Search This Blog

Tuesday, May 28, 2019

বাংলা নববর্ষ নিয়ে বিভাজন

অপসংস্কৃতি আর ধর্মান্ধতার আগ্রাসনে এমনিতেই আমরা হারাতে বসেছি আমাদের ঐতিহ্যকে। ২০০১ সালে রমনার বটমুলে বোমা হামলা যতটা ক্ষতি করেছে তার থেকেও বেশী ক্ষতি হচ্ছে “পহেলা বৈশাখ হিন্দুয়ানী উৎসব এবং তা পালন করা হারাম” এই জাতীয় আগ্রাসন। প্রতিক্রিয়াশীল এসব মৌলবাদীদের হয়ত আপনি রুখেই দিলেন কিন্তু “হিন্দুরা বাংলাদেশের নিয়মে পহেলা বৈশাখ পালন করে না, এরা দেশদ্রোহী....” এসব কথা বলা প্রগতিশীলতার অন্তরালের মৌলবাদীদের রুখবেন কি দিয়ে? হঠাৎ করে এসব আলাপ কেন? আর এরা কারা?........ এসব প্রশ্ন আপনার মাথায় আসাটা অলীক কোন ভাবনা নয়। আসুন এসব নিয়ে আলাপ করি।
আপনি এসব প্রগতিশীল মৌলবাদীদের কি কখনো প্রশ্ন করেছেন! এদেশের একটা বিরাট অংশের মানুষ এখনো এদেশের প্রবর্তিত দিনে-নিয়মে ঈদ পালন করে না কেন? একদিন আগে বা পরে ঈদ পালন করাও কি তবে এদের রাষ্ট্রদ্রোহীতা? আসলে এসব প্রশ্ন বা আলোচনা করে জাস্টিফাই করা নয়, ভন্ড আর বদমায়েশদের সাথে কোন প্রতিযোগিতাও নয়। জানি এর উত্তর ওদের নেই। কারন আমরা বিশ্বাস করি ধর্ম বা সাংস্কৃতি প্রতিটি মানুষেরই স্বাধীনতা; কে-কেমন করে তার ধর্ম বা সাংস্কৃতিকে পালন করবে সেটা তার ব্যাপার। এই স্বাধীনতা বুঝতে হলে মনটাকে মুক্ত করতে হয়, যা সবার জন্য সহজ নয়।
এবার শুরুতেই আপনাদের কে একটা তথ্য দিই। এবছর বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ ছিলো চৌদ্দ এপ্রিল কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুরা পহেলা বৈশাখ পালন করেনি। কিন্তু কেন? দাঁড়ান। এর কারন এটা না যে হিন্দুরা পশ্চিম বাংলাকে তাদের ঠাকুরঘর মনে করে। এর কারন এটা যে, যখন কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাংলাদেশে, তখন সেই সিদ্ধান্তে সাতচল্লিশে ভিটে না ছেড়ে যাওয়া মানুষ গুলোর কথা থাকেনা, আজব্দি কখনই থাকেনি৷
এত বড় একটা অভিযোগ যখন করাই হলো এরও ইতিহাস আছে নিশ্চই। আসুন সে ইতিহাসে একটু পায়চারি করে আসি।
এই ভূখন্ডের মানুষ সম্রাট আকবর আসার আগেও চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থান বুঝেই তাদের প্রাত্যহিক কর্ম সিদ্ধান্ত নিতো৷ গ্রহ নক্ষত্র ভিত্তিক যে বর্ষপঞ্জী টি তারা অনুসরণ করতেন তার নাম শকাব্দ৷ সেটি মৌর্য আমল থেকে প্রচলিত বলে জানা যায়। আকাশের কোন নক্ষত্রটি কোন অবস্থানে থাকবে তা অনু দন্ড পল হিসেব করতে নক্ষত্র বিজ্ঞানের প্রয়োজন এবং প্রাচীন ভারতবর্ষ যে নক্ষত্রবিজ্ঞানে প্রাজ্ঞতার সাক্ষর রেখেছে হাজার হাজার বছর আগে তাতো বিজ্ঞানের ইতিহাস ই বলে! (দাঁড়ান, ভারতবর্ষ শুনে পালাচ্ছেন কেন? অঙ্গ-বঙ্গ অথবা মগধের ইতিহাসে আপনার আমার সকলের পূর্বপুরুষই আছে, প্রাচীন ভারতবর্ষের উত্তরাধিকার আপনার আছে, আছে বলেই হিন্দুয়ানীকে গালি দেয়া ওয়াজ টি অহিন্দু ভাষায় কুলিয়ে উঠতে পারা যায় না)
যাই হোক, যেখানে ছিলাম। কেমন সেই নক্ষত্র বিচার দিয়ে করা বর্ষপঞ্জী? উদাহরণ দিই। এই যেমন আজ। ২৯ চৈত্র, ১৩ এপ্রিল, ৭ শাবান, আজ শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি (যার মানে আর সাত দিন পর পূর্ণিমা)। পুনর্বসুনক্ষত্রটি রাত দুইটা এক মিনিট তেতাল্লিশ সেকেন্ড থেকে ভোর ৬ টা ৪১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত পৃথিবীর সাথে উপবৃত্তাকারে অবস্থান করবে এবং তারপর আসবে পূষ্যানক্ষত্রের পালা। নক্ষত্র আর গ্রহের এই অবস্থান থেকে শুধু বাংলা মাসের নাম আসেনি, বাংলা দিন এর নাম ও এসেছে। মিলিয়ে দেখুন। পহেলা বৈশাখ কে না হয় হিন্দুয়ানী বলে এড়াবেন, কিন্তু শুক্র বা শনিবারকে এড়াবেন কী করে?
এই নক্ষত্রের গ্রহের অবস্থান ভিত্তিক বর্ষ গণনা পদ্ধতি কি হাজার বছর ধরে অবিকৃত? না৷ বহুবার এর সংস্কার হয়েছে, নক্ষত্র বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে ভুল সংশোধন করা হয়েছে প্রয়োজন মত৷ এই মুহুর্তে যে নক্ষত্রভিত্তিক বর্ষপঞ্জীটি ব্যবহৃত হচ্ছে তার বয়স ১৯৪০ বছর৷ অর্থ্যাৎ আজ শকাব্দ ১৯৪০, বঙ্গাব্দ ১৪২৫ আর হিজরী ১৪৪০. অর্থ্যাৎ সংশোধিত এই বর্ষপঞ্জিটি হিজরী সাল প্রবর্তনের ৫০০ বছর আগের৷ স¤্রাট আকবর যে ফসলি সাল টি সংস্কার করেন তার বয়স ১৪২৫ বছর, সেটা আসলে শকাব্দ আর হিজরী সাল মিলিয়ে। অর্থ্যাৎ বর্তমানে যে বিশুদ্ধ পঞ্জিকায় বাংলাবছর টি অনুসরণ করা হয় তাতে হিন্দু মুসলিম দুইয়ের ই ভাগ আছে। হিন্দুর একার নয়।
 আপনি হয়ত ভাবছেন যে, হিন্দু মুসলিম দুই এর যদি হবে তবে কাল বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন পহেলা বৈশাখ পালন করবেনা? এর ও আছে গল্প। ১৯৫২ সালে পশ্চিম বাংলার সরকারের অনুরোধে মেঘনাদ সাহা বাংলা বর্ষপঞ্জীর সাথে শকাব্দের সমন্বয় আরো সংশোধন ও সূক্ষ্মতানয়ন করেন। ১৯৬৩ সালে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও বাংলা সাল গণনায় কিছু সংস্কার করেন৷ যেমন, নক্ষত্র ভিত্তিক দিন গণনার পদ্ধতিতে একটি মাস ৩২ দিন ও হতে পারে। যেমন শ্রাবণ মাস প্রায়ই ৩২ দিনের হয়,  শ্রবণা নক্ষত্রের আয়তনের কারণে পৃথিবীর সাথে তার সরণে সময় লাগে বলে৷ আবার পূষ্যা নক্ষত্রের সরণ ভেদে পৌষ মাস ২৯ দিনের ও হয়। তবে বছরের মোট দিন ৩৬৫ ই থাকে। কোন বছর কোন মাস কতদিনের হবে তা নক্ষত্রের পল দন্ড অবস্থান বুঝেই হিসেব করা হয়। এই কারনেই হিন্দু বাড়িগুলোতে আজও ঠিক ক্যালেন্ডারে চলে না, একটি পঞ্জিকাও প্রয়োজন।
কিন্তু ভাষাবিদ ডক্টর শহীদুল্লাহ্ এই নক্ষত্রভিত্তিক চর্চাটি অস্বীকার করে যে বাংলা ক্যালেন্ডারটি করেন তাতে শুধু মাত্র হিসাবের সুবিধার জন্য বাংলা বছরের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনের আর আর পরের সাত মাস ৩০ দিনের হবে বলে ঠিক করেন। অর্থাৎ গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে মাথা ঘামাবার আর প্রয়োজন নেই৷ গ্রেফ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার এর নীচে আংগুল এর কর গুনে বাংলা তারিখ বসিয়ে দেয়া। তাতে যে বাংলা পঞ্জিকা মেনে চলা মানুষ গুলোকে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে তা আর কারোর মাথাতেই এলো না। ভাষাবিদ মহাশয় ও নন। তখন তো আর সংখ্যায় ৫% ছিলনা তারা। তবু ভাবেনি। কারন পাকিস্থান বা বাংলাদেশ, কেউই তার সংখ্যালঘুদের ভাবার কথা নিজের শেকড়ে অনুভব করেনি কোনকালেই।
কাহিনী এখানেই শেষ নয়। পাকিস্থানি আমলে ৬৩ সালের সংশোধিত বাংলা ক্যালেন্ডার নিয়ে খুব বড় প্রভাব না দিলেও বাংলাদেশ সরকার ডক্টর শহীদুল্লাহর ক্যালেন্ডারটিই নিলেন৷ আর ১৯৯৫ সালে ঠুকে দেয়া হল শেষ পেরেক। সরকার এর পরামর্শ নিয়ে বাংলা একাডেমি শুধু বাংলা ক্যালেন্ডার আরেকবার সংস্কার করলেন যাতে ইংরেজি ঐতিহাসিক তারিখ এর মত বাংলা তারিখ ও নির্দিষ্ট করে দেয়া হল৷ ফলে কী সর্বনাশটা হলো জানেন? আপনি যখন কবিতায় পড়ছেন যে ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলার ওয়াক্ত আর সেদিন ছিল ফাল্গুনের আট তারিখ, ১৯৯৫ এর ক্যালেন্ডারে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো যে ২১ ফেব্রুয়ারি মানে ৯ ফাল্গুন। পহেলা বৈশাখ মানে ১৪ এপ্রিল, এটাই নির্দিষ্ট। পলিটিক্স বুঝলেন কিছু?
অতএব, গত চৌদ্দ এপ্রিল যারা পহেলা বৈশাখ পালন করতে করেছেন তারা নির্ভয়ে থাকুন। আপনারা যে দিনটি পালন করলেন তা নির্ভেজাল মেডইন পাকিস্থানি ও এসেম্বেল্ড ইন বাংলাদেশ। হিন্দুরা পনের সেদিন চৈত্র সংক্রান্তি পালন করেছে। পাজন খেয়েছে, চৌদ্দ শাক খেয়েছে, আট পদের ফলার খেয়েছে, সকাল বেলা বিষকাটালির ডাল পুড়িয়ে বলেছিলো পুরাতন বছরের সাথে সাথে দুনিয়ার সব অশুভ শক্তি দূর হোক! নতুন বছরে মঙ্গল হোক জগতের।
কারণ, ওদিন অশ্লেষানক্ষত্র পৃথিবীর সাথে দক্ষিণ কোণে ৫৪ পল ২১ অনুপল ও ৫৩ দন্ডে রাত্রি ৩ টা ৩৬ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড পর্যন্ত অবস্থান করার পর রেবতী ও বৈশাখ নক্ষত্রের অমৃত যোগে ১৯৪১ শকাব্দের ১৪২৬ বংগাব্দের বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি শুরু হয়েছে।
কিন্তু সে হিসেব নিয়ে চিন্তিত হবার কোনই কারণ নেই আপনার। আপনি বরংচ নির্ভাবনায় সম্রাট আকবর, মেঘনাদ সাহা ও প্রাচীন নক্ষত্রবিজ্ঞানের হিন্দুয়ানী স্পর্শ মুক্ত খাঁটি বাংলাদেশী বাংলা নববর্ষই পালন করুন।
দ্বিজাতীতত্বের যে আবর্জনা আপনাদের মগজে আপনারা জন্ম থেকে লালন করে আসছেন ওটা অত সহজে পরিস্কার হবার বিষয় নয়। দুলাল ভট্টাচার্য্যর রথযাত্রায় যাওয়া আর সৈয়দ দুলালের মহানবীর জন্মদিন পালন দিয়ে যারা জাতীয়তাকে খন্ডিত করে তাদের মগজের দেউলিয়াপনাটা তাদের একান্তই নিজেদের। মানুষের পরিচয় টিকি বা টুপি দিয়ে হয়নি কখনো; বরংচ মনুষত্বের পরিচয়টা প্রকাশের জন্য ওই পোশাকী পরিচয়টা অন্তরালে নেয়াই মানবিকতা আর প্রগতিশীলতার পরিচয়। সেজন্য আপনাকে আরো জানতে হবে, পরতে হবে, বুঝতে হবে, চর্চা করতে হবে; সর্বোপরি মনের বদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে হবে। তবেই পাবেন জাতীয়তার আসল স্বাদ।


তথ্যসূত্র:
১। সোনম সাহা, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার
২। বঙ্গাব্দের উৎস কথা- সুনীল কুমার বন্দোপাধ্যায়
৩। বাঙলা সন ঃ বঙ্গ, বাঙালা ও ভারত- ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

No comments:

Post a Comment

অনুকুল: সত্যজিৎ রায়ের এআই নিয়ে ভাবনা

সত্যজিৎ রায়ের মূল ছোটগল্প অনুকূল প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে; যা তাঁর জনপ্রিয় সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ সালে তাঁর গল্প সংকলন অশ্...