Search This Blog

Monday, February 18, 2019

প্রযুক্তি সুনীতি ও মহৎ জীবন : ড. আমিনুল ইসলাম

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মানুষ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তা রীতিমত আভাবিত। নিত্যনতুন আবিস্কারাদির ফলে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, গোটা পৃথিবী পরিণত হয়েছে এক বিশ্বপল্লীতে এবং মাটির মানুষ এগিয়ে চলেছে মহাকাশ বিজয়ের পথে। কিন্তু এত অর্জন-আবিস্কারের পরও শান্তি নেই কেথাও না আমাদের এই দুর্ভাগা বাংলাদেশে, না কোনো বিত্তবান পরাশক্তিমান দেশে। ক্ষুধা দারিদ্র্যের মধ্যে যেমন, বিপুল বিত্তের মধ্যেও তেমনি দেখা দিয়েছে চিত্তের এক মহাশূণ্যতা, নৈতিক-মানবিক দিক থেকে মানুষ যেন আজ প্রায় নিঃস্ব। অবাক কাণ্ড! এত কৃতি-কীর্তি ও অর্জন আবিস্কারের মধ্যেও মানুষের জীবন সমস্যা সমাধানের লক্ষণ নেই কোনোদিকে, বরঞ্চ সর্বত্র ঘটছে তার উল্টোটি দুঃখ যন্ত্রণা ও জটিলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বপল্লীতে যেন আজ লেগেছে আগুন। জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে মানুষের সব স্নিগ্ধ ধ্যান-ধারণা, ভাব-কল্পনা ও সনাতন মূল্যবোধ। নৈতিক ও নান্দনিক গুণাবলির চেয়ে আজ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে দেখা  দিয়েছে হীন জান্তব প্রবৃত্তিগুলো। কবিগুরুর ভাষায়:রুচি আশা অভিলাষ
যা মিলিয়ে জীবনের স্বাদ
তার হোলো রসবিপর্যয়।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানব সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য, প্রতাপশালীদের চরম খামখেয়াল ও শক্তিমদমত্ততা। তাইতো দেশে দেশে, এমনকি একই দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে চলছে নরমেধযজ্ঞ। একই কারনে যুদ্ধের শিকার হলো ইরাকের নীরহ জনগণ, চূর্ণ হয়ে গেল দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। শুধু ইরাকই নয় কোরীয় উপদ্বীপ, ইরান, ফিলিস্তিনিসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে এবং উপমহাদেশ ও আফ্রিকার আরো অনেক ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে মানুষের যে চেহারা দেখা যাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে এক অসহায় পীড়িত চেহারা। বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যে, বিশ্বময় একাধিপত্য বিস্তারের জন্য শক্তি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, নৃশংসতা, কপটতা প্রভৃতি সব ম্যাকিয়্যাভেলীয় কূটকৌশল ব্যবহার করে চলছে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি ও তার কিছু তাবেদার রাষ্ট্র। ভাবতে অবাক লাগে, এ শক্তিচক্র কিছুতেই আঁচ করতে পারছেন না সেই সম্ভাব্য মহাপ্রলয়ের ভয়াবহতা, যা অন্য সকলকে ধ্বংস করার সঙ্গে ধ্বংস করে ফেলবে তাদের নিজেদেরকেও। এ কেবল কারো মনগড়া কথার কথা নয়, এ এক অভ্রান্ত অকাট্য সত্য। এ সত্য অতীতের অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে মানুষের সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাসে, বহু সাম্রাজ্যের উত্থান পতন রাজ-রাজড়াদের গ্লানিকর ক্ষমতাচ্যুতি ও মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে।
এসব কথা বলার অর্থ এই যে, হালের চরম বস্তুবাদী ভোগবাদী মনোবৃত্তি, প্রযুক্তির একপেশে অগ্রগতি মানুষকে বিপুল বিত্ত ও যন্ত্রশক্তি উপহার দিয়েছে বটে, কিন্তু তার চিত্তের প্রসার ঘটাতে, ঐক্য ও প্রেমানুভূতির পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায় ধর্ম, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা দ্রুত প্রসারমাণ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে সুনীতির সংযোজন ও সমন্বয় সময়ের এক জরুরী প্রয়োজন। আমার মতে, এ নবনৈতিকতার নির্যাস হবে মানবকল্যাণ। ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী মানবকল্যাণ। এ মানদণ্ড অনুসারে মানুষের একটি কাজ ভাল ও বাঞ্ছনীয় বলে বিবেচতি হতে পারে কেবল তখনই, যখন তা তার নিজের জন্য যেমন, সমাজের অন্যান্য মানুষের জন্যও তেমনি কল্যাণকর। যে কাজ মানুষের ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি এবং মানুষ্যত্বের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে তাই ভাল, তাই বাঞ্ছনীয় ও অনুমোদনযোগ্য। আর যে কাজের ফলাফল এর উল্টো, অর্থাৎ যা সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি সৃষ্টি করে, তাই গর্হিত ও অমানবোচিত কাজ। আমরা এই নতুন মতের নাম দিতে পারি কল্যাণবাদ। কল্যাণবাদ অনুসারে পারস্পরিক আদান প্রদান ও সহযোগিতা সমঝোতারভিত্তেতে অর্জন করতে হবে মানুষের ব্যাপক কল্যাণ, নিশ্চিত করতে হবে সামজিক ন্যায় ও সুবিচার। মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক চেতনা মানুষের একটি মূল্যবান গুণ। ব্যক্তি নিজে বেঁচে  থেকেই কিংবা তার নিজের অস্তিত্বকে সংগঠিত করেই সুখী হতে পারে না। জোর যার মুল্লুক তার এই নীতি মানবসমাজে সুখ শান্তি বয়ে আনতে পারে না। যেকোনো মানবিক সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত পারস্পরিক সহযোগিতা সমঝোতা ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মাধ্যমে। এরই পারিভাষিক নাম মর‌্যালিটি বা নৈতিকতা। একেই আবার আমরা বলি কালচার, ভদ্রতা বা নীতিপরায়ণতা। আপন অধিকার সংরক্ষণ যেমন মানুষের কর্তব্য, অপরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাও তার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। মানুষ স্বাধীন হয় অপরের স্বাধীনতাকে হরণ করে নয়, শ্রদ্ধা ও স্বীকার করে। তাই তো অন্ধ প্রবৃত্তির চাপের মুখেও কত না মহৎপ্রাণ মানুষ ব্রতী হয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠায়, এমন কি অকাতরে প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন আর্তমানবতার দুঃখ দুর্দশা মোচনে। এ যুক্তিতেই তো মহামতি এরিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ একটি সামাজিক জীব; আর যে সমাজে বাস করে না সে মানুষ নয়, বরং হয় একজন ফেরেস্তা নয়তো একটি জানোয়ার। সমাজের  আর দশজনকে বাদ দিয়ে কখনো কারো নিজের ব্যক্তিত্ব বিকশিত হতে পারে না; একক প্রচেষ্টায় কেউই কখনো তার সব অভাব মেটাতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, একটি প্রদীপ যেমন একা রাতের অন্ধকার ঘোচাতে পারে না, তেমনি কোন ব্যক্তিবিশেষের একক  চেষ্টায়ও মানবসমাজের ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মহলের সমবেত প্রচেষ্টা।
এখানে নৈতিকতার সঙ্গে মানুষের অধিকার ও দায়িত্ববোধের সম্বন্ধের বিষয়টা  প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ, অধিকার ও দায়িত্ববোধ এমন দুটি জিনিস যা থাকা না থাকার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে মানুষের সুখ দুঃখ, শান্তি নিরাপত্তা। এমতাবস্থায় অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা, প্রভৃতি যেকোন এক বা একাধিক মৌলিক অধিকার না থাকার কারনে কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা ও দাবি করার অধিকার সে নাগরিকের আছে। আর তা পূরণ করাও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায় দায়িত্বের অন্তর্গত। মানবাধিকার ইদানীংকালের একটি বহুল আলোচিত বিষয় বটে। তবে এ বিষয়ে মানুষের চিন্তা ভাবনা ও আলাপ আলোচনার সূত্রপাত বহুকাল আগে। অতীতে এক সময় অধিকারকে দেখা হতো প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত জন্মগত অধিকার হিসেবে। এ মতে, এমন কিছু অধিকার আছে যেগুলো মানুষমাত্রই জন্মসূত্রে পেয়ে থাকে। এসব অধিকার যেহেতু প্রকৃতিদত্ত ও জন্মগত, সুতরাং এরা মৌলিকও বটে। এরা অলঙ্ঘনীয় ও অপরিবর্তনীয় মৌলিক অধিকার; সুতরাং এগুলোর নিশ্চয়তা বিধান সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ব্যক্তি নিজে যেমন তার কোন মৌলিক অধিকার অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারে না, তেমনি সমাজ বা রাষ্ট্রও কারো মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে কিংবা কারো কাছ থেকে তার মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে কিংবা কারো কাছ থেকে তার মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারে না। অধিকারমাত্রই, মানবিক অধিকার এবং এসব অধিকার মানুষের উদ্দেশ্য সাধনে, জীবনের নূন্যতম চাহিদা পূরণে সহায়ক। যথার্থ অধিকার তাই যা নিশ্চিত করে ব্যক্তির স্বচ্ছন্দ জীবন, সহজ ও সুগম করে দেশ ও দশের সামগ্রিক কল্যাণ।
অতীতে একসময় একচ্ছত্রবাদ নামে যে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল এবং যা এখন ক্রমবিলীয়মান, তাতে ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের কোন স্বীকৃতি ছিল না। এ ব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি রাষ্ট্রবাদী এবং এতে ‘ব্যক্তির জন্য সমাজ’ কথাটার পরিবর্তে  ‘সমাজের জন্য ব্যক্তি’ কথাটা বিবেচিত হতো সঙ্গত বলে। এ ব্যবস্থায় অধিকার বলতে বোঝাতো রাষ্ট্রের অধিকার; আর নাগরিক সাধারণের যা প্রাপ্য বলে প্রচার করা হত, তা অধিকার নয়, রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তির কেবল কর্তব্যপালন। এ ব্যবস্থায় নাগরিক অধিকার বলে যা কিছু থাকবে, তা কোন প্রাকৃতিক বা মানবিক অলঙ্ঘনীয় অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মর্জিমাফিক নাগরিকদের দেয়া কিছু সুযোগ সুবিধা।
এ ধরনের একচ্ছত্রবাদী মত বহুলাংশে স্বেচ্ছাচারী, এবং এজন্যই তা গ্রহণযোগ্য নয়, হতেও পারে না। মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র রক্ত মাংসে গড়া কোনো সচেতন সত্তা নয়; আর নাগরিকদের সুখ দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধার কথা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের আলাদা কোনো লক্ষ্যের কথাও ভাবা যায় না। আমরা যাকে রাষ্ট্র বলি, তা নিজে কখনো ন্যায়, সুনীতি ও সামাজিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নয়, বরং নাগরিক সাধারণের লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় বা মাধ্যমমাত্র। সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে ভাল বা মন্দ বলা হয় তাদের নিজস্ব দোষগুণের জন্য নয়, বরং তাদের মাধ্যমে নাগরিকদের ভাল কিংবা অনিষ্ট করা হয় বলে। মানবাধিকারের যথার্থ বিকাশ ঘটে সমাজের গণমানুষের সুযোগ-সুবিধার সঠিক সংরক্ষণ ও বিলি বণ্টনের মধ্য দিয়ে। আর মানুষের মৌলিক অধিকার যথার্থভাবে সংরক্ষিত হতে পারে উগ্র ব্যক্তিবাদ ও সর্বাত্মক একচ্ছত্রবাদ এ দুই চরম একপেশে মতবাদের কোন একটির মাধ্যমে নয়, বরং এদের মধ্যবর্তী এক সমন্বয়ী রাষ্ট্রব্যবস্থায়। এ যুক্তিতেই মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার, যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেকের কর্মসংস্থানের, কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিকের এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকারের দাবি আজ ধাবিত হচ্ছে দিকে দিকে। অতীতে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় এ অধিকার তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু আধুনিক শিল্পকেন্দ্রিক সমাজের বিকাশ প্রক্রিয়ায় জীবনধারণের উপায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এসব বিষয় যেহেতু সামাজিক আওতার অন্তর্গত, সেজন্যই সমাজকে প্রতিটি ব্যক্তির বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকার করতে হয়। সাধারণত মানুষ যেহেতু কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, সেজন্য তাকে কাজ থেকে বঞ্চিত করার মানেই হলো ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ বঞ্চিত করা। যদি কোনো একজনকে কাজ দেয়া না যায়, তা হলে সমাজ ও রাষ্ট্রেকে দেখতে হবে যে, মানুষ হিসেবে সুখ শান্তিতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ সুবিধা সেও যেন সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারে। এ যুক্তিতেই পাশ্চাত্যের অনেক দেশে আজকাল বেকারভাতা, বেকারবীমা প্রভৃতি নানারকম সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়।
তবে এখানে এ কথাও বলে রাখা দরকার যে বেঁচে থাকার জন্য মানুষমাত্রেরই অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য হলেও এ প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোই মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। কথায় বলে, ম্যান ডাজ নট লিভ বাই ব্রেড এলোনÑ মানুষ কেবল খেয়ে পরেই বেঁচে থাকতে চায় না। মানুষ ভালোভাবে, মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আর তা চায়  বলেই অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের বাইরেও সে কিছু বাড়তি জিনিস প্রত্যাশা করে। এমতাবস্থায় মুষ্টিমেয় কিছু লোক আরাম আয়েশে থাকবে, আর বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ দুঃখ-দারিদ্র্য-বাঞ্চনায় কাল কাটাবে, এটা হতে পারে না, কোনো সচেতন মানুষই তা মেনে নিতে পারে না। আর তাই ‘অন্ন চাই’ ‘বস্ত্র চাই’ প্রভৃতি দাবির পাশাপাশি মানুষ আজ ‘বাঁচার মতো বাঁচাতে চাই’ ধ্বনি তুলছে সোচ্চার কণ্ঠে। এ দাবি আজ সুবিদিত যে, মৌলিক মানবাধিকার সার্বজনীন; এ অধিকার কারো প্রতি অন্য কারো (ব্যক্তি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র) বিশেষ করুণা কিংবা অনুগ্রহের ব্যাপার নয়। মানবাধিকারমাত্রই মানুষের ন্যায্য অধিকার; আর এজন্যই এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য। একই সঙ্গে এও মনে রাখা দরকার যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণে ব্রতী হওয়া প্রত্যেকেরই কর্তব্য; কারণ প্রত্যেকেই সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন সদস্য এবং সেই সামাজিক কল্যাণ অকল্যাণের অংশীদার। তবে সামাজিক কল্যাণের দোহাই দিয়ে কারো নাগরিক অধিকার ও সুখ-সুবিধাকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। একথা সহজেই বোধগম্য যে, কোনো সচেতন সভ্য সমাজে জোর যার ম্ল্লুুক তার  এ নীতি চলে না, চলতে পারে না। সমাজের সবার ন্যায্য অধিকার সুরক্ষার পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, সদ্ভাব-সম্প্রীতি ও আদান প্রদান অপরিহার্য। অন্য কথায়, হিংসা বিদ্বেষ, সংঘাত সহিংসতা নয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতারভিত্তিতেই রচনা করতে হবে দেশ ও দেশের ব্যাপক কল্যাণ। নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক ন্যায়-সুবিচার ও সুখ-শান্তি। এটাই হওয়া উচিত বিজ্ঞান-রাষ্ট্র-ধর্ম-দর্শন ও নীতিবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য।
এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে যথার্থ শিক্ষা অধিকার ও প্রয়োজনীয়তার কথা। মা-বাবার আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, সমাজের প্রত্যেকটি শিশুরই লেখাপড়া করার এবং নিজেকে ও পরিবেশকে জানার অধিকার আছে। শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন সফল ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এ অধিকার অন্যান্য অধিকার অর্জনের জন্য অপরিহার্য। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা আত্মরক্ষার জন্য যেমন, সৃষ্টিশীল অর্জনের জন্যও তেমনি প্রয়োজনীয়। আমরা জানি সফল জীবনযাত্রা এক সুকঠিন  সার্বক্ষণিক সংগ্রাম। বহুবিধ জটিলতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হবে প্রতিনিয়ত। এসব জটিলতা নিরসন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথার্থ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার মূল লক্ষণ কী? এ প্রশ্নের সদুত্তর বর্তমান যন্ত্রকেন্দ্রিক সভ্যতার সঙ্কটময় সময়ের এক বড় প্রয়োজন। শিক্ষাকে অব্যশই হতে হবে এমন যেখানে মানুষ একদিকে হবে বিদ্বান এবং অন্যদিকে হবে হৃদয়বান ও মহৎপ্রাণ। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় দৈনিক ও জৈবিক চাহিদা মোটবার ব্যবস্থা আছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিকাশের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা আছে, কিন্তু দয়া-মায়া প্রেম প্রভৃতি মানবিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি ও তাগিদ নেই, সে শিক্ষা একপেশে ও অকার্যকর সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, অথচ শিক্ষার্থী মানুষ হচ্ছে না, সজ্জন হচ্ছে না এটা আর যাই হোক প্রকৃত শিক্ষা নয়। ফ্রান্সিস বেকন শিক্ষাকে শক্তি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এই শক্তিকে যদি আমরা অস্ত্র বলি, তাহলে সে অস্ত্র দিয়ে যেমন অস্ত্রোপচার করে একটি মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানো যায়, আবার একই অস্ত্র দিয়ে মানুষ দিয়ে মানুষ খুনও করা যায়। জার্মানির নাজি এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট সরকারসহ অনেক স্বৈরশাসকই শিক্ষাকে ব্যবহার করছে তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার অসৎ উদ্দেশ্যে। সুতরাং শিক্ষারূপ আলো বা অস্ত্র দিয়ে কে কী করবে তা পুরোপুরি নির্ভরশীল সংশিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠির সদিচ্ছা, মূল্যবোধ ও নীতিবোধ থাকা না থাকার ওপর। ইতিহাস থেকে এমন দৃষ্টান্ত পাই যে, শিক্ষা একটি সভ্যতা-সংস্কৃতিকে যেমন গড়তে পারে, তেমনি আবার চূর্ণও করে দিতে পারে। তার মানে শিক্ষাব্যবস্থার মূলে একটা নৈতিক ও মানবিক লক্ষ্য থাকা চাই। তা না হলে শিক্ষা (তা বৈষয়িক ও প্রায়োগিক দিক থেকে যত বড় অর্জনই বয়ে আনুক না কেন) ব্যথর্, এমন কি প্রাণঘাতী হতে পারে। যাই হোক, এর আগে বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে যেসব দুঃখ ও ক্ষোভের কথা বললাম সেগুলো আমাদের দেশের বেলায়ও কমবেশি প্রযোজ্য। তামাম দুনিয়া জানে বহু ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম, যাত্রা শুরু করলাম ন্যায় ও সুনীতিভিত্তিক এক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে। কিন্তু সেই থেকে দীর্ঘ চার দশক অতিক্রান্তির পরও আজ পর্যন্ত আমরা পারলাম না ঐক্যবদ্ধ হতে, পেলাম না শান্তি ও স্বস্তির স্বাদ। আমাদের জাতীয় জীবনের মূলমন্ত্রটা যেখানে হওয়া উচিত ছিল ‘যত মত তত পথ’, সেখানে ক্রমাগত লক্ষ্য করছি  ‘যত মত তত সংঘাত’। বিশেষ করে পীড়াদায়ক মনে হয় সরকার ও বিরোধী দলের অব্যাহত দূরত্ব ও দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিকে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকাশের পক্ষে মারাত্মক অন্তরায় এই বিরোধ সব সরকারের আমলেই একইভাবে অব্যাহত রয়েছে। স্বাভাবতই প্রশ্ন ওঠে অতীতের বহু বিপদ আপদে বিশেষ করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এককাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করলেন যাঁরা (বিশেষ করে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল), এখন কেন তাঁরা পারছেন না সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ  অনুশীলন করতে, এমনকি এক দল অন্য দলকে সহ্য করতে? এ এক গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন বটে। এই জটিল প্রশ্নের সদুত্তর আবিস্কারের স্থান এটা নয়, এ ক্ষুদ্র পরিসরে সে আলোচনাও সম্ভব নয়। তবে এ অনাকাক্সিক্ষত উপদ্রব থেকে অব্যাহতির উপায় সম্পর্কে এটুকু বলা যায় যে, এর জন্য চাই সংশ্লিষ্ট নেতা-নেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মীদের সেই সযতœ আত্ম-নির্দেশনা যার পারিভাষিক নাম ‘auto-suggestion’। দেশ ও দশের সামগ্রিক স্বার্থেই কি, সংসদ কি রাজপথ সর্বত্রই তাঁদের অনুসরণ করতে হবে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার মহান পথ। একথা যতটুকু প্রযোজ্য সরকারের বেলায়, ততটুকুই প্রযোজ্য বিরোধী দলের বেলায়; কারণ সরকার যেমন জনগণের নির্বাচিত সরকার, বিরোধী দলও একই জনগণেরই নির্বাচিত ছায়া সরকার। সুতরাং উভয়কেই পারস্পরিক শ্রাদ্ধাবোধ ও সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার রাজনৈতিক কালচার গড়ে তুলতে হবে। তাঁরা যখন তা করবেন, তখনই জনগণ পাবে স্বস্তি, তখনই দেশে আসবে প্রকৃত শান্তি ও সমৃদ্ধি, এবং তখনই সাথর্ক হবে আমাদের রক্তক্ষয়ী মহান স্বধীনতা ও এ সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপার আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ রক্তদান।
এই একই সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিহার্য  আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্বন্ধ ও আন্তর্জাতিক মানবসম্পর্কের বিস্ফোরণ স্পর্কে ক্ষেত্রে। হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায় আগ্রাসন, বিচ্ছিন্নতা শূণ্যতাবোধ প্রভৃতির সমবায়ে আজ বিশ্বব্যাপী যে মনস্তাত্ত্বিক মন্দ্ভাব, অনাস্থা ও মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তার হাত থেকে অব্যাহতি পেতে হলে সংশিষ্ট সকলকে উপলব্ধি করতে হবে যে, বিজ্ঞান প্রযুক্তির কল্যাণে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে মানুষের আধিপত্য যতই বাড়–ক না কেন, পরাশক্তি যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন, মানবিক মূল্যবোধের আন্তরিক মনন ও অনুশীলন ব্যতিরেকে মাটির পৃথিবীতে কখনো শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। আগেই বলছি এ সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে মানুষের অতীত ইতিহাসে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও শক্তিমদমত্ত রাজ-রাজাড়াদের গ্লানিকর পরিণতির মধ্য দিয়ে। আজ যারা বিশ্বে একধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিলাষে কথায় কথায় শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন, অনৈতিক আগ্রাসনের পথ বেছে নিচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি : অতীতে যা ঘটেছে অবিবেচক ও অত্যাচারীদের বেলায় তা যে আপনাদের বেলায়ও ঘটতে পারে, এ কথা একবার ভেবে দেখেছেন কি? একথা তো অনস্বীকার্য যে জন্ম থেকে শুরু করে রোগ, শোক, জরা, মৃত্যু পর্যন্ত এমন কিছু মৌলিক বিষয় আছে যেগুলো সসীম মানুষের ( এমন কি পরাশক্তির) নিয়ন্ত্রণের বাইরে; আর তাই নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন দ্বারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেকাংশে ঠেকাতে পারলেও মাটির মানুষ কখনো জরা-মৃত্যুর অনিবার্যতাকে ঠেকাতে পারবে না। যৌবনের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ (এমনকি পরাশক্তিমান দেশের খোদ শীর্ষ  ব্যক্তিটিও) ক্রমশ ক্ষয় হবেই। যোশেফ নীডহ্যাম মানুষের এই সীমাবদ্ধতাটাকেই অভিহিত করেছেন ক্রীচারলিনেস বলে। এখানেই অসীমের সঙ্গে সসীমের, বিশ্ববিধাতার সঙ্গে মানুষের পার্থক্য; এটাই সৃষ্টির সেরা মানুষের পরম অসহায়তা, যা-কিনা কোনো পঞ্চবর্ষিকী পরিকল্পনা কিংবা অন্য কোনো মানিবিক কলাকৌশল দ্বারা  নিরসনযোগ্য নয়।
যাই হোক, বর্তমান বিশ্বব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ও চরম হা-হুতাশের মধ্যেও কিছু আশার কথা বলতে চাই। পরাক্রমশীলদের বোধোদয় কবে হবে, আদৌ হবে কিনা জানি না কিন্তু তবু আমি দুঃখ-ক্লেশ ও বিপদ আপদের কালোমেঘ দেখে ভয় পেতে চাই না। কোনো অপ্রীতিকর অবস্থাকেই জগৎ ও জীবনের শেষ পর্যায় বলে মনে করি না; কারণ এ জগৎসংসার ও মানবজীবন সুন্দর কুৎসিতে ইষ্টানিষ্টে ও আনন্দ বেদনায় মিথুনীকৃত। এখানে যেমন আছে আধি-ব্যাধি-দুঃখ-বঞ্চনা তেমনি আছে সুস্বাস্থ্য, সুখ, সৌন্দর্য ও আনন্দ। এমতাবস্থায় সুস্থ ও সুখকর জীবনের জন্য যে দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শনকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি এবং যা অনুশীলনের পক্ষপাতী, তা একপেশে নৈরাশ্যবাদ নয়, আবার আত্মতৃপ্ত কল্যাণবাদও নয়। আমার এ জীবনদর্শনের নাম দিতে চাই উন্নয়নবাদ। এ মতে জগৎ সম্পূর্ণ শুভ কিংবা সবৈধ অশুভ এ দুয়ের কোনটিই নয়।
মানুষের শ্রম ও সদিচ্ছার মাধ্যমে দুঃখ বিমোচন ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ঘোর দুর্দিনের মধ্যেও রচনা করা যায় সুদিনের ভিত্তি। হালের পরিস্থিতি অবশ্য খুবই নাজুক, নীতিবোধ মূল্যবোধের অবক্ষয় সুস্পষ্ট, প্রাকৃতিক দুর্দৈব ও মানবিক নৃশংসতার মাত্রাও লোমহর্ষক। এ সবকিছু মিলিয়ে গতি মন্থর হলেও একেবারে অনুপস্থিত নয়। একদিকে হৃদয়হীন যুদ্ধবাজ নেতারা যেমন আগ্রাসনে নিরীহ ও সাধারণ মানুষের প্রাণসংহারে অটল, অন্যদিকে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং শান্তির আকাক্সক্ষা দেশে দেশে প্রবল। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে বিবেকের প্রতিবাদ প্রতিরোধের সংকেতও সুস্পষ্ট। এমতাবস্থায় জগতের আধি-ব্যাধি,দ্বন্দ্ব-কলহ, দুর্ভিক্ষ-দারিদ্র প্রভৃতি রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আমাদের অগ্রসর হতে হবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেই সংহত করতে হবে নৈতিক ও মানবিক আদর্শকে। এ কথারই সংকেত ও সমর্থন পাওয়া যায় প্লেটোর সংলাপে। বন্ধু গ্লোকনকে লক্ষ্য করে সক্রোটিস বলেন, হে গ্লোকন পৃথিবী থেকে কোনোদিনই অশুভ-অমঙ্গল সম্পূর্ণ উবে যাবে না। আর যাবেই বা কী করে? আমরা যাকে অশুভ বলি তাতো সেই অপূর্ণতারই নাম যার সঙ্গে অব্যাহত লড়াই করে অর্জন করতে হয় নৈতিক উৎকর্ষ, সমুন্নত রাখতে হয় মানবজীবনের মহত্ত্ব ও মর্যাদা।
কথায় বলে, truth triumphs in the long run আর আমার নিজেরও বিশ্বাস আজ হোক কাল হোক মনুষ্যত্বের কাছে পাশবিকতা এক দিন হার মানবেই, সব বিপাক-বিপত্তির মধ্যেও জগৎ নৈতিক প্রগতির দিকে অগ্রসর হবে এবং পরিণামে মানুষ শুভ শ্রেয় সুন্দরের সন্ধান পাবে। আর তাই শত ঝড়-ঝাপ্টার মধ্যেও ভাঙ্গা হাল ও ছেঁড়া পাল নিয়েই আমাদের ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যেতে হবে সুখশান্তি ও অগ্রগতির পথে এবং পাশব শক্তির মোকাবেলা করেই সংহত করতে হবে সত্য সুন্দর কল্যাণের শক্তিকে। তাতেই আশা করি একদিন পরিসমাপ্তি ঘটবে বর্তমান মানবসঙ্কটের, তাতেই সহজ ও সুগম হবে মানবজাতির সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার পথ।

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফিরিয়ে দাও আমাদের আনন্দ : অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশ এখন অভিন্ন সড়ক নেটওয়ার্কে বাঁধা পড়েছে। খাল-নদী-বিলের এই দেশে যে কোনো স্থানে যাওয়া যায় সড়ক পথে। নৌকায় ভ্রমণ এখন নিছকই স্বল্প সময়ের আনন্দ লাভের জন্য। দূরে কেন, কাছের কোথাও নৌকায় যাওয়ারই বা সময় কোথায় মানুষের? অথচ এক সময় গ্রামের সচ্ছল প্রায় সব পরিবারের থাকত নিজস্ব নৌকা। তার জন্য ঘরের কাছেই থাকত ঘাট। এটা মানমর্যাদারও প্রতীক ছিল। হাতিশালে হাতি আর ঘোড়াশালে ঘোড়াও কারো কারো বাড়িতে দেখা যেত। তবে চলাচলের জন্য নৌকাই ছিল যুৎসই বাহন।
বরিশালের ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রামের নাম গৈলা। এখানেই জন্ম হয়েছিল মনসা মঙ্গলের কবি বিজয় গুপ্তের। তবে সে সময়ে এ গ্রামেরই একটি অংশের নাম ছিল ফুল্লশ্রী, যাকে কবি অভিহিত করেছিলেন পণ্ডিত নগর হিসেবে। তিনি গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করে পাঁচ’শ বছর আগে রচনা করেছিলেন এমন এক গ্রন্থ, যা আজো কোটি কোটি মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে আছে। শ্রাবণ মাসে এ মঙ্গল কাব্য পাঠ হয় না, দক্ষিণাঞ্চলে এমন হিন্দু পরিবার কমই মিলবে। বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দিরে একটি পিতলের মূর্তি ছিল, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগীরা লুট করে নিয়ে যায়। যারা এ অপরাধ করেছিল তারা পরিচিত মুখ, হানাদার বাহিনীর সহযোগী লুটেরার দল। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। স্বাধীনতার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ কেন নেয়া হয়নি, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের এ এক বড় সমস্যা। তারা অন্যায়ের শিকার হলেও তার প্রতিকার সবসময় হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে এমনকি অন্যায় যে ঘটেছে সেটাও স্বীকার করা হয় না। তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না, প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার প্রতিকারের কথা সাধারণত ভাবে না। বরং অনেকেই ধরে নেয় যে এমনটি ঘটায় অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। এভাবে দেশের নানা স্থানে লাখ লাখ হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি বেহাত হয়েছে, দখল হয়ে গেছে দেবোত্তর হিসেবে চিহ্নিত মন্দিরের সম্পত্তি। প্রতিকারহীন শক্তির অপরাধে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদছে, কিন্তু এগিয়ে আসে না প্রশাসন বা পুলিশ।
বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দির পিতলের দেবীমূর্তি লুট হয়ে যাওয়ার ৩২ বছর পর ২০০৩ সালের জুন মাসে এ মূর্তিটি নতুন করে তৈরি করার উদ্যোগ নেয় গৈলা-আগৈলঝাড়া-বাকাল-বাগধা-আসকর-চাঁদশী-গৌরনদী-টরকির অধিবাসীরা। বরিশাল শহর থেকেও অনেকে এগিয়ে আসেন। ওই অঞ্চলের যারা ঢাকায় বসবাস করেন তারাও মূর্তিটি নবরূপে তৈরির কাজে উদ্যোগী হন। মনসা মন্দিরে অনুষ্ঠিত এক সামাজিক সভায় ঠিক হয়, মনসা মঙ্গলের বিররণ অনুযায়ী মূর্তিটি তৈরি হবে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকার শাঁখারি বাজারে মৃৎশিল্পী হরিপদ পাল এবং কাঁসা-পিতলের কাজে দক্ষ রামগোপাল কংসবণিকের সঙ্গে আমরা কয়েকজন আলোচনা করি। তারা এক বছরের কঠোর শ্রম ও সাধনায় নির্মাণ করেন প্রায় একটন পিতল দিয়ে তৈরি মনসা দেবীমূর্তি। ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে এ মূর্তি গৈলা নেয়া হলে হাজার হাজার নারী-পুরুষ শাঁখ-ঢোল-করতাল বাজিয়ে দেবীকে বরণ করে নেয়। মূর্তিটি মন্দিরে নেয়ার পথে বহনকারী গাড়িটি গৈলার কর্মকার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকশ’ নারী উলুধ্বনি দিয়ে ও শাঁখ বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। তাদের অনেকে পরে বলেছেন, এমন আনন্দের দিন আসবে তা ভাবিনি কখনও।  
বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দিরে স্থাপিত মূর্তি প্রথম থেকেই দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের বিপুলভাবে আকৃষ্ট করে। গৈলা বাজারের মিষ্টি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য : এখন বেশি বেশি দর্শনার্থী আসছে, তাই বিক্রি বেড়েছে। দুধ বিক্রেতাদেরও একই মত। রিকশাচালরা বলছে, তারা বেশি যাত্রী পাচ্ছে। বৃহত্তর বরিশালের নানা এলাকা থেকে গাড়ি করে ভক্তরা আসছে এ মন্দিরে। বরিশাল জেলা প্রশাসন জেলার বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর যে তালিকা করেছে তাতে স্থান পেয়েছে গৈলার বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দির।



 এখন মূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে মন্দির। প্রকৌশলী অরুণ চক্রবর্তী এর ডিজাইন করেছেন। মন্দিরের চত্বরে আয়োজিত এক সমাবেশে ডিজাইন ল্যাপটপে প্রদর্শন করেন অরুণ চক্রবর্তী। এ সময়ে বরিশালের এডভোকেট ফনিভুষণ দাস বলেন, সামনে একটু বেশি স্থান রাখলে ভাল হয়। সভায় উপস্থিত অন্যরাও তাতে সায় দেন এবং ডিজাইনে সঙ্গে সঙ্গেই এ পরিবর্তন আনা হয়। আলোচনা চলতে চলতেই অরুণ চক্রবর্তী মন্দিরের আশপাশ ঘুরে দেখেন এবং পরে সভায় এসে বলেন, মন্দিরের একটি সিঁডি পাশের দিঘীতে নেমে গেলে কেমন হয়? তবে এতে ৩-৪ লাখ টাকা ব্যয় বাড়বে। উপস্থিত সবাই তাতে সায় দেয় আনন্দচিত্তে। 


মন্দিরের কাজ শুরুর জন্য বহুকাল আগে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যের মন্দিরটি ভেঙে ফেলার প্রয়োজন পড়ে। আশির দশকে গৈলার অধিবাসী সুনীল কুমার গুপ্ত মন্ত্রী থাকার সময়ে এর সংস্কার কাজ করিয়েছিলেন। স্থানীয় জনগণ সর্বসম্মতভাবে একটি আকর্ষণীয় মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দিলে আর কোনো বাধা থাকে না। তহবিল সংগ্রহের কাজও শুরু হয়ে যায়। গৈলার বাসিন্দা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম এ মালেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফকরুদ্দিন আহমদের বিশেষ সহকারী থাকার সময় আরেক উপদেষ্টা জনাব আনোয়ার ইকবালকে দিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা মনসা মন্দিরের জন্য বরাদ্দ করেন। কিন্তু সরকারের তহবিলের টাকা তো পাওয়া যাবে কাজ শুরু হলে? কাজ শুরু করা হবে কীভাবে? এ নিয়ে বৈঠক বসলে আশীষ তফাদার বলেন, তিনি ৫০ হাজার টাকা ধার দেবেন। বরিশালের কৃতী পুরুষ শিল্প উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী শ্রী বিজয় কৃষ্ণ দে তার বাসভবনে শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক সভা ডাকেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শ্রী নিখিল সেন, প্রাণ কুমার সেনগুপ্ত, আশীষ দাশগুপ্ত, এডভোকেট ফনিভুষণ দাস, পবিত্র কুমার দাস, অসীম দাশগুপ্ত প্রমুখ। বিজয় কৃষ্ণ দে বলেন, মন্দিরের কাজ শুরুর জন্য রড-সিমেন্ট-ইট-বালু যা দরকার তার ব্যবস্থা তিনি করবেন। এর ফলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলে। মন্দিরটি ভক্তদের মনের মতো গড়ে উঠছে। ধাপে ধাপে চলছে এর সাজসজ্জার কাজ। যারা দেখছেন সবাই বলছেন, এ এক চমৎকার শিল্পকর্ম নির্মাণ করা হচ্ছে। শুধু বরিশাল নয়, গোটা দেশের মানুষকে তা আকৃষ্ট করবে। অনেক বছর ধরেই বরিশালের গৈলা এ মন্দিরের কারণে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনের স্থান। মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে পর্যটকদের যাতায়াত আরও বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সাংস্কৃতিক পর্যটনের স্থান হিসেবে বিজয়গুপ্তের মনসা মন্দিরকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শাহজাহান মিয়ার অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মন্দিরটি নির্মাণে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এ স্থানটি নিয়ে আমাদের যে পরিকল্পনা তা এভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
 গৈলার সাবেক আমলের কথায় ফিরে যাই। এ গ্রামেই একটি বড় দীঘি আছে, যা দাশের বাড়ির দীঘি নামে পরিচিত। গ্রামটির পত্তন আর এ দীঘি খনন সম্ভবত একই সময়ে হয়েছিল। এ জলাশয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রশস্ত খালের। এখন খালটি ক্ষীণকায়। কিন্তু একদা শুধু বর্ষা নয়, বছর জুড়েই জল থই থই করত। গ্রামের যারা ব্যবসা, চাকরি বা পড়াশোনা উপলক্ষে বাইরে যেত তাদের এ খাল ব্যবহার করতে হতো। আজ থেকে প্রায় ষাট-সত্তর বছর আগের সময়ে আমরা ফিরে যেতে পারি। তখন গৈলায় এমন হিন্দু পরিবার কমই ছিল, যাদের কেউ না কেউ কলিকাতায় নেই। ঢাকাসহ অন্যত্রও ছিল যাতায়াত, তবে সংখ্যায় কম। ব্যবসায় কিংবা পড়াশোনা উপলক্ষে বাইরে থাকা সবাই শারদীয় দুর্গা পূজায় গ্রামে আসবে, এটা ছিল রেওয়াজ। এ সময়ে ছুটিও মিলত অনেকদিন। কীভাবে গৈলার বাসিন্দারা ভারতবর্ষের এক সময়ের রাজধানী কলিকাতা শহরে যেত? মিথ ছিল এ রকম : খুব ভোর বেলা নৌকায় রওনা হয়ে যেতে হতো গোপালগঞ্জের পাটগাতি গ্রামে। যেতে যেতে সন্ধ্যা হতো। পথেই নৌকায় রান্না করা গরম ভাত আর মধুমতি নদীর সুস্বাদু ইলিশ মাছে শুধু পেট নয়, মনও ভরে যেত। বরিশাল শহর থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া স্টিমার কিছুটা রাত হলে থামত পাটগাতিতে। কলিকাতার যাত্রীরা উঠতো স্টিমারে। পরদিন সকালে খুলনা থেকে বরিশালগামী স্টিমারে গৈলা বা আশপাশের গ্রামের যেসব যাত্রী থাকতেন, তারা ওই নৌকায় ফিরতেন নিজের ঘরে। খুলনায় স্টিমার থেকে নেমে কলকাতা যাত্রীদের চাপতে হতো রেলগাড়িতে। পথে বেনাপোল-পেট্রাপোলে চেকিং শেষে সন্ধ্যার কিছু পরে পৌঁছানো যেত কলিকাতায়।


কলিকাতা থেকে বাড়ির পথে সকালে ট্রেনে চেপে বসতে হতো শিয়ালদহ থেকে। সঙ্গে থাকত প্রিয়জনদের জন্য কেনা নানা বাহারি পণ্য। দেড় দিনের যাত্রা শেষে সন্ধ্যায়  গৈলা দাশের বাড়ির দিঘীতে কিংবা খালের দুই তীরের কোনো বাড়িতে। শরতের সন্ধ্যার মনোরম পরিবেশে তাই দিঘীর পাড়ে জমে যেত ভিড়Ñ নারী-পুরুষ-শিশু সবাই প্রিয়জনের মুখ কে আগে দেখবে, উন্মুখ সেজন্য। এক একটি নৌকা ঘাটে থামত, আর সবাই ছুটে যেত। যার স্বজন এতে আছে তাদের চোখ-মুখে আনন্দের বান। অন্যরা জানতে চাইত, ‘ওর’ নৌকা কত দূর? যখন কেউ শুনতে পেত, তার প্রিয়জন বিশেষ সমস্যা কিংবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারবে না, হতাশা আর যন্ত্রণায় অন্ধকারেও ধরা পড়ত মুখ যেন আরও কালো হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরত বিষণœ মনে। অন্যরা সান্ত্বনা দিত। কিন্তু মন যে মানে না তাতে। উৎসবের আনন্দ তাদের জন্য মাটি হয়ে যেত। এখনকার মতো মোবাইল ফোনের যুগ হলে তারা অনেক আগেই হয়তো সব খবর পেয়ে যেত। কিন্তু তখন যে পোস্ট কার্ডে চিঠি আসতেও ৮-১০ দিন! 


সেকালের এই যে দীর্ঘ অপেক্ষা তার আনন্দও তো কোনো অংশে কম ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত আমার ছোট কাকার কাছে শুনেছি, পূজায় গ্রামে আমাদের দাশের বাড়িতে সবচেয়ে বেশি লোক আসত। বাড়িতে অনেক ঘর ছিল। তারপরও এত লোক প্রবাস থেকে ফিরত পূজায় যে সবার ঘরে ঠাঁই হতো না। পুরুষ সবাইকেই ঘুমাতে হতো উঠানে খোলা আকাশের নিচে। পূজায় বৃষ্টি হবে, সেটা সংস্কারের মতোই ছিল। বৃষ্টি নামলে উঠানের পুরুষদের ঘরে চলে যেতে হত। কিন্তু ঘুমানোর অবকাশ মিলত না। স্থান যে নেই...। তাতে কি? রাত জাগার মধ্যেও মিলত পরম তৃপ্তি ও আনন্দ।
আমাদের জীবনের এ আনন্দ-উচ্ছাস কে কেড়ে নিল? শারদীয় দুর্গোৎসব এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান এলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের সভা হয় শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে। সরকারের দিক থেকে কঠোর নির্দেশ যায় এমন দিনগুলোতে যেন হিন্দুদের মন্দিরে কেউ টোকাটিও দিতে না পারে। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের আগেভাগেই পাকড়াওয়ের জন্য বলে দেওয়া হয়। কোথাও মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা থাকলে সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করে। এসবই ভাল লক্ষণ। প্রশংসনীয় মনোভাব। কিন্তু যাদের হিন্দু কিংবা সংখ্যালঘু বলা হয়, তারা কি কেবল এ কয়টা দিনই নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থেকে ‘সুখি-সুন্দর’ জীবন কাটাবে? অন্য সময়ে চলবে অত্যাচার? কিংবা সেটা না হলেও প্রতি মুহুর্ত কাটাবে অবদমিত মনোভাবে? যদি সমঅধিকারের কথা বলা হয়, তবে তারা মোটেই ভাল নয়Ñ যদি মাথা নত করে সুবোধ বালকের মতো থাকে তবে এমন ভাল মানুষ আর হয় না এটাই কি তাদের নিয়তি?


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে যেসব ছাত্র থাকার সুযোগ পায় তারা সবাই মেধাবী। তদবির-সুপারিশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায় না। কিন্তু তাদের বেশিরভাগের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। অনেকেই টিউশানি করে পড়ার খরচ চালায়। এমনকি কেউ কেউ এ আয় থেকে বাড়িতেও টাকা পাঠায়। টিউশানির বাজারে এ হলের ছাত্রদের খুব চাহিদা কারণ তারা যে ভাল ও সুবোধ ছেলে! বিকেলে অন্য হলের ছাত্ররা যখন মাঠে আড্ডা দেয় কিংবা নিউমার্কেটসহ আশপাশে বেড়াতে যায়, তখন জগন্নাথ হল থেকে দলে দলে ছাত্ররা যায় ছাত্র পড়াতে। এরপরও পরীক্ষায় জগন্নাথ হলের ছাত্ররা অনেকেই ভাল ফল করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তালিকা দেখুন, হাজার দেড়েক শিক্ষকের মধ্যে পঞ্চাশজনও মিলবে না ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যাত্রা শুরু করা এ হলের মেধাবী মুখগুলো থেকে। সিনেট-সিন্ডিকেটে জগন্নাথ হলের সাবেক ছাত্রদের কোনো প্রতিনিধি কদাচিৎ দেখা যায়। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়। সর্বত্রই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অবদমিত চিত্র। এমন পরিস্থিতিতে তাদের মেধার বিকাশ ব্যাহত হয়। কর্মস্থলে আসে হতাশা। এতে শুধু যে তাদের ক্ষতি, সেটা নয়। সমাজেরও ক্ষতি। একটি উদাহরণ দেই। পুলিশের সর্বোচ্চ পদটি শূণ্য হয়েছিল। এ পদে নিয়োগ প্রদানের জন্য সিনিয়র লোক রয়েছেন। তারা যোগ্য ও নিষ্ঠাবান। কিন্তু সমস্যা রয়েছেÑ ধর্মীয় পরিচয়ে তারা হিন্দু। তাই বিবেচনাতেই এলেন না। সমাজে যোগ্য লোক আছে, কিন্তু তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে না। এতে ব্যক্তির বঞ্চনা যথেষ্ট। কিন্তু সব চেয়ে বেশি বঞ্চনা তো দেশেরই। যে হাত সৃজনের তা কেন অলস হয়ে থাকবে? কিংবা ব্যবহার হবে আংশিক? এ অন্যায় যত বেশিদিন চলতে থাকবে, দেশ তত বেশি সময় পিছিয়ে থাকবে। এ নিয়তি নিশ্চয়ই আধুনিক সমাজ বেশিদিন মেনে নেবে না।


শারদীয় উৎসবে কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক আনন্দের দিনগুলোতে আমরা দলে দলে নিজের শেকড়ে যেতে চাই। সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে চাই। এজন্য উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। সেটা যে আমাদের সমাজ চায় না, তা বলা যাবে না। সমাজের বেশিরভাগ মানুষই ধর্ম নির্বিশেষে শান্তি চায়। আর মুষ্টিমেয়রা চায় অশান্তি। তাদের রুখতে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে সরকারকেই। সবসময়ই দেখা গেছে, সরকার কঠোর অবস্থানে থাকলে অশান্তি সৃষ্টিকারীরা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এমন সময় অনেক রক্ত দিয়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে খুব বেশিদিন পাওয়া যায়নি। সরকার কঠোর হয় না বরং প্রশ্রয় দেয়, লালন পালন করে অশুভ শক্তির। আগামীতে এ অমানিশা কেটে যাবে, আসবে সুদিন, এবারের শারদীয় উৎসবে এটাই হোক প্রার্থনা। আমরা আন্দময় জীবন কাটাতে চাই। উৎকণ্ঠার চির অবসান চাই। দেশকে কিছু দিতে চাই। সভ্যতার বিকাশ চাই। এ চাওয়ায় অন্যায় কিছু নেই। আর এ কারণেই একটি স্পষ্ট চাওয়া কেউ এ পথে যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাতে কারো মঙ্গল নেই।


লেখক : সাংবাদিক।    

স্বর্ণের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: সংকট, ডলারের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের রূপান্তর

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সোনা বা স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং পরম আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে ...