পূর্ণাঙ্গ লেখক হিসেবে বিবেচিত সদস্যরা, গ্রাহক, পাঠক কিংবা অতিথি লেখকেরা লেখা প্রকাশের জন্য kalerdhwani@gmail.com ইমেইলে লেখা কালের ধ্বনিতে পাঠাতে পারেন।
পলাশীর যুদ্ধের পর ভারতবর্ষে ইংরেজ কোম্পানির প্রভাব বাড়তেই থাকে,
ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে ভিড়তে থাকে ব্যবসায়ী জাহাজ। সেই জাহাজে ব্যবসায়ীদের
ভিড়ে খুব অল্প হলেও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে আসতে শুরু করেন মিশনারীরা।
কিন্তু ব্যবসা কিংবা ধর্মপ্রচারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভাষা।
পলাশীর যুদ্ধ, এর পর থেকেই ভারতে ইংরেজ বণিকদের আধিপত্য বাড়তে থাকে; Image source: Wikimedia Commonsভারতবর্ষ
আশ্চর্য এক এলাকা, এর ভাষার ভীষণ বাহার। কয়েকশো মাইল পাড়ি দিলেই মানুষের
মুখের ভাষা বদলে যায়। হিন্দি, বাংলা, উর্দু, ফারসি, তামিল আরো কত শত ভাষা।
তাই সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ইংরেজির পাশাপাশি বেশ অনেকগুলো
ভারতীয় ভাষা জানে এমন কিছু পণ্ডিত নিয়োগ দেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। তাদেরকে
মুন্সী নামে ডাকা হতো। মূলত, ফারসি ভাষায় মুন্সী শব্দের অর্থ পণ্ডিত।
মুন্সীদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দোভাষীর কাজ করা এবং ব্যবসায়িক ব্যাপারে
পরামর্শ দেওয়া। এই মুন্সীগিরি করে অনেকেই সমাজে বিশাল প্রতিপত্তি
অর্জন করেছিলেন সেই আমলে। মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুর প্রথম জীবনে ছিলেন
ওয়ারেন হেস্টিংসের মুন্সী। উর্দু, ফারসি, আরবি আর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ছিল
তার। তুখোড় বুদ্ধির অধিকারী নবকৃষ্ণ বাহাদুর পরে রবার্ট ক্লাইভেরও মুন্সী
হয়েছিলেন। মুন্সীর কাজ করতে গিয়েই দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তির খুব কাছের মানুষ
হয়ে উঠেন তিনি। ইংরেজদের আনুকূল্যে মহারাজা উপাধি নিয়ে কলকাতার মাথা হয়ে
উঠেছিলেন এই নবকৃষ্ণ বাহাদুর।
নবকৃষ্ণ বাহাদুরের শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা দেখতে এসেছিলেন রবার্ট ক্লাইভ; Image source: Wikimedia Commons তবে
সব মুন্সীদের ভাগ্যে এমন জমিদারি আর প্রভাব প্রতিপত্তি জুটেনি। অনেকেই
নীরবে কাজ করে গেছেন। ধর্মপ্রচার করতে গেলে মানুষের মনের ভাষা বুঝতে পারা
আর মুখের ভাষা পড়তে পারা দুইটাই জরুরী। এই কাজে মুন্সীরা সেতুবন্ধন তৈরি
করে দিতেন। এমনই এক মুন্সী ছিলেন রামরাম বসু, অল্প বয়সেই তিনি মুন্সীগিরি
শুরু করেন। উইলিয়াম চেম্বার্সের সাথে ফারসী দোভাষী হিসেবে কাজ করে ইংরেজীও
শিখে নিয়েছিলেন ভালোই। ১৭৮৩ সালে ভারতে আসেন ব্যাপটিস্ট ধর্মপ্রচারক
জন টমাস। এদেশের মানুষের সাথে কথা বলে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খ্রিস্ট
ধর্ম প্রচার করবেন। কিন্তু দরকার ভাষা শিক্ষা, উইলিয়াম চেম্বার্সের
সুপারিশে রামরাম বসুকে টমাস তার মুন্সী নিয়োগ দিয়েছিলেন ১৭৮৭ সালে। সেই
থেকে রামরাম বসুর যাত্রা শুরু, এরপর সারা জীবনই তিনি মিশনারীদের মুন্সীগিরি
করেছেন, সাথে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চায় এক নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছেন।
সে
বছরেই ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে টমাস বেরিয়ে পড়লেন মালদহে, সেখানে কোম্পানির
রেশম কুঠির রেসিডেন্ট জর্জ উডনীর সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল তার। মুন্সীর
সহায়তায় খুব দ্রুত বাংলা আর ফারসী শিখে সাধারণের মাঝে বেরিয়ে পড়লেন টমাস। মুন্সী
রামরাম বসুও ছিলেন চালাক চতুর লোক। তিনিও খুব দ্রুত বাইবেল আত্মস্থ করে
নিলেন। কথায় কথায় বাইবেলের প্রসঙ্গ টেনে মুগ্ধ করে দিতেন টমাসকে। পাশাপাশি
হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের ব্যাখ্যাও দিতে শুরু করলেন। টমাস খুব দ্রুতই বুঝতে
পেরেছিলেন তার মুন্সী বিদ্বান লোক, তাকে ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়া মুশকিল হবে। ১৭৯২
সালে টমাস টমাস যখন ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন তখন সাথে নিয়ে গেলেন মুন্সী
রাম বসুর রচনাকৃত ‘খ্রীস্ট মহিমা সংগীত’। টমাস ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রস্তাব
দিলেন উইলিয়াম কেরীকে ভারতে গিয়ে ধর্মপ্রচারের জন্য। স্ত্রী ডরোথির অনিচ্ছা
সত্ত্বেও কেরী ইংল্যান্ডের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে সপরিবারে পাড়ি জমালেন
অনিশ্চিত রাজ্য ভারতের দিকে। ভারতে বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে
ধর্মপ্রচার করার সংকল্প নিয়ে জাহাজে বসেই টমাসের কাছে বাংলা শেখা শুরু করে
দিয়েছিলেন। কলকাতার বন্দরে নেমেই কেরীর সাথে টমাস পরিচয় করিয়ে
দিয়েছিলেন মুন্সী রামরাম বসুকে। সেই শুরু, তারপর তিনি দীর্ঘ সময় কেরীর সাথে
বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন।
কেরী আর রাম বসু; Image source: missionariesoftheworld.orgউইলিয়াম কেরী আর তার মুন্সীর এই দীর্ঘ পথচলা নিয়ে আছে উপন্যাসও। ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ নামের ঐতিহাসিক উপন্যাসে কেরী আর রাম বসুর পথচলার পাশাপাশি তখনকার সমাজের চিত্রটিও তুলে ধরেছেন উপন্যাসের লেখক প্রমথনাথ বিশী। উপন্যাসের
শুরুতেই দেখা যায়, কলকাতার ঘাটে নামার পরেই কথাবার্তা শুরু হয়ে যায় কেরী
আর বসুর। বসুর সাথে কথা বলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। বাকপটু রাম বসু জানেন
কীভাবে মানুষের মন রক্ষা করতে হয়। মাসপ্রতি বিশ টাকা বেতনে কেরী তৎক্ষণাৎ
রাম বসুকে মুন্সী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
উইলিয়াম কেরী তার মুন্সী রামরাম বসু এবং তৎকালীন বাংলার চিত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস; Image source: rokomari.comউপন্যাসে
কেরী, রামরাম বসু, টমাসের মতো খাঁটি ঐতিহাসিক চরিত্র ছাড়াও আরো কিছু
চরিত্র আছে যেগুলোকে লেখক আখ্যা দিয়েছেন ইতিহাসের সম্ভাবনা-সঞ্জাত। প্রথমেই
বলতে হয় টুশকি চরিত্রের কথা, রাম বসুর সাথে এক অদ্ভুত সম্পর্ক টুশকির।
স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে টুশকির কাছে আশ্রয় খুঁজে রাম বসু। তার ঘরে
বসেই যীশু খ্রীস্টকে নিয়ে গীত রচনা করে। কেরীর সংসারেও শান্তি নেই।
কেরীর স্ত্রী ডরোথি ভারতের ব্যাপারে শুরু থেকেই নানা ভয়ের গল্প শুনে
এসেছিল, বন জঙ্গল সাফ করে ঘেঁষে গড়ে উঠা লোকালয় কলকাতা, সন্ধ্যার পরেই
শেয়ালের ডাক চারদিক থেকে। বাঘ শেয়ালের ভয়ে শুরু থেকেই কাবু ছিলেন তিনি।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভারতবর্ষের ব্যাপারে তার ভয় থেকে গিয়েছিল। নানা
ঘটনাচক্রের সম্মুখীন হয়ে কেরী চিন্তা করলেন কলকাতার বাইরে গিয়ে ধর্মপ্রচার
করবেন। জর্জ উডনী নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ীর নীল আর রেশমের কুঠির
দায়িত্ব নিয়ে কেরী গেলেন মালদহ জেলার মদনাবাটিতে। বজরা নিয়ে কলকাতা
থেকে মদনাবাটির পথে কেরী সতীদাহের হাত থেকে রক্ষা করলেন এক তরুণী বিধবা
রেশমীকে। চিতা থেকে পালিয়ে যাওয়ায় গ্রামের গোঁড়া নেতাদের ক্রোধানলে পড়ে যায়
রেশমী। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল পিতা-মাতাহীন রেশমীকে সরিয়ে দিয়ে তার
সম্পত্তি দখল করা। রেশমী পালিয়ে যাওয়ায় তাদের উদ্দেশ্য বানচাল হয়ে যায়।
উইলিয়াম কেরী পরবর্তীতে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন; Image source: theculturetrip.comঅন্যদিকে
রামরাম বসু মদনাবাটিতে কেরীকে বাংলা, সংস্কৃতের শিক্ষা দিতে থাকেন। কেরী
সাহেবের উদ্দীপনায় নীলকুঠীতে চালু হয় ছেলে-মেয়েদের স্কুল। সেখানেও চলতে
থাকে শিক্ষা। রেশমী খুব দ্রুতই শিখে নিতে থাকে ইংরেজী। সময় গড়িয়ে যায়,
রেশমীকে ভালো লেগে যায় রামরাম বসুর। আলোকে সামনে রেখে দাঁড়ালে পেছনে
যেমন ছায়া পড়ে, ঠিক সেভাবে ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ উপন্যাসে ইতিহাসের আলোতে
তুলে আনা হয়েছে কেরী, রামরাম বসুকে। তাদের মূল চরিত্রকে দিয়ে এই উপন্যাস
কখনোই বিচার কিংবা যাচাই করা সম্ভব নয়। ইংরেজদের আসার পর বাংলাসহ
পুরো ভারতে এক পরিবর্তনের রেশ শুরু হয়েছিল। ইংরেজ কুঠিগুলোর আশপাশ থেকে
ধীরে ধীরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেই পরিবর্তন ছড়িয়ে যায়। সতীদাহ প্রথা অমানবিক
ঠেকে দূরদেশ থেকে আসা হর্তাকর্তা এই বণিক আর পাদ্রীদের কাছে। কিন্তু
কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক সমাজে চিতার আগুন থেকে বাঁচালেই কি তাকে মানুষের
লালসার আগুন থেকে বাঁচানো যায়? তবে উপন্যাস কিংবা ইতিহাসের পাতায়,
দৃঢ় প্রত্যয়ী উইলিয়াম কেরী ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। স্ত্রী, পুত্রকে হারিয়েছেন
কিন্তু মনোবল অটুট রেখে কাজ করে গেছেন। কেরী আর তার মুন্সীর প্রত্যক্ষ
তত্ত্বাবধানে শ্রীরামরামপুরে স্থাপিত প্রেস থেকে বাইবেলের বাংলা আর সংস্কৃত
অনুবাদ বেরিয়েছে। তেরোটি ভারতীয় ভাষাকে আয়ত্ত্ব করে একটি বহুভাষিক অভিধানও
রচনা করেছিলেন কেরী। তবে অভিধান ছাপাকালীন সময়ে শ্রীরামপুর প্রেসে আগুন
লেগে হাজারখানেক মূল্যবান বই, পাণ্ডুলিপি আর কাগজ পুড়ে যায়।
শ্রীরামপুর কলেজের ছবি, এই আঙ্গিনা থেকেই বেড়ে উঠেছে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি; Image source: John Brown Myers; London 1887কেরীকে
সহায়তার পাশাপাশি তার মুন্সী হিসেবে রামরাম বসুও বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়ার
কাজটি করে দিয়ে গিয়েছেন। ১৮০১ সালে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ চালু হয় সেখানে
রামরাম বসুকে সহকারী মুন্সী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কলেজের ছাত্রদের
পাঠ্যপুস্তক হিসেবে বারো ভুঁইয়াদের একজন রাজা প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে গ্রন্থ
রচনা করেছিলেন। ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ নামের এই বইটিকেই বাংলা ভাষায়
বাঙালীর রচিত প্রথম গদ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিহাসের
সাক্ষী এই বইটিও ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল শ্রীরামপুরের মিশন প্রেস থেকে।
এই বইয়ের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কাউন্সিল তাকে পুরস্কৃত করে। এর পরের বছর
‘লিপিমালা’ নামে বিভিন্ন কাজের উপযোগী একটি চিঠিপত্রের সংকলন রচনা করেন,
এটিও মিশন প্রেস থেকে ছাপা হয়। এছাড়া খ্রিস্টের প্রশংসা করে স্তবগান রচনায়ও
তিনি ছিলেন পটু। তার স্তবগানে খ্রিস্টের প্রতি ভক্তি আর খ্রিস্ট ধর্মের
প্রতি অনুরাগ দেখে পাদ্রীরা ভাবতেন এই বুঝি রামরাম বসু খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা
নেবে। কিন্তু সেটি আর কোনোদিনই হয়নি। বাকপটু, জ্ঞানী আর চালাকচতুর এই
মানুষটি শেষজীবনের পুরোটাই কাটিয়েছেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সহকারী মুন্সী
হিসেবে। লেখক: শাহ্ মো: মিনহাজুল আবেদিন
“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা। আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।” (‘আজিকার শিশু’ কবিতার অংশবিশেষ)
কবি সুফিয়া কামাল, নামটির সাথে মিশে আছে অসংখ্য আবেগ, অনুভূতি, ভালো লাগা ও
ভালোবাসার সরলতা ও নারীর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করার মনোবল। শুধুমাত্র কবিই নন,
তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজ সেবক, শিক্ষক ও সংগ্রামী
নেতৃত্ব । তার কবিতার স্তবকে মিশে আছে প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিগত অনুভূতি,
বেদনাময় স্মৃতি, স্বদেশের প্রতি মমতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এবং ধর্মীয়
আবেগ। সহজ কিন্তু আবেগী ভাষার প্রয়োগ ও মননশীল শব্দচয়ন তার প্রতিটি
কবিতায় অন্য মাত্রা যুক্ত করে। তার লেখার ঝুলিতে কবিতা ছাড়াও আরও আছে ভ্রমণ
কাহিনী, ডায়েরি, ছোট গল্প, উপন্যাস ও শিশুতোষ গ্রন্থ। সব মিলিয়ে প্রকাশিত
গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। সেসবের মধ্যে কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, মন ও
জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক, ভ্রমণ কাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’,
স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জীবনের শুরুটা কবি সুফিয়ার জন্যে মোটেও আনন্দদায়ক ছিল না। নারীরা তখন সমাজে
অনেকটাই পশ্চাৎপদ ছিল। চার দেয়ালের বদ্ধ ঘরে জীবন কাটানোর জন্য প্রস্তুত
হতে চাননি তিনি, সমাজের সাথে ঠিকভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিল না তার মন।
প্রেরণা ছিলেন শুধুই কবির মা সৈয়দা খাতুন। রক্ষণশীল পরিবার বলে, ঘরে
মেয়েদের পড়ালেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। মায়ের হাত ধরে হাতে প্রথম বই পাওয়ার
আনন্দ পান তিনি। বাড়িতে উর্দুর চল থাকলেও নিজের চেষ্টায় বাংলায় লিখতে পড়তে
শিখেন তিনি। গৃহবন্দী জীবনে নিজেকে ধীরে ধীরে স্বশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে
থাকেন কবি সুফিয়া। সুফিয়া কামালের জীবনের দিক পরিবর্তনের সূচনা হয়
আরেক মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে।
১৯১৮ সালে মায়ের সাথে যখন প্রথম কলকাতায় যান তিনি, তখন তার পরিচয় হয় বেগম
রোকেয়ার সাথে। বেগম রোকেয়ার দর্শন, নারী জাগরণের মনোভাব এবং সাহিত্যানুরাগ
ভীষণভাবে নাড়া দেয় শৈশবের সুফিয়াকে। রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে জন্ম
নিয়ে ও সেখান থেকে সুফিয়া কামাল শুধু উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে বেরিয়ে
আসেননি দুঃসহ নিগড়ে আবদ্ধ বাঙালি মুসলমান নারী সমাজকে তিনি জাগরণের
চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন , শৃঙ্খলমুক্ত জীবনের পথিকৃৎ । রক্ষণশীল ও
আভিজাত্যের বৃত্ত ভেঙেই তিনি সাহসী কিন্তু দৃঢ় পদচারণা শুরু ।
১৯৭১সালের ১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কার্ফ্যু উপেক্ষা করে
নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও
মৌলবাদের বিপক্ষে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। প্রতিটি প্রগতিশীল
আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে আছে যে নাম, তিনি সুফিয়া কামাল, জননী সাহসিকা ।
পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতিকর্মীদের একটি দলকে ডেকে পাঠিয়েছিল জল্লাদ
ইয়াহিয়া । নেতৃত্বে ছিলেন সুফিয়া কামাল । এক পর্যায়ে ইয়াহিয়া বলল , ''
পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা সব জানোয়ার । '' সুফিয়া কামালের উত্তর ''আপনি
তাহলে জানোয়ারদের প্রেসিডেন্ট । '' বাঙালির নারীর সত্যিকার রূপ
এভাবেই পুরো জীবন আপোষ না করে মুক্তির লড়াইয়ে সাহসের প্রতীক হয়েছিলেন ,
আছেন । এই বাঙালি হারবে না , পথ হারাবে না ।
১৯৫২ সালের ভাষা
আন্দোলনে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের কারণে রবীন্দ্রনাথকে
নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কবি সুফিয়া কামাল এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও তীব্র
প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক
স্বাধিকার আন্দোলন’ নামে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ সালে ‘মহিলা
সংগ্রাম পরিষদ’ যা বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নামে পরিচিত, তার হাত
ধরেই গঠিত হয়। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী
উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা, ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী
ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠার সাথেও সরাসরি জড়িত
ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’
নামকরণের দাবিও তোলেন কবি সুফিয়া কামাল। সুফিয়া কামাল ১৯২৫ সালে
অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীজি বরিশাল এলে
নিজে চরকায় সুতা কেটে গান্ধীজির হাতে তুলে দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী
জানা যায়- 'চৌদ্দ বছর বয়সে বরিশালে প্রথমে সমাজ সেবার সুযোগ পাই। বাসন্তী
দেবী ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের ছেলের বৌ। তাঁর সঙ্গে দুঃস্থ
মেয়েদের বিশেষ করে মা ও শিশুদের জন্য মাতৃসদনে আমি কাজ শুরু করি।'
১৯৪৬-এ কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় সুফিয়া কামাল এ দাঙ্গা প্রতিরোধে
কাজ করার সময় তার সাথে পরিচয় হয় সেই সময়ের বাংলা দেশের দুই উদীয়মান তরুণ
শিল্পী কামরুল হাসান ও জয়নুল আবেদিনের সাথে, যারা সেই সময় থেকেই তার নিজের
ভাই এ পরিণত হন । কবিদের মৃত্যু নেই; তাই তো তিনি এখনো পাঠকদের সাথে মিশে আছেন তার লেখা কবিতার প্রতিটি চরণে। “হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?” কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?” কহিল সে কাছে সরি আসি- “কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী- গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।” (তাহারেই মনে পড়ে কবিতার শেষ কিছু পঙক্তি)
বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি নারীর শরীরের ওপর কেবল একটি পু্রুষের মালিকানা নয় , পারিবারিক মালিকানা এনে দেয় । আমাদের মহাকাব্যগুলোর দিকে তাকালে এমনটাই দেখা যায় । প্রাচীনকালে কন্যারা স্বয়ংবরা হতেন , এই নিয়ে অনেককেই বেশ শ্লাঘা করতে দেখেছি , কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এইসব স্বয়ংবরের পেছনে থাকতো পৌরুষ দেখিয়ে নারীকে ""জয়"" করে নেবার কোনো না কোনো প্রতিযোগিতা !! তাকিয়ে দেখুন সীতার , তাকিয়ে দেখুন দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের দিকে !! একটি নারীশরীরের মালিকানা পাবার জন্য শৌর্যবান সব পুরুষদের দ্বৈরথ !! প্রতিযোগিতা দ্বারা নারীকে জয় করে নেবার প্রদর্শনী , যা শুনলেই মেলার মাঠে লটারি বা জুয়া খেলার কথা মনে পড়ে । পণ্য সাজানো থাকবে, বিভিন্ন কসরত করে যিনি খেলায় জিতবেন , পণ্যটি তাঁর । আর্য ভারতের ইতিহাসে নারীর পণ্যায়ণের পত্তন এই প্রথাগুলোর হাত ধরেই । গুহাজীবন বা গোষ্ঠীজীবনে নারীর অধিকার ছিলো স্বাধীনভাবে সঙ্গী চয়ন করবার , কিন্তু আর্যসংস্কৃতির এই স্বয়ম্বর ইত্যাদি প্রথা মূলত নারীর আপাত চয়নের অধিকারের আড়ালে নারীর শরীরের অধিকার নিয়ে জুয়া খেলা । সেখানে লক্ষ্যভেদ বা শর্তপূরণ যিনি করবেন, নারীটি তাঁর ভোগ্যা হবেন , তাঁর নিজের সেই বীরপুরুষটিকে পছন্দ হোক বা না হোক । আর শর্তগুলোও ঠিক করে দিতেন কন্যার পিতারা , কন্যা নিজে নন ।
দ্রৌপদীকে "জয়" করে আনলেন অর্জুন , শাশুড়ির সিদ্ধান্তে তিনি হয়ে গেলেন পঞ্চভর্তারিকা , নিজের কোনো অধিকার ছিলোনা না বলার । মুহূর্তে তাঁর শরীরকে পাঁচ পুরুষের ভোগ্য করে দেয়া হলো , তাঁর অনুমতির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা কেউ করলেন না , এমনকী অর্জুনও নন !! কারণ বিজিত নারীর শরীর কেবল প্রভু পুরুষটির নয় , পরিবারের সম্পত্তি । জ্যেষ্ঠ স্বামী যুধিষ্ঠিরের সিদ্ধান্তে তিনি মুহূর্তের মধ্যে রাজেন্দ্রাণী থেকে পরিণত হলেন দাসীতে , পাশাখেলায় পণ বা বাজি রাখা হলো তাঁকে । একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বাজি রেখে জুয়া খেলতে পারে কারণ নারীটি তার বা তার পরিবারের সম্পত্তি !! কোনোমতেই একজন স্বাধীন মানুষ নন !! নারীর এর চেয়ে চরম অগৌরবের আর কী হতে পারে ?? অন্তঃপুর থেকে প্রকাশ্য রাজসভায় চূড়ান্ত অপমানের মুখোমুখি হতে হলো তাঁকে । নিজের কোনো মতামত ছিলোনা সেখানেও !!
এছাড়াও স্বয়ংবরে নারীকে হরণ করবার প্রথাও ছিলো । কাশীরাজকন্যা অম্বা , অম্বিকা, অম্বালিকা তিন বোনকে স্বয়ংবর থেকেই হরণ করে এনেছিলেন ভীষ্ম , বৈমাত্রেয় ভাই বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য । এই হরণ প্রথা বা রাক্ষসবিবাহ প্রথাও অগৌরবের ছিলোনা পুরুষের পক্ষে বরং গৌরবের ছিলো । বাহুবল দ্বারা নারীকে জয় করা , তা সে নারীর তাকে পছন্দ হোক বা না হোক, সমাজের চোখেও অপার গৌরবেরই ছিলো । কাশীরাজকন্যা অম্বা মহারাজ শাল্বের বাগদত্তা ছিলেন , ভীষ্ম দ্বারা অপহৃত হবার পর তিনি আগুন জ্বেলে আত্মহত্যা করেন ।
নারীর নিজের সিদ্ধান্তে অপর পুরুষের সন্তানের মা হওয়া সমাজসিদ্ধ না হলেও , স্বামী বা পরিবারের অনুমতিতে সেসব ঢালাওভাবে সমাজসিদ্ধ ছিলো । কুন্তী বিবাহের পূর্বে নিজের সিদ্ধান্তে কর্ণের জন্ম দিয়েও তাঁকে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন , অথচ বিবাহের পর স্বামীর অনুমতিসাপেক্ষে যখন তিনজন ভিন্ন পুরুষের তিন সন্তানের মা হলেন , সেই পুত্রেরা পেলেন "বৈধ" রাজবংশগৌরব !! কাশীকন্যা অম্বিকা ও অম্বালিকাও ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েছিলেন শাশুড়ি সত্যবতীর আদেশে ভাসুর ব্যাসদেবের অঙ্কশায়িনী হতে , বংশরক্ষার তাগিদে !! অথচ স্বামী বিচিত্রবীর্য তখন মৃত , অর্থাৎ পৃথিবী জানবে যে সন্তান স্বামীর নয় , তাতে দোষও নেই !! বংশের সন্তান তো !! বংশধারা , পরিবার, এসবের কাছে নারীর নিজের শরীর , নিজের ইচ্ছে নির্মম এবং অবিসংবাদিতভাবে বলিপ্রদত্ত !!
অধুনা সুপ্রিমকোর্ট যে ৪৯৭ ধারাটি বাতিল করেছেন , সেখানেও এই কথাটিই ছিলো । নারী নিজের সিদ্ধান্তে কারোর সাথে শরীর ভাগ করতে পারবেনা , স্বামীর অনুমতিসাপেক্ষে পারবে । একেবারে মহাকাব্যিক নিদান । অনুমতি নিয়ে যা খুশি করুন কোনো অসুবিধে নেই । ও হ্যাঁ , স্বামীটির কিন্তু স্ত্রীর অনুমতির দরকার পড়বেনা অপর নারীর শয্যা ভাগ করতে অথবা স্ত্রী তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারবেন না সেক্ষেত্রে !! তবুও কতো না গেলো গেলো হায় হায় রব চারদিকে !!
মহাকাব্যে এমন নিদান দিয়েও দেখানো হয়েছে, পুরুষের কেটে দেয়া গণ্ডীর মধ্যে থাকলে নারী নিরাপদ , গণ্ডীর বাইরে গেলেই বিপদ !! লক্ষ্মণের গণ্ডী তো আসলে পুরুষতন্ত্রের দ্বারা নারীর জন্য মেপে দেয়া , নির্ধারণ করে দেয়া সীমারেখা । হে নারী তুমি পুরুষ বিনে একা , অসুরক্ষিত , অসহায় , খাদ্যবৎ !! অতএব গৃহের পরিধির মধ্যে থাকো , গণ্ডীর বাইরে বেরিওনা । গণ্ডীর মধ্যে থাকার অমোঘ নিদান তো মেয়েদের প্রতি পদে পদে !! অপর কেউ তোমায় ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি সেটা বিচার্য নয় , ছোঁয়ার সম্ভাবনামাত্রেই তুমি অসতী !! তোমায় ছুঁড়ে ফেলা যাবে আগুনে , ছুঁড়ে ফেলা যাবে নির্বাসনে , গর্ভাবস্থার মতো অবস্থাতেও ,নির্বিচারে !! আর তারপরেও ভাবীকালের নারী এহেন কর্মের কর্তাপুরুষের নামে জয়ধ্বনি তুলবে , ভক্তিগদগদ চিত্তে নত হবে । নিজের অপমান অসম্মান নির্যাতন পরিত্যাগ সবকিছু ভুলে গিয়ে প্রভুত্বস্বীকার আর ভৃত্যবৎ আনুগত্য নারীর মতোন আর কেউ দিতে পারবেনা পৃথিবীতে । এতোখানি পরিহাস নিজেদের নিয়ে আর কেউ করতে পারবেনা ।
অধিকৃত নারীশরীরটি বা তার গর্ভের মালিকানা বংশের বাইরে যেতে দেয়া যাবেনা , এ প্রথা কেবল আর্য নয় , অনার্য সমাজেও ছিলো । কিস্কিন্ধ্যাপতি বানররাজ বালীর রামের দ্বারা হত্যার পর তাঁর মহারাণী তারা বালীর অনুজ সুগ্রীবের দ্বারা এবং লঙ্কাপতি রাক্ষসরাজ রাবণের মৃত্যুর পর তাঁর রাণী মন্দোদরীকে রাবনানুজ বিভীষণের দ্বারা গৃহীতা হতে দেখা গেছে । অনার্য নারী সঙ্গীচয়নের ক্ষেত্রে আর্যনারী অপেক্ষা স্বাধীনতর হলেও বিবাহের পর তাদের শরীরের অধিকার স্বামী এবং তার কুল বা পরিবারের কুক্ষিগতই ছিলো । স্বাধীনভাবে নিজ শরীরের চূড়ান্ত পর্যায়ের মালিকানা বা অধিকার তাদেরও ছিলোনা ।
নারীর শরীর , গর্ভ , যোনি , সমস্তই পুরুষতন্ত্রের , পরিবারতন্ত্রের অধিকারে , কবজায় !! মহাকাব্যের সময়ের কিছু নিয়মের খোলস হয়তো পাল্টেছে, নিয়োগ প্রথা হয়তো আজ আর সেভাবে প্রকাশ্যে আইনত প্রচলিত নেই , কিন্তু ভেতরে ভেতরে আদৌ কতোটা পাল্টেছে ?? আইন খানিকটাও এগোতে চাইলে প্রগতির মুখোশ ছিঁড়ে এতো চিলচীৎকার জুড়ছে চারদিকে সবাই ...... আবার না এসব ফিরে আসে !! সময়টাওতো ভালো নয় , বরং দুঃসময় বড় ।
সারাদিন
এ পথে ও পথে এ পাড়ায় ও পাড়ায় ঘুরে ঘুরে দানাপানির জোগাড় করতে করতে রাত হয়।
পথের পাশে কুপি জ্বেলে বসে থাকে সবজিওয়ালারা, ফুল আর মালার পসরা সাজিয়ে
রাতের পসারিনী, হাইওয়ে দিয়ে সারি সারি মালভর্তি ট্রাক কোথায় যেন যায়
সারারাত ধরে। মনে হয়, রাত হল, ঘরে যাই। ভাবি, কোথায় আমার সেই ঘর?
কোথাও তো নেই। আকৈশোর ঘরছাড়া, ভবঘুরেগিরি করেই জীবন কাটল। কতো জায়গায় যে
থেকেছি, কতো জায়গায় যে ঘুমিয়েছি মঠে, মন্দিরে, আশ্রমে, পথে, গৃহস্থের ঘরে,
খোলা ছাদে কোথায় নয়। তার পরেও যেখানে যখন রাতে ফিরি তখন সেই জায়গাকেই ঘর
মনে হয়। কিন্তু তাকে ঘর কি আর বলা চলে? রাস্তা দিয়ে ফিরতে ফিরতে
দেখি কোনো এক বাড়ির আলো ঝলমলে জানালা, খাওয়ার টেবিলে এসে বসেছে সে বাড়ির
মানুষজন। স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ছেলের বৌ। হৈ হৈ ব্যাপার। তারা রাতের
খাবার খেতে খেতে গল্প করছে, হাসছে, মজা করছে। দূর থেকে দেখতে বেশ লাগে
তাদের এই সুখের পৃথিবীর খণ্ড মুহূর্ত। ভাবি, যদি এই সুখ চিরস্থায়ী হত! ওই পুরুষটি তার স্ত্রীকে ঘিরে যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা কি মিলে গেছে
পুরোপুরি? সবটা নয়। স্ত্রী যে স্বপ্ন দেখেছিল তার স্বামীকে নিয়ে, কিংবা
মা-বাবা যে স্বপ্ন দেখেছে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, তার ছিটেফোঁটাও কি মিলবে
বাস্তবের সঙ্গে? অল্প একটু মিলবে, বাকি অনেকটাই অধরা থেকে যাবে। মানুষের
স্বপ্ন বড় ব্যক্তিগত, বাস্তবের সঙ্গে সেই স্বপ্নের সচরাচর দেখা হয় না। সারা
জীবন পাশাপাশি থেকেও দুজন মানুষ একে অপরের কাছে অচেনা থেকে যায়। যে এই
কথার বিরোধিতা করে, সে হয় মিথ্যাবাদী, নয় মোহগ্রস্ত। সকলেই সকলের কাছে
শেষাবধি অচেনা। অচেনা, অপরিচিত মানুষ সব...কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ
সন্তানসন্ততি সেজে ডাইনিং টেবিলে কয়েক মুহূর্তের জন্য খেতে বসেছে, আনন্দ
করছে, হাসছে। কেউ কারুর নয়, তবুও। এখানে আচমকাই সব দেখা, কিছুদিন একসাথে
থাকা, তারপর চলে যাওয়া যে যার পথে। এই একসঙ্গে থাকাটার নামই ঘর? 'ঘর'
শব্দটির মধ্যে এই অভিপ্রায় তো ছিল না। নিশ্চিন্ত, পরম, অচ্ছেদ্য ভালবাসার
নীড়কেই তো আশা করেছে মানুষ 'ঘর' শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু এ
কেমন ঘর? একদল অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একজীবন থাকাথাকি, এই-ই ঘর? আর তা ছাড়া
সত্যিকারের ঘর কোথায় এই পৃথিবীতে, যেখানে ব্যক্তিমানুষের স্বপ্ন সাকার হয়ে
বিরাজ করে? দেয় চিরস্থায়িত্বের নিশ্চিন্ত আশ্বাস? ভাল লাগছে না তো? ভাল লাগবেই বা কেন? অপ্রিয় সত্য কার ভাল লাগে, বলুন? থাক ওসব কথা। চলুন, দেড়শো বছর আগের একটা গল্প বলি। এ শহরেরই উত্তর প্রান্তে গঙ্গাঘেঁষা কোনো এক অঞ্চলে জন্মেছিলেন এক অন্যরকম
মানুষ। নাম তাঁর হরিনাথ। যুবাবয়সে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ছিলেন তিনি। এক হাজার
বুকডন দিতে পারতেন। সাঁতরে গঙ্গা এপার ওপার করা তাঁর কাছে ছেলেখেলা ছিল।
শৈশবেই পিতৃমাতৃহীন। দাদা-বৌদির কাছে মানুষ। ব্রাহ্মণ যুবক। গম্ভীর
প্রকৃতির। একবেলা স্বপাক হবিষ্যান্ন আহার করতেন। সংস্কৃত ভাষায় অসামান্য
অধিকার। বেদান্তশাস্ত্রের পঠনপাঠনে অতিশয় মনোযোগ ছিল হরিনাথের। তারপর বহুদিন কেটে গেছে। দক্ষিণেশ্বরের এক সাধুর কাছে যাতায়াত ছিল। তাঁর
কাছ থেকেই ধর্মজীবনের দিশা পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন ত্যাগ ও প্রেমের অনুপম
আদর্শ, শাস্ত্রে যার আভাসটুকু মাত্র আছে। গুরুদেবের মহাসমাধির পর
ত্যাগব্রতী গুরুভ্রাতারা একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলেন বরানগরের একটা জীর্ণ
বাড়িতে। সকলেই প্রায় যুবক। নরেন, রাখাল, তারক, শশী, হরিনাথ, নিরঞ্জন...।
সেই তাঁদের প্রথম মঠ। যথাসময়ে সন্ন্যাস নিলেন তাঁরা। হরিনাথ হলেন
তুরীয়ানন্দ। কয়েক মাস থাকবার পর হরিনাথের এই মঠে আটকে থাকা ভাল
লাগল না। একদিন কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লেন পথে। মাঝে মাঝে বরানগরে খবর
আসত তাঁর। তারপর আর কোনো খবর নেই। বরানগরের সাধুভাইয়েরা-- তাঁরাও একে একে
বেরিয়ে পড়লেন অনিকেত যাত্রায়। কেউ কারুর খবর পেতেন না আর। কখনও এর ওর
সঙ্গে দেখা হয়ে যেত পথের বাঁকে। কিন্তু হরিনাথের খবর খুব কমজনই পেতেন।
অনেকে ধরে নিলেন, হরিনাথ মারা গেছেন। হরিনাথ কিন্তু তখন
গঙ্গোত্রীতে। একা। দুটি বহির্বাস, কম্বল একটা, একটি কমণ্ডলু, কটা বই। আর
কিছু নেই। ঘুরতে ঘুরতে এ বিজন স্থানে এসে পড়েছেন। একটি পরিত্যক্ত গুহা
পাওয়া গেল। এখানেই থাকতে শুরু করলেন। অনেক নীচে একটা ছত্র আছে। সপ্তাহে
দুদিন সেখান থেকে ভিক্ষা করে নিয়ে আসেন। তাতেই চলে যায়। দিনের বেশিরভাগ সময়
ধ্যানধারণা ও শাস্ত্রাধ্যয়নে ডুবে থাকেন। এইভাবে জীবনের কতো কতো নিমগ্ন
বছর চলে গেল। একটু রাত হলে গঙ্গার ধারে এসে বসেন। কনকনে হাড়হিম
ঠান্ডা। ঘোর অন্ধকার রাত্রি, নিঃশব্দ চরাচর, শুধু গঙ্গার নিরবধি
স্রোতোধ্বনি। সেই নীরব নিশীথের প্রহর জুড়ে হরিনাথ অন্তর্বহিঃশূন্য অনুভবে
মগ্ন হয়ে থাকেন। কখনও কখনও ধ্যান ছেড়ে নিশ্চুপে অন্ধকারে উদাস হয়ে বসে
থাকেন। প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়। রাত গাঢ়তর হলে ধীরে ধীরে গুহায় ফিরে আসেন হরিনাথ। এক রাত্রে এরকম গঙ্গাতীরে বসে থাকতে থাকতে মনে হল, বড্ড শীত লাগছে। গুহায়
ফিরে যাবেন। অন্যমনস্কভাবে নিজেকেই বলে উঠলেন, রাত হল। ঘরে চলো। অমনই সম্বিত ফিরে এল। এ আমি কী বললাম? ঘরে চলো? ঘর? আমার আবার ঘর কোথায়?
কোন সুদূর কৈশোরে ঘর ছেড়েছি...এখন আবার ঘর? এখনও ঘর? হায় হায়! এখনও আমার
গৃহসংস্কার রয়ে গেছে? ভয়ানক আত্মক্ষোভ হল তাঁর। দ্রুতপদে গুহাতে
ফিরে ধ্যানে বসলেন। অবিরত বিচার, ধ্যান, তপশ্চর্যায় নিরত থেকে ছয় মাসের
চেষ্টায় মনের অবচেতনা থেকে ঘর, ঘরের স্বপ্ন, ঘরের ধারণা, ঘরের স্মৃতিকে ঘষে
ঘষে মুছে তুলে দিলেন। ছয়মাস পর একদিন সানন্দে বলে উঠলেন, নাহ, আমার মনে আর
ঘর নেই। আমি যথার্থই অনিকেত হয়েছি! এই জীবন আসলে একটা সেতু। সেতুর উপরে কেউ ঘর বানায়? সেতু বেয়ে পার হয়ে চলে যেতে হয় শুধু। আর কিছু নয়। লেখক: সন্মাত্রানন্দ
প্রেমে প্রতারিত
হয়ে বা স্বামীর কাছে প্রতারিত হয়ে আইনি প্রতিকার চাইতে আসা প্রায় মেয়েদেরই
একটা কমন ডায়লগ আছে দেখেছি, "দিদি ও আগে আমি ছাড়া কিছু জানতোই না জানেন?
আর এখন চা খাওয়া হয়ে গেছে ভাঁড় ফেলে দিয়েছে, বুঝলেন তো কী বললাম? আর ফিরেও
দেখে না"!
আমার পা থেকে মাথা অবধি দপ করে আগুন ধরে
যায় এই কথা শুনে। ইচ্ছে করে ঠাটিয়ে একটি চড় কষাই, মেয়েটি ছিটকে পড়ুক নীচে!
দাঁত কিড়মিড় করে বলি হ্যাঁ রে গর্দভ, বুঝেছি সবই! এগুলোর কোনোটাই করা
হয়না তবে মেয়েটিকে থামিয়ে অতি অবশ্যই দিই। বলি ওহে মেয়ে আগে তুমি নিজের
মূল্য বুঝতে শেখো। নিজেকে অসম্মান করাটা বন্ধ করো! নিজেকে চায়ের ভাঁড়ের
চেয়ে একটু উৎকৃষ্ট কিছু ভাবতে শেখো!
সস্তার থার্ডক্লাস সব বাংলা সিনেমায় বা
বইপত্রে স্বামী বা প্রেমিকের সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে যাবার পর মেয়েদের
চায়ের ভাঁড়/ এঁটো শালপাতা ইত্যাদির সঙ্গে তুলনার প্রচুর প্রচুর উদাহরণ
রয়েছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির ক্ষেত্রে তো বটেই! সেই পোসেনজিতের কোনো এক
ছবিতে যেনো ছিলো না, এঁটো ফুল না বাসি ফুল কী একটা যেনো! দেবতার পুজোয়
লাগেনা! তো সেইসব দেখে দেখে বেড়ে ওঠা, ব্রেনওয়াশড মেয়েগুলোর মনে এর বেশি
আর কী ফীলিং থাকবে! এরা নিজেদেরকে ব্যবহৃত, এঁটো, ডিসপোজেবল ছাড়া আর কিছু
ভাবতেও শেখে না অগত্যা! কী পরিকল্পিত মগজধোলাই জনমভরের অসম্মান আর
আত্মগ্লানি বয়ে নিয়ে বেড়ানোর জন্য!
যারা বিক্রি হয়ে যান, প্রতারিত হন,
অপছন্দের লোকের গলায় মালা দিতে রাজী হন বাধ্য হয়ে, তাঁদের ভেতরের গ্লানি
আমি বুঝি। কিন্তু তাই বলে নিজেকে একটা মাটির ভাঁড় বা এঁটো শালপাতা ভাবতে
হবে কেনো? এতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভাবতে হবে কেনো? ব্যবহৃত ভাবতে হবে কেনো?
সেলফ এস্টিমেশান চূড়ান্ত তলানির পর্যায়ে না পৌঁছলে এইসব ধারণা আসতে পারে?
আর আত্মবিশ্বাস ভেতর থেকে আসে, ওটা না থাকলে লড়াইটা কিসের ভিত্তিতে হবে?
হয় কিন্তু, ক্রমাগত ভোক্যাল টনিকে
অনেকেরই খানিকটা আত্মবিশ্বাস ফেরে। ভাবতে থাকে তারা। আমার খুব প্রিয়
মানুষ, বিখ্যাত মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েকটি লাইন মনে পড়ে,
আমারও খুব প্রিয় লাইনগুলো, আমিও ভাবি প্রতিটি মেয়ের মানসিকতা যেনো এই
ধাঁচেই গড়া হয়, নিজেদের যেনো আগে চায়ের ভাঁড়ের বদলে গোটা মানুষ ভাবতে শেখে
মেয়েরা...
"গোপনে ছুঁয়েছো বলে আমার গোপনতম স্থান তোমার অধিকৃত, এ তোমার ভুল অনুমান। যতদূর চোখ যায়, স্পর্শ গেছে ঠিক ততোখানি, করায়ত্ত নয় কারো, বাকিটা আমার রাজধানী "।
আমার শেষ ইচ্ছা, আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন না কাঁদে, আমি চাই আমার শবদেহের পাশে সবাই যেন আমাকে গান শোনায়।
একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী টেলিভিশন চ্যানেলে
ফাহমিদা নবীর সাথে এক আলাপচারিতায় তার এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু
গত ৭ই মে ভোরের আলো ফোটার সময় যখন তার মৃত্যু সংবাদ গায়কের
পরিবার-শুভাকাঙ্ক্ষী-সহকর্মী-ভক্তদের কানে এসেছিল, তখন নিশ্চয়ই তাদের মন
কেঁদে উঠেছিল। হয়তোবা কেউ কেউ শুনতে বসে গিয়েছিলেন সুবীর নন্দীর কণ্ঠের
প্রিয় কোনো গান।
ব্রাকেটে জন্মসালের সাথে মৃত্যুসাল বসে গেল; Image source: facebook.comসুবীর নন্দী আধুনিক বাংলা গানের এক কিংবদন্তী শিল্পী, সুরের রাজকুমার। দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে তিনি গেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজারেরও
বেশি গান। আধুনিক বাংলা গানের জাগরণ পর্ব বলা হয় গত শতকের ষাটের দশককে।
স্বাভাবিকভাবেই তখন আমাদের দেশে ছিল ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানের শিল্পীদের
বিস্তর প্রভাব। ঠিক সেই সময়ে আবির্ভাব ঘটে সুবীর নন্দীর মতো কয়েকজন গুণী
শিল্পীর যারা যাবতীয় প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের সংগীত প্রতিভা ও
সাধনাকে কাজে লাগিয়ে সূচনা করেছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের নতুন এক
অধ্যায়ের। সুবীর নন্দী জন্মেছিলেন ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ
জেলার বানিয়াচং থানার নন্দীপাড়ায়। তার বাবা ডাক্তার সুধাংশু নন্দী ছিলেন
সংগীতপ্রেমী আর মা পুতুল রানীও বাড়িতে ঘরোয়াভাবে গান গাইতেন। তাই ছোটবেলা
থেকেই সুবীর নন্দী পারিবারিকভাবেই গানবাজনার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। বাবার
চাকরি সূত্রে নন্দীর শৈশব কেটেছে চা বাগান এলাকাতে। পড়েছেন সেই চা-বাগান
এলাকারই খ্রিষ্টান মিশনারীর একটা স্কুলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার
করার পর পড়াশোনার জন্য চলে যান হবিগঞ্জ শহরে। সেখানে ভর্তি হন হবিগঞ্জ
সরকারি হাইস্কুলে, তারপর পড়েছেন হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজে।
সুরের ভুবনে তার পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। তখন তিনি মাত্র তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। মায়ের কাছে প্রথম গান শেখা শুরু হলেও শাস্ত্রীয় সংগীতে তার গুরু ওস্তাদ বাবর আলী খান। তবে তিনি লোকগানে তালিম নিয়েছেন বিদিত লাল দাসের কাছে। কিশোর বয়সেই তিনি সিলেট বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে যান, সেখানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে। প্রথমে শুধুমাত্র সিলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৭২
সাল থেকে তার ঢাকায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। প্রথমদিকে নজরুলগীতি নিয়ে মনোযোগী
হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঝুঁকে পড়েন বাংলা আধুনিক গানের দিকে। বাংলাদেশ বেতারে (তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ) তার গাওয়া প্রথম
গান ছিল ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। গানটির সুরকার মীর কাশেম তাকে বেতারে
গান গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশেষকরে
যখন ১৯৭৬ সালে রাজা হোসেন-সুজয় শ্যামের সুরে আব্দুস সামাদের ‘সূর্যগ্রহণ’
চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক করার সুযোগ পেলেন। সেই সিনেমায় গাওয়া লোকগান ‘দোষী
হইলাম আমি দয়াল রে’ গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল।
কয়েকটা সিনেমায় গান
করার কিছুদিনের মধ্যেই তার গানকেন্দ্রিক ব্যস্ততা কয়েকগুন বেড়ে গেল। একের
পর এক নতুন গান রেডিওতে বাজছে, সেগুলোর প্রায় সবই আবার শ্রোতাপ্রিয়ও হচ্ছে।
তবে সে সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে’ আর ‘বন্ধু
হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’ গান দুইটি। এরপর ১৯৮১ সালে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে প্রথম একক অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান বাজারে আসে।
একক
কিংবা দ্বৈত, সব ধরনের গানেই নন্দী বাবু ছিলেন সাবলীল। সাবিনা ইয়াসমীনের
সাথে তার জুটি ছিল এক কথায় অনবদ্য। সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে প্রথম প্লেব্যাক
ছিল ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায়, একেবারে ক্যারিয়ারের শুরুতে। সেই সিনেমায় সত্য
সাহার সুরে ও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘মাস্টার সাব, আমি নাম-দস্তখত
শিখতে চাই’ গানটি সিনেমপ্রেমী সবার মুখেমুখে প্রচলিত ছিল। রুনা লায়লার
সাথেও তিনি অনেকগুলো গান করেছেন। বিশেষ করে তখনকার সময়ের প্রতিটি সাহিত্য
নির্ভর সিনেমাতে সুবীর নন্দীর গান থাকবেই। ‘দেবদাস’, ‘শুভদা’, ‘চন্দ্রনাথ’,
‘বিরাজ বৌ’ সিনেমাতে তার দরদমাখা কণ্ঠের জাদুতে সবাই মুদ্ধ হয়েছে। সংগীত
যে একটা গভীর সাধনার ব্যাপার সেটা সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীদের দেখলে বোঝা
যায়। গানের পাশাপাশি তিনি ব্যাংকেও চাকরী করতেন, কিন্তু গানের সাধনায় তিনি
কখনো কমতি রাখননি। প্রথমদিকে গান করার সময় জর্দা দিয়ে অনবরত পান খাওয়ার
অভ্যাসের কারণে কিছু শব্দের উচ্চারণ নিয়ে সমস্যায় পড়তেন। একদিন প্রখ্যাত
সুরকার সত্য সাহার সামনে বসে তিনি গান গাইছিলেন। কিন্তু একটা শব্দের
উচ্চারণ ঠিকঠাক কোনোভাবেই হচ্ছিল না। সত্য সাহা তাকে বললেন, "হবে কীভাবে? সারা দিন মুখে পান দিয়ে রাখলে উচ্চারণ বের হবে?" তারপর থেকে নাকি আর কখনো তার মুখে পান দেখা যায়নি। তার
শৈশব-কৈশোর কেটেছে আধুনিক বাংলা গানের জোয়ারের মধ্যে। তাই স্বাভাবিকভাবেই
উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী পঙ্কজ মল্লিক, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না
দে, জগজিৎ সিং-দের ভক্ত ছিলেন তিনি। এদের গান শিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে সুবীর নন্দীকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, প্রভাবিত করেছে।
নন্দী পরিবার, সহধর্মিণীদের সাথে চার ভাই; Image source: facebook.comঅগ্রজ
সংগীতজ্ঞদের অনেকে নতুন দিনের কালচার ব্যান্ড সংগীতকে অপসংস্কৃতির অংশ
হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছিলেন। তাদের কারোর মতে পপ কিংবা ব্যান্ড সংগীত নাকি
বাংলা গানের জন্য হুমকিস্বরূপ। এক সাক্ষাৎকারে সুবীর নন্দীকে এ বিষয়ে
প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন,
আমি
বিশ্বাস করি, সংগীত সবটাই সংগীত। সংগীতে ‘অপ’ বলতে কিছু নেই। আমাদের দেশে
অনেক পণ্ডিতশ্রেণির সমালোচক পপ সংগীত কিংবা ব্যান্ড সংগীতকে নাক সিটকান।
এটা আমাকে খুব ব্যথিত করে। একটা জিনিসকে আমি জানলাম না ভালো করে, বলে
ফেললাম জাত গেল, জাত গেল। এটা ঠিক নয়। কারণ, আমাদের পপ ও ব্যান্ডের আন্দোলন
অনেক এগিয়ে গেছে।
তার জনপ্রিয় কিছু গানের মাঝে আছে- আমার
এ দুটি চোখ, হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, বৃষ্টির
কাছ থেকে, একটা ছিল সোনার কন্যা, চাঁদের কলঙ্ক আছে, ও আমার উড়াল পঙ্খী
রে, দিন যায় কথা থাকে, হাজার মনের কাছে, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, সেই
দুটি চোখে, কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়, তোমারই পরশে জীবন, বন্ধু তোর বরাত
নিয়া, মাস্টার সাব, আমি নাম-দস্তখত শিখতে চাই ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননার মাঝে আছে- একুশে পদক (২০১৯); জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (৫বার); সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পীঃ মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা ( ১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), মহুয়া সুন্দরী (২০১৫); বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার; সেরা পুরুষ কন্ঠশিল্পীঃ ১৯৭৭, ১৯৮২, ১৯৮৫, ১৯৮৬; ১৩তম চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার (আজীবন সম্মাননা)।
গত
১৪ এপ্রিল পরিবারের সাথে শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ট্রেনে অসুস্থ
হয়ে পড়লে রাত ১১ টার দিকে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি
করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। তাছাড়াও তার হার্টে বাইপাস
অপারেশন করা হয়েছিল। আবার কিডনিতেও সমস্যা ছিল। টানা ১৬ দিন সেখানে
চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ এপ্রিল উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে
সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর নেওয়ার কয়েকদিন পর সুবীর নন্দীর
শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তারপর থেকে ক্রমেই অবস্থার অবনতি হতে
থাকে। সেখানে চিকিৎসা চলাকালেও তিনি পরপর তিনবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন।
শেষমেষ গত মঙ্গলবার (৭ মে) ভোর সাড়ে চারটার দিকে তিনি দৈহিকভাবে মৃত্যুবরণ
করেন। দৈহিকভাবে তার মৃত্যু হলেও আত্মিকভাবে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন
সঙ্গীতপ্রেমীদের মাঝে।
১৯৪৭
সালের দেশভাগে জন্ম নেওয়া নতুন দেশ পাকিস্তান, নতুন দেশের মুদ্রা থেকে
ডাকটিকেট, মানিঅর্ডার থেকে শুরু করে নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় সরকারি সব কাগজে
বাংলাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে এভাবে
দূরে সরিয়ে রাখায় চাপা কষ্ট বুকে নিয়েই গণপরিষদে একটি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত; Source: bonikbarta.net
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পাকিস্তানের বয়স তখন ছয়মাসের ঘরে, করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম
অধিবেশনে প্রস্তাব করা হয়েছিলো, “ইংরেজির সঙ্গে উর্দুও পাকিস্তান
গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে বিবেচিত হবে”। ধীরেন্দ্রনাথের আনা সংশোধনীতে
প্রস্তাব করা হয়েছিলো, বাংলাকেও পরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি
দেওয়ার জন্য।
ধীরেন্দ্রনাথ বাঙ্গালী এবং মাতৃভাষার প্রতি তার সহজাত
আবেগ থাকা স্বাভাবিক। পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে যে তিনি সেই আবেগের
প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই তিনি বলেছিলেন,
“So
sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our
state and therefore Bengali should not be treated as provincial
language. It should be treated as the language of the state.”
তবে
গণপরিষদের সেই অধিবেশনে তার বক্তব্যে যতটা না আবেগের প্রতিফলন ছিলো বরং
তার চেয়ে বেশি ছিলো যুক্তির ধার। পাকিস্তানের ছয় কোটি নব্বই লক্ষ জনগণের
মধ্যে চার কোটি চল্লিশ লক্ষই যে বাংলা
ভাষাভাষী এবং পাকিস্তানের রাজকার্যে তাদের ভাষাকে বাদ দিলে সমস্যার সৃষ্টি
হবে সেটিও তার বক্তব্যে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তার
বক্তব্য থেকেই প্রথম দাবি ওঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলার পথে
প্রান্তরে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাকেই অভিজাত গণপরিষদ সদস্যদের সামনে তুলে
ধরেছিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার একজন মানুষ সাধারণ পোস্ট অফিসে মানিঅর্ডার
করতে গেলেও যে উর্দু ভাষায় লিখিত ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খান এই কথাটিই
ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো সেদিন। খাম-পোস্টকার্ডের
ভেতরে বন্দী থাকা ছাড়া বাংলার যেন আর কোনো গতি নেই।
দীর্ঘদিনের
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন কাজটি তার জন্য সহজ হবে না। তবে
তার আশা ছিলো পূর্ব বাংলার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতারা তার পক্ষে সমর্থন
দেবেন।
প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন; Source: dailyasianage.com
কিন্তু পূর্ব
বাংলার কোনো মুসলমান গণপরিষদ সদস্যই তার এই প্রস্তাবকে আমলে নিলেন না।
ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান উর্দুভাষী খাজা নাজিমুদ্দীন সরাসরি এই
প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বসলেন। কটাক্ষের তীরে ধীরেন্দ্রনাথকে জর্জরিত
করলেন খাদ্যমন্ত্রী রাজা গজনফর আলী খান। আর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান
এই প্রস্তাবের সূত্র ধরে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বললেন,
“আসলে
যখন সংশোধনী নোটিশটি দেওয়া হয় তখন ভেবেছিলাম এর উদ্দেশ্যটা নির্দোষ।
‘কিছু লোক’ যদি গণপরিষদে ইংরেজি বা উর্দুতে দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের প্রকাশ
করতে না পারে তাহলে তারা ওই ভাষায় বক্তব্য পেশ করতে পারে। কিন্তু এখন দেখছি
আগে যা ভাবছিলাম এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য তো তেমন নির্দোষ নয়।”
মূলত,
প্রথমে যখন গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ইংরেজী আর উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে
প্রস্তাব করা হয় তখন পর্যন্ত লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবটিকে নির্দোষ
ভেবেছিলেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান; Source: brecorder.com
কিন্তু
গণপরিষদে দেওয়া বক্তব্যে যখন তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবেও স্বীকৃতি
দেওয়ার জন্যে ন্যায্য প্রস্তাবটিকেও সামনে নিয়ে আসলেন তখন প্রধানমন্ত্রী
তার বক্তব্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ঢেলে দিতে ভুল করেননি। পাকিস্তানের
ভিত্তি যে ধর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই জানিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই রাষ্ট্রের
ধর্মীয় চরিত্র বজায় রাখার জন্য সর্বত্রই উর্দুর প্রাধান্য থাকা প্রয়োজন সেই
ব্যাপারে একটি অযৌক্তিক বক্তব্যও দিয়ে দিলেন। পাশাপাশি সংসদে বাঙ্গালীর
প্রাণের দাবী যৌক্তিকভাবে তুলে ধরার অপরাধে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বিছিন্নতাবাদী উপাধি দিয়ে দিলেন। পূর্ব বাংলা থেকে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্য প্রেমহরি বর্মন
বাদে প্রায় সকল বাঙ্গালী গণপরিষদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের
সেই বক্তব্য বিনা বাক্যব্যয়ে হজম করে নিলেন। ফলাফল হিসেবে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি
পাকিস্তান গণপরিষদে বাঙ্গালী স্পিকার তমিজউদ্দিন খানও রায় দিতে বাধ্য হলেন
প্রস্তাবটি গৃহীত হচ্ছে না। বাঙ্গালীর ভাষার দাবীতে প্রথম যে
নিয়মতান্ত্রিক দাবীটি উঠেছিলো তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু এই
গণপরিষদে এই একটি মাত্র প্রস্তাব সমগ্র পূর্ব বাংলায় এক ঝড় তুলবে, সেই ঝড়ই
একদিন বাঙ্গালীকে মুক্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেকথা তখনো পাকিস্তানীদের
শাসকদের হিসেবের বাইরে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অনেকটা ব্যথিত হৃদয় নিয়েই
করাচি থেকে ঢাকায় ফিরলেন। তেজগাঁ বিমান বন্দরে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল
অভূতপূর্ব এক সংবর্ধনা। সেই সংবর্ধনাকে তিনি তার স্মৃতিকথায় এভাবেই
অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন,
“প্রথম
গণপরিষদ অধিবেশন শেষে করাচি থেকে ফিরলাম। অনুন্নত তেজগাঁ বিমান বন্দরে
সিকিউরিটি বলতে কিছুই নেই। প্লেন থেকে নেমে দেখলাম, প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশজন
যুবক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। তাদের প্রত্যেকের গায়ে চাদর। আমার ধারণা হলো,
গণ-পরিষদে বাংলার সপক্ষে কথা বলার দরুণ এরা বিক্ষোভ জানাতে এসেছে, এদের
চাদরের আড়ালে অস্ত্রও থাকতে পারে। সংশয় নিয়ে এগিয়ে গেলাম। যখন ওদের একেবারে
নাগালের মধ্যে চলে গেছি তখন হঠাৎ প্রত্যেকে চাদরের তলা থেকে রাশি রাশি ফুল
বের করে আমার ওপর বর্ষণ করতে লাগলো। ওরা সবাই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র।”
ধীরেন্দ্রনাথের প্রস্তাবটি গণপরিষদে বাতিল হয়ে যাবার ফলে ২৬ ফেব্রুয়ারিতে
ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট অনুষ্টিত হয়। স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা
ক্লাশ ছেড়ে বেড়িয়ে আসে। বাংলার সপক্ষে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি খাজা
নাজিমুদ্দীন, তমিজউদ্দীন খানকে ধিক্কার জানানো হয় এই ধর্মঘট থেকেই। সেই
বছরের ১১ মার্চ সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট
পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছাত্র
রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাওয়ার
ফলে তিনিও ব্যথিত হয়েছিলেন, প্রতিবাদে যুক্ত করেছিলেন নিজেকে। এই ঘটনার
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছিলেন,
“পূর্ব
পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল,
বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ
শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশ
যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’
গঠন করে।… সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা
হল।”
১১ মার্চের ছাত্র ধর্মঘটে ড. মুহম্মদ
শহীদুল্লাহর মত শিক্ষকেরাও সামনে থেকে রাস্তা দেখিয়ে গেছেন। এই আন্দোলনে
গ্রেফতার হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, রণেশ দাশগুপ্তসহ অসংখ্য
ছাত্রনেতা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তখন বাঙ্গালীকে একদম ভেতর থেকে
নাড়া দিয়েছে।
শেরে বাংলার কাছ থেকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত; Source: bdnews24.com
বাঙ্গালির
আত্মপরিচয়ের অন্যতম উপাদান ছিলো এই বাংলা ভাষা। পাকিস্তান গণপরিষদে সেই
প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হলো, জিন্নাহ আর খাজা নাজিমুদ্দীন বলে গেলেন উর্দুই
হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। আর তাই বাঙ্গালীকে নিজের আত্মপরিচয়ের এই
উপাদানকে বাঁচাতে রাজপথে নামতে হয়েছিলো। ভাষা সাধারণ মানুষের জীবনের কতটা
বড় অংশ জুড়ে থাকে তা হয়তো পাকিস্তানের গণপরিষদের অভিজাতশ্রেণী বুঝতে
পারেনি। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন তার দাবী মেনে না নিলে যে এই
দাবী রাজপথেই আদায় হবে।
চার বছরের ঘটনাক্রমেই ১৯৫২ সালের সেই একই
ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রাণের ভাষার দাবী আদায় করে পাকিস্তানী শাসকদের ভিত
নাড়িয়ে দিয়েছিলো বাঙ্গালী। হয়তো বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে
পারবে না বলেই ১৯৪৭ এ দেশভাগের কঠিন মুহুর্তেও থেকে গিয়েছিলেন নিজের
পিতৃভূমিতে।
১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার বাকী সদস্যদের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত; Source: bdnews24.com
তবে
শুরু থেকেই কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা ধীরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন
ভারত ভাগ না হোক, অন্তত ধর্মের ভিত্তিতে তো নয়ই। বাংলাকে ভাগ করার
সিদ্ধান্তেও চরমভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। কংগ্রসের
অসংখ্য নেতা-কর্মী, বন্ধুবান্ধব আর অনুসারীদের অনুরোধ উপেক্ষা করেও থেকে
গেলেন পূর্ববঙ্গে, মাতৃভূমির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেননি। কঠিন সেই
দিনগুলোর কথা তার স্মৃতিকথায় ঠিক এভাবেই লেখা আছে,
“পাকিস্তান
হওয়ার পর আমার বহু রাজনৈতিক বন্ধু পাকিস্তান ত্যাগ করিয়া ভারতবর্ষে চলিয়া
যান। ত্রিপুরা জেলার বহু কংগ্রেস কর্মী ও বহু লোক পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া যান।
অভয় আশ্রমের বহু কর্মী পূর্ববঙ্গ ছাড়িয়া পশ্চিমবঙ্গে তাঁহাদের কর্মস্থান
ঠিক করিলেন, তাহাতে আমি বহু রাজনৈতিক বন্ধু হারাইলাম, বেদনায় মন ক্লিষ্ট
হইয়া গেল। কিন্তু পূর্ববঙ্গে থাকিব এই সংকল্প করিয়াছি, সেই জন্য
পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুবান্ধবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করিয়া পূর্ববঙ্গে রহিয়া
গেলাম।”
১৮৮৬ সালে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি আজীবন
নিজেকে মাটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই চিন্তা করে গেছেন। ১৯৭১ সালের
অগ্নিঝরা মার্চে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন বাঙ্গালীর স্বায়ত্ত্বশাসনের সূর্য ওঠার কথা।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে এ্যারোমা দত্ত ও রাহুল দত্ত; Source: bdnews24.com
কুমিল্লার সেই বাড়ি থেকেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায়। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদকে তারা নির্মমভাবে হত্যা
করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পবিত্র রক্তে আজো ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি,
আমাদের প্রতিটি বাংলা শব্দে পরম মমতায় জড়িয়ে আছেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের এই
ধ্রুবতারা।