Search This Blog

Friday, February 8, 2019

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

"মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত
করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে।"
-- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী বলা হয় তাকে। ছোটবেলায় একবার মাথায় একটা ফোঁড়া হওয়ায় সব চুল ফেলে দেয়া হয়। সেই থেকে সবাই তাকে ডাকতো ‘ন্যাড়া’ বলে। নামটি শুনে মনে পড়েই যায় ‘বিলাসী’ গল্পের কথা। পাঠ্যবইয়ের বদৌলতে প্রায় সবাই-ই পড়েছে। মৃত্যুঞ্জয়ের সকল গল্পের ঝুলি নিয়ে পাঠকদের কাছে যে গল্প বলেছিলো, সে কথকের নামও কিন্তু ছিল ‘ন্যাড়া’। এই দুজন ব্যক্তিই এক। আজ আমরা বলছি বিলাসী গল্পের কথক শরৎচন্দ্রের কথা। পুরো নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি ব্যক্তিজীবনেও সাপুড়েদের মতো পটু ছিলেন বিষধর সাপ ধরার ক্ষেত্রে।

গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ সব জায়গায়ই পাঠককূলে সমাদৃত এক সাহিত্যিক। রোম্যান্টিক ট্র্যাজেডি কিংবা সমাজ সংস্কার, আবহমান বাংলার আত্মকথা কিংবা স্যুট-ব্যুট পরা কোনো বিলেতফেরত নায়ক, আত্মত্যাগে নিজেকে বিলীন করে দেয়া নায়িকা কিংবা প্রতিবাদে মাথাচাড়া দেয়া কোনো অরক্ষণীয়া। শরৎচন্দ্র এদের সবাইকেই খুব গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন আমাদের কাছে। নারীর প্রতি বিশেষ একধরনের স্থান থাকতো শরতের গল্প-উপন্যাসে, তার সমসাময়িক অন্যদের মতো নারীকে তিনি শুধু অবলা বলেই রেখে দেননি, তাদের মুখে বুলি ফুটিয়েছেন, কিছুটা হলেও তাকে দাঁড় করিয়েছেন সমাজের স্রোতের বিরুদ্ধে। রবি ঠাকুরের হৈমন্তী যখন স্বামী সংসার আর যৌতুকের পরাকাষ্ঠার বলি হয়, শরতের বিলাসী তখনো লড়ে যাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু জয়ে।

পরিবার, বন্ধু, কাউকে কিছু না জানিয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বর্মা (এখন মায়ানমার) পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু জাহাজ বর্মার রাজধানী রেঙ্গুনে ঢোকার আগেই তাঁকে যেতে হল ‘কোয়ারান্টিন’-এ। সেই সময় কোনও বন্দরে সংক্রামক ব্যাধি দেখা দিলে সেখান থেকে জাহাজ অন্য বন্দরে প্রবেশের আগে জাহাজকে বন্দর থেকে কিছুটা দূরে অন্য এক জায়গায় কয়েক দিন রাখা হত। একেই বলা হয় কোয়ারান্টিন। রেঙ্গুন তখন প্লেগে ভয়ংকর বিপর্যস্ত। বর্মার সাহেবসুবোরা ধরেই নিয়েছিল, প্লেগ ছড়িয়েছে তৎকালীন বম্বের বন্দরে জাহাজে জাহাজে যে কুলিরা কাজ করে, তাদের থেকে। রেঙ্গুন ঢোকার আগেই কুলি আর ডেকের অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রও গেলেন আটকে। এক জঙ্গলঘেরা জায়গায় কাটালেন নয় নয় করে সাত দিন।



অবশেষে ঢোকা গেল রেঙ্গুন শহরে। হাত একেবারে খালি। সে সময় রেঙ্গুন শহরে একটিমাত্র বাঙালি হোটেল—‘দাদাঠাকুরের হোটেল’। সেখানে থেকেই শরৎচন্দ্র তাঁর মেসোমশাই অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ঠিকানা জেনে শেষমেশ পৌঁছলেন তাঁর কাছে। অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন রেঙ্গুনের নামকরা উকিল। শরৎচন্দ্র সাত দিন আটকে ছিলেন শুনে মেসোমশাই বললেন, ‘‘তুই আমার নাম করতে পারলি না? আমার নাম করে কত লোক পার হয়ে যায়, আর তুই পড়ে ছিলিস করনটিনে!’’
বর্মি ভাষা শিখে শরৎচন্দ্র যদি বর্মায় ওকালতি করে তা হলে তাকে আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে না, এ কথা শরতের পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়কে অঘোরবাবু আগেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু শরতের আর উকিল হওয়া হল না। কারণ, তিনি বর্মি ভাষার পরীক্ষাতেই পাশ করতে পারলেন না।

উকিল না হয়েও প্রায় তেরো বছর তিন মাস বর্মায় কাটিয়ে ফেললেন শরৎচন্দ্র। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন উত্তর বর্মার অলিতে-গলিতে। মিশেছিলেন চোর, ডাকাত, খুনি... হাজারও মানুষের সঙ্গে। বিচিত্র সেই সব অভিজ্ঞতা!
বর্মার নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল সরকারি কন্ট্রাক্টর গিরীন্দ্রনাথ সরকারের। পেশায় সরকারি চাকুরে, কিন্তু তাঁর নেশা ছিল ভ্রমণ। শরৎচন্দ্র বর্মি ভাষা একেবারেই বুঝতে পারতেন না। গিরীনবাবুই তাঁর দোভাষীর কাজ করতেন। এক দিন দু’জনে ঘুরতে বেরিয়েছেন। রাস্তায় দেখলেন, মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে এক দল বর্মি মেয়ের সঙ্গে কিছু লোকের ঝগড়া হচ্ছে। গিরীনবাবুকে জিজ্ঞেস করে শরৎচন্দ্র জানলেন, বর্মায় মরা মাছের খুব কদর। জ্যান্ত মাছ মেরে খাওয়া নাকি ওদের কাছে অধর্ম। ব্যাপারটা জেনে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘‘তা হলে দেখছি একদিন গুচ্ছের মাছ মেরে ওদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে।’’ উত্তরে গিরীনবাবু বললেন, ‘‘উহুঁ, ওরা এমনি এমনি নেওয়ার পাত্র নয়, যা নেবে পয়সা দিয়ে নেবে। আর যদি বোঝে মতলব খারাপ, সঙ্গে সঙ্গে ফনানে-ছা। মানে জুতোপেটা!’’

শোনা যায়, প্রণয়ঘটিত ব্যর্থতার যন্ত্রণা ভুলতে প্রথম জীবনে হাতে পয়সা পেলেই শরৎচন্দ্র বেজায় মদ্যপান করতেন। মাঝে মাঝে মদ খেয়ে বেহুঁশও হয়ে পড়তেন। এক দিন শরৎচন্দ্রের বাড়িতে মদ শেষ। কী করা যায়? গভীর রাতে এক বাঙালি বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে চললেন তাদেরই পরিচিত এক বর্মি বন্ধুর বাড়ি মদ আনতে। বর্মি বন্ধুটির হার্টের অসুখ থাকায় তাঁর মদ খাওয়া নিষেধ ছিল। অনেক অনুরোধের পর বন্ধুর স্ত্রী মদের বোতল বের করে দিলেন। এ দিকে শরৎ ও অন্য বন্ধুদের কী খেয়াল হল, তাঁরা মদ খেতে বসে পড়লেন ওই বর্মি বন্ধুর বাড়ির বারান্দাতেই। মদ খাবে না, এই শর্তে সেও আসরে যোগ দিল। স্ত্রীর নজরদারিতে গোড়ায় মদ না খেলেও, স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়লে বন্ধুদের অনুরোধে যথারীতি মদের গ্লাসে চুমুকও দিয়ে ফেলল। তার কিছু ক্ষণ পরেই হঠাৎ বুক চেপে ধরে বিকট আর্তনাদ, এবং মৃত্যু!
এর পর শরৎচন্দ্র মদ ছে়ড়ে আফিম ধরেছিলেন। যে নেশা তাঁর জীবনের শেষ দিন অবধি ছিল। ভাল গান গাইতেন, শরতের গানে মুগ্ধ হয়ে কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁকে ‘রেঙ্গুন রত্ন’ উপাধি দিয়েছিলেন।

রেঙ্গুনের যৌনপল্লিতেও নাকি শরৎচন্দ্রের যাতায়াত ছিল। এক বার একটি মেয়ের কাছে গিয়ে দেখলেন, তার বসন্ত রোগ হয়েছে। তা দেখে বন্ধুরা সকলে ভয়ে পালিয়ে গেলেও শরৎচন্দ্র কিন্তু পালালেন না। পয়সা খরচ করে ডাক্তার ডাকলেন, মেয়েটির চিকিৎসা করলেন। এত কিছু করা সত্ত্বেও মেয়েটি বাঁচল না। শরৎচন্দ্র মেয়েটির সৎকারও করেছিলেন।

রেঙ্গুনে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন লোয়ার পোজনডং-এর এক মিস্ত্রিপল্লিতে। সেখানকার মানুষজনের আপদে-বিপদে সাহায্য করা, অসুখে হোমিয়োপ্যাথি ওষুধ দেওয়া, সব মিলিয়ে শরৎচন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান মুশকিল আসান। শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা দেখে বন্ধু গিরীন মিস্ত্রিপল্লিকে মজা করে বলতেন ‘শরৎপল্লি’।

এই মিস্ত্রিপল্লিতেই এক অসহায় মেয়েকে সাহায্য করতে গিয়ে শরৎচন্দ্র বিপদে পড়েছিলেন। ওই পল্লিতে থাকত এক দম্পতি। বছরখানেক পর মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে যুবকটি তাকে ছেড়ে পালায়। মেয়েটির প্রসব বেদনা উঠলে স্থানীয় লোকজন গেলেন শরৎচন্দ্রের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করতে। শরৎচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকলেন। সন্তান প্রসবের পর মেয়েটির দুঃখের কাহিনি শুনলেন ও যুবকটির খোঁজে লোক লাগালেন। খোঁজ পাওয়ার পর শরৎচন্দ্র লোক মারফত যুবকটিকে বলে পাঠালেন, সে যেন তার স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রহণ করে। যুবকটি কিন্তু মেয়েটিকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করল। তারা যে বিবাহিত ছিল না সেটাও জানা গেল। ছেলেটি তখন অন্য এক জায়গায় সংসার পেতেছে।
শুনে বেজায় চটলেন শরৎচন্দ্র। অসহায় মেয়েটিকে বললেন, যুবকের বিরুদ্ধে খোরপোশের মামলা করতে। মামলা কোর্টে উঠলে যুবকটি বলল, মেয়েটির সঙ্গে শরৎচন্দ্রের সম্পর্ক আছে। সদ্যোজাত সন্তানটি তার নয়, শরৎচন্দ্রের। আর সন্তান প্রসবের সময় সে কারণেই নাকি শরৎচন্দ্র খরচাপাতি করে ডাক্তার আনিয়েছিলেন। বিচারক সব শুনে ডাক্তারের বয়ান নিলেন। ডাক্তার জানালেন, শরৎচন্দ্র তাঁকে ডাকলেও প্রসবের সময় মেয়েটি তার স্বামীর নাম, মানে ওই যুবকটির নামই করেছিল। যে নাম তার ডায়েরিতে লেখা আছে। বিচারক সিদ্ধান্ত শোনালেন। যুবকটি খোরপোশ দিতে বাধ্য হল।

রেঙ্গুনের বাড়িতে ছিল তাঁর নিজস্ব একটি লাইব্রেরি। কাঠের এই বাড়িটি তিনি কিনেছিলেন এক ইউরোপীয় সাহেবের কাছ থেকে। এক বার আগুন লাগল সেই বাড়িতে। পুড়ে ছাই হয়ে গেল সব কিছু। তার মধ্যেই ছিল ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি এবং তাঁর নিজের আঁকা বেশ কিছু পেন্টিংও। সব খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে শরৎচন্দ্র পথে এসে দাঁড়ালেন, কুকুর ‘ভেলি’ আর পোষা কাকাতুয়া ‘বাটুবাবু’র সঙ্গে।

আক্রান্ত হলেন রোগে। হাত-পা ফুলে যাচ্ছে, যন্ত্রণা। অবস্থা এমন, প্রায়-পঙ্গু পা নিয়ে চলাফেরাই করতে পারেন না। ডাক্তার জানালেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণেই এই দশা, বর্মা ছাড়লে তবেই এ রোগ সারবে। এ দিকে চিকিৎসার জন্য ছুটি চাওয়া নিয়ে অফিসে বড়সাহেবের সঙ্গে বচসা বাধল। শরৎচন্দ্র খুব উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গেলেন সাহেবের দিকে। বাঙালি কেরানির ঔদ্ধত্য দেখে সাহেব স্তম্ভিত!

সে দিনই কাজে ইস্তফা দিলেন শরৎচন্দ্র। ফিরলেন দেশে। দেশে ফিরে চেহারায় বদল আনলেন। রেঙ্গুনে থাকার সময় দাড়ি রেখেছিলেন। ঘন ঘন সিগারেট খেতেন। খেলতেন দাবা। জীবনচর্চায় ছিল ফরাসি বোহেমিয়ানিজমের প্রভাব। তখন তাঁর গুরু ফরাসি সাহিত্যিক এমিল জোলা। বর্মা থেকে ফেরার কয়েক বছর পর দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে ফেললেন। শুরু হল আর এক নতুন জীবন।

বাংলা কথাসাহিত্যে ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্র পাঠ করেন নি এমন শিক্ষিত বা মোটামুটি লেখাপড়া জানা বাঙালি পাওয়া দুষ্কর। ব্যাপারটা আরও একটু পরিষ্কার করে লেখা যেতে পারে, পৃথিবীর যে কোনো বাংলাভাষীর সঙ্গে শরৎচন্দ্রের পরিচয় হয়েছে; না হয়ে উপায় নেই। এতো গল্প, এতো উপন্যাস আর এতো আশ্চর্য চরিত্র তিনি তৈরি করেছেন- সেইসব চরিত্র বা আখ্যান পাঠ না করে এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, যে কোনো বাঙালির পক্ষে।
কবিগুরু যথার্থ বলেছিলেন "শরৎচন্দ্রের সৃষ্টি ডুব দিয়েছে বাঙালির হৃদয়রহস্যে| সুখে দুঃখে মিলনে বিচ্ছেদে সংঘটিত বিচিত্র সৃষ্টির তিনি এমন করে পরিচয় দিয়েছেন বাঙালী যাতে আপনাকে প্রত্যক্ষ জানতে পেরেছে।"

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে শরৎচন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে ইউনাইটেড প্রেসের প্রতিনিধিকে বলেন-‘ যিনি বাঙালীর জীবনের আনন্দ ও বেদনাকে একান্ত সহানুভূতির দ্বারা চিত্রিত করেছেন, আধুনিক কালের সেই প্রিয়তম লেখকের মহাপ্রয়াণে দেশবাসীর সঙ্গে আমিও গভীর মর্মবেদনা অনুভব করছি’।

এর কয়েকদিন পরে ১২ই মাঘ তারিখে কবি আবার শরৎচন্দ্রের মৃত্যু সম্পর্কে এই কবিতাটি লিখেছিলেন-
যাহার অমর স্থান প্রেমের আসনে।
ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে।
দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি।

শরৎচন্দ্র সৃষ্ট রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত-ইন্দ্রলাল, রমা-রমেশ, সব্যসাচী, বড়দিদি, সতীশ-সাবিত্রী, বিলাসী সহ আরো বহু অমর চরিত্র বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধতর। তার শক্তিশালী লেখনী ও সমাজকদে ভিন্নভাবে দেখবার চোখ সাহিত্যজগতে যুক্ত করেছে বহু কালজয়ী রচনা, যার আবেদন পাঠকসমাজে বছরের পর তাকে জীবিত রাখবে একজন অপরাজেয় কথাশিল্পীর পরিচয়ে।

মনুষ্যত্বের মরণ যাকে আহত করত নিয়ত , আজন্ম অসাম্প্রদায়িক,নারীর প্রতি বৈষম্যকে আঘাত করেছেন তীব্রভাবে , বাঙালির চিরন্তন আবেগ , প্রেম , বেদনা, আটপৌরে জীবনের অনিন্দ্য কথাকার শরৎবাবু...

লেখক: লুৎফুল কবির রণী, কবি ও প্রাবন্ধিক

কুঠিবাড়ী: ড. অশোক মিস্ত্রি

কুঠিবাড়ী
ড. অশোক মিস্ত্রি

জোড়াসাঁকো, শান্তিনিকেতন, কুঠিবাড়ী
গঙ্গা, কোপাই, পদ্মা, হে ঠাকুর কবি
তোমার এ সবইতো দেখলামÑ
প্রতিবার যখনই তোমার কাছে গেছি,
তোমার সম্মুখে দাঁড়িয়েছি ততবারই
সুউচ্চ, সুবিশাল হিমালয়ের প্রতি বালুকণা
আর অনন্ত অথৈ অপার সমুদ্রের প্রতি বারিবিন্দু স্বরূপ
নিজেকে কেবলই মনে হয়েছে বারবার।
মূলতঃ বারি বিন্দু অথবা বালুকণার তাতে লজ্জ্বা নেই কোন
বরংচ বিস্ময় আর গর্বে নতজানু হয়েছি বারংবার হে মহা মহিম,
তোমার পদমূলে হে রবীন্দ্র ঠাকুরঃ
শুধু তুমি নাই, তোমার স্মৃতি ঘেরা, তোমার স্পর্শ লাগা
সেই জনপদ, বাগানবাড়ী, আসবাবপত্র, দর-দালানকোঠা
সবই আছে পড়ে শুধু তুমি ছাড়া;
যেন দীর্ঘ বিরহ ক্লিষ্টা প্রিয়তমাসম
প্রিয়তম একদিন আসবে বলে কথা আছে যাঁরÑ
সেই পদ্মা, পদ্মার পাড়ঃ
‘কুঠিবাড়ী বীণা হলে পদ্মা যার তার’
হায় পদ্মা! তুমি কার বিরহে শুকিয়ে এমন কাঠ?
হায় রবি ঠাকুর!
কোন বিধবাকেইতো কোনদিন দেখে না তার স্বামী
প্রকৃতির এটাইতো নিয়ম।
কোন চৈত্র দিনে অথবা কোন শ্রাবণ রাতে
তুমি অশরীরি রবীন্দ্র ঠাকুর কোনদিন আসনাকি?
তোমার কুঠিবাড়ীতে, তোমার পদ্মার তীরে
আমার বড্ড জানতে ইচ্ছা করে।
শুধুমাত্র কুঠিবাড়ী ছাড়া অন্য সব তোমার বিশেষ জনপদে
প্রকৃত তোমার বাড়ীর চিহ্ন নাইÑ
আছে শুধু কোলাহল, কোলাহল আর জনতার ভীঁড়
ঐগুলো আজ আর তোমার কোন একার বাড়ী নয়Ñজনতার বাড়ি।
কুঠিবাড়ী আজও যেন প্রায় আছে ঠিক সেই আগরেই মতো
সেই মাঠ-ঘাট, সেই প্রাচীন প্রকৃতি, যেন অবিকল সব
শুধুমাত্র বিধবা পদ্মার বৈরী প্রকৃতির তীরে
নিঃসঙ্গ কুঠিবাড়ী;
কেবলমাত্র জড়ধর্মে বাঁচার গ্লানি নিয়ে বাঁচে
আর যার একমাত্র প্রতিবেশী
এক নিঃসঙ্গীর সঙ্গী চির নিঃসঙ্গী বিদেহী লালন। 

কবি : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়।

হেনরী স্বপনের একগুচ্ছ কবিতা

শারদীয় ঘ্রাণ নুয়ে পড়ে ঘাসে

 শরৎ এসে, শারদীয় ঘ্রাণ নুয়ে পড়ে  ঘাসে
শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে...
মৃত্তিকায় জড়ালে মমতা মাখা মহুয়া আকাশে।

শাঁখের ধ্বনিতে বুঝি, দুঃসহ লড়াই রপ্ত করে
পূর্ণিমা গমনে দেবী...
বাপের ঘরে এলে দুর্গা সাজে ভৈরবী প্রহরে ।

বোধন ভোরের ঝলমলে রোদ ঝাঁপাচ্ছে বেশ
প্রতিমা তোমার মূর্তি...
শিবের জটায় বাঁধবে বেণী রুদ্র কালোকেশ।

কাশেরবনে কলুষ ছায়া, ফর্সা ফুলের আলোয় ঢাকা
কুয়াশা কোমল...
হিমশীত নেমে এসে ধানের পাতায় শিশির জমে থাকা।

কলাবতী বউয়ের পাশে গণেশ ঠাকুর বর
ভিডিও গানের সিডি...
শিউলি ঝরা উঠোন ভরা আছে সন্ধ্যা নদীর চর।

আমাদের গায়ে রঙিন পোষাক, সিল্ক-সালোয়ারি
নতুন সাজের গন্ধ নিয়ে...
আমরা যাচ্ছি পুজো মন্দিরে -পুরনো কালিবাড়ি।

আমরা বেড়াচ্ছি রাত জেগে মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে
ঢাকের-উল্লাসে...
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকায়-পেঁচাপাখি যায় উড়ে।

লাইটিং-এ রাত জ্বলজ্বলে ডিজিটাল জোনাকিরা
অসুর বুকে ধনুক ছুড়ে... 
ধুপের তাওয়ায় তপ্ত আরতি নাচছে শাকিরা।

আঁধার কাটবে, ঝুমকা জবায় পাপড়ি ঝিরিঝিরি
মহিষ তাড়াতে...
সিংহের  লড়াই শুরু তবু সাইবারে গেম বিচ্ছিরি।

জায়া লক্ষ্মী-সরস্বতী বোন, মোহিনী বীণায় বাজে
ভাদুই মাল্লারে গায়...
মা তোর  জঠরে আশ্রয় খুঁজে পাওয়া এসরাজে।

আমরা অতসী, আমরা খুশির উত্তেজনায়
অপরাজিতা অঞ্জলি তো, মায়ের মুখেই মানায়...







বেসিনের সিরামিকে সাদা পাণ্ডুলিপি

হেসে হেসে ট্যাপকলের জল ঝরে
বেসিনের সিরামিকে সাদা পাণ্ডুলিপি ভিজিয়ে ফেললে;
কামিজের ছিটেফোটা বিবর্ণতা-
মুছে ফেলা যায়...

বিমূঢ়তা আগোচরে থাকে ;
দীর্ঘশ্বাসে বুকের মাছিরা গুনগুনিয়ে ডাকলে
জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় মুচড়ে ওঠে হৃদয়ের মূর্তি
হাতেগড়া প্রতিমাও প্রার্থনায় নতমুখ
কৌতূহলে-ক্ষমার অযোগ্য পাপ বলে-
খুলে বললে সবই...

পদ্ম-গোক্ষুর সাপের কামড়ে
ভ্রমরের বিষ পর্যন্ত নামিয়েছিলে পুকুরের জলে...

ইস্পাতের আয়ু
দুধ রান্নায় হলুদ রঙের ডেকচি ভরে ওঠে
গ্রিলে মরচে ধরার রহস্য দেখেই-
বোঝা যায় ইস্পাতের আয়ু।

গল্পে না হয়; ঘটনা সাজানো নিসর্গ !
সূর্যাস্তের মিঁউমিঁউ আলো
বসন্ত...নিশ্বাস নিতে আসে...
টিভি মেরামতের তুখোড় মিস্ত্রীদের
মশানিধন কাজর প্রযুুক্তি প্রয়োজন;
কর্পোরেশন কর্মীদের বাড়তি চাপ নেই
নগর জায়গা ঘিরে ধরে
কিছু ট্যাক্স বিলের বাড়তি প্রশাখা নুইয়ে
পড়ে আছে-

যেখানে ঝরছে আবর্জনার স্তুপ-পালক পুচ্ছ !
মশারি-চাঁদর বিছানায় নরম তোষক...



মাইক্রোওয়েভ রান্নাঘর

ডোবা থেকে তুললে সে মাটিতে লুকানো
থাকে ফুলের সুবাস...
আঙিনায় ঘাসের উর্বরা নিয়ে
বেশ কিছু উদ্ভিদ চর্চার কথা: বেলচা-কোদাল-কাস্তে
ছন্দের নিবিড়ে সামান্য আলো যে নিয়মিত গাছের খাদ্যের
রুটি-তরকারী মাইক্রোওয়েভ রান্না ঘরের উষ্ণতা ফিরে গিয়ে
বিকেল হলেই বাড়ে-কমে !

দরজার মাপেই হয়তো ফনিমনসার গায়ে
এতো তীক্ষ্ম কাঁটা-
ক্ষোভে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।

টবের বাইরে খুব বর্ষাকাল জেনে গুছিয়ে রাখবে
পোষাকের আলমারি ভরা
নেপথোলিনের ঘ্রাণ...





ভেজা পরিচ্ছদ যতটা ছড়াবে

বিকেলের রৌদ্র অতোটা বিপ্লবী নয়,
গাঢ়লাল জবা-পুকুরের জল...
খালের জোয়ারে বয়ে যাচ্ছে রক্তাভ হিজল
জালনার এতো কাছে !
তবু-ফুল দেখি না,
দেখি! রক্তের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে
ছটফটে স্রোতে...

যে ঘরের দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি
টাঙিয়ে রেখেছি;
আমাদের আলিঙ্গনে ভেজা
পরিচ্ছদ কতোটা শুকাবে প্রার্থনায় জপে ?

মনিকাঞ্চন ফুলের গন্ধ যতটা ছড়াবে
সুপারি গাছের চিরল পাতায় বিছেপোকা সুরসুরে হেঁটে যায়
ভিজে হাওয়া জানলায় এসে
উঁকি দেয়....
রূপকথা...


কবি : জীবনানন্দ গবেষক, বরিশাল।

Saturday, January 5, 2019

অভিজিৎ রায়-এর মা; আমাদের মা

বড় ছেলের মরণোত্তর দেহদান করা হয়েছিল ২০১৫ সালে ঢাকা মেডিকেলে। গতকাল দেহদান করা হল মায়ের; ঢাকার আদ-দ্বীন হাসপাতালে । এই হাসপাতালে স্বেচ্ছায় দেহদানের এটা প্রথম এবং একমাত্র ঘটনা। এতো বড় ঘটনা অথচ কেউ জানে না!
গতকাল ভোর ৬ টায় মারা গেছেন শেফালী রায়। তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত, মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক ও লেখক অজয় রায়-এর স্ত্রী এবং ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে চাপাতির আঘাতে মৃত্যুবরণকারী অভিজিৎ রায়-এর মা।

 

মূলত অভিজিৎ রায় খুন হওয়ার পরেই তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। অবশেষে চিরবিদায় নিলেন ৩ জানুয়ারি ২০১৯। বড় ছেলের মত তিনিও মানব কল্যাণের লক্ষ্যে নিজের দেহ দান করে গেলেন। আমরা কেউ জানলাম না!

(কাজল)

Monday, February 19, 2018

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: বাংলা কথাসাহিত্যের অকালপ্রয়াত প্রবাদপুরুষ

মাত্র দুটি উপন্যাস আর হাতেগোনা কয়েকটি ছোটগল্প লিখে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখকের আসনে বসে যাওয়ার কাজটি মোটেই সহজ নয়। কিন্তু উপন্যাস দুটির একটি যদি হয় ‘চিলেকোঠার সেপাই’, আর অন্যটি যদি হয় ‘খোয়াবনামা’, তাহলে হয়তো সম্ভব। কারণ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে যে তার লেখা শব্দ কিংবা বাক্যের কলেবরে পরিমাপ করা দুঃসাধ্য ব্যপার, তা তিনি তার লেখার গুণগত ব্যাপ্তি দিয়েই প্রমাণ করে গেছেন।
এই দুই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে খুব সচেতনভাবেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন। মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিতে লেখা এই উপন্যাস দুটোকে একটু গভীর থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এগুলোতে কোনো ব্যক্তি কিংবা ইতিহাস নয়, বরং একেকটি জনপদই যেন নায়কের ভূমিকায়। সমকালীন উপন্যাস রচনায় এমন মুন্সিয়ানাই তাকে পরিণত করেছে ধরাবাঁধা কাঠামোর বাইরের উপন্যাসিকদের ধ্রুবতারা হিসেবে। তার দেখানো পথ ধরেই বাংলা সাহিত্য বহুদূর হেঁটে যাবে, তা বুঝতে আর কারো বাকি ছিলো না। পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, ইলিয়াসের শব্দচয়নে যে নতুন করে বাংলা উপন্যাসের পুর্নজন্ম হচ্ছে তা নিয়ে লিখেছিলেন,
“এ এক নতুন বাংলা ভাষা, শহরের ধুলো-কাদা-মবিল-আবর্জনা-হঠাৎ ধনীর বর্বর অসভ্যতা আস্তাকুঁড়ের মানুষদের বারুদ হয়ে ওঠার ভাষা। শহরের নিচুতলার সমাজের মানুষের বাংলা ভাষা এমন ইজ্জত পায়নি সাহিত্যে। যেমন দেখার চোখ, তেমনি স্বচ্ছ ও কঠিন রাজনীতিক বিশ্বাস, তেমনি ধারালো হিউমার।”
তবে শুধু উপন্যাসেই যে তিনি নতুন ধারার সৃষ্টি করেছেন তা নয়, বাংলা সাহিত্যের মুমূর্ষু ছোটগল্পকে বাঁচিয়ে তোলার দায়িত্বও যেন তার কাঁধেই পড়েছিল।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; Source: arts.bdnews24.com
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্ম ১৯৪৩ সালে, বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বগুড়া মুসলিম লীগের সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তাই ইলিয়াস তার রাজনীতির প্রথম পাঠ নিঃসন্দেহে তার বাবার কাছেই পেয়েছিলেন। দেশভাগের সেই উত্তপ্ত সময়টাতে তিনি বড় হয়েছেন, বুঝতে শিখেছেন। দেশভাগের ফলে সৃষ্ট লক্ষ-কোটি মানুষের কান্নার রোল তার অন্তরেও বাসা বেঁধেছিল। পরবর্তীকালে তার রচনায় নানাভাবে চিত্রায়িত হয়েছে এই দৃশ্যপট।
NewsletterSubscribe to our newsletter
and stay updated.
বাবা-মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা আর বগুড়া জিলা স্কুলে পড়া ইলিয়াস ইন্টারমিডিয়েট পড়ার জন্য ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স। জোরেশোরে লেখালেখি না করলেও ইলিয়াস বসে ছিলেন না। আশপাশের যা কিছুই তাকে নাড়া দিতো, তা নিয়েই লেখার চেষ্টা করেতেন। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালেই সওগাত পত্রিকায় তার ছোটগল্প প্রকাশিত হয়।
ষাটের দশকে যখন সাহিত্যজগতে ইলিয়াসের পদচারণা শুরু হয়, ততদিনে পূর্ব বাংলার বাংলা সাহিত্য নিজের খুঁটিতে দাঁড়িয়ে গেছে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন ভারতবাসী ক্লান্ত, ঠিক তখনই দেশভাগের করাল গ্রাসে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয় পুরো উপমহাদেশ।
আর এই উপাদানগুলো থেকে শক্তিশালী বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠার যে প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল, তা অনেকটাই অনাদরে থেকে গেল। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকের খ্যাতিমান বাংলা কথাসাহিত্যিকদের প্রায় সবার গল্প আর উপন্যাসে গ্রামের চেহারা অনেকটাই শোচনীয়। রাজনৈতিক পটভূমিতে বাংলাদেশের গ্রামের কিংবা সমাজের প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ যে উপেক্ষিত ছিল, তা বলাই বাহুল্য। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অবশ্য স্রোতের বিপরীতে হেঁটে জেগে উঠা গ্রামের কথা, সমাজ আর সভ্যতার ঘূর্ণাবর্তে প্রান্তিক মানুষের আখ্যানকে তুলে ধরেছিলেন।
বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল, আহমদ ছফা এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; Source: সুশীল চন্দ্র সিংহ, বাংলামোটর, ঢাকা।
১৯৬০ সালে সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বগত মৃত্যুর পটভূমি’ গল্পের মধ্য দিয়েই ইলিয়াস জানান দিয়েছিলেন, বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগ আসছে। যে যুগে মানুষের অনুভূতি, দুঃখ-যন্ত্রণা কিংবা মনোজাগতিক ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েই চরিত্রকে চিত্রায়ন করা হবে। এই ধরনের বর্ণনা পাঠককে যেমন চিন্তার খোরাক দেবে, ঠিক তেমনি শব্দের বুননে সমকালকেও অবধারিতভাবেই সামনে নিয়ে আসবে।
তবে এই ব্যাপারটি যে ইলিয়াস একাই বাংলা সাহিত্যে চর্চা করছিলেন, ব্যাপারটি কিন্তু মোটেও সেরকম নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মে এই অনুসূক্ষ্ম মনোজাগতিক বিশ্লেষণের ধারা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তারপরে আবারও তা ঝিমিয়ে পড়ে। জেমস জয়েস আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মতো খ্যাতিমান সাহিত্যিকেরাও তাদের গল্প আর উপন্যাসে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পরিচয় দিয়েছিলেন। ইলিয়াসও এদের সবার কাছ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার সহকর্মী এবং বন্ধু শওকত আলী বলেছিলেন, “জয়েস ছিলেন ইলিয়াসের একজন প্রিয় লেখক, তেমনি ছিলেন মার্কেজও।” তাই অনেকেই জেমস জয়েসের ইউলিসিসের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন চিলেকোঠার সেপাইয়ের চিত্রপট উপস্থাপনা আর চরিত্রগুলোর মনোজাগতিক রসায়ন বিশ্লেষণের গভীরতায়।
চিলেকোঠার সেপাই এর প্রচ্ছদ; Source: ebanglalibrary.com
ইলিয়াসের লেখালেখির শুরুর সময় থেকেই পূর্ব বাংলায় চলছিল অস্থির সময়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার লেখনীতে বেশ ছাপ ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার বেশ কয়েকটি আলোচিত ছোটগল্পও আছে। আর এই তালিকায় সবার আগে চলে আসে ‘রেইনকোট’ গল্পটির নাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে রসায়নের প্রভাষক নূরুল হুদার দ্বিধাদ্বন্দ্বের মনস্তত্ত্ব নিয়েই গড়ে উঠেছে এই গল্পের দৃশ্যপট। লড়াই না করে বরং সাধারণভাবে গোলমালকে পাশ কাটিয়ে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে দিনাতিপাত করা নুরুল হুদা কি গল্পের নায়ক? নাকি মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়া শ্যালক মিন্টুর রেইনকোটটিই নায়ক? তবে পাঠকদের মতে সবাইকে ছাপিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক দর্শনই হয়ে উঠেছে গল্পের প্রধান চারিত্রিক নায়ক।
মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের অস্থির সময়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষের চিন্তা, হতাশাকেও পরম মমতায় বন্দী করেছেন ইলিয়াস। অপ্রাপ্তির নৈরাশ্য, যুব সমাজের অস্থিরতা, স্বার্থপরতা আর সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’।
‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ এর প্রচ্ছদ; Source: somewhereinblog.net
বাংলা কথাসাহিত্যের পাঠকের একটি বড় অংশ যেহেতু মধ্যবিত্ত, তাই বাংলা ছোটগল্পই হোক কিংবা উপন্যাসই হোক, সেখানে মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল। নিম্নবিত্তের চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়া কিংবা ভাষা সবই ছিল যেন অনাকাঙ্ক্ষিত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও সেই মধ্যবিত্তের গণ্ডি ভেঙে দিলেন। ভাষারীতিতে নিয়ে এলেন অভিনব পরিবর্তন। অভূতপূর্ব এই পরিবর্তনকে সম্বল করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তাই ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ প্রবন্ধে ইলিয়াস জোর দিয়ে বলেছিলেন,
“আজ মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু যে মধ্যবিত্ত আজ তাদের ‘মুক্তির জন্য স্থিরসংকল্প’, তাদের ‘শ্রমজীবী নিম্নবিত্তের সঙ্গে যোগাযোগ’ রাখতে হবে।”
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের যার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে কিংবদন্তী বলে বিবেচিত হবেন, সেটি হলো ‘খোয়াবনামা’। বগুড়ার কাছাকাছি কোনো এক কালাৎহার বিল আর এর পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামকে কেন্দ্র করে সাধারণ কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের ঘটনাগুলো এই উপন্যাসে আবর্তিত হতে থাকলেও, ইলিয়াস সেখানে তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারতভাগের ঐতিহাসিক ঘটনাকে যোগ করেছেন সুনিপুণভাবে। অতীতের পলাশীর যুদ্ধ, সিপাহী বিদ্রোহ আর ফকির বিদ্রোহের ফলে মানুষের জীবন আর চিন্তায় পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করেছেন। ভারত বিভাগের ফলে সৃষ্ট সমস্যা প্রান্তিক মানুষকে কীভাবে জর্জরিত করেছে, সেই ব্যাপারটিকেও তুলে এনেছেন তিনি খোয়াবনামায়।
‘খোয়াবনামা’র  প্রচ্ছদ; Source: gobanglabooks.com

যে পা নিয়ে পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে সারাদেশে চষে বেড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন আর মনস্ততত্ত্বের গল্প লিখেছেন ইলিয়াস, শেষ জীবনে সেই পা দু’টির একটি তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলো ক্যান্সার। অসুস্থ হয়েও লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। মনের জোর দিয়েই বাংলা সাহিত্যকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
চিরচেনা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস; Source: wikimedia commons

কিন্তু মাত্র ৫৪ বছর বয়সেই থামতে হয় বাংলা সাহিত্যে নিচুস্তরের মানুষের কথা তুলে আনা অনন্য এই কলমযোদ্ধাকে। ১৯৯৭ সালে যাওয়ার আগে বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ভূষিত করা হয়েছে ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’, ‘আনন্দ পুরস্কার’ সহ অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মাননায়। নিজের সাহিত্যসৃষ্টির ব্যপারে তার অভিমত ছিলো অনেকটা এরকম,
“আমার সময়ের দেওয়ালের ভেতর আমি শুধু হাঁসফাঁস করি। এভাবে বাঁচা মুশকিল। তাই কোনো বড় কিছু করার জন্যে নয়, এমনি বাঁচার তাগিদে, নিশ্বাস নেওয়ার জন্যে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দেওয়ালের ওপারটা দেখার চেষ্টা করি।”

লেখক: শাহ্ মো: মিনহাজুল আবেদীন
 
তথ্যসূত্র:
সাহা, করুণা রাণী (২০১৫)। ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যে জীবন ও সমকাল’; পৃষ্ঠা: ৮-১৩
ফিচার ইমেজ: Daily Sun

Sunday, June 25, 2017

নজরুল যা পেরেছিলেন


একাধারে বামুন-মোল্লাকে বিদ্রূপ করতে পেরেছেন, ঈশ্বরের কাছে যাবার জন্য কোনো মধ্যবর্তীর প্রয়োজন নেই বলতে পেরেছিলেন সোচ্চারে। ধর্ম যেখানে ধর্মধ্বজীদের হাতে মানবতার শত্রু হয়, তাকে কলমের আগায় বিঁধতে ভয় পাননি।
"পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল মূর্খরা সব শোন
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন।"

আবার শ্যামা হিন্দুর মা বলে গান লিখতে আটকায়নি তাঁর। ইসলামী সঙ্গীতে ঢেলে দিয়েছেন নিজের সুর-সাধনা। ধর্মের যে ভাব মানবিক তাকে আপন করতে দ্বিধা বোধ করেননি। আশ্চর্য যৌবনে মেতে ছিলেন নজরুল। আশ্চর্য ভাবে মেতেছিলেন।
শ্যামাসঙ্গীত লিখছেন বলে শুধু আত্ম-উদ্ধারের বাসনা ব্যক্ত করেননি।
"আর কতকাল রইবি বেটি, মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গকে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি-
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?”

বুকের পাটা অনেক বড়। মন বলেছে মা-কে ডাকবেন। দুঃসময়ে সেই অপরূপা শক্তি যদি ভক্তির কথা শুনে প্রলয় নাচনে না আসে, তবে তার কোলের সন্তানের কি হবে? সে শক্তি বাহুতে বাহুতে প্রলয়ের হাওয়া লাগালে তবে সাগরপার করা যাবে অত্যাচারীকে। এবং তিনি আল্লাকেও দাঁড় করিয়েছেন আল্লার নাম নেওয়া জাত-জালেমদের বিরুদ্ধে।
"সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ
চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা;
মোদের হিস্‌সা আদায় করিতে ঈদে
দিল হুকুম আল্লাতালা!
দ্বার খোলো সাততলা-বাড়িওয়ালা, দেখো কারা দান চাহে,
মোদের প্রাপ্য নাহি দিলে যেতে নাহি দেব ঈদ্গাহে!
আনিয়াছে নবযুগের বারতা নতুন ঈদের চাঁদ,
শুনেছি খোদার হুকুম, ভাঙিয়া গিয়াছে ভয়ের বাঁধ।
মৃত্যু মোদের ইমাম সারথি, নাই মরণের ভয়;
মৃত্যুর সাথে দোস্তি হয়েছে – অভিনব পরিচয়।
যে ইসরাফিল প্রলয়-শিঙ্গা বাজাবেন কেয়ামতে–
তাঁরই ললাটের চাঁদ আসিয়াছে, আলো দেখাইতে পথে।
মৃত্যু মোদের অগ্রনায়ক, এসেছে নতুন ঈদ,
ফিরদৌসের দরজা খুলিব আমরা হয়ে শহিদ।
আমাদের ঘিরে চলে বাংলার সেনারা নৌজোয়ান,
জানি না, তাহারা হিন্দু কি ক্রিশ্চান কি মুসলমান।
নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই –
জুলুমের জিন্দানে জনগণে আজাদ করিতে চাই!
এক আল্লার সৃষ্ট সবাই, এক সেই বিচারক,
তাঁর সে লীলার বিচার করিবে কোন ধার্মিক বক?
বকিতে দিব না বকাসুরে আর, ঠাসিয়া ধরিব টুঁটি
এই ভেদ-জ্ঞানে হারায়েছি মোরা ক্ষুধার অন্ন রুটি।"

ইসলামী সঙ্গীত-এর পংক্তি এগুলি। নজরুল কিন্তু নজরুল-ই। খোদার সামনেই বসুন আর শ্যামা মায়ের কোলের কাছে, তিনি বলেন সেই মানুষের কথা, যার কেউ নেই।
নজরুল পেরেছিলেন। আমরা পারিনি।

লেখক:শুদ্ধসত্ত্ব সহজিয়া ঘোষ, নাট্যকার

Sunday, January 22, 2017

“আরজ আলী মাতুব্বর দার্শনিক নন”,আপনি কি দার্শনিক? – ২

১।
আরজ আলী মাতুব্বর কিম্বা সরদার ফজলুল করিম কে “অ-দার্শনিক” প্রমান করবার জঙ্গে যারা হাজির তাদের যুক্তি গুলো কি? দেখুন তাদের যুক্তিগুলো কিরকমের “অকাট্য” !

  • আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব কেবল ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করেছেন, তিনি কোনও মৌলিক প্রশ্ন তোলেন নি।
  • আর সরদার ফজলুল করিম দর্শন পড়েছেন বটে, দর্শন পড়িয়েছেন বটে এমন কি কিছু দর্শনের বই অনুবাদও করেছেন, কিন্তু তিনি দর্শন চর্চা করেন নি।
তাই এরা দুজনের কেউই দার্শনিক নন। এরা আরো বলেন – আরজ আলী মাতুব্বর একজন ইসলামী বিদ্বেষী আর সরদার ফজলুল করিম কেবলই একজন অনুবাদক। আরজ আলী আর অধ্যাপক সরদারের পেছনের লাগা অনলাইন গোষ্ঠীটির এইই হচ্ছে মোদ্দা কথা। এই লাইনে যেমন আহমেদ – আলম – কুদ্দুসেরা আছেন তেমনি পাল – সাহা – গোমেজ – ভট্টাচার্যরাও আছেন। আমাদের বোঝা দরকার আলম – কুদ্দুস – গোমেজ – ভট্টাচার্যদের ঐক্যের যায়গাটি কোথায়। এদের এই ঐক্যের যায়গাটি এই লেখার এক পর্যায়ে ব্যাখ্যা করবো।
২।
যে সকল অনলাইন পুরোহিত আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবের কাজ কে গৌন প্রমানের জঙ্গে লিপ্ত তাদের মতামত কে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমি মনে করি, পৃথিবীর যেকোনো মানুষ মনে করতেই পারেন – অমুক গৌন লেখক, তমুক গৌন শিল্পী কিম্বা অমুক তো দার্শনিক নন, তমুক তো কবি নন ইত্যাদি। কিন্তু যে সকল অনলাইন পুরোহিতেরা আরজ আলী বা সরদার ফজলুল করিমের পেছনে লেগে আছেন কয়েক বছর ধরে, আমরা তাদের এজেন্ডার কথা জানি। এবং আমি মনে করি আমাদের তরুন পাঠকদের এই সকল অনলাইন পুরোহিতদের এজেন্ডাগুলোর কথা জানানোটা জরুরী।


৩।
বাংলাদেশ যেভাবে রকেটের গতিতে ইসলামী মোল্লাতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে – সেকুলার, ধর্ম-নিরপেক্ষ, প্রগতিবাদী চিন্তকদের উপরে ব্যক্তি আক্রমন, তাঁদের কাজ কে গৌন বলে প্রচার করা, তাঁদের ভুমিকা, তাঁদের প্রতিষ্ঠান, তাঁদের অর্জন সকল কিছুকে গৌন বলে প্রচার করাটা খুব স্বাভাবিক একটি কাজ, খুবই প্রত্যাশিত প্রবনতা। এই ধরনের প্রচারনার পেছনে রাজনীতিটা আসলে মোল্লাতন্ত্রের রাজনীতি। ঐতিহাসিক ভাবেই মোল্লাতন্ত্র এই সকল কাজ করে এসেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। একাজ করার জন্যে “মালপানি”র সরবরাহও কম নয়। সেকুলার প্রগতিশীল চিন্তার সাথে মোল্লাতন্ত্রের এই বৈরীতা ঐতিহাসিক। তা সে কখনও ইউরোপে খ্রিস্টিয় মোল্লাতন্ত্রের রুপ ধরে এসেছে আবার কখনও বা এশিয়ার দেশ গুলোতে ইসলামী মোল্লাতন্ত্র কিম্বা ভারতে হিন্দু মোল্লাতন্ত্রের স্বরূপে এসেছে। তাই ভারতে যেমন প্রগতিশীল চিন্তক ইরফান হবিব কে হিন্দু বিদ্বেষী হিসাবে চিহ্নিত করা হয় ঠিক একই কায়দায় ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক রোমিলা থাপারকেও হিন্দু বিদ্বেষী বলা হয়। অরুন্ধতী রায় কে বলা হচ্ছে পশ্চিমের দালাল – ভারতের শত্রু। এদের সবারই “দোষ” হচ্ছে এরা নিরন্তর ভাবে ভারতের ভয়াবহ মোল্লাতন্ত্র – হিন্দুত্তবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের কর্পোরেট পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। মোল্লাতন্ত্র আর কর্পোরেট পুঁজির ঐক্য তো ঐতিহাসিক। পৃথিবীর ইতিহাস আমাদের বলে দেয়, পুঁজি কখনই মোল্লাতন্ত্র কে উৎখাত করতে চায়নি, বরং পুঁজি – পুজিবাদ সবসময়েই মোল্লাতন্ত্রের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে। যেখানে যেখানে দরকার সেখানে সেখানে পুঁজির সবচাইতে কাছের বন্ধু হচ্ছে – ধর্ম বা মোল্লাতন্ত্র। ভারতে যারা ইরফান হবিব – রোমিলা থাপার বা অরুন্ধতী রায়ের গুষ্ঠি উদ্ধার করছেন দিন রাত, তাঁদের ঠিকুজি নিয়ে দেখুন … পেয়ে যাবেন হিন্দুত্ববাদের এলিট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগুলোকে। একই ভাবে, বাংলাদেশে যারা আরজ আলী মাতুব্বর, আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম, হুমায়ুন আজাদ বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সহ আরো অনেকের পেছনে লেগে আছেন দলবল নিয়ে, তাঁদের ঠিকানা – সাকিন – পরিচয় নিয়ে দেখুন, দেখবেন, গোড়াটা একই যায়গায় বাঁধা – ওপারে হিন্দুত্ববাদ আর এপারে ইসলাম আর দুপারেই রয়েছে মোল্লাতন্ত্র আর ব্যবসায়ী – বেনিয়াদের জোট । ইরফান হবিব-রোমিলা থাপার – অরুন্ধতী রায় – আরজ আলো মাতুব্বর – সরদার ফজলুল করিম – আহমদ শরীফ – হুমায়ুন আজাদ – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এদের সকলকে গৌন প্রতিপন্ন করাটা মোল্লাতন্ত্রের বড় এজেন্ডার অংশ। শুধু প্রেক্ষিত ভেদে তা কখনও হিন্দু মোল্লাতন্ত্র কিম্বা ইসলামী মোল্লাতন্ত্রের অংশ মাত্র। আসুন এবার, বাংলাদেশের মোল্লাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের “কে দার্শনিক” বিষয়ক প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করি।

৪।
কে দার্শনিক আর কে নয়? প্রশ্নটা প্রায় একই রকমের যখন আমরা জিজ্ঞাসা করি কে কবি আর কে নয়। অর্থাৎ কোনটা কবিতা তা যত সহজে বোঝা যায় কবিকে ততটা সহজে বোঝা যায়না। তাই – আধুনিক কালে দর্শন কি, দর্শনের আওতা কতদূর, দর্শনের আলোচনার প্রধান প্রশ্ন গুলো কি কি, আর দর্শনের পদ্ধতিই বা কি রকমের? এই সকল প্রশ্ন নিয়ে হাজার হাজার লেখা পাওয়া যাবে। দর্শনের একাডেমিক বই গুলোতে এই শিরোনামের অধ্যায় গুলো পাওয়া যাবে। কিন্তু কে দার্শনিক আর কে নয়, এ বিষয়ে আলোচনার – লেখালেখির নজির খুব বেশী নয়। এমন কি কে দার্শনিক নন, এটা পেশাদার দার্শনিকদের আলোচনার বিষয়ের মধ্যে পড়েই না। বরং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি কি, একজন মানুষ কখন দার্শনিক হয়ে ওঠেন সেই সকল বিষয়ে কিছু আলোচনা আছে।

৫।
প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছি, আরজ আলী মাতুব্বর আর সরদার ফজলুল করিমের বিরুদ্ধে এই জঙ্গের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যে অনলাইন পুরোহিত, তিনি অনুবাদ করেছিলেন (অথবা করিয়ে নিয়েছিলো)ফরাসী দার্শনিক রেনে দেকারতের পুস্তক, সেই অতি নীচু মানের অনুবাদের ভুমিকা লিখে দিতে রাজী হননি অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম। সেই থেকেই সরদার ফজলুল করিমের নাম দার্শনিকের খাতা থেকে কাটা যায়। আমার বিশ্বাস, অধ্যাপক সরদার বা মাতুব্বর সাবের কেউই খুন মাইন্ড করবেন না – যদি বাংলাদেশের মোল্লাতন্ত্র তাঁদেরকে দার্শনিকের খাতা থেকে বাদ দিয়ে দেন। বরং আসুন মূল আলোচনাটা শুরু করি – কে দার্শনিক, কখন ও কিভাবে দার্শনিক?

রেনে দেকারতেরই একটা বিখ্যাত কথা দিয়ে শুরু করি। পড়ে দেখুন –
“It is now some years since I detected how many were the false beliefs that I had believed to be true since my earliest youth. And since that time, I have been convinced that I must once and for all seriously try to rid myself of all the opinions which I had formerly accepted, and begin to build a new, if I wanted to establish any firm and permanent structure for my beliefs.”
— René Descartes, Meditations

“অনেক বছর হলো, আমি এখন বুঝতে পারি, আমার যৌবন থেকে এখন পর্যন্ত কতগুলো ভুল ও মিথ্যা বিশ্বাস আমি সত্যি বলে জেনেছিলাম। যেদিন থেকে বুঝেছি, সেদিন থেকেই মনে করেছি, আমি অন্তত একবার, সকল শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবো আমার বয়ে বেড়ানো সেই সকল মিথ্যা বিশ্বাস – সংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে আমার নিজের চিন্তা গড়ে তুলতে, যা হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং আমার নিজস্ব চিন্তা”।
— মেডিটেশন, রেনে দেকারতে
(অনুবাদ আমার নিজের, ভুল হলে দেখিয়ে দিন, শুধরে নেবো)
রেনে দেকারতে হচ্ছেন আধুনিক দর্শনের জনক। ফরাসী এই নাক উচু ভদ্রলোক দর্শনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্যে স্মরনীয়। তাঁর কথা বলার আগে, খেয়াল করে দেখুন, তিনি কি বলছেন – জীবনের একটা পর্যায়ে এখন তিনি বুঝতে পারেন, কত ভুল ধারণা বিশ্বাস তিনি পুষে রেখেছিলেন, বহন করেছিলেন তাঁর যৌবন কালে, সে সকল ভুল ধারণা, বিশ্বাস থেকে তিনি এখন বেরিয়ে আসতে চান। এবং আশা প্রকাশ করছেন – একদিন তিনি তাঁর নিজের রচিত – গড়ে তোলা চিন্তার মাঝে বসবাস করবেন। দেকারতের মন্তব্যটিতে কোনও সুনির্দিষ্ট বিশ্বাসের কথা বলা নেই, এটা কি ধর্ম বিশ্বাস নাকি অন্য কোনও প্রসঙ্গে? তাতে আসলে কিছু যায় আসেনা, যদি আমরা তাঁর “বোধ” টিকে বোঝার চেষ্টা করি।
(রেনে দেকারতে, আধুনিক দর্শনের অন্যতম ব্যক্তি, পুরনো বিশ্বাসকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন, নিজের চিন্তা – বিশ্বাস।)
সকল মানুষের এই বোধদয় হয়না। বরং বাস্তব জীবন থেকে বললে – বলা যাবে, পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষেরই তাঁর জীবদ্দশায় এই বোধদয় হয়না। খুব কম মানুষই ভেবে উঠতে পারেন … যে সে তাঁর সমগ্র শৈশব – কৈশোর – যৌবন ধরে অসংখ্য ভ্রান্তির মাঝে অতিবাহিত করেছে, এখন সময়, সেই সকল ভ্রান্তি কে দূর করার, নতুন চিন্তা গড়ে তোলার। রেনে দেকারতের এই বোধদয় ছিলো এবং তিনি তা দূর করার চেষ্টা করেছেন তাঁর নিজের চিন্তা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।
এটা দর্শনের একটি প্রধান ধাপ – বর্তমান – অস্তিত্তমান বিষয়ের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলা, পুরনো চিন্তার মাঝ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের চিন্তা গড়ে তোলা, অন্তত গড়ে তোলার চেষ্টা করা।
প্রশ্ন হচ্ছে – মানুষ কিভাবে পুরনো চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মতো করে নতুন চিন্তা গড়ে তোলে বা তোলার চেষ্টা করতে পারে? এর কোনও সোজা সাপটা উত্তর নেই। অথবা এর হয়তো অসংখ্য উত্তর আছে। তবে সবচাইতে সহজ উত্তর টা হচ্ছে – “জিজ্ঞাসা” ! মানুষ জিজ্ঞাসার মাধ্যমেই তাঁর নিজের পুরনো জ্ঞান – জানাশোনা – বোধ কে চ্যালেঞ্জ করে এবং নতুন জ্ঞান – জানাশোনা – বোধ তৈরী করার চেষ্টা করে। এই পথপরিক্রমায় হয়তো নানান পদ্ধতিগত ধাপ আছে – নানান টুল আছে ব্যবহারের। পদ্ধতিগত বিষয়ে নানান তফাত থাকলেও – মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে – “জিজ্ঞাসা” বা প্রশ্ন তোলা। এই জিজ্ঞাসা কখনও নিজের সম্পর্কে কখনও বা বহিরঙ্গন সম্পর্কে, কখনও সৃষ্টি বা স্রষ্টা সম্পর্কে কিম্বা প্রকৃতি সম্পর্কে।
৬।
সাম্প্রতিক সময়ের এক দর্শনের অধ্যাপক বিষয়টিকে এভাবে লিখেছেন – “ফিলসফি বা দর্শনের শুরুটা প্রায়ই হয় কিছু ঘ্যান ঘ্যান করা ব্যক্তিগত প্রশ্ন দিয়ে। প্রায়শই আমাদের দার্শনিক চিন্তার শুরু হয় কোনও বিশাল হতাশা বা বিষাদের মধ্যে দিয়ে। কখনও কখনও বড় সড় ট্র্যাজেডি থেকেই আমাদের দার্শনিক চিন্তার উদ্ভব ঘটে। আমাদের দার্শনিক চিন্তার শুরু হয় যখন সত্যিই আমরা অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করি, যখন আমারা সত্যিই অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হই ও সেসবের সমাধানের চেষ্টা করি। সোজা করে বললে দর্শন হচ্ছে জীবনের সেই বড় প্রশ্ন গুলো উত্থাপন করা। দর্শন হচ্ছে জীবনের প্রাথমিক প্রশ্নগুলো তোলা, আমাদের চিন্তা ও জ্ঞানের জগতের খুব ছোট কিম্বা বড় কিম্বা প্রাথমিক প্রশ্নগুলো তোলা, সেইসকল প্রশ্ন যা প্রায়শই আমরা ধরাধার্য বলে মেনে নেই, প্রশ্ন করিনা। ধরা যাক আমরা জানি মানুষ হত্যা খুব মন্দ একটি কাজ। এটা আমরা বিশ্বাস করি এবং ধরেই নেই সঠিক বলে কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন তোলে কেনও মানুষ হত্যা ভালো কাজ নয়? কখন মানুষ হত্যা ভালো কাজ নয়? এই নৈতিক অবস্থানটি কি সকল সময়েই সঠিক? এই প্রশ্নগুলো বিব্রতকর, কঠিন প্রশ্ন এবং আমরা সকলেই হয়তো এই ধরনের বিব্রতকর-কঠিন প্রশ্নগুলো করিনা, অথচ এসকল প্রশ্ন জীবনেরই অংশ। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক মধ্যবিত্ত যাপিত জীবনে এই প্রশ্নগুলো করা হয়ে ওঠেনা, তাঁরা এই সকল প্রশ্নের একধরনের উত্তর বা নৈতিক অবস্থান কে ধরাধার্য হিসাবে মেনে নেন। কিন্তু কেউ কেউ এধরনের বিব্রতকর প্রশ্নগুলো তোলেন, সেসবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন, এই সকল প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিজের চিন্তাগুলোকে আরটিকুলেইট বা সংঘবদ্ধ করেন বা গুছিয়ে তোলেন, সেই সকল গোছানো চিন্তার পেছনে যুক্তি দাঁড়া করেন এবং সব শেষে… সেই সকল চিন্তার প্রকাশ, অন্যদের কে জানানো – কখনও লিখে,কখনও বা বলে। হয়তোবা এই নতুন চিন্তার সাথে বেশীরভাগ মানুষ একমত হবেন না, কিম্বা মানুষ হয়তো প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হবেন এই নতুন চিন্তায়, কিন্তু এইই হচ্ছে দর্শনের পদ্ধতি। বলা যেতে পারে, প্রায়শই দর্শনের শুরুই হয় দ্বিমত দিয়ে, ভিন্নমত পোষণের মধ্যে দিয়ে।” (The Big Question – Robert C Solomon, Kathleen Higgins)

৭।
আমি জানি, কুট তার্কিক বন্ধুরা বলবেন, প্রশ্ন তোলাই যদি দর্শন হয়, তাহলে পৃথিবীর সকল মানুষই দার্শনিক, তাহলে তো পৃথিবীতে কোটি কোটি দার্শনিক ! প্রশ্ন তোলাই যদি দার্শনিক হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হয়, তাহলে তো শিশুরা সবচেয়ে বড় দার্শনিক ! আপাত যুক্তিতে হয়তো তাইই। অর্থাৎ যেকোনো মানুষই দার্শনিক হতে পারেন। শিশুরাও দর্শনের প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু বিষয় হিসাবে দর্শন তা বলেনা। সকল প্রশ্নই দার্শনিক প্রশ্ন নয়। কেনো নয়, সে বিষয়ে দ্বিমত – ভিন্নমত – বহুমত থাকতে পারে, কিন্তু সকল প্রশ্নই দার্শনিক প্রশ্ন হিসাবে উত্তীর্ণ হয়না। এই বিষয়ে বহু লেখালেখি আছে। দর্শনের একাডেমিক পুস্তকগুলোতে তাই ইদানিং সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ই থাকে – দার্শনিক প্রশ্ন কি সে বিষয়ে আলোচনা নিয়ে। হাতের কাছে একটা বহুল পঠিত ও স্বীকৃত দর্শনের প্রবন্ধ আছে – দার্শনিক প্রশ্ন কি এ বিষয়ের উপরে, প্রখ্যাত দার্শনিক ও দর্শনের অধ্যাপক Nermi Uygur ১৯৬৪ সালে, দার্শনিক প্রশ্ন কি? এ বিষয়ে একটি দারুন প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটিতে তিনি বিষয়টির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন, কেনও আমাদের দৈনন্দিন প্রশ্নগুলো দার্শনিক প্রশ্ন নাও হতে পারে। দুটি খুব সহজ উদাহরন ব্যবহার করেছেন তিনি – আমি শুধু প্রেক্ষিত বদল করে তাঁর ব্যাখ্যাটি তুলে ধরছি। ধরুন, ঢাকা শহরে এখন এপার্টমেন্ট ব্যবসায়ের রমরমা অবস্থা (না হলেও ধরে নিন)। আপনি একটি এপার্টমেন্ট কিনবেন, তাই আপনি প্রশ্ন করছেন – “এখানকার এপার্টমেন্ট গুলোতে কয়টা করে বেডরুম আছে?” – এই প্রশ্নটি কি একটি দার্শনিক প্রশ্ন? কিম্বা হতে পারে? এই প্রশ্নটি একটি দার্শনিক প্রশ্ন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি। কেননা, কেবলমাত্র একটি সংখ্যা প্রশ্নকারীর সকল উত্তর দিতে পারে, কেবলমাত্র একটি সংখ্যার উল্লেখ এই বিষয়ের সকল জানার আগ্রহকে নিবৃত্ত করতে পারে। ধরুন উত্তরটি হচ্ছে – “চারটি বেডরুম আছে”। মাত্র একটি শব্দ – “চারটি”, উল্লেখিত প্রশ্নটি সম্পর্কে সকলের আগ্রহের অবসান ঘটায় এখানে। ধরুন, আপনি সেই ফ্ল্যাটটি কিনেছেন এবং একদিন আপনার সন্তান কে জিজ্ঞাসা করছেন – “রান্নাঘরের দরোজাটি কি বন্ধ নাকি খোলা?” এই প্রশ্নটি কি দার্শনিক প্রশ্ন হতে পারে? এটাও দার্শনিক প্রশ্ন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি। কেনন – মাত্র দুটি অপশনের যেকোনো একটি দিয়ে এই প্রশ্নটি সম্পর্কে সকল মিমাংসা করে দেয়া সম্ভব। “খোলা” অথবা “বন্ধ” এই দুটি শব্দের যেকোনো একটি হচ্ছে পার্থিব উত্তর। কিম্বা প্রশ্নটি শুধুমাত্র একটি অপশন দিয়েও করা যেতে পারে – “রান্না ঘরের দরোজাটি কি খোলা”? এই প্রশ্নেরও পরিনতি একই। কিন্তু ধরুন তো – “জীবনের মানে কি?” এই প্রশ্নটির কতগুলো উত্তর হতে পারে? একটি? দুইটি কিম্বা চৌদ্দটি? কিম্বা দুই হাজার? কিম্বা দুই লক্ষ উত্তর? এমন কি দুই লক্ষ উত্তর হলেও – দু’লক্ষতম উত্তরটিও হয়তো এই প্রশ্নটিতে পৃথিবীর সকলের আগ্রহ নিবৃত্ত করতে পারবেনা, অর্থাৎ কোনও উত্তরই শ্রোতার পরবর্তী প্রশ্ন করাকে বন্ধ করতে পারেনা। এটাই হচ্ছে প্রাত্যহিক প্রশ্ন ও দার্শনিক প্রশ্নের মাঝে একটা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। প্রাত্যহিক প্রশ্নের ঠিক কিম্বা বেঠিক উত্তর তৈরী থাকে, দর্শনের প্রশ্নের কোনও ঠিক বেঠিক উত্তর নেই, শুধু উত্তর খোঁজার প্রয়াস আছে।

৮।
আরজ আলী মাতুব্বর এর লেখালেখিগুলোকে তিনখন্ডে প্রকাশ করেছে ঢাকার একটি প্রকাশনা (অন্তত আমার কাছে এগুলোই আছে)। প্রথম খন্ডের প্রথম অংশের নাম “সত্যর সন্ধান” … এই পুস্তকে তিনি শুরু করেছিলেন মানুষের জিজ্ঞাসা দিয়ে… এবং কয়েকটি অধ্যায়ে তিনি বিন্যস্ত করেছেন তাঁর প্রশ্ন গুলো এবং তাঁর পেছনে দাড়া করিয়েছেন তাঁর যুক্তির দেয়াল। যারা আরজ আলী মাতুব্বর এর লেখা সত্যিই পড়েছেন – তাঁরা জানেন, আরজ আলী মাতুব্বর এর তোলা প্রশ্ন গুলো কি প্রাত্যহিক জীবনের প্রশ্ন নাকি সেই প্রশ্নগুলো মাতুব্বর সাহেবের নিজের পুরনো বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। মাতুব্বর শুধু নিজেই তাঁর পুরনো বিশ্বাস কে প্রশ্নবিদ্ধ করেন নি, তিনি তাঁর সাথের ও তাঁর পরবর্তী মানুষদেরও সেই সকল প্রশ্নের সহযাত্রী করেছেন। মাতুব্বর সাহেব লিখেছেনঃ

“জগতে এমন অনেক বিষয় আছে, সেসব বিষয়ে দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্ম এক কথা বলেনা। আবার ধর্ম জগতেও মতানৈক্যর অন্ত নেই। যেখানে একই কালে দুইটি মত সত্য হইতে পারেনা সেখানে শতাধিক ধর্মে প্রচলিত শতাধিক মত সত্য হইবে কিরুপে? যদি বলা হয় সত্য হইবে একটি তখন প্রশ্ন হইবে কোনটি এবং কেনো? অর্থাৎ সত্য বিচারের মাপকাঠি কি? সত্যতা প্রমানের উপায় কি এবং সত্যর রুপ কি?”
— আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, খন্ড – ১, পৃষ্ঠাঃ ৫০ / ৫১
প্রথম অধ্যায়ের শেষে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন –
  1. আমি কে?
  2. প্রান কি অরুপ না স্বরূপ?
  3. মন ও প্রান কি এক?
  4. প্রানের সহিত দেহ ও মনের সম্পর্ক কি?
  5. প্রান চেনা যায় কি?
  6. আমি কি স্বাধীন?
  7. অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকিবে?
— আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, খন্ড – ১, পৃষ্ঠাঃ ৫৯ / ৬১
পাঠকের কাছে প্রশ্ন – বলুন তো এই প্রশ্নগুলো কি প্রাত্যহিক প্রশ্ন? নাকি দার্শনিক প্রশ্ন? প্রশ্নগুলো কি কোনও বিশেষ ধর্মের সমালোচনা? নাকি জীবন অনুসন্ধিৎসা? এই প্রশ্নগুলো থেকে আরজ মাতুব্বর সাহেব চেষ্টা করেছেন নিজের মতো করে অনুসন্ধান করতে, নিজের যুক্তি গুলোকে সাজাতে এবং নিজের চিন্তা – উপসংহার গুলোকে লিখে প্রকাশ করতে – একজন দার্শনিক এভাবেই তাঁর চিন্তাকে গড়ে তোলেন। তাঁর প্রকাশের ধরন হয়তো আমাদের আধুনিক নাগরিক মস্তিস্ক কে খুব স্বস্তি দেয়না, আমরা হয়তো ঠিক এভাবে বিষয়গুলিকে দেখিনা, দেখতে চাইনা, হয়তো আরজ মাতুব্বর সাহেবের লেখায় শহুরে মেকী “ক্ল্যাসিক” ভাবটি নেই, কিন্তু প্রশ্নগুলো দার্শনিক প্রশ্ন নাকি প্রাত্যহিক প্রশ্ন এ বিষয়ে কি ভেবে দেখবেন? আরজ মাতুব্বর এর পুস্তকগুলো অনলাইনে খুবই সহজলভ্য – পড়ে দেখুন, প্রেজুডিস বা সংস্কার মুক্ত থেকে পড়ে দেখুন, তারপর নিজেকে প্রশ্ন করুন – আরজ মাতুব্বর যে সকল প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, সেগুলো কি দার্শনিক প্রশ্ন?
৯।
আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র ডাউনলোড করতে পারেন এখান থেকে আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র

আমি বলছিনা যে আরজ আলী মাতুব্বর সাহেবকে আপনার দার্শনিক হিসাবে স্বীকার করতেই হবে। এই স্বীকার করা না করা দিয়ে মাতুব্বর সাব তো বটেই তাঁর পাঠকদেরও কিছু যায় আসেনা। আমি চেষ্টা করলাম, দর্শনের চর্চা কিভাবে কিভাবে শুরু হয়, দার্শনিক প্রশ্ন কি? তাঁর একটা সহজ প্রাথমিক ধারণা দেবার, বলাই বাহুল্য দর্শনের একাডেমিক পুস্তক/প্রবন্ধ থেকেই আলোচনাটি করার চেষ্টা করেছি। যারা আরজ আলী মাতুব্বর এর লেখার নিবিড় পাঠক, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, আশা করি।
আগামী পর্বে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আলোচনা করবো।
(চলবে)

 লেখক:, লেখক ও প্রাবন্ধিক

রেফারেন্সঃ
Nermi Uygur (1964) What is a Philosophical Question? Mind, New Series, Vol. 73, No. 289 (Jan., 1964), pp. 64-83
Robert C Solomon, Kathleen Higgins, (2010), The big questions: A short introduction to philosophy, 8th ed. 2010, 2006 Wadsworth, Cengage Learning –

স্বর্ণের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: সংকট, ডলারের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের রূপান্তর

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে ...