাকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে (সাহাদাত হাসান মান্টো থেকে খুশবন্ত সিং)। কিন্তু বাঙালি তার ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের কারণে নিজের ওপর হওয়া ক্ষতকে বিশ্বের কাছে গোপন করে গেল।

ঋত্বিক ঘটক বাঙালির শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হতে পারতেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বা ‘সুবর্ণরেখা’য় তিনি ছিন্নমূল জীবনের হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনিও শেষমেশ কফি হাউসের ‘আঁতেল’ বিপ্লবের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে পারেননি। পোলানস্কি যেভাবে ইহুদি নিধনকে বিশ্ববিবেকের সামনে ন্যাংটো করে দিয়েছিলেন, ঋত্বিক সেই স্তরে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পক্ষকে দায়ী করতে পারেননি। ফলে তাঁর কাজগুলোও ‘আধা-আঁতেল’ খোরাক হয়েই রয়ে গেল।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের লড়াই। কিন্তু মার্কিন নথিপত্র এবং ব্লাড টেলিগ্রাম প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল টার্গেট ছিল বাঙালি হিন্দুরা। অথচ যুদ্ধের পরবর্তী বয়ানে কৌশলে ‘হিন্দু হত্যা’ শব্দবন্ধটিকে সরিয়ে ‘বাঙালি হত্যা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলো। এটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার এক করুণ প্রচেষ্টা, যা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।

বাংলাদেশ যেহেতু নামে শুধুমাত্র ধর্ম নিরপেক্ষ হলে আদতে একটি পরিপূর্ন ইসলামি রাষ্ট্র তাই সেই রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে আলাপ কিছুটা সংকুচিত করে আমরা যদি ওপার বাংলার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাবো, সেখানকার আজকের তৃণমূল, কংগ্রেস বা বামপন্থীদের একটা বড় অংশই কিন্তু পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের সন্তান। কিন্তু তাঁরা কেন নিজেদের শিকড় নিয়ে নীরব? কারণ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতিতে ‘সংখ্যালঘু ভোট’ একটি নির্ণায়ক শক্তি। তাঁরা মনে করেন, যদি ওপার বাংলায় হিন্দুদের ওপর হওয়া ঐতিহাসিক বা বর্তমান অত্যাচারের কথা তাঁরা জোরে বলেন, তবে তা মেরুকরণ ঘটাবে এবং প্রকারান্তরে বিজেপি-র ফায়দা হবে। এই রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আজ নিজভূমে পরবাসী হওয়ার স্মৃতিকেও তাঁরা অস্বীকার করেন।

ভারতের গণতন্ত্রে মুসলমানরা একটি শক্তিশালী ‘প্রেসার গ্রুপ’। তাঁরা ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে রাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষি করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি নেই। সেখানে কোনো প্রকৃত ‘ইলেক্টরাল কালচার’ গড়ে ওঠেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের সমালোচনা করার স্পেস সেখানে শূন্য। ফলস্বরূপ, ওখানকার সংখ্যালঘুরা আজ কোণঠাসা। তাদের আত্মরক্ষা এখন আর রাজনৈতিক নয়, তা পেশিশক্তি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। যেমন- হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা পরিষদ, রানা দাশগুপ্ত, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মত মানুষের কাঁধে গিয়ে পরেছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী : ছবি ডেইলিস্টার


চিন্ময়কৃষ্ণ দাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন। তিনি গত সত্তর বছরের ‘অ্যানেস্থেটিক’ ড্রাগে ঘুমিয়ে থাকা এক জাতির হঠাৎ জেগে ওঠার উপসর্গ। বাঙালি হিন্দু যখন দেখল তার সাহিত্যিকরা তাকে ধোঁকা দিয়েছেন, তার রাজনীতিবিদেরা তাকে ভোটের গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তখন তারা বাধ্য হয়েই ধর্মের আধারে নিজের অস্তিত্ব খুঁজছে। এটি কোনো লুম্পেন শক্তির উত্থান নয়, এটি আসলে এক দীর্ঘকালীন ‘অস্তিত্বের সংকট’-এর বহিঃপ্রকাশ।

মানব কর্তৃত্বের অবসান

ইতিহাসবিদ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষ, যিনি অতীতের কোনো ধূলিমলিন দলিল, কয়েকশ বছর আগের কোনো যুদ্ধ অথবা কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশের উত্থান-পতন নিয়ে গবেষণায় মগ্ন। কিন্তু আমি নিজেকে সেই প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। আমি ইতিহাসকে দেখি এক বিশাল ক্যানভাস হিসেবে, যেখানে অতীত কেবল পেছনের গল্প নয় বরং আগামীকে বোঝার একমাত্র দর্পণ। সত্তর হাজার বছর আগে আমরা যখন পূর্ব আফ্রিকায় এক তুচ্ছ প্রাণী হিসেবে ঘুরে বেড়াতাম, তখন আমাদের প্রভাব এই পৃথিবীর বুকে জেলিফিশ বা কাঠঠোকরার চেয়ে বেশি ছিল না। আজ সেই অবস্থা থেকে আমরা পুরো গ্রহের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছি। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কেন আমরা অন্য সব প্রাণীকে ছাড়িয়ে গেলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, মানুষের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত অলৌকিক ক্ষমতা। যা হলো বড় স্কেলে, অত্যন্ত নমনীয়ভাবে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করার ক্ষমতা। শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে চেনে এবং সহযোগিতা করে, কিন্তু তাদের দল ২০ বা ৩০ জনের বেশি বড় হতে পারে না। আবার মৌমাছি বা পিঁপড়েরা লাখ লাখ সংখ্যায় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু তাদের সেই সহযোগিতা অত্যন্ত যান্ত্রিক ও অনমনীয়। মৌচাকে নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে তারা তাদের সামাজিক কাঠামো রাতারাতি বদলে ফেলতে পারে না। মানুষই একমাত্র জীব, যে একই সাথে লাখ লাখ অচেনা মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে নিজের নিয়ম বদলে ফেলতে পারে।

কিন্তু এই নমনীয় সহযোগিতার আসল চাবিকাঠি কী? এর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের কল্পনাশক্তিতে। আমরা এমন সব মিথ, গল্প এবং কাল্পনিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারি এবং সম্মিলিতভাবে তা বিশ্বাস করতে পারি, যার কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বে নেই। দেশ, মুদ্রা, কোম্পানি, আইন, মানবাধিকার, ধর্ম ...... এসবই মানুষের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী একেকটি গল্প। পকেট থেকে একটি কাগজের নোট বের করে যখন আমি অন্য একজন অচেনা মানুষকে দিই, সে আমাকে খাবার দেয়। কেন? কারণ আমরা দুজনেই বিশ্বাস করি যে, এই কাগজের টুকরোটির একটি মূল্য আছে। এই যে সম্মিলিত বিশ্বাসের ক্ষমতা, এটাই আমাদের এই গ্রহের শাসক বানিয়েছে।

তবে আজ আমি এখানে অতীতের গল্প বলতে আসিনি। আজ আমি বলতে এসেছি আমাদের ভবিষ্যতের কথা। আজ আমি যে সত্যটি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই, তা হয়তো অনেকের কাছে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং রূঢ় মনে হতে পারে। আমার বিশ্বাস, আমরা অর্থাৎ আজ যারা এই গ্রহে উপস্থিত আছি তারা হয়তো আধুনিক মানব প্রজাতির শেষ কয়েকটি প্রজন্মের একটি। আগামী এক বা দুই শতাব্দীর মধ্যে আমাদের মতো মানুষ এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের স্থান দখল করবে এমন কিছু সত্তা বা জীব, যারা আমাদের চেয়ে ততটাই আলাদা হবে, যতটা আমরা শিম্পাঞ্জি বা নিয়ানডার্থালদের থেকে আলাদা।

এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এটি হলো মানুষের হাত থেকে ‘কর্তৃত্ব’র স্থানান্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা নিজেদের হাতে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পুঞ্জীভূত করেছি, তা এখন আমাদের অজান্তেই চলে যাচ্ছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের হাতে। এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে তাকাতে হবে আমরা কীভাবে আজকের এই মানবকেন্দ্রিক বিশ্বে এসে পৌঁছালাম, তার দিকে।


গত দুই থেকে তিন শতক ধরে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, তা একটি বিশেষ মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত। একে আমরা বলি ‘হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ। কিন্তু মানবতাবাদের আগের যুগটি কেমন ছিল?

মানবতাবাদের পূর্বে, মানুষ বিশ্বাস করত যে এই মহাবিশ্বের এবং আমাদের জীবনের সমস্ত কর্তৃত্বের উৎস আমাদের ভেতরে নেই। কর্তৃত্বের উৎস ছিল মেঘের ওপরে, স্বর্গে- অর্থাৎ ঈশ্বরের হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি বা নৈতিকতার ক্ষেত্রে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হলে মানুষ নিজের মনের কথা শুনত না। তারা দ্বারস্থ হতো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের, কিংবা পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবিদার পুরোহিত, পোপ, রাব্বাই বা শামানদের কাছে। মানুষ বিশ্বাস করত যে ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র ঈশ্বর।

কিন্তু গত দুই-তিনশ বছরে এক অভূতপূর্ব জাগতিক ও মানসিক বিপ্লব ঘটল। আমরা কর্তৃত্বকে আকাশ থেকে নামিয়ে নিয়ে এলাম মাটির পৃথিবীতে, মানুষের নিজের বুকের ভেতর। এই হিউম্যানিস্ট বিপ্লব ঘোষণা করল: এই মহাবিশ্বে মানুষের অনুভূতি এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার  চেয়ে বড় কোনো কর্তৃত্ব নেই। মানবতাবাদ আমাদের শেখাল যখনই তুমি জীবনে কোনো সংকটে পড়বে, সে তোমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সিদ্ধান্তই হোক বা পুরো দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হোক, তোমাকে বাইবেল বা কোনো বড় নেতার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। তোমাকে তাকাতে হবে নিজের ভেতরের দিকে। শুনতে হবে নিজের হৃদয়ের আওয়াজ।

আমরা শৈশব থেকে হাজার বার এই স্লোগানগুলো শুনেছি: "নিজের মনের কথা শোনো" (Listen to yourself), "হৃদয় যা বলে তা-ই করো", "যা তোমাকে আনন্দ দেয়, সেটাই করো"। আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মানবতাবাদী দর্শন কীভাবে মিশে আছে, তা একটু বিশদভাবে দেখা যাক।

আজকের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে মানুষের অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যখন বলি "ভোটারই সব ক্ষমতার উৎস" বা "ভোটারই সবচেয়ে ভালো বোঝেন", তখন আমরা আসলে হিউম্যানিজমের কথাই বলি। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি কে হবেন, বা দেশের নীতি কেমন হবে—এই জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা কোনো পরম জ্ঞানী ব্যক্তি, কোনো নোবেলজয়ীদের কাউন্সিল কিংবা ঈশ্বরের প্রতিনিধিদের কাছে যাই না। আমরা দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে যাই এবং জিজ্ঞেস করি, "আপনি কী মনে করেন? আপনার কী মনে হয়?"

ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একজন মানুষ যখন ব্যালটে সিল দেন, তখন তিনি কোনো জটিল গাণিতিক হিসাব বা বিশুদ্ধ যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে ভোট দেন না; তিনি ভোট দেন তাঁর অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে। কেউ একজন প্রার্থীকে দেখে ভরসা পান, কাউকে দেখে তাঁর রাগ হয়, কেউ আশাবাদী হন। এই অনুভূতিগুলোর ওপরে কোনো উচ্চতর আদালত নেই। আধুনিক গণতন্ত্রে আপনি কোনো ভোটারকে গিয়ে বলতে পারেন না যে, "হ্যাঁ, আপনি এই নেতাকে পছন্দ করছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার চেয়ে উচ্চতর কোনো শক্তি বলছে যে আপনি ভুল করছেন।" মধ্যযুগে এমনটা বলা সম্ভব হলেও, আধুনিক মানবতাবাদী রাজনীতিতে ভোটারের অনুভূতিই শেষ কথা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে হিউম্যানিজমের রূপটি হলো "ক্রেতাই সর্বদা সঠিক" (The customer is always right)। একটি পণ্য ভালো না মন্দ, কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল—তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো পলিটব্যুরো বা রাষ্ট্রীয় কমিটির হাতে নেই। তা নির্ধারণ করে ক্রেতার ইচ্ছা, পছন্দ এবং তাঁর খেয়ালখুশি। ক্রেতারা তাদের ক্রেডিট কার্ড বা টাকা দিয়ে ভোট দেয়।

ধরা যাক, টয়োটা বা ফোর্ড কোম্পানি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও সেরা গাড়িটি তৈরি করতে চায়। এর জন্য তারা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের একত্র করল। সাথে নিল সেরা সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং অস্কারজয়ী শিল্পীদের। তারা সবাই মিলে চার বছর ধরে গবেষণা করে, নকশা তৈরি করে একটি ‘নিখুঁত গাড়ি’ উৎপাদন করল এবং বাজারে ছাড়ল। কিন্তু শোরুমে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্রেতারা সেই গাড়ি কিনছে না।

এখন হিউম্যানিস্ট অর্থনীতিতে এর অর্থ কী? এর অর্থ কি এই যে ক্রেতারা বোকা এবং তারা ভুল করছে? একদমই নয়। এর অর্থ হলো, ওই নোবেলজয়ীরা এবং বড় বড় বিশেষজ্ঞরা সবাই ভুল করেছিলেন। ক্রেতার অনুভূতির চেয়ে বড় কোনো বিশেষজ্ঞ এই বাজারে নেই। কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রে হয়তো রাষ্ট্র এসে বলতে পারত, "আমাদের পলিটব্যুরো অনেক ভেবেচিন্তে এই গাড়িটি সোভিয়েত শ্রমিকের জন্য নির্ধারণ করেছে, অতএব আপনাদের এটাই ব্যবহার করতে হবে।" কিন্তু মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ক্রেতার ইচ্ছাই পরম আইন।

শিল্পকলার জগতেও হিউম্যানিজম এক বড় পরিবর্তন এনেছে। আমরা বলি, "সৌন্দর্য থাকে দর্শকের চোখে" (Beauty is in the eye of the beholder)। হাজার বছর ধরে দার্শনিকরা থিওরি দিয়েছেন যে সৌন্দর্য একটি বস্তুনিষ্ঠ বা ঐশ্বরিক বিষয়। ঈশ্বর বা প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয় কোনটা সুন্দর আর কোনটা কুৎসিত। কিন্তু মানবতাবাদী নান্দনিকতা এই কর্তৃত্বকে মানুষের অনুভূতির ওপর ছেড়ে দিল।

ঠিক এক শতাব্দী আগে, ১৯১৭ সালে, ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ (Marcel Duchamp) বাজার থেকে একটি সাধারণ সিরামিকের ইউরিনাল বা প্রস্রাবাগার কিনে আনলেন। সেটির ওপর একটি ভুয়া নাম সই করে সেটিকে একটি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শন করলেন এবং নাম দিলেন ‘ফাউন্টেন’ (Fountain)। আজ পৃথিবীর যেকোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট হিস্ট্রির ক্লাসে প্রথম সপ্তাহে এই ছবিটা দেখানো হয়। অধ্যাপক ছবিটি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেন, "বলুন তো, এটা কি শিল্প?"

মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কেউ বলে এটা শিল্প, কেউ বলে এটা স্রেফ একটা নোংরা জিনিস। কিন্তু আলোচনার শেষে অধ্যাপক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তা হলো—শিল্পের কোনো অবজেক্টিভ বা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। মানুষ যদি কোনো কিছুকে শিল্প হিসেবে দেখে এবং তার জন্য লাখ লাখ ডলার খরচ করতে প্রস্তুত থাকে, তবে সেটাই শিল্প। আপনি যদি মনে করেন দুশাঁ-র ওই ইউরিনালটি একটি চমৎকার শিল্পকর্ম, তবে পৃথিবীর কারো ক্ষমতা নেই আপনাকে ভুল প্রমাণ করার।

ভালো ও মন্দ, পুণ্য ও পাপের ধারণাও আজ হিউম্যানিজম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মধ্যযুগে যদি কেউ সমকামিতার কথা বলত, চার্চ এসে বলত—এটা এক মহাপাপ। কেন? কারণ বাইবেলে লেখা আছে, পোপ বলেছেন, ঈশ্বর নিষেধ করেছেন। সেখানে সেই মানুষের অনুভূতি কেমন, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

কিন্তু আজ হিউম্যানিস্ট নৈতিকতার যুগে আমরা জিজ্ঞেস করি, "ঈশ্বর কী বলেছেন বা ধর্মগ্রন্থে কী লেখা আছে, তা আমাদের প্রধান বিবেচ্য নয়। আমরা দেখতে চাই এর দ্বারা মানুষের অনুভূতিতে কী প্রভাব পড়ছে।" যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, তারা একসাথে সুখী হয় এবং এর দ্বারা অন্য কোনো মানুষের ক্ষতি না হয়—তবে এতে পাপের কী থাকতে পারে? হিউম্যানিজম বলে, যদি কোনো কাজ কাউকে আঘাত না করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনন্দ দেয়, তবে তা নৈতিকভাবে সঠিক।

এমনকি আজ যদি কোনো ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী কোনো কিছুর বিরোধিতা করতে চায়, তারাও কিন্তু এখন আর শুধু "ঈশ্বরের আদেশ" বলে চিৎকার করে না। তারা আধুনিক মিডিয়ার সামনে এসে বলে, "এই বিষয়টি আমাদের অনুভূতিতে আঘাত হানছে" (It hurts our feelings)। অর্থাৎ, তারাও বুঝে গেছে যে আধুনিক বিশ্বে নিজের দাবি টিকিয়ে রাখতে হলে ঈশ্বরের আইনের চেয়ে মানুষের অনুভূতির দোহাই দেওয়া বেশি কার্যকর।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যও হিউম্যানিজম বদলে দিয়েছে। অতীতে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল একজন শিক্ষার্থীকে বাইরের কোনো পরম শক্তির সাথে জুড়ে দেওয়া—তা সে ঈশ্বরই হোক বা প্রাচীন জ্ঞানীদের কোনো গ্রন্থই হোক। তখন মুখস্থ বিদ্যা এবং শাস্ত্রীয় শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হতো।

কিন্তু আজ যেকোনো কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে যান এবং জিজ্ঞেস করুন, "আপনার শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী?" তারা সবাই একবাক্যে বলবেন, "আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের ফিজিক্স, ম্যাথ বা হিস্ট্রি যাই শেখাই না কেন, আমার মূল লক্ষ্য হলো তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখানো, যাতে তারা নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারে"। কারণ মানুষের নিজের চিন্তাই হলো তার জীবনের সর্বোচ্চ গাইড।


মানবতাবাদের এই যে বিশাল ও সুন্দর প্রাসাদ যা মানুষের অনুভূতি, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আর তার সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে- তা আজ এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। তবে এই সংকট কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী বা উত্তর কোরিয়া কিংবা রাশিয়ার একনায়কদের কাছ থেকে আসছে না। এই মারাত্মক হুমকিটি ধেয়ে আসছে সিলিকন ভ্যালির গবেষণাগার, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্রগুলো থেকে।

আজকের লাইফ সায়েন্স বা জীবনবিজ্ঞান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষকেরা আমাদের বলছেন যে, হিউম্যানিজমের এই পুরো গল্পটি আসলে একটি ভুল এবং সেকেলে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। হিউম্যানিজম ধরে নেয় মানুষের একটি ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বা 'Free will' আছে এবং মানুষের অনুভূতি হলো এক পরম পবিত্র বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রমাণ করছে যে, "স্বাধীন ইচ্ছা" বলে আসলে কিছু নেই।

ভৌত ও জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানের কাছে প্রকৃতির কেবল দুই ধরনের প্রক্রিয়া জানা আছে—একটিকে আমরা বলি ‘ডিটারমিনিস্টিক’ বা পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া (Deterministic processes), আর অন্যটি হলো ‘র‍্যান্ডম’ বা সম্পূর্ণ আকস্মিক প্রক্রিয়া (Random processes)। এই দুটির মিশ্রণে একটি সম্ভাব্যতা বা প্রবাবিলিস্টিক ফলাফল আসতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে "স্বাধীনতা" বা 'Freedom' বলে কিছু থাকে না। মানুষ যেভাবে ঈশ্বর, স্বর্গ ও নরকের ধারণা তৈরি করেছে, ঠিক একইভাবে সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে "স্বাধীন ইচ্ছা"র ধারণাটি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সত্য এটাই যে, মানবদেহের জিন, নিউরন আর হরমোনের বাইরে এমন কোনো অদৃশ্য সত্তা নেই যা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তাহলে আমাদের অনুভূতিগুলোর কী হবে? প্রেম, বিরহ, ভয়, আনন্দ—এগুলো কি মিথ্যা? না, অনুভূতিগুলো মিথ্যা নয়, এগুলো বাস্তব। কিন্তু এগুলো কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নয়। বিজ্ঞান বলছে, অনুভূতি হলো আসলে ‘বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদম’।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গত এক শতাব্দীর গবেষণাকে যদি আমি মাত্র তিনটি শব্দে প্রকাশ করতে চাই, তবে তা হবে: "Organisms are algorithms" (জীব হলো এক ধরনের অ্যালগরিদম)। শিম্পাঞ্জি, তিমি বা মানুষের অনুভূতিগুলো আসলে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়, এগুলো হলো জীবনসংগ্রাম ও বংশবৃদ্ধির তাগিদে প্রকৃতি দ্বারা লাখ লাখ বছর ধরে তৈরি হওয়া এক জটিল গাণিতিক হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরা যাক, আফ্রিকার সাভানাতে একটি বাবুন বানর হেঁটে যাচ্ছে। টিকে থাকার জন্য তাকে খাবার খুঁজতে হবে, আবার এটাও খেয়াল রাখতে হবে যেন সে নিজে কারো খাবার না হয়ে যায়। হঠাৎ সে একটি গাছে অনেকগুলো পাকা কলা দেখতে পেল। কিন্তু একই সাথে সে দেখল, গাছের কিছু দূরে একটি সিংহ বসে আছে। এখন বাবুনটিকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে- সে কি কলার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখবে, নাকি ওখান থেকে চলে যাবে?

এই সিদ্ধান্তটি আসলে কিসের সিদ্ধান্ত? এটি মূলত সম্ভাবনার হিসাব-নিকাশ। বাবুনটিকে মনে মনে হিসাব করতে হবে: আমি যদি কলার দিকে না যাই, তবে ক্ষুধায় আমার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? আর আমি যদি কলার দিকে যাই, তবে সিংহটি আমাকে ধরে ফেলার সম্ভাবনা কতটুকু? কোন সম্ভাবনাটি বেশি?

এই হিসাবটি করার জন্য বাবুনটির প্রচুর তথ্যের বা ডাটার প্রয়োজন।

  • কলার ডাটা: কলাগুলো গাছ থেকে কত উঁচুতে আছে? সেখানে কয়টি কলা আছে? সেগুলো কি বড় নাকি ছোট? পাকা নাকি কাঁচা? দশটি বড় পাকা কলা হলে এক হিসাব, আর দুটি ছোট কাঁচা কলা হলে অন্য হিসাব।

  • সিংহের ডাটা: সিংহটি গাছ থেকে কত দূরে আছে? সে কি ঘুমাচ্ছে নাকি জেগে আছে? সিংহটিকে দেখে কি ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে নাকি তার পেট ভরা? সে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে?

  • নিজের ডাটা: আমি নিজে কতটুকু ক্ষুধার্ত? আমি কত জোরে দৌড়াতে পারি?

এখন এই সমস্ত ডাটা বা তথ্যকে একত্র করে বাবুনটিকে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বাবুনটি তো আর পকেট থেকে কাগজ-কলম বা ক্যালকুলেটর বের করে প্রবাবিলিটি থিওরি মেলাবে না। তাহলে সে কীভাবে এই হিসাব করে?

আসলে, বাবুনটির পুরো শরীরটাই হলো একটি ক্যালকুলেটর। তার চোখ, কান, নাক চারপাশের পরিবেশ থেকে এই ডাটাগুলো সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন এবং পুরো স্নায়ুতন্ত্র মিলে মুহূর্তের মধ্যে বায়োকেমিক্যাল প্রসেসিং সম্পন্ন করে। এই হিসাবের ফলাফলটি কিন্তু কোনো সংখ্যা বা পার্সেন্টেজ হিসেবে ভেসে ওঠে না; ফলাফলটি প্রকাশ পায় একটি তীব্র ‘অনুভূতি’ বা ইমোশন হিসেবে।

যদি হিসাবের ফল বলে যে কলার দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, তবে বাবুনের শরীরে এক বিশেষ হরমোন নিঃসৃত হবে এবং সে নিজের ভেতরে ‘সাহস’ অনুভব করবে। তার বুক ফুলে উঠবে এবং সে কলার দিকে দৌড় দেবে। আর যদি হিসাবের ফল বলে যে ঝুঁকি বেশি, তবে তার শরীরে অন্য রাসায়নিক কাজ করবে যা তাকে ‘ভয়’ হিসেবে নাড়া দেবে এবং সে ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচবে।

আমরা যাকে মনের তাগিদ, অনুভূতি বা হৃদয় বলি—তা আসলে লাখ লাখ বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এক অত্যন্ত উন্নত জৈবিক অ্যালগরিদম, যা আমাদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।


এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, অর্থাৎ জীব যে একটি অ্যালগরিদম—এই তত্ত্বটি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের বাস্তব জীবনে কোনো বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেন পারেনি? কারণ কোনো চার্চ, কোনো সরকার বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি (KGB)-র পক্ষেও একজন মানুষের শরীরের ভেতরের ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না।

ধরা যাক, কেজিবি আপনার পেছনে ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখল। আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন- সব তারা রেকর্ড করল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেজিবির পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে আপনার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর ভেতরে কী ঘটছে, আপনার রক্তচাপ কেন বাড়ছে বা আপনার ডিএনএ-র গঠন কেমন। তাদের কাছে সেই বায়োলজিক্যাল জ্ঞানও ছিল না, আর সেই বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রসেস করার মতো কম্পিউটার বা প্রসেসিং পাওয়ারও ছিল না।

তাই এতদিন পর্যন্ত হিউম্যানিজমের এই পরামর্শটিই সেরা ছিল যে "তুমি পোপের কথা শুনো না, স্টালিনের কথা শুনো না, নিজের অনুভূতির কথা শোনো।" কারণ আপনার অনুভূতিই ছিল এই পৃথিবীর সবচেয়ে পরীক্ষিত ও সফল অ্যালগরিদম।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এসে আমরা দুটি বিশাল বৈজ্ঞানিক সুনামির মুখোমুখি হয়েছি, যা পরস্পরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। ১. একদিকে, ডারউইনের পর থেকে আমরা মানবদেহ, মস্তিষ্ক এবং মানুষের আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট বায়োলজিক্যাল জ্ঞান অর্জন করছি। ২. অন্যদিকে, কম্পিউটার সায়েন্সের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রনিক অ্যালগরিদম তৈরি করছি।

আজ যা ঘটছে, তা হলো এই দুটি সুনামির মিলন—অর্থাৎ বায়োটেক এবং ইনফোটেক -এর দেয়ালটি ভেঙে এক হয়ে যাচ্ছে। গুগল, অ্যামাজন, অ্যাপল বা ফেসবুক—যারা একসময় নিছক তথ্যপ্রযুক্তির কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা আজ ক্রমেই বায়োটেক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, মানুষের শরীর এবং মনের মেকানিজমও আসলে কোডিং আর ডাটার খেলা।

আমরা এমন এক বিন্দুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যেখানে এই প্রযুক্তি জায়ান্টদের তৈরি করা বাহ্যিক অ্যালগরিদমগুলো (External algorithms) আমাদের নিজেদের চেয়েও আমাদের অনেক ভালো বুঝতে পারবে। তাদের কাছে থাকবে আমাদের বায়োলজিক্যাল ডাটা, আমাদের জিনগত কোড এবং তা বিশ্লেষণ করার মতো কোয়ান্টাম কম্পিউটিং পাওয়ার। আর যেদিন এই বাহ্যিক অ্যালগরিদমটি আপনাকে আপনার নিজের চেয়ে ভালো চিনবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষের থেকে কর্তৃত্বের চাবিকাঠি চলে যাবে অ্যালগরিদমের কাছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই কর্তৃত্ব বদলের খেলা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগের হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির একটি ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি একটি ডিএনএ টেস্ট করিয়েছিলেন। সেই টেস্টের রিপোর্টে দেখা গেল তাঁর শরীরে 'BRCA1' নামক জিনের একটি বিপজ্জনক মিউটেশন রয়েছে। বিগ ডাটা (Big Data) এবং পরিসংখ্যানের হিসাব অনুযায়ী, যে নারীদের শরীরে এই নির্দিষ্ট মিউটেশনটি থাকে, তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮৭%।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এই পরীক্ষাটি করিয়েছিলেন, তখন তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তাঁর নিজের অনুভূতি বা শরীর তাঁকে বলছিল না যে তিনি অসুস্থ। কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো অস্বস্তি ছিল না। হিউম্যানিজমের ভাষায় বললে, তাঁর হৃদয় বলছিল—"তুমি একদম ঠিক আছ, জীবন উপভোগ করো।" কিন্তু বিগ ডাটার অ্যালগরিদম তাঁকে বলছিল অন্য কথা, "তোমার শরীরের ভেতরে একটি টাইম বোম টিকটিক করছে। তুমি হয়তো এখন কিছুই টের পাচ্ছ না, কিন্তু ভেতরের সত্যটা ভিন্ন।"

অ্যাঞ্জেলিনা জোলি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের অনুভূতির চেয়ে অ্যালগরিদমের সেই গাণিতিক হিসাবকে বেশি বিশ্বাস করলেন। তিনি কোনো লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচার (Double mastectomy) করালেন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিবন্ধ লিখে অন্য নারীদেরও এই বিষয়ে সচেতন করলেন। এই যে নিজের অনুভূতিকে পাশে সরিয়ে রেখে একটি বাহ্যিক অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ওপর নিজের জীবন সঁপে দেওয়া—এটাই হলো একবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত রূপ। ভবিষ্যতে আমরা কেউই আর নিজের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত নেব না; আমাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইস (Wearable devices) সার্বক্ষণিক আমাদের রক্ত, হরমোন আর হার্টবিট মেপে আমাদের চেয়ে আগে বলে দেবে আমাদের কখন কোন ওষুধ খেতে হবে বা কোন অপারেশন করাতে হবে।


ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে আমরা দেখব, মধ্যযুগের ধর্মগুলো বলত—কর্তৃত্ব আকাশ থেকে আসে। এরপর হিউম্যানিজম এসে বলল—কর্তৃত্ব মানুষের অনুভূতি থেকে আসে। আর আজ আমাদের চোখের সামনে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বৈশ্বিক ধর্ম বা মতাদর্শ, যাকে আমি বলি ‘ডাটাইজম’ (Dataism)। ডাটাইজম বিশ্বাস করে যে এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের উৎস হলো ‘ডাটা’ বা তথ্য। এই মতাদর্শ মানুষের হাত থেকে কর্তৃত্বকে পুনরায় আকাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—তবে তা কোনো ঈশ্বরের স্বর্গ নয়, তা হলো ‘গুগল ক্লাউড’ বা ‘মাইক্রোসফট ক্লাউড’।

ডাটাইজম মানুষকে বলছে: "তোমার নিজের হৃদয়ের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি গুগলের কথা শোনো, অ্যামাজনের কথা শোনো। কারণ তুমি কী অনুভব করছ এবং কেন অনুভব করছ—তা তোমার চেয়ে তারা অনেক নিখুঁতভাবে জানে। তাই তোমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তটি তারাই নিতে পারবে।"

একজন লেখক এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি সবসময় ভালোবাসিকে মাটির কাছাকাছি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝতে। চলুন দেখা যাক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সিদ্ধান্তগুলো এই অ্যালগরিদমের প্রভাবে কীভাবে বদলে যাচ্ছে।

খুব সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত—"আমি আজ কোন বইটি পড়ব?"

  • মধ্যযুগে আপনি এই প্রশ্ন নিয়ে যেতেন চার্চের পুরোহিতের কাছে। তিনি বলতেন, "বাইবেল পড়ুন। এর বাইরে আর কোনো বই পড়ার প্রয়োজন নেই।"

  • হিউম্যানিজমের যুগে আপনি যেতেন একটি বইয়ের দোকানে। বইগুলোর তাকের মাঝখান দিয়ে হাঁটতেন, দু-একটি বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতেন এবং নিজের ভেতরের একটি ‘গাট ইনস্টিনক্ট’ বা মনের টানে একটি বই কিনে বাড়ি ফিরতেন।

  • আর আজ, ডাটাইজমের প্রাথমিক যুগে আমরা যখন অ্যামাজনের ভার্চুয়াল বুকশপে ঢুকি, একটি অ্যালগরিদম স্ক্রিনে ভেসে উঠে বলে—"আমি তোমাকে চিনি। গত কয়েক বছর ধরে তুমি কী কী বই কিনেছ, কোন বিষয়গুলো পছন্দ করেছ তা আমি জানি। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমি তোমাকে এই তিনটি বই পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।"

কিন্তু এটি তো কেবল শুরু, অত্যন্ত প্রাথমিক একটি পদক্ষেপ। এর পরের ধাপটি আরও চমকপ্রদ এবং কিছুটা ভয়ানক, যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা যখন কিন্ডল (Kindle) বা কোনো ই-রিডারে বই পড়ি, তখন আমরা ভাবি আমরা বইটি পড়ছি। কিন্তু সত্য হলো—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, আপনি যখন বইটি পড়ছেন, বইটি একই সাথে আপনাকে পড়ছে! গুটেনবার্গের ছাপাখানার বই কখনো মানুষকে পড়তে পারত না। কিন্তু কিন্ডল জানে আপনি বইয়ের কোন পাতাটি কত দ্রুত পড়ছেন, কোন লাইনে এসে আপনি থমকে গেছেন, আর কোন পৃষ্ঠায় যাওয়ার পর আপনি বইটি বন্ধ করে দিয়েছেন এবং আর কখনোই খোলেননি।

এখন কল্পনা করুন, এই ই-রিডারকে যদি আপনার ডিভাইসের ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial recognition) বা মুখাবয়ব চেনার প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা হয়, তবে কিন্ডল বুঝতে পারবে বইয়ের কোন লাইনটি পড়ে আপনি হাসলেন, কোন অংশটি পড়ে আপনার চোখে জল এলো, আর কোথায় গিয়ে আপনি বিরক্ত হলেন।

এর চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে, যখন এই রিডারকে আপনার হাতের স্মার্টওয়াচ বা শরীরের ভেতরের কোনো বায়োমেট্রিক সেন্সরের সাথে যুক্ত করা হবে, তখন অ্যামাজন বা গুগল জানতে পারবে তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়ার সময় কোন বাক্যটিতে আপনার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, কোন দৃশ্যে আপনার হার্টবিট দ্রুত হয়েছিল আর কোথায় আপনার শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসৃত হয়েছিল।

আপনি হয়তো বইটি শেষ করার পর তার অর্ধেকের বেশি ভুলে যাবেন, কিন্তু অ্যামাজন কিছুই ভুলবে না। বইটি পড়া শেষ হওয়ার পর অ্যামাজন আপনার মনস্তত্ত্বের এমন একটি নিখুঁত প্রোফাইল তৈরি করে ফেলবে, যা দিয়ে সে আপনার ইমোশনাল বোতামগুলো ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

বই কেনার চেয়েও মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো সঙ্গী নির্বাচন—কাকে আমি বিয়ে করব, কার সাথে আমি জীবন কাটাব? বিবর্তনের পরিভাষায় এটি হলো 'Mate selection', যা যেকোনো প্রাণীর বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত।

ধরা যাক, আমি একটি সম্পর্কে আছি এবং আমার সঙ্গী আমাকে আলটিমেটাম দিল—"হয় তুমি আমাকে বিয়ে করো, না হয় আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।" এখন আমি এক চরম সংকটে।

  • মধ্যযুগে আমি হয়তো কোনো কাজীর কাছে বা পুরোহিতের কাছে যেতাম দোয়ার জন্য বা উপদেশের জন্য।

  • বিংশ শতাব্দীতে আমার বন্ধুরা আমাকে বলত, "নিজের মনের কথা শোনো, তোমার মন যার দিকে টানে, তাকেই বেছে নাও।"

  • কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই ডাটাইজমের যুগে আমি গুগলের কাছে গিয়ে বলব, "গুগল, আমার সামনে এই কঠিন সিদ্ধান্ত। আমি এখন কী করব? আমার কি একে বিয়ে করা উচিত?"

গুগল তখন তার বিশাল সার্ভার থেকে আমার সমস্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে বলবে: "দেখো, আমি তোমার জন্মের পর থেকে তোমাকে ট্র্যাক করছি। আমি তোমার জীবনের প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি সার্চ হিস্ট্রি, তোমার করা প্রতিটি ফোন কল জানি। তুমি যখনই থিয়েটারে কোনো সিনেমা দেখেছ বা কোনো গান শুনেছ, তোমার হার্টবিট কেমন ছিল তা আমি রেকর্ড করেছি। এমনকি তুমি যখন এই মানুষটির সাথে ডেটিংয়ে গিয়েছ, তখন তোমার রক্তচাপ কতটা বেড়েছিল, তাও আমার জানা আছে। আমার কাছে তোমার ডিএনএ রিপোর্ট এবং মেডিকেল রেকর্ডও আছে। শুধু তাই নয়, তোমার সঙ্গীর সমস্ত ডাটাও আমার কাছে আছে। আর আমার সার্ভারে আছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সফল ও ব্যর্থ দাম্পত্য জীবনের ডাটাবেজ। এই সমস্ত তথ্যকে আমাদের কোয়ান্টাম অ্যালগরিদমে প্রসেস করে আমি তোমাকে ৮৭% নিশ্চিতmap দিয়ে বলছি যে—একে বিয়ে করলেই তুমি দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুখী হবে।"

গুগল এখানেই থামবে না। সে আরও যোগ করবে: "আমি তোমাকে এত ভালো চিনি যে, আমি জানি আমি এখন যে পরামর্শটি দিলাম, তা তোমার পছন্দ হয়নি। তোমার মন খারাপ হয়েছে। আমি এটাও জানি কেন তোমার মন খারাপ হয়েছে। কারণ তোমার যে আদিম বায়োকেমিক্যাল অ্যালগরিদমটি এক লাখ বছর আগে আফ্রিকার সাভানাতে তৈরি হয়েছিল, তা বাহ্যিক সৌন্দর্য বা লুকসকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। আদিম যুগে ভালো চেহারা সুস্থতার লক্ষণ ছিল বলে তোমার জিন ওদিকেই টানছে। তুমি ভাবছ এই ছেলে বা মেয়েটি দেখতে ততটা সুন্দর নয়, তাই তোমার মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আমার আধুনিক পোস্ট-মডার্ন অ্যালগরিদম জানে যে দীর্ঘমেয়াদী সুখী দাম্পত্যে বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভূমিকা মাত্র ১১%, যেখানে তোমার আদিম মন একে ৩০% গুরুত্ব দিচ্ছে। অতএব, নিজের প্রাচীন মনকে বাদ দিয়ে আমার কথা শোনো। বিয়েটা করেই ফেলো।"

এখানে একটি বিষয় আমাদের খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। গুগলকে কিন্তু ১০০% নিখুঁত বা অন্তর্যামী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাকে কেবল একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে কত বড় বড় ভুল করে! ভুল সাবজেক্টে পড়াশোনা করে, ভুল মানুষকে বিয়ে করে, ভুল পেশা বেছে নেয় এবং ১০ বছর পর মাথায় হাত দিয়ে বলে—"হায়! আমি কী ভুলই না করেছিলাম!" গুগলকে কেবল মানুষের এই গড়পড়তা ভুলের চেয়ে একটু কম ভুল করতে হবে। আর যখনই আমরা দেখব যে গুগলের দেওয়া পরামর্শগুলো মেনে চললে আমাদের জীবন আসলেই সহজ আর সুন্দর হচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুগলের হাতে তুলে দেব।

আজকে আমরা যখন শহরের কোনো অচেনা রাস্তায় গাড়ি চালাই, আমরা কি আমাদের নিজেদের দিকবিদিকের অনুভূতির ওপর ভরসা করি? না। আমরা চোখ বন্ধ করে গুগল ম্যাপস (Google Maps) বা ওয়েজ (Waze)-এর নির্দেশ মেনে চলি। ডানে মোড় নিতে মন চাইলেও ম্যাপ যদি বলে বাঁয়ে যেতে, আমরা বাঁয়েই যাই। কারণ আমরা জানি ম্যাপ আমাদের চেয়ে বেশি তথ্য জানে। এর ফলে আজ আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক দিক চেনার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। স্মার্টফোনটি বন্ধ হয়ে গেলে আমরা অনেকেই আজ সম্পূর্ণ অন্ধ ও অসহায় বোধ করি। এভাবেই খুব ছোট ছোট পদক্ষেপে, স্বেচ্ছায়, কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়াই আমরা আমাদের কর্তৃত্ব অ্যালগরিদমের কাছে হস্তান্তর করছি।


কর্তৃত্বের এই যে স্থানান্তর, তা আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে? এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অ্যালগরিদম যখন আমাদের অনুভূতিকে হ্যাক করতে পারবে, তখন দুটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার জন্ম হতে পারে।

১. ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্রের চরম রূপ (Digital Dictatorship)

যদি এই প্রযুক্তি কোনো সর্বগ্রাসী বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারের হাতে পড়ে—যেমন উত্তর কোরিয়া—তবে তা এক ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। আজকের দিনে উত্তর কোরিয়ার মানুষ মুখে একনায়ক কিম জং উনের প্রশংসা করলেও মনে মনে হয়তো তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু স্বৈরশাসক মানুষের মনের খবর জানে না বলে তারা বেঁচে যায়।

কিন্তু ভবিষ্যতে যখন উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি নাগরিককে একটি বাধ্যতামূলক বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট বা চিপ পরতে হবে, এবং তারা যখন কোনো ঘরের দেওয়ালে কিম জং উনের ছবি দেখবে—তখন যদি তাদের রক্তচাপ, হার্টবিট বা মস্তিষ্কের নিউরনের কম্পন সামান্যতম রাগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অ্যালগরিদম সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় পুলিশকে অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেবে। সেই মানুষটির অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যাবে। এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত এবং নিশ্ছিদ্র স্বৈরতন্ত্র, যেখানে মানুষের মনে মনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হবে।

২. উদারনৈতিক সমাজের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

অন্য দিকে, আমেরিকার মতো একটি লিবারেল বা মুক্ত সমাজে এই প্রযুক্তি স্বৈরতন্ত্রের রূপ না নিয়ে হয়তো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের রূপ নেবে। সেখানে অ্যালগরিদম আপনাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে না, কিন্তু সে আপনাকে এত সূক্ষ্মভাবে প্ররোচিত (Nudge) করবে যে আপনি ভাববেন আপনি নিজের ইচ্ছাতেই কাজটি করছেন। আপনার মন খারাপের মুহূর্তে সে আপনার সামনে এমন পণ্যের বিজ্ঞাপন আনবে যা আপনি কিনে ফেলবেন। আপনার ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য আপনার ভয়ের বোতামগুলোতে চাপ দেবে। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা সেখানে পরিণত হবে একটি নিয়ন্ত্রিত পণ্যে।


আমার এই পুরো বক্তব্য শোনার পর আপনাদের মনে হতে পারে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ তবে সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং আমরা এক অনিবার্য নিয়তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শেষ করার আগে আমি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা ‘ক্যাভিয়েট’ (Caveats) আপনাদের সামনে রাখতে চাই, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।

প্রথম সংশয়: মন এবং মস্তিষ্কের পার্থক্য (Mind vs. Brain)

আমার এই পুরো থিওরি বা ডাটাইজমের মূল ভিত্তি হলো একটি ধারণা—"Organisms are algorithms" (জীব হলো অ্যালগরিদম)। কিন্তু বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত মস্তিষ্কের (Brain) মেকানিজম কিছুটা বুঝতে পারলেও, মানুষের ‘মন’ বা চেতনা (Mind) সম্পর্কে এখনও প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছে।

মস্তিষ্ক হলো নিউরন, সিন্যাপ্স আর কেমিক্যালের একটি ভৌত নেটওয়ার্ক। কিন্তু ‘চেতনা’ বা ‘মন’ হলো আমাদের অনুভূতি—ভয় পাওয়ার অনুভূতি, ভালোবাসার অনুভূতি, কোনো কিছুর স্বাদ নেওয়ার ভেতরের অভিজ্ঞতা (Subjective experiences)। বিজ্ঞান আজও জানে না কীভাবে মস্তিষ্কের কোটি কোটি ইলেকট্রনিক সিগন্যাল থেকে একটি জীবন্ত অনুভূতির জন্ম হয়।

যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে মানুষের মন বা চেতনাকে কেবল গাণিতিক অ্যালগরিদম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে কম্পিউটারের পক্ষে কখনোই মানুষকে পুরোপুরি হ্যাক করা সম্ভব হবে না। তখন এই পুরো ‘হোমো ডিউস’ বা অ্যালগরিদমিক রাজত্বের গল্পটি একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বা ফ্যান্টাসি হিসেবেই থেকে যাবে।

দ্বিতীয় সংশয়: প্রযুক্তি কখনো পূর্বনির্ধারিত নয় (Technology is not deterministic)

ইতিহাস থেকে আমরা যে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পাই, তা হলো—প্রযুক্তি আমাদের কেবল একটি পথ দেখায়, কিন্তু আমরা সেই প্রযুক্তি দিয়ে কেমন সমাজ তৈরি করব, তা কিন্তু আমাদের ওপরই নির্ভর করে। প্রযুক্তি কোনো ভাগ্য বা নিয়তি নয়।

বিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের কথা ধরা যাক। ট্রেন, বিদ্যুৎ, রেডিও, গাড়ি—এই প্রযুক্তিগুলো যখন আবিষ্কৃত হলো, তখন কিন্তু ট্রেন এসে মানুষকে বলে দেয়নি যে তাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। মানুষ এই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দিকে তৈরি করেছে হিটলারের ফ্যাসিবাদের অমানবিক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, স্টালিনের কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্রের গুলাগ, আবার অন্য দিকে তৈরি করেছে পশ্চিমের উদারনৈতিক গণতন্ত্র।

আমি প্রায়ই একটি চমৎকার এবং দৃশ্যমান উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝানোর চেষ্টা করি। আপনারা যদি রাতের বেলায় মহাকাশ থেকে তোলা পূর্ব এশিয়ার একটি স্যাটেলাইট ছবি দেখেন, তবে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়বে।

  • ছবির নিচের ডান কোণায় দেখা যাবে আলোর এক সুবিশাল সমুদ্র—সেটি হলো আধুনিক, উন্নত দক্ষিণ কোরিয়া।

  • ছবির ওপরের অংশে দেখা যাবে আলোর আরেকটি বিশাল অবয়ব—সেটি হলো চীন।

  • আর এই দুই আলোর সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিশাল অন্ধকার গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল দেখা যায়। সেটি কিন্তু কোনো সমুদ্র বা মহাসমুদ্র নয়; ওটি হলো উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়ার মানুষ কি বিদ্যুৎ বা লাইট বাল্বের প্রযুক্তি সম্পর্কে জানে না? অবশ্যই জানে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া বা চীন বিদ্যুৎ দিয়ে যে ধরনের সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার শাসকরা বিদ্যুৎ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অন্ধকার একটি সমাজ তৈরি করেছে। প্রযুক্তি এক হলেও মানুষের সিদ্ধান্তের কারণে ফলাফল সম্পূর্ণ আলাদা হয়েছে।


তাই আজ আমি আপনাদের সামনে যে অ্যালগরিদমিক ভবিষ্যতের চিত্রটি তুলে ধরলাম—যেখানে আমাদের অনুভূতিগুলো তার সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে, যেখানে গুগল বা অ্যামাজন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে—তা কিন্তু কোনো অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। এটি কেবল একটি সম্ভাবনা, একটি সতর্কবার্তা।

যদি আপনাদের এই আসন্ন ভবিষ্যতের রূপরেখা পছন্দ না হয়, যদি আপনারা মনে করেন যে মানুষের অনুভূতি আর তার স্বাধীন ইচ্ছার মর্যাদা অ্যালগরিদমের গাণিতিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান, তবে আজই আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কীভাবে এই প্রযুক্তিগুলো কাজ করছে, কীভাবে আমাদের ডাটা নিয়ে আমাদের অজান্তেই আমাদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে।

আমরা যদি আজ সচেতন না হই, আমরা যদি আমাদের সমস্ত তথ্য ও মনোযোগ অন্ধের মতো এই বড় বড় টেক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দিতে থাকি, তবে কর্তৃত্বের এই স্থানান্তর কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি এই প্রযুক্তির সঠিক ও মানবিক ব্যবহারের আইনি ও নৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারি, তবে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে আমাদের গৌরবময় অস্তিত্ব আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারব।

ভবিষ্যৎ কিন্তু ইতিমধ্যেই আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি আমাদের জীবনের ম্যাপটি গুগলের হাতে দিয়ে অন্ধের মতো গাড়ি চালিয়ে যাব, নাকি মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং চাকাটি নিজের হাতে ধরে ম্যাপের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো পথ আবিষ্কার করব?

Tuesday, May 5, 2026

অনুকুল: সত্যজিৎ রায়ের এআই নিয়ে ভাবনা

সত্যজিৎ রায়ের মূল ছোটগল্প অনুকূল প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে; যা তাঁর জনপ্রিয় সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে তাঁর গল্প সংকলন অশ্বমেধের ঘোড়া-তেও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর ২০১৭ সালে পরিচালক সুজয় ঘোষ সত্যজিৎ রায়ের এই ছোটগল্প অবলম্বনে একটি শর্টফিল্ম নির্মান করেন যার নাম- অনুকুল। আমি যখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, আমার বারবার সত্যজিৎ রায়ের সেই কালজয়ী গল্প 'অনুকূল'-এর কথা মনে পড়ে। ২০১৭ সালে এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত শর্ট ফিল্মটি যারা দেখেছেন, তারা হয়তো আমার সাথে একমত হবেন। সেখানে দেখা যায়, অনুকূল নামের একটি রোবট মানুষের চেয়েও বেশি নিয়মনিষ্ঠ, বেশি দক্ষ; এমনকি এক পর্যায়ে সে তার মালিকের প্রতি এমন এক ধরনের 'যান্ত্রিক আনুগত্য' প্রদর্শন করে যা একই সাথে বিস্ময়কর এবং আতঙ্কজনক। অনুকূলের সেই নির্লিপ্ত চাহনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যন্ত্র যখন মানুষের জায়গা নিতে শুরু করে, তখন মানবিক আবেগ আর যান্ত্রিক যুক্তির লড়াইটা কতটা অসম হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সত্যজিতের সেই দূরদর্শী ভাবনাকে আমার খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী বলে মনে হচ্ছে। কারন ইতিহাসকে আমি কেবল গত হয়ে যাওয়া দিনগুলোর দলিল মনে করি না; আমার কাছে ইতিহাস হলো পরিবর্তনের পাঠশালা। কিন্তু বর্তমানের এই এআই বিপ্লব অতীতের যেকোনো পরিবর্তনের চেয়ে আলাদা। এর কারণ হলো এর 'গতি'। আমরা মানুষ হিসেবে যেহেতু জৈবিক প্রাণী, তাই আমাদের বিবর্তন হতে, কোনো কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে বা শিখতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু এআই হলো অজৈব, ফলে এর বিবর্তন ঘটে আলোর গতিতে। আমার ভয় হয়, অনুকূলের মতো নিখুঁত হতে গিয়ে আমরা আমাদের ধীরস্থির মানবিক সত্তা নিয়ে এই অতিদ্রুত দৌড়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত খেই হারিয়ে ফেলব না তো?



প্রথম বিশ্বের উদ্যোক্তারা আমাদের চমৎকার সব স্বপ্ন দেখান- ক্যানসার নিরাময় হবে, জলবায়ু সংকট মিটে যাবে, ব্যক্তিগত টিউটর সবার হাতে পৌঁছাবে। আমি তাদের এই আশাবাদকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু একজন সমাজ ও পরিবেশ সচেতন মানুষ হিসেবে আমার মন তাতে পুরোপুরি সায় দেয় না। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় বলশেভিকরাও কিন্তু এক নিখুঁত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ইউটোপিয়া বা স্বর্গরাজ্য গড়তে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী পথ বেছে নিয়েছিল, তা আমাদের সবার জানা। আমার প্রশ্ন হলো- একটি অমলেট বানানোর জন্য আমরা ঠিক কতগুলো ডিম ভাঙতে রাজি আছি? এআই-এর সুফল পাওয়ার লোভে আমরা কি আমাদের গণতন্ত্র বা মানবিক আস্থাকে বিসর্জন দিতে পারি?
আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র হলো একটি সুস্থ কথোপকথনও যা শুধু নিজে বল্লেই চলবে না বরংচ অন্যেরটাও মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। কিন্তু আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালে আমি কী দেখি? আমি দেখি, অ্যালগরিদমগুলো আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে। এই এআই-র কোনো দেশপ্রেম নেই, কোনো নৈতিকতা নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো ইউজার এনগেজমেন্ট। আর মানুষ হিসেবে আমরা রাগ বা ঘৃণার খবরে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে- সমাজ ভাগ হয়ে যাচ্ছে, আমরা একে অপরের কথা শোনার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। একটি সমাজ যখন কথা বলার ক্ষমতা হারায়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
আমার কাছে সবচেয়ে আতঙ্কজনক মনে হয় বট বা নকল মানুষের ধারণাটি। আমরা যদি এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে আমি কার সাথে কথা বলছি; মানুষ নাকি বট? সেটাই বুঝতে না পারি, তবে আস্থার জায়গাটা কোথায় থাকবে? আমরা যেমন জাল টাকা রুখতে কঠোর আইন করি, তেমনি ইন্টারনেটে ছদ্মবেশী এই নকল সত্তাদের রুখতেও আমাদের শক্ত হতে হবে। আমি মনে করি, কোনো এআই যদি মানুষের পরিচয় দিয়ে আমার সাথে কথা বলে বা আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তবে তা মানবসভ্যতার ওপর এক ধরনের ডিজিটাল হামলা।
অনেকে বলেন, এআই-কে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব কারণ এতে উদ্ভাবন থমকে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি, রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ মানেই বাধা দেওয়া নয়। একটি গাড়িতে ব্রেক থাকে বলেই আমরা তা দ্রুত চালাতে পারি। এআই-এর ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু মূল নীতি ঠিক করতে হবে। এআই-কে সবসময় প্রকাশ করতে হবে যে সে একজন যান্ত্রিক সত্তা। কোনো কোম্পানির অ্যালগরিদম যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তবে সেই দায়ভার সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেই নিতে হবে। আমরা এআই-কে স্মার্ট করার জন্য যত টাকা খরচ করছি, তার অন্তত কিছু অংশ কি আমাদের নিজেদের বিবেক ও সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে পারি না?
আমরা কি সেই শিশুর মতো হবো যে এখনই একটা মার্শমেলো খাওয়ার লোভে ভবিষ্যতের দুটো মার্শমেলো পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে? পৃথিবীজুড়ে এখন এআই নিয়ে এক পাগলাটে প্রতিযোগিতা চলছে। সবাই সবার আগে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু এই দৌড়ে যদি আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলি, তবে সেই বিজয়ের কোনো মূল্য থাকবে না। আমি চাই এআই আমাদের অনুকূল হোক, আমাদের সহযোগী হোক; কিন্তু আমাদের হৃদয়ের মালিক যেন সে না হয়ে ওঠে। প্রযুক্তির এই বিশাল জোয়ারে দাঁড়িয়ে আমি কেবল এটুকুই বলতে চাই; আসুন আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের প্রজ্ঞা এবং করুণাকেও লালন করি।
কারন দিনশেষে, যন্ত্র কেবল গণিতে দক্ষ হতে পারে
কিন্তু সহমর্মিতা কেবল মানুষেরই ভূষণ।

কাজল দাস
সম্পাদক
কালেরধ্বনি
৬ মে ২০২৬

স্বর্ণের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: সংকট, ডলারের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের রূপান্তর

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে ...